ছবির পার্থক্য খোঁজো-৩
বুদ্ধির খেলা

ছবির পার্থক্য খোঁজো-৩

ছবিতে দশটি পার্থক্য খোঁজো। শেষে উত্তরের সাথে মিলিয়ে দেখো ১. ২. ৩. ৪. ৫. ৬. ৭. ৮. ৯. ১০. 🔍 পার্থক্যগুলো দেখতে এখানে ক্লিক করুন বাঁ পাশে কাঁকড়া আছে, ডান পাশে নেই। ডান পাশে বালুর দুর্গ আছে, বাঁ পাশে নেই। সূর্যের রশ্মির সংখ্যা দুই ছবিতে ভিন্ন। মেয়েটির ডান হাতের আঙুলের ভঙ্গি আলাদা। বাঁ পাশে একটি বল আছে, ডান পাশে নেই। বাঁ পাশে ছোট হলুদ তারা মাছ আছে, ডান পাশে নেই। মেয়েটির স্কার্টের ডিজাইনের রেখা দুটি ছবিতে ভিন্ন। মাটির ঘাসের অবস্থান ভিন্ন। বাঁ পাশে মেয়ের ডান পায়ের জুতা গোল, ডান পাশে কোণাকুণি। পিছনের ঢেউয়ের আকৃতি ভিন্ন।

গোপালের পড়া
বিখ্যাতদের লেখা, বিখ্যাতদের লেখা গল্প, হাসির গল্প

গোপালের পড়া

গোপালের পড়া সুকুমার রায় দুপুরের খাওয়া শেষ হইতেই গোপাল অত্যন্ত ভালোমানুষের মতন মুখ করিয়া দু-একখানা পড়ার বই হাতে লইয়া তিনতলায় চলিল। মামা জিজ্ঞাসা করিলেন, কিরে গোপলা, এই দুপুর রোদে কোথায় যাচ্ছিস? গোপাল বলিল, তিনতলায় পড়তে যাচ্ছি। মামা: পড়বি তো তিনতলায় কেন? এখানে বসে পড় না। গোপাল: এখানে লোকজন যাওয়া-আসা করে, ভোলা গোলমাল করে, পড়বার সুবিধা হয় না। মামা: আচ্ছা, যা মন দিয়ে পড়গে। গোপাল চলিয়া গেল, মামাও মনে মনে একটু খুশি হইয়া বলিলেন, যাক, ছেলেটার পড়াশুনোয় মন আছে। এমন সময় ভোলাবাবুর প্রবেশ বয়স তিন কি চার, সকলের খুব আদুরে। সে আসিয়াই বলিল, দাদা কই গেল? মামা বলিলেন, দাদা এখন তিনতলায় পড়াশুনা করছে, তুমি এইখানে বসে খেলা কর। ভোলা ততক্ষনাৎ মেঝের উপর বসিয়া প্রশ্ন আরম্ভ করিল, দাদা কেন পড়াশুনা করছে, পড়াশুনা করলে কি হয়? কি করে পড়াশুনা করে? ইত্যাদি। মামার তখন কাগজ পড়িবার ইচ্ছা, তিনি প্রশ্নের চোটে অস্থির হইয়া শেষটায় বলিলেন, আচ্ছা ভোলাবাবু, তুমি ভোজিয়ার সঙ্গে খেলা কর গিয়ে, বিকেলে তোমায় লজেঞ্চুস এনে দেব। ভোলা চলিয়া গেল। আধঘণ্টা পর ভোলাবাবুর পুনঃপ্রবেশ। সে আসিয়াই বলিল, মামা, আমিও পড়াশুনা করব। মামা বলিলেন, বেশ তো আর একটু বড় হও, তোমায় রঙচঙে সব পড়ার বই কিনে এনে দেব। ভোলা: না সেরকম পড়াশুনা নয়, দাদা যে রকম পড়াশুনা করে সেইরকম। মামা: সে আবার কি রে? ভোলা: হ্যাঁ, সেই যে পাতলা-পাতলা রঙিন কাগজ থাকে আর কাঠি থাকে, আর কাগজে আঠা মাখায় আর তার মধ্যে কাঠি লাগায়, সেই রকম। দাদার পড়াশুনার বর্ণনা শুনিয়া মামার চক্ষু স্থির হইয়া গেল। তিনি আস্তে আস্তে পা টিপিয়া টিপিয়া তিনতলায় উঠিলেন, চুপি চুপি ঘরের মধ্যে উঁকি মারিয়া দেখিলেন, তাঁর ধনুর্ধর ভাগ্নেটি জানালার সামনে বসিয়া একমনে ঘুড়ি বানাইতেছে। বই দুটি ঠিক দরজার কাছে তক্তপোশের উপর পড়িয়া আছে। মামা অতি সাবধানে বই দুখানা দখল করিয়া নিচে নামিয়া আসিলেন। খানিক পরে গোপালচন্দ্রের ডাক পড়িল। গোপাল আসিতেই মামা জিজ্ঞাসা করিলেন, তোর ছুটির আর কদিন বাকি আছে? গোপাল বলিল,আঠারো দিন। মামা: বেশ পড়াশুনা করছিস তো? না কেবল ফাঁকি দিচ্ছিস? গোপাল: না, এইতো এতক্ষণ পড়ছিলাম। মামা: কি বই পড়ছিলি? গোপাল: সংস্কৃত। মামা: সংস্কৃত পড়তে বুঝি বই লাগে না? আর অনেকগুলো পাতলা কাগজ, আঠা আর কাঠি নিয়ে নানা রকম কারিকুরি করার দরকার হয়? গোপালের চক্ষু তো স্থির ! মামা বলে কি? সে একেবারে হতভম্ব হইয়া হাঁ করিয়া মামার দিকে তাকাইয়া রহিল। মামা বলিলেন, বই কোথায়? গোপাল বলিল, তিনতলায়। মামা বই বাহির করিয়া বলিলেন, এগুলো কি? তারপর তাহার কানে ধরিয়া ঘরের এক কোণে বসাইয়া দিলেন। গোপালের ঘুড়ি লাটাই সুতো ইত্যাদি সরঞ্জাম আঠারো দিনের জন্য মামার জিম্মায় বন্ধ রহিল। লেখা ও ছবি: সংগৃহীত বাংলা গল্প

স্মেল রেকর্ডার
গল্প, প্রযুক্তি ও সাহিত্য, সায়েন্স ফিকশন

স্মেল রেকর্ডার

স্মেল রেকর্ডার প্রিন্স মাহমুদ হাসান ১. রেকর্ডার. খুন… রেকর্ডার. চারপাশে হট্টগোল। প্রফেসর শামসুজ্জোহা দুষ্কৃতকারীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। কখন খুন হয়েছেন তা কেউ কিছুই জানে না । সকাল বেলায় ধান খেতে ওনার লাশটি পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে মৃতদেহ তুলে নিয়ে গেছে। শামসুজ্জোহা ছিলেন খুবই ভদ্র লোক। তার কোন শত্রু থাকতে পারে তা কারোই ধারণা ছিল না। পুলিশ সন্দেহভাজন কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও কোন কূল কিনারা করতে পারছে না। প্রফেসর শামসুজ্জোহা বিজ্ঞানী হিসেবে সমাদৃত ছিলেন। গবেষণার পিছনে সময় দিতে গিয়ে বিয়ের কাজটিও সম্পন্ন করতে পারেননি। পুরো দেশজুড়ে ওনার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। টেলিভিশন, পত্রিকা, রেডিও সব জায়গাতেই ওনার চাঞ্চল্যকর মৃত্যুকে ঘিরে নানা ধরণের সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকলো। কিছুদিন যেতেই আস্তে আস্তে সবাই যেন ঝিমিয়ে পড়লো। অন্যান্য মৃত্যু সংবাদের মত ওনার মৃত্যু সংবাদটাও স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়াল। ওনার কথা এখন আর কেউ সেভাবে তুলে ধরছে না।  সবাই যেন তাঁকে ভুলতে শুরু করলো। ততদিনে প্রফেসর ইসমাইল হুসেন বিজ্ঞানী হিসেবে পুরো বিশ্বে সমাদৃত হয়ে গেছেন। ইসমাইল হুসেন এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছেন যার দ্বারা অডিও বা ভিডিও কলের মত স্মেল বা গন্ধকে রেকর্ড করে রাখতে পারে। এই যন্ত্র দ্বারা কারও প্রিয় গন্ধকে ধারণ করে যেকোন সময় অবিকল সেই গন্ধটিই ফিরে পাওয়া সম্ভব। যা সহজে ধ্বংস হবে না, যখন খুশি তখনই স্নেল রেকর্ডার চালু করলেই হলো। প্রফেসর ইসমাইল হুসেন বাণিজ্যিকভাবে যন্ত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ শুরু করে দিলেন। স্নেল রেকর্ডার বিক্রয় করে তিনি অল্প সময়ের ব্যবধানে বিজ্ঞানী থেকে ধনকুবের ব্যবসায়ী হয়ে ওঠলেন। তার কারখানায় এখন বেশ কয়েকশো লোক কাজ করে। মো: হামিদ ছিলেন কর্মীদের মধ্যে অন্যতম একজন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ, মেধাবী এবং ধুরন্ধর। তার আরেকটি পরিচয় হলো তিনি প্রফেসর শামসুজ্জোহার ছাত্র। তবে বিষয়টি ইসমাইল হুসেনের অজানা ছিল। হামিদ প্রফেসরের খুনকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। প্রফেসর শামসুজ্জোহার খুনের পিছনে তার সন্দেহের তীর প্রফেসর ইসমাইলের দিকেই। ২.  হাশেম মিয়া প্রফেসর ইসমাইল হুসেনের একজন বিশ্বস্ত গৃহকর্মী। ইসমাইল হুসেনের বাড়ির সমস্ত খুঁটিনাটি ছিল তার নখদর্পণে, শুধু একটি মাত্র ছোট কক্ষ ছাড়া। যে কক্ষে প্রফেসর তার সারাদিন-রাত ব্যয় করেন। ইসমাইলের বাড়িতে আসা যাওয়ার সূত্র ধরে মো: হামিদের সাথে হাশেম মিয়ার ভালো সখ্যতা গড়ে ওঠে। হাশেম মিয়ার সব কিছুতেই জানার খুব আগ্রহ। বিষয়টি হামিদের নজরে পড়তে বেশিদিন সময় ব্যয় করতে হয়নি। তাই হামিদ চিন্তা করলেন হাশেম মিয়ার এই আগ্রহটাকেই কাজে লাগাবেন। ইদানিং প্রফেসর ইসমাইল হামিদকে সবার চেয়ে বিশ্বস্ত ভাবা শুরু করেছেন যা ছিল হামিদের পরিকল্পনার একটি অংশ। আসল ঘটনা বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রফেসরের বাসায় হামিদের আসা যাওয়া করতে হয়। আর হামিদ সেই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। বাসায় আসা যাওয়ার সূত্র ধরে হাশেম মিয়ার সাথে আন্তরিকতা বাড়াতেও দক্ষতার ছাপ রাখেন মোঃ হামিদ। এভাবে আরও বেশ কয়েক বছর সব স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকলো। একদিন প্রফেসর ইসমাইল ভুল করে তার চশমা বাসায় ফেলে আসেন । তিনি চশমা আনার জন্য হামিদকে তার বাসায় পাঠান। হামিদ হাশেমকে চশমা খুঁজে আনতে বলে ড্রইং রুমে বসলেন। ড্রইং রুমে বসতেই তার চোখ-মুখে যেন আনন্দের ঢেউ বয়ে গেলো। ড্রইংরুমের সোফার কাছে প্রফেসরের চশমাটি পড়েছিল। চশমাটির ঠিক পাশেই একটি চাবি চকচক করতে লাগলো। হামিদ চশমাটি দ্রুত লুকিয়ে ফেললেন আর চাবিটা টি-টেবিলের ওপর রেখে দিলেন। চশমা খোঁজার ছুতোয় মোঃ হামিদ হাশেমকে নিয়ে প্রফেসরের সেই গোপনীয় কক্ষে প্রবেশ করলেন। কক্ষে প্রবেশ করার পরপরই তারা অবাক হয়ে গেলেন। কক্ষ খোলার সাথে সাথেই সুগন্ধির গন্ধে তাদের প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। তবে মো: হামিদের কাছে ঘ্রাণটি খুবই পরিচিত মনে হলো। হামিদের মনে হচ্ছিল প্রফেসর শামসুজ্জোহা যেন তার কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন। হাশেমের নজর এড়িয়ে হামিদ পকেট থেকে একটি রুমাল বের করে একটি অব্যবহৃত বোতলের ছিপি পকেটে লুকিয়ে ফেললেন। তিনি মনে করেন এই ছিপিটিই প্রফেসর শামসুজ্জোহার আসল খুনিকে পাইয়ে দেবে। হয়তো তিনি যা ধারণা করছেন তা-ই সঠিক। আবার না-ও হতে পারে। হাশেম চশমা খুঁজতে ব্যর্থ হয়ে যখন কক্ষ থেকে বের হতে যাচ্ছিল তখনই হামিদের চতুরতায় হাশেম চশমাটির সন্ধান পায়। তবে তা হামিদের পকেটে নয়, কক্ষের এক কোণে আধখোলা অবস্থায় চশমাটি পড়েছিল। চশমাটি হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই হাশেম দ্রুত কক্ষটি লাগিয়ে ফেললেন। ৩. হামিদ রাতে কাজ শেষে বাসায় এসে প্রফেসর ইসমাইলের বাসা থেকে পাওয়া বোতলের ছিপিটি একটি বাল্বের সামনে রেখে পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখতে লাগলেন। তিনি খেয়াল করলেন ছিপিটির একপাশে সামান্য ক্ষয়প্রাপ্ত। প্রফেসর শামসুজ্জোহার কক্ষ থেকে উদ্ধারকৃত একটি বোতল হাতে নিয়ে পরখ করতেই হামিদ চমকে উঠলেন। বোতলের গায়ে দাগ পর্যবেক্ষণ করে বোঝা যায় ছিপিটা এই বোতলেরই। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন প্রফেসর শামসুজ্জোহার সাথে প্রফেসর ইসমাইলের কোন যোগসূত্র আছে। পরদিন প্রফেসর ইসমাইল পুলিশের হাতে গ্রেফতার হতেই কারও বুঝতে বাকি রইল না যে প্রফেসর শামসুজ্জোহার আসল খুনি কে। জানা যায় বেশ কিছুদিন আগে প্রফেসর শামসুজ্জোহা এক জায়গায় একটি ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখেছিলেন। তিনি ব্যাগের মালিককে খুঁজে ব্যাগ বুঝিয়ে দিতে গেলেই বাঁধে বিপত্তি। ব্যাগটি আর কারও নয়, ব্যাগটি ছিল প্রফেসর ইসমাইলের। ইসমাইল চাননি তার আবিষ্কারের পেটেন্ট সম্পর্কে আগে থেকেই কেউ কিছু জেনে যাক। প্রফেসর ইসমাইলের সন্দেহ হতে থাকলো এই ব্যাগটি যিনি পেয়েছিলেন তিনি নিশ্চয়ই তার আবিষ্কার সম্পর্কে কিছু না কিছু জেনে গেছেন। না হলে উনি কী করে ইসমাইলের হদিস পাবেন। তার উপর যিনি পেয়েছিলেন তিনিও একজন বিজ্ঞানী। তাই প্রফেসর ইসমাইলের মাথায় খুনের ইচ্ছা চেপে বসল। তবে দু’টি বিষয় হামিদের মাথায় খটকা লাগলো। ইসমাইল প্রফেসর শামসুজ্জোহাকে মারার উদ্দেশ্যে পিস্তল চালালেও তিনি তার বুকে দূর থেকে একটি মাত্রই গুলি করেছেন। গুলি ভেদ করার পর প্রফেসর শামসুজ্জোহাকে পড়ে যেতে দেখেই তিনি দ্রুত পালিয়ে যান। তাহলে শামসুজ্জোহার শরীরে যে আঘাতের চিহ্ন সেগুলো আসলো কীভাবে! স্মেল রেকর্ডার যে প্রফেসর ইসমাইল আবিষ্কার করেছেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তাহলে যে বোতলটি খুনিকে পাইয়ে দিলো সেটিই বা ইসমাইলের বাসায় আসলো কীভাবে? বাংলা গল্প

বিকেল বেলা খুশির মেলা
গল্প, নির্বাচিত লেখা, শিশু সাহিত্য

বিকেল বেলা খুশির মেলা

বিকেল বেলা খুশির মেলা স্বপনকুমার রায় বিকেল বেলা খুশির মেলা জল টলটল ঢেউ তিরতির একটা নদীর তীরে। সেই নদীকে ঘিরে, আজকে আমার গল্প। বলতে পারো গল্পটাতে মজা আছে, দুঃখ আছে অল্প। নদীর তীরে কী যেন এক গ্রাম। জানা নেই তার নাম। থাক না ওসব, কী আসে যায় তাতে। সেই গ্রামে তো সূর্য ওঠে, ফুটফুটে চাঁদ জোছনা ছড়ায় রাতে। গ্রামের মাঝে বিশাল মাঠ নরম ঘাসে ঢাকা। চারদিকে তার গাছগাছালি সবুজ রঙে আঁকা। বিকেল হলে সেই সে মাঠে বসে খুশির মেলা। সারা গ্রামের ছোটরা এসে করে নানান খেলা। কেউ খেলছে কানামাছি, কেউ খেলছে বউ-বসন্তি কেউবা রুমাল চুরি। কেউ খেলছে কুমির-ডাঙা কেউ ওড়াচ্ছে ঘুড়ি। হা-ডুডু, কেউ রবারের ছোট বল। সারা মাঠ জুড়ে কেবল খুশির ঢল। বন্ধুরা বল খেলার জন্য দুটো দলে ভাগ করে নিল। তাতাই বিল্টুরা একটা দল আর বিতানরা একটা দল। দু’দল মিলে খেলছিল সেই বল। খেলতে খেলতে কষ্ট হলে তাতাই মাঠের পাশে, হাঁপিয়ে উঠে বসল গিয়ে ঘাসে। এদিকে, বল নিয়ে ছুটতে ছুটতে বিল্টু গিয়ে যেই দিয়েছে গোল, তাতাই দেখে ঘাসের মধ্যে ফড়িং খোকাদের ‘গোল হয়েছে, গোল হয়েছে’ বলে, আনন্দেতে কতই কলরোল। গুবরে পোকারা ছিলো বিতানদের পক্ষে। বিতানদের টিম গোল খেয়েছে। এখন নেই তো তাদের রক্ষো ফড়িংয়ের দলের সে কী টিটকিরি। নানা রকম ছিরি। হাসতে হাসতে নাচতে নাচতে করছে কতই ভঙ্গি। যত ছিল ফড়িং দলের সঙ্গী। গুবরের মুখে চুন, লজ্জায় রাগে মুখ লাল। সময় আছে, বিতানের দল এখনই ছাড়বে কেন হাল? এবারে বিতানের দল খুব সিরিয়াস। উরিব্বাস। বল নিয়ে ছুটছে জোরে, আরও জোরে, করছে পাস। কী নিখুঁত! আরে ধুৎ! বিকেল বেলা মজার খেলা পাস্ ভুল, বল আবার বিল্টুদের পায়ে। জমে উঠেছে খেলা, আজকে বিকেলবেলা। এদিকে ফড়িং আর গুবরে, পড়বে কে মুখ থুবড়ে? কাদের হবে জিৎ? দেখছে তাতাই, পাচ্ছে মজা। ওদের মাঝে ঘাসে বসে সে-ই তো উপস্থিত। ওদিকে উঠছে ঘুড়ি আকাশ নীলে। বউ-বসন্তি, রুমাল চুরি খেলছে ওরা সবাই মিলে। এদিকে ছোট রবারের বলে বিল্টু আর বিতানদের জেতার লড়াই চলে। চলছে লড়াই আরও। গুবরে আর ফড়িং-দের মধ্যে সেটাও বলতে পারো। ক্রমে ক্রমে বল খেলা উঠেছে জমে। বল আবার বিতানদের দখলে গেছে এসে। দেখা যাক কী হয় শেষে! চলছে দারুন লড়াই। গুবরে বলে ওরে ফড়িং করিস না আর বড়াই। এক্ষুনি দেখ শোধ হবে তোর গোল। সবুর কর না পাল্টে দেব তোদের মুখের বোল! টানটান উত্তেজনা। সারা মাঠ জুড়ে ছোটদের আনাগোনা। বল একবার বিতানদের কাছে তো একবার বিল্টদের কাছে। খেলার সময় যত হয়ে আসছে শেষ। সবার মধ্যে ততই যেন বাড়ছে ব্যস্ততার রেশ। রুমাল চুরি খেলায় কে হবে চোর! কুমির-ডাঙায় কে হবে কুমির! বউ বসন্তি খেলায় জিতবে কারা, তা নিয়েও চলছে লড়াই জোর। এদিকে বিতান মাঝমাঠে বল পেয়েছে নিজে। কাটিয়ে নিয়ে এক একজনকে ছুটছে জোরে কী যে। তারপর গোলের কাছে গিয়ে মারলো যেই শর্ট, হয়ে গেল গোল। গুবরে পোকার মনে তখন খুশির কলরোল। বিকেল বেলা বিল্টু রেগে গিয়ে বলটাকে বিল্টু মারল জোরে। বলটা গিয়ে পড়ল মাঠের প্রান্তে। যেখানে ছিল গুবরে পোকার দল, পারল না কেউ জানতে। বলের আঘাতে একটা গুবরে পোকার পায়ে লাগলো ভীষণ চোট। প্রচন্ড যন্ত্রণা, কি হবে এবার। বলছে সবাই ডাক্তারের কাছে ছোট। ফড়িংদের মধ্যে ছিল একজন ডাক্তার-ফড়িং। সে এই অবস্থা দেখে ছুট্টে গিয়ে কী সব ঘাসপাতা নিয়ে জাব বানালো চিবিয়ে চিবিয়ে। তারপর গুবরের পায়ে দিল লাগিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে গুবরে উঠলো সেরে। সবার মনে তখন আবার খুশির হাওয়া ফেরে। খেলা শেষ হয়েছে। বিতান ও বিল্টু দু’দলের মনই খুশি, যেন ভাই-ভাই। কিন্তু তাতাই! সে ফড়িং আর গুবরেদের কান্ড দেখছিল। আর অবাক হচ্ছিল। একটু আগে যারা ছিল বিপক্ষ, ছিল দলাদলি। কেমন করে বলি, যখন বিপদ এলো গুবরে পোকার, তখন কে ফড়িং আর কে গুবরে। সবাই তো পোকা। ওরা কী আর মানুষের মত বোকা ! তাই মিলেমিশে একাকার। ফড়িং এলো গুবরেকে সারিয়ে তুলতে। তাতাই দেখে অবাক, পারছে না এই দৃশ্যটাকে ভুলতে। ভাবছে, মানুষের মধ্যে যদি এমন সম্ভাব থাকতো, তবে হতো কি এত বিবাদ, এত ধ্বংস? বিশ্বজুড়ে হাসত সবাই খুশির খেলায় সবাই নিত অংশ….. বাংলা গল্প

ঘুম ও স্বপ্নের দোলাচলে
গল্প

ঘুম ও স্বপ্নের দোলাচলে

ঘুম ও স্বপ্ন ঘুম ও স্বপ্নের দোলাচলে চন্দনকৃষ্ণ পাল ঘুম ও স্বপ্ন ভবের বাজার এসে বাস থেকে নামলাম। নাড়িভূড়ি হজম হয়ে গেছে । পেট চো চো করছে। একটা বেকারীতে গিয়ে কিছু বিস্কুট নিয়ে বহু কষ্টে গলাধঃকরণ করি। আর মাত্র দেড় ঘণ্টা সময় আছে। ঠিক তিনটায় ইন্টারভিউ। এখন দেড়টা বাজে। যেতে হবে নৌকায় করে পুরো চার মাইল। ঘণ্টা সোয়া ঘন্টায় নাকি পৌঁছা যায়। কি জানি কি হবে। জীবনে এই প্রথম নৌকো চড়তে যাচ্ছি। নৌকার নাম গয়না। চমৎকার ঘোমটা দেয়া। আমার সাথে আরও চার পাঁচ জন নৌকোয় ওঠেন। নৌকা ভীষণ রকম দোলে। আমার ভয় লাগে, ছিটকে পড়ি কিনা। দুলুনি থামলে মাঝি নৌকো ছাড়ে। বেশ মসৃণ ভাবে এগোয় নৌকা। চমৎকার একটা অনুভূতি। আমি ঘোমটার বাইরে এসে দাড়াই। ভাদ্রের মেঘলা আকাশ। খালে টলটলে জল ভাটির দিকে বইছে। আমাদের নৌকার গতিও একই দিকে। খালের পাশেই রাস্তা। মাঝিকে জিজ্ঞস করে জানা যায় বেশ কটা ব্রীজ ভাঙ্গা। তাই বাস রিক্সা জগন্নাথপুর পর্যন্ত পৌঁছোয় না। শীতকালে রাস্তা কেটে ভাঙ্গা ব্রীজের পাশ দিয়ে বাস রিক্সা যাওয়া আসা করে। নৌকো এগোচ্ছে। দুপাশে বাড়ি ঘর গাছপালা। শৈশব স্মৃতি ও বিলের দৃশ্য পাখির ডাক। চমৎকার গ্রামীন পরিবেশ ভালো লাগে। একটা প্রাইমারী স্কুল পার হই আমরা। নানা বয়সের ছেলেমেয়ে রঙ্গিন জামা পরে কলরব করছে। বোধ হয় টিফিন আওয়ার চলছে। গ্রামের স্কুলে টিফিন আওয়ারে কোন বাচ্চারা কি টিফিন করে? আমরা তো করিনি। সকাল বেলা গরম ভাত খেয়ে স্কুলে গিয়েছি। টিফিন আওয়ারে হৈ চৈ দুষ্টুমী করে কাটিয়েছি। আবার বিকেল চারটার পর বাড়ি ফিরে ভাত খেয়েছি। শহরের টিফিন আওয়ার আর গ্রামের টিফিন আওয়ারে কতো পার্থক্য! একটা বিলের মতো জায়গার ওপর দিয়ে নৌকো যাচ্ছে। পানিতে প্রচুর সাদা শাপলা আর পানি ফল। তিরতির করছে জল পোকারা। আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ। দূরে জলের গা ছুঁয়ে গ্রাম আর গ্রাম। ঘুম ও স্বপ্ন এবং কিছু আশা ঘন্টা খানেক পর দূরে কিছু বিল্ডিং চোখে পড়ে। মাঝিকে জিজ্ঞস করলে জানায় ও গুলো উপজেলা অফিস। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌছে যাবো এ শান্তনা টুকু দিতেও ভুলেনা মাঝি। তিনটার মাত্র কমিনিট আগে নৌকা উপজেলার পাশে মাঠের গায়ে লাগে। উপজেলার যাত্রী আমি একাই। অন্যান্য বা বাজার পর্যন্ত যাবে । আমি কোণাকোণি মাঠ পাড়ি দিয়ে উপজেলায় পৌঁছাই। গেটে বড় করে লেখা জগন্নাথপুর উপজেলা কার্যালয়। পুরনো সিও অফিসে বসেন নির্বাহী অফিসার। বাকী সবাই স্কুল ঘরের মতো লম্বা টিনের দুচালা ঘরে বসে কাজ কর্ম চালান। পাশে বিশাল দুটো দুতিন তলা বিল্ডিং এর কাজ চলছে। আমার মতো ফাইল হাতে (কারো কারো হাতে ব্যাগ) ভদ্রলোকের সংখ্যা বেশ কজন। একজন মহিলাকেও ইতস্তত হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যাচ্ছে। ইন্টারভিউ নেবেন ইউএনও এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এটা বুঝাই যায়। ইন্টারভিউ শুরু হয়নি। কিছুক্ষণ কাটে। পেটের ভেতর ছুচুর দৌড়োদৌড়ি। হাঁটাহাঁটি করতে করতে চা স্টলের দেখা পাওয়া যায়। পাউরুটির টুকরো আর চা তে আপাততঃ ক্ষুন্নিবৃত্তির রফা। পূর্বস্থানে ফিরে আসতেই দেখা যায় হালকা পাতলা এক ভদ্রলোক ঢুকছেন ইউএনও সাহেবের রুমে। এই ভাদ্রের তালপাকা গরমেও কালো কোট কালো প্যান্ট। আশপাশের ফিসফিসানী জানান দেয় চেয়ারম্যান। উপজেলা না ইউনিয়ন পরিষদের বুঝা যায় না।  ইন্টারভিউ শুরু নির্বাহী সাহেবের পিয়ন সাহেব টুল নিয়ে দরোজায় বসতেই অনেকের এগিয়ে যাওয়া। সবার সাথে নিজেও। পিয়ন সাহেবের বক্তব্য ‘এক্ষণই ইন্টারভিউ শুরু অইব। পয়লা স্যার হকলোর এর পরে বাকী সব।’ আমি তো স্যার না কেরানী পদ প্রার্থী। মনটা দমে যায়। দুপুর সাড়ে তিন। ফিরে যেতে পারবো তো? ইন্টারভিউ শুরু হয়। তিন জনের পর সেই ম্যাডাম। বেশ দেরী করে ম্যাডাম বের হন। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। পিয়নের চিৎকার। আমার নিজের নাম শুনে গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতর ড্রামের শব্দ । ফাইল বগলে চেপে ভেতরে পদার্পন এবং জোর করেই স্লামালেকুম । এক সঙ্গে তিনটি কণ্ঠ বসুন বসুন। আমি নিজেকে চেয়ারে ছেড়ে হাফ ছাড়ি। একে একে চোখ রাখি কর্তাদের দিকে। নির্বাহী সাহেবকে উনার চেয়ারই চিনিয়ে দেয়। বাকী চারজনের তিনজনই কালো কোট। এর একজন সেই চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান সাহেবের ঠোঁটের কোণে পানের লালা প্রমাণ করে ভদ্রলোক পানের প্রতি ভীষণ আসক্ত। আমার দেয়া এপ্লিকেশন কাগজপত্রসহ ইউএনও সাহেবের সামনে। ভদ্রলোক সন্দেহ ভরা চোখে জিজ্ঞেস করেন- – এপ্লিকেশন নিজে লিখেছেন? -জী। ভদ্রলোকের চোখে মুখে অসন্তুষ্টি। -বর্তমানে কি করছেন? কালো তিন কোটের এক কোট। -জী টিউশনি। – অন্য কিছু নয়? -জী মাস্টার্সে এডমিশন আছে। তবে ঢাকায় থেকে ক্লাশ করা সম্ভব নয় বলে চাকুরীর চেষ্টা করছি। -হুম। খান সাব আপনি জিজ্ঞেস করেন। এক কোট অন্য কোটকে অনুরোধ করেন -পড়াশুনা তো করছেন, আবার চাকরির চেষ্টা করছেন কেন? -পড়াশুনা করছি ঠিক না। এডমিশন আছে। বেকার তাই। ইন্টারভিউ ও উৎকিণ্ঠা সবকিছু থমথমে। এরপর ইউএনও এবং ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব একে একে সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রশ্ন করেন। তিন কোট আমাকে দেখতেই থাকেন। এক সময় ইউএন ও সাহেব বাহিরে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেন। আমি বাইরে আসতেই কয়েক জন ছেকে ধরে। -কি বললো ভাই। -ভাই বহু কিছু। সব সাধারণ জ্ঞান। দুএক জন সাধারণ জ্ঞানের বই খুলে শেষ মুহূর্তের সঞ্চয়টা করে নেয় । আমি হাসি। চাকরি। চুপচাপ বসে থাকি। আধঘন্টার মধ্যে একাউন্টেন্টদের ইন্টারভিউ ফিনিস। আবার আমার ডাক পড়ে। যাই। -বসুন। আমি নিরবে বসে পড়ি। -চাকরি কি আপনি করবেন? করার জন্যই তো আসা। -কবে নাগাদ জয়েন করতে পারবেন। আমি একটু ভাবি। -দুতিন দিন সময় দিতে হবে। চাকরিটা হয়ে গেল নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলে নিচু গলায়। তিন কোট আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ পর ইউএনও সাহেব গলা খাকারি দেন। সবাই চুপ। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বক্তব্য শুরু করেন। -পাল বাবু আমরা আপনাকে জগন্নাথপুর কলেজের হিসাব রক্ষক হিসেবে নিয়োগ করতে একমত হয়েছি। বেতন ভাতা সরকারী স্কেলে পাবেন। থাকার খাওয়ার ব্যবস্থা আপনার নিজেকেই করতে হবে। অবশ্য আমরা সহযোগিতা করবো। আপনি আজ থেকে যান। আগামীকাল সকাল বেলা নিয়োগ পত্র পেয়ে সম্ভব হলে জয়েন করে যাবেন। আগামী শনিবার থেকে আমরা ক্লাশ করতে চাই। চাকরি হওয়ার পর ইউএনও সাহেব থামেন। আমি বলি ‘ধন্যবাদ স্যার।’ বুঝি কণ্ঠটা যান্ত্রিক হয়ে গেছে। মনের ভেতর একটা অজানা অনুভূতি। ওটা সুখের না দুঃখের তাৎক্ষণিক ভাবে আলাদা করতে পারি না । স্নালামালেকুম জানিয়ে বাইরে এসে নিঃশ্বাস ফেলি। বেশ কজন লোক ঘিরে ধরে। হলো ভাই, হলো। আমি নিরাসক্ত গলায় জানাই ‘না’। না টা মুখ ফসকে নয়, ইচ্ছে করেই বলি। কারণ এখনও নিয়োগ পত্র পাইনি। তিন কালো কোটকে আমার পছন্দ হয়নি। এদের হাব ভাব দেখে আমার মনে হয় ওরা সর্বদা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। এটা একান্তই আমার ভাবনা। ভুলও হতে পারে। ইউএনও অফিস থেকে বের হয়ে উচু ব্রীজ পার হই। সামনে কয়েকটা চা দোকান প্রতিটা দোকানেই কিছু সংখ্যক লোক আড্ডা দিচ্ছে। একটা দোকানে বেশ জোরে শোরে পংকজ উদাস এর এর গজল বাজছে। দোকানদার ভদ্রলোক বুড়ো। কাউন্টারে বসে ঢুলছেন। আমার পেটের ভেতর আবার ক্ষিধে। এবার ঝাল খাবার ইচ্ছে। কিন্তু আশে পাশে পাউরুটি আর বিস্কিট ছাড়া কিছু চোখে পড়ছে না। ধীর পায়ে

ডানা-নিরঞ্জন মণ্ডল
গল্প

ডানা-নিরঞ্জন মণ্ডল

ডানা নিরঞ্জন মণ্ডল ডানা-নিরঞ্জন মণ্ডল ছোট্ট একমাত্র জানালাটার পাশে এসে দাঁড়ায় মুন্নি। ডাগর দুটি চোখ মেলে তাকায় আকাশের দিকে। ছাই রঙের মেঘের দঙ্গল এগিয়ে আসছে আকাশ বেয়ে। বিজলি চমকাচ্ছে মাঝে মাঝে। শেষ বিকেলের আলোটাকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে মেঘ। অন্ধকার হয়ে আসবে এবার। নড়বড়ে দুটি কাঠের পাল্লা জানালায়। সেগুলোকে দুপাশের দেয়ালে প্রায় লেপটে দেয় সে। জং ধরা গ্রিলটা আঁকড়ে ধরে ছোট্ট দুটি হাতে। কাঠের পুরোনো পাল্লাগুলো পলেস্তারা খসতে থাকা দেয়ালে ঠকঠক করছে। খসে পড়ছে বালির গুঁড়ো মেঝেতে। উদাস মুন্নির খেয়ালই নেই কোনো দিকে। ঠায় দাঁড়িয়ে সে, আকাশমুখী। বড় অভিমান হয়েছে তার আকাশটার ওপর। কী সুন্দর খেলছিল সে! ঘরের পাশের অপ্রশস্ত রাস্তাটার দুপাশে নাম না জানা ছোট ছোট গাছ। মাথা ছাঁটা। কোনটার পাতা সবুজ, আবার কোনটার রঙচঙে। কোন কোনটায় ছোট ছোট ফুলও ফুটেছে। সেই ফুলের টানে ছোট ছোট প্রজাপতি উড়াউড়ি করছে। একটি-দুটি নয়—অনেকগুলো। কী সুন্দর রঙিন তাদের ডানা! কখনো পাতায়, কখনো ফুলে বসে। ধরতে হাত বাড়ালেই উড়ে যায়। এ এক মজার খেলা। তার তো কোনো ভাই-বোন নেই! তাই একাই সে সারা বিকেল এভাবেই খেলে, ঘরের পাশে। গত বছর পর্যন্ত তার ঠাম্মি থাকতেন সঙ্গে। মাঝে মাঝে খবরদারি করতেন। কী যে হলো একদিন! সারা রাত ঠাম্মির কাছেই ঘুমিয়েছিল সে, রোজকার মতো। ঘুম আসার আগে শুনেছে পরীদের গল্প। প্রজাপতিরাই নাকি জাদুর ছোঁয়ায় পরী হয়ে যায়! কত গল্পই না জানা ছিল ঠাম্মির! রাজপুত্তুর, পক্ষিরাজ, রাজকন্যে, রাক্ষস, খোক্কস, দত্যি-দানো—আরও কত কী! সব তো শোনা হলো না তার। সকালে ঘুম ভাঙিয়ে মা বলেছিলেন, ঠাম্মি আর নড়াচড়া করছেন না, কথা বলছেন না। সে জানতে চেয়েছিল—ঠাম্মি অসুখ করলেন কি? মা কোনো উত্তর দেননি। কিছুক্ষণ পর কাঁচঘেরা এক গাড়িতে করে ক’জন লোক ঠাম্মিকে নিয়ে গেলেন। ঠাম্মি তখনও শুয়ে ছিলেন। সেই যে গেলেন, আর ফিরলেন না। এমন তো কতবার হয়েছে—ঠাম্মি গেছেন দেশের বাড়ি, পিসির বাড়ি। কদিন বাদেই তো ফিরে এসেছেন। এবার আর কেন এলেন না! বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন—ঐ আকাশে তারা হয়ে আছেন ঠাম্মি। সেদিন থেকেই রাতে আকাশে তারা দেখলেই সে ঠাম্মিকে খোঁজে, ডাকে। কিন্তু ঠাম্মি আসেন কোথায়! ঠাম্মি কি রাগ করেছেন তার ওপর? গত বছর একদিন ঠাম্মির বারণ না শুনে রাস্তা ধরে খুব জোরে দৌড়েছিল সে প্রজাপতির পেছনে, ধরবে বলে। রেগে গিয়েছিলেন ঠাম্মি। সে যে রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাঁটু কেটে ফেলেছিল। কিন্তু এই এক বছরে তো সে কতবার ঠাম্মির কাছে মাফ চেয়েছে! তবু কি রাগ কমেনি ঠাম্মির? চোখে একটা ঘোর আসছে মুন্নির। সারা দুপুর ঘুমোয়নি সে। বাবা দুপুরে বাড়ি থাকেন না। সরকারি বাবুদের গাড়ি চালান তিনি। এখানকার উঁচু উঁচু বাড়িগুলো কত সুন্দর রঙিন! তাদের ঘরটাই কেমন ভাঙাচোরা। বাবা তো কতবার বলেছে—চলো না একটায় যাই! কিন্তু বাবা শোনেননি। সকাল ন’টায় গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে যান বাবা, ফেরেন সন্ধে গিয়ে। মা দুপুরে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমোন। সে মার পাশে বসে খেলে—ঘর আঁকা, পাতা আঁকা, প্রজাপতি আঁকা—আরও কত কী! বালিশ দিয়ে ঘর বানায়। সে ঘরে কখনো শুয়ে পড়ে, কখনো গুছিয়ে রাখে। বিকেলে মা রান্নার কাজে ব্যস্ত হলে সে চলে যায় খেলতে, রাস্তাটার পাশে। বাবা ফিরলে একটু অ-আ, ক-খ পড়া। একশো পর্যন্ত গোনা। তারপর খেয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া। কিন্তু আজ তো খেলাটাই হলো না ঠিক মতো! বাবার ফিরতে এখনো অনেক দেরি। মা রান্না গোছাতে ব্যস্ত। মুন্নি একেবারে একা। ঠাম্মিটা যদি——! হঠাৎ জানালার ওপারে চোখ পড়ে মুন্নির। একটু দূরে একটি বেশ বড়ো প্রজাপতি। কী সুন্দর রঙিন তার ডানা! তার যদি এমন দুটো ডানা থাকত! প্রজাপতিটার ডানা দুটো পতপত করে নড়ছে। আরে! প্রজাপতিটা তো তার দিকেই এগিয়ে আসছে!নড়েচড়ে ওঠে মুন্নি। কী আশ্চর্য! যতই এগোচ্ছে, প্রজাপতির শরীর আর ডানা ততই বড় হচ্ছে। জানালার চেয়েও বড় দেখাচ্ছে! তার দুটো পা আর দুটো হাতও আছে! তবে কি ওটা পরী? আরও কাছে চলে আসছে সেটা। মুন্নি এখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, তার হাত দুটো তার দিকেই বাড়ানো। মুখটাও নড়ছে—সে কি কিছু বলছে? উত্তেজিত হয়ে পড়ে মুন্নি। পিছন ফিরে তাকায়। মা আসছেন কি না দেখে নেয়। বারান্দা থেকে রান্নার ঠুকঠাক, টুংটাং শব্দ ভেসে আসে। মা রান্নায় ব্যস্ত। নাম ধরে কে যেন ডাকে তাকে। ঘুরে দাঁড়ায় মুন্নি। আরে—পরীটা তো জানালার ওপারে এসে দাঁড়িয়েছে! কী সুন্দর দেখতে! তার সারা গা থেকে ভারী সুন্দর গন্ধ আসছে মুন্নির নাকে। আরামে যেন চোখ বন্ধ হয়ে আসছে তার। বাইরে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে জোরে, ভেজা বাতাস। বৃষ্টি আসবে বুঝি। চোখের পাতা খোলে মুন্নি। তাকায় পরীর মুখের দিকে। গোলাপি মুখ, নীল চোখ, সারা গা থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। মুখে মিষ্টি হাসি। পরীটাও তাকিয়ে তার মুখের দিকে। বুকটা তোলপাড় করে ওঠে মুন্নির—তুমি কে গো? এখানে কেন এলে? তুমি কি পরী? আমার বন্ধু হবে? তাহলে ভেতরে এসো, খেলি তোমার সঙ্গে। নরম হাসিতে বাতাস ভরিয়ে দেয় পরী। বলে—খেলা পরে হবে মুন্নি। আমি তোমার বন্ধুই তো হতে চাই। কিন্তু দেখ তো আমার এই ডানাটার দিকে। একটা ফুটো দেখতে পাচ্ছ? আজ খেলতে গিয়ে তুমি আমার দিকে পাথরের টুকরো ছুঁড়লে। ডানায় লেগে ফুটো হয়ে গেল। খুব কষ্ট পায় মুন্নি। বলে—ভুল হয়ে গেছে গো! আমি তোমাকে ধরতে চেয়েছিলাম, আদর করার জন্য। তুমি উড়ে চলে যাচ্ছিলে বারবার। তাই রাগ হল। তখন তো বুঝিনি তুমি আমার বন্ধু হতে চাও। বুঝিনি তুমি পরী। কিন্তু তখন তো তুমি খুব ছোটো ছিলে, এই টুকুন। এখন এত বড়ো হলে কী করে? —ওটাই তো জাদু। আমরা তোমাদের সঙ্গে খেলব বলে ছোটো হয়ে তোমাদের কাছে আসি। ধরতে গেলে উড়ে যাই। এটাই তো খেলা। তুমি দৌড়াও আমার পেছনে। এই দৌড়োদৌড়িতেই তো রাতে ভালো ঘুম হয় তোমার। ঘুমে স্বপ্ন আসে। তোমার হাত-পা—গোটা শরীর শক্তপোক্ত হয়। ধরা দিলে তো এসব হয় না ভাই। —তুমি আমাকে ভাই বললে? —তাই তো বললাম। বন্ধু হলে তাই তো বলতে হয়। —তুমি সত্যিই আমার বন্ধু? —হ্যাঁ গো। কত দিন ধরে তোমার বন্ধু হতে চাচ্ছি! তুমি বুঝতে পারোনি। তাই পাথর ছুঁড়ে ডানাটা ফুটো করে দিলে। এখন উড়তে আমার কত কষ্ট হচ্ছে। তুমি বুঝবে কি—? —আর বোলো না বন্ধু। আমারও কষ্ট হচ্ছে। এই কান মলছি। আর করব না ভাই। —বেশ। এখন তুমি চলো আমার সঙ্গে। —কোথায়? —তোমার ঠাম্মি তোমাকে আদর করার জন্য ডাকছে। ঐ দেখো, মেঘের মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন তোমার ঠাম্মি। পরীর আঙুল অনুসরণ করে দূরে মেঘের মাথায় তাকায় মুন্নি। দুধসাদা কাপড় পরে মেঘের মাথায় দাঁড়িয়ে তার ঠাম্মি। ঠাম্মির গা থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে আলো। ছড়িয়ে পড়ছে সারা আকাশে। ঠাম্মি যে সত্যিই তারাদের মতো! বাবা-মা ঠিকই বলেছিলেন তাকে! চোখ দুটো ভালো করে রগড়ে আবার তাকায় মুন্নি ঠাম্মির দিকে। দুই হাত বাড়িয়ে তাকেই ডাকছেন ঠাম্মি। ধড়াসধড়াস করে ওঠে মুন্নির বুক। ঠাম্মির কাছে যাবার প্রবল ইচ্ছেয় ছটফট করে ওঠে তার পা দুটো। কিন্তু জানালাটা যে গ্রিল দিয়ে আটকানো! যাবে কী করে সে? বারান্দা দিয়ে যেতে পারে অবশ্য। কিন্তু মা তো যেতেই দেবে না বাইরে, বৃষ্টি আসতে

গল্প

সুখ ও অসুখ

সুখ ও অসুখ অবশেষ দাস সুখ ও অসুখ (Kaler Sanko) কয়েক কোটি টাকার বাড়ি। বলা ভাল  প্রাসাদ। ছবির মতো ফুলের বাগান। ফলের বাগান।পুকুর ভর্তি মাছ।গা ভর্তি গহনা । সংসারে সুখ যেন ধরে না ।বাড়ির বউ রূপা খুব সাবধানী । অতিথির যাতায়াত অপছন্দ । বাগানে গরু-ছাগল ঢোকার জো নেই। শ্বশুর -শাশুড়ি শুরুতেই তাড়িয়েছে। অন্দরের ধুলোবালি ঝেড়েই ফেলেছে । দুঃখের গল্প শোনার আশঙ্কায় সম্বন্ধ ও সম্পর্ক এড়িয়ে চলে। স্বামীকে নিজের দিকে টেনে রেখেছে। স্বামীর অবস্থা ভাষাহীন শিশুর মতো, বলা ভাল গৃহপালিত স্বামী। রোজগারের যন্ত্র হলেও সংসারে তার কোনও মতামত পাত্তা পায় না। সোনা বাঁধানো সংসারে বউ-ই শেষ কথা। অহংকারী স্ত্রী এ সংসারে কারও প্রবেশাধিকার নেই। শুধু বউয়ের বাপের বাড়ির লোকজন নয়নের মণি। এভাবেই চলছিল সোনার সংসার । তাদের একার সংসার । সংসারের আর কোনও কিছুর সঙ্গে  তাদের যোগাযোগের প্রয়োজন নেই। প্রাচুর্যের হুঙ্কারে বউয়ের পা জোড়া হয়তো মাটিতে পড়ে না। একদিন আকাশ থেকেই পড়তে হল। সামান্য উপসর্গ নিয়ে  নামকরা বেসরকারি হসপিটাল । ডক্টর বলেছেন, ” রূপার ব্লাড-ক্যানসার।” বড়জোর তিন মাস আয়ু। সোনার সংসারে আজ ঘোর অমাবস্যা । মৃত্যু পথযাত্রী রূপার চোখে জল গড়িয়ে যাচ্ছে । সুখের ঘরে আজ শোক জ্বলজ্বল করছে । সব বন্ধ রাখা ছিল । এ বাড়িতে কেউই ঢুকতে পারেনি । ঢুকতে দেওয়াও হয়নি । তবু রোগ ঠিক ঢুকে গেছে। রূপার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। কেউ তাকে দেখতে আসছে না।‌ দেখতে আসছে না , ঠিক তা নয়। স্ত্রীর বোধোদয় এ বাড়িতে আসার পথ আগে থেকেই বন্ধ হয়ে আছে। বাধ্য স্বামী অরূপকে শয্যাশায়ী রূপা বলল, ” সবাইকে আসতে দাও। কেউ যেন ফিরে না যায়। তোমার বাবা-মাকে বাড়িতে নিয়ে এসো। যে কদিন বাঁচব, একসাথে থাকব। ” অরূপ বলল , ” বাবা-মা অনেক অভিমান নিয়ে গেছে।‌‌ যেভাবেই হোক, ফিরিয়ে আনব।” এখন একটা কাজের মেয়ে রাখা হয়েছে। শুধু রূপাকে দেখাশোনা করবার জন্য। সেই মেয়েটি পাড়ার সব খবর রাখে। পাড়ার লোকে বলছে,‌ খুব অল্প বয়স্ক মেয়ে । জীবনের কিছুই তো দেখলো না। এইভাবে চলে যেতে দেখলে কষ্ট হয়। আবার অনেকে বলছে, ঈশ্বর‌ তো অহংকার সহ্য করে না। অমন স্বার্থপর মেয়ে খুব একটা দেখা যায় না। আজকের অসুস্থ , তাই হয়তো মানসিকতা একটু বদলেছে। তা না হলে ধরাকে সরা জ্ঞান করত। রূপার বাপের বাড়ির লোকজন খুব ভেঙে পড়েছে। অসুস্থ মেয়েটাকে নিয়ে লড়াই করবার আগেই যেন হেরে বসে আছে। ব্রাহ্মণ এর আশাবাদ এই বাড়ির ব্রাহ্মণ বেশ পন্ডিত মানুষ। পাড়ার লোকজন অনেকেই বলছে, প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। এই ব্রাহ্মণ কিছুতেই রাজি নন। তিনি বললেন, “এই দুরারোগ্য ব্যাধি সমাজে নতুন কিছু নয়। সব এলাকাতেই কমবেশি মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শেষ বললেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। বরং এই কঠিন অবস্থা থেকে কিভাবে নতুন করে জীবন শুরু করা যায় , সেটাই দেখতে হবে।” ব্রাহ্মণের কথা শুনে বাড়ির সবাই যেন আশার আলো দেখে। ব্রাহ্মণ বললেন , ” সবাইকে আরো জোর ধরতে হবে। সবাই শক্ত হলে তবে তো বউমা মনে বল পাবে। জীবন কখনো ফুরিয়ে যাবার নয়। বরং সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে। গৃহস্থ বাড়ির দরজা-জানলা না রাখলে আলো-বাতাস প্রবেশ করবে কিভাবে। নিজেরাই বা ঢুকবে কোথা দিয়ে যদি ঘরের দরজা না থাকে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কখনো কখনো অসৎ কেউ ঢূকে পড়তেই পারে , তাই বলে ঘরের দরজা না রাখলে হবে কেমন করে। ঘরের জানলা দিয়ে আমরা জানি আলো বাতাস আসে, আর সেজন্যই তো জানলা ছাড়া ঘর হয় না। কিন্তু ধুলোবালি দুর্গন্ধ সবই জানলা দিয়ে আসে। ঠিক তেমনি জীবনের দরজা-জানলা সবই আছে, কখনো কখনো উল্টোটা ঘটে যায়। শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে, সমাধান নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।” এই কদিনে সবাই যেন কেমন সমব্যথী হয়ে উঠেছে। সবার চোখে বিন্দু বিন্দু করুণা জমে আছে। বাড়ির সুখ ও অসুখ সম্ভাব্য শোকের ছায়া এই বাড়ির সর্বত্র একে একে ছড়িয়ে পড়ছে। দক্ষিণের জানালার ঠিক পাশে রাস্তা পেরিয়ে বকুল গাছের ছায়া এসে পড়েছে। ছোট্ট বাগানে অজস্র জবা ফুল ফুটেছে। জবা গাছের পাতার ভিতরে কটা টুনটুনি বাসা করে আছে। তারা ফাঁকে ফাঁকে বেশ কথা বলে। আজ তারা যেন আশ্চর্যরকম চুপচাপ। শোক বড় ছোঁয়াচে। টুনটুনিরাও বুঝি , সব জানতে পেরেছে। নাকি তারা সংসার নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে ! পাড়াতে একটা পুরানো ফেরিওয়ালা এসেছে। এই বাড়ির দরজার সামনে কখনো দাঁড়ায় না। তিনিও জানেন ,  এই বাড়িটা মিশুকে নয়। এদের দরজায় কেউ আসে না। এ বাড়ির অসুস্থ বউ রুপা হঠাৎ বলল , ফেরিওয়ালার ডাকটা শুনে মনটা কেমন কেমন করছে। আজ একটু দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াব। বাইরের লোকজনগুলো দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। ফেরিওয়ালার কাছ থেকে আজ আলতা-সিঁদুর কিনব। পাড়ার বউদের সঙ্গে একটু কথা বলব। বাড়ির লোকজন আশ্চর্য হয়ে যায়। রুপা তো কখনো এইভাবে যেখানে সেখানে কেনাকাটা করে না। নিজের মধ্যে থাকতে ভালবাসে। নিজেকে নিয়েই থাকতে ভালবাসে। স্বামীর হাত ধরে দু তিনটে গেট পেরিয়ে একেবারে বাইরের দরজার সামনে এসে সে দাঁড়ায়। ততক্ষণে ফেরিওয়ালা অন্য পাড়ায় চলে গেছে। লোক পাঠিয়ে তাকে ডেকে আনা হয়। তার চোখে-মুখে বিস্ময়। আবার, কেমন একটা তৃপ্তির ছায়া। ফেরিওয়ালা বেশ স্বচ্ছন্দে বললেন, পাড়ার লোকের মুখে শুনেছি, “এই বাড়ির দিদিমণি খুব অসুস্থ। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, দিদিমণি আগে অসুস্থ ছিলেন। এখন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন। রুপা হাসিমুখে বলল,  ” ফেরিওয়ালা ঠিক কথা বলেছেন। আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছি। “

Scroll to Top