পাখির মতো
বিখ্যাতদের লেখা

পাখির মতো

পাখির মতো আল মাহমুদ আম্মা বলেন, পড়রে সোনা আব্বা বলেন, মন দে; পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠালচাঁপার গন্ধে। আমার কেবল ইচ্ছে জাগে নদীর কাছে থাকতে, বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে পাখির মতো ডাকতে। কর্ণফুলীর কূল সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে কর্ণফুলীর কূলটায়, দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি ফেরেস্তারা উল্টায়। মনের বাসনা তখন কেবল ভাবতে থাকি কেমন করে উড়বো, কেমন করে শহর ছেড়ে সবুজ গাঁয়ে ঘুরবো ! বক্তব্য তোমরা যখন শিখছো পড়া মানুষ হওয়ার জন্য, আমি না হয় পাখিই হবো, পাখির মতো বন্য।   আবৃত্তি    আল মাহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬ – ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্‌ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন প্রবাসী সরকারের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত সরকার বিরোধী সংবাদপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ (১৯৭২-১৯৭৪) পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তথ্যসূত্র: https://bn.wikipedia.org/

মোটা কেঁদো বাঘ
বিখ্যাতদের লেখা

মোটা কেঁদো বাঘ

মোটা কেঁদো বাঘ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক ছিল মোটা কেঁদো বাঘ, গায়ে তার কালো কালো দাগ। বেহারাকে খেতে ঘরে ঢুকে আয়নাটা পড়েছে সমুখে। এক ছুটে পালালো বেহারা, বাঘ দেখে আপন চেহারা। গাঁ – গাঁ করে ডেকে ওঠে রাগে, দেহ কেন ভরা কালো দাগে। ঢেঁকিশালে পুঁটু ধান ভানে, বাঘ এসে দাঁড়ালো সেখানে। ফুলিয়ে ভীষণ দুই গোঁফ বলে, চাই গ্লিসেরিন সোপ। পুঁটু বলে, ও কথাটা কী যে জন্মেও জানি নে তা নিজে। ইংরেজি – টিংরেজি কিছু শিখি নি তো, জাতে আমি নিচু। বাঘ বলে, কথা বল ঝুঁটো, নেই কি আমার চোখ দুটো। গায়ে কিসে দাগ হল লোপ না মাখিলে গ্লিসেরিন সোপ। পুঁটু বলে, আমি কালো কৃষ্টি কখনো মাখি নি ও জিনিসটি। কথা শুনে পায় মোর হাসি, নই মেম – সাহেবের মাসি। বাঘ বলে, নেই তোর লজ্জা? খাব তোর হাড় মাস মজ্জা। পুঁটু বলে, ছি ছি ওরে বাপ, মুখেও আনিলে হবে পাপ। জান না কি আমি অস্পৃশ্য, মহাত্মা গাঁধিজির শিষ্য। আমার মাংস যদি খাও জাত যাবে জান না কি তাও। পায়ে ধরি করিয়ো না রাগ! ছুঁস নে ছুঁস নে, বলে বাঘ, আরে ছি ছি, আরে রাম রাম, বাঘনাপাড়ায় বদনাম রটে যাবে; ঘরে মেয়ে ঠাসা, ঘুচে যাবে বিবাহের আশা দেবী বাঘা – চণ্ডীর কোপে। কাজ নেই গ্লিসেরিন সোপে।   লেখকের আরও লেখা পড়ুন

চায়না শপ
ছড়া

ষাঁড় ঢুকেছে চায়না শপে

ষাঁড় ঢুকেছে চায়না শপে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চায়না শপ ষাঁড় ঢুকেছে চায়না শপে কেনাকাটার ছুঁতায়, শপকিপারের মাথা খারাপ এমন ক্রেতার গুঁতায়। ঝনঝনিয়ে প্লেট পড়ে যায়, খনখনিয়ে বাটি, পায়ের নিচে ডিনার সেটের চলছে ফাটাফাটি। এদিক যখন শিঙে বাধে, ওদিক বাধে পেটে, একমনে ষাঁড় জিনিসপাতি দেখছে হেঁটে হেঁটে। পিরিচগুলো পড়ছে ডানে, কাপগুলো তার বাঁয়ে, গ্লাস ট্রে বোল স্যুপের বাটি ভাঙছে লেজের ঘায়ে। শপকিপারের রাগ চড়ে যায়, সঙ্গে ক্রেতাদেরও, আসলো সবাই তেড়েমেড়ে-ষাঁড় ব্যাটা তুই বেরো। কিন্তু সে ষাঁড় বেরোবে কি-শপিং আরও বাকি, মাথার পরে ঝাড়বাতিরাও হালকা খেল ঝাঁকি। ষাঁড় হয়ে কেউ জন্ম নিলে ষাঁড়ই থাকে-ষাঁড়ই, কী আর করা-দোকানি ওর মাথায় মারে বাড়ি। চারদিকে তার চার পা তুলে লুটিয়ে পড়ে সে ষাঁড়, সবাই হেসে টিটকারি দেয়, ‘উঠল কি না প্রেশার! এক ঘায়ে তুই কাত হয়ে যাস্, হারিয়ে ফেলিস জ্ঞানও, গাধার মতো চায়না শপে ঢুকতে এলি কেন?’     আরও ছড়া পড়ুন চায়না শপ

গন্ধ বিচার
বিখ্যাতদের লেখা

গন্ধ বিচার

গন্ধ বিচার সুকুমার রায় গন্ধ বিচার সিংহাসনে বস্‌ল রাজা বাজল কাঁসর ঘন্টা, ছট্‌ফটিয়ে উঠল কেঁপে মন্ত্রীবুড়োর মনটা। বল্‌লে রাজা, মন্ত্রী তোমার জামায় কেন গন্ধ ? মন্ত্রী বলে, এসেন্স দিছি—গন্ধ তো নয় মন্দ ! রাজা বলেন, মন্দ ভালো দেখুক শুঁকে বদ্যি, বদ্যি বলে, আমার নাকে বেজায় হল সর্দি। রাজা হাঁকেন, বোলাও তবে রাম নারায়ণ পাত্র, পাত্র বলে, নস্যি নিলাম এক্ষুনি এইমাত্র। নস্যি দিয়ে বন্ধ যে নাক গন্ধ কোথায় ঢুকবে ? রাজা বলেন, কোটাল তবে এগিয়ে এস, শুঁকবে। কোটাল বলে, পান খেয়েছি মশলা তাতে কর্পূর, গন্ধে তারি মুণ্ড আমার এক্কেবারে ভরপুর। রাজা বলেন, আসুক তবে শের পালোয়ান ভীমসিং, ভীম বলে, আজ কচ্ছে আমার সমস্ত গা ঝিম্ ঝিম্। রাত্রে আমার বোখার হল বলছি হুজুর ঠিক বাৎ, ব’লেই শুল রাজসভাতে চক্ষু বুজে চিৎপাত। রাজার শালা চন্দ্রকেতু তারেই ধ’রে শেষটা, বল্‌ল রাজা, তুমিই না হয় কর না ভাই চেষ্টা। চন্দ্র বলেন, মারতে চাও তো ডাকাও নাকো জল্লাদ, গন্ধ শুঁকে মরতে হবে এ আবার কি আহলাদ ? ছিল হাজির বৃদ্ধ নাজির বয়সটি তার নব্বই, ভাবল মনে, ভয় কেন আর একদিন তো মরবই। সাহস ক’রে বল্‌লে বুড়ো, মিথ্যে সবাই বক্‌ছিস, শুঁকতে পারি হুকুম পেলে এবং পেলে বক্‌শিস। রাজা বলেন, হাজার টাকা ইনাম পাবে সদ্য, তাই না শুনে উৎসাহেতে উঠল বুড়ো মদ্দ। জামার পরে নাক ঠেকিয়ে—শুঁকল কত গন্ধ, রইল অটল দেখল লোকে বিস্ময়ে বাক্ বন্ধ। রাজ্যে হল জয়–জয়কার বাজল কাঁসর ঢক্কা, বাপরে কি তেজ বুড়োর হাড়ে পায় না সে যে অক্কা ?     গন্ধ বিচার আবৃত্তি  

এক থালা ভাত
গল্প

এক থালা ভাত

এক থালা ভাত আহমেদ কিবরিয়া ইদের দিন সকালের কথা। ভাইদের সাথে নামাজ পড়ে বাসায় আসলো রাহাত। বাড়ির বড়রা কুরবানির জন্য ব্যস্ত। রাহাত অসুস্থ থাকায় এগুলোর ধারের কাছে গেলো না। বাড়ির কাজের লোকেরাই ভাই ও বড় আব্বুদের সাথে ছিলো। রাহাত আম্মুর সাথে রান্নাঘরে গল্প করছিলো আর চা পান করছিলো। আম্মু বললো, মাংস রান্না হতে হতে দুপুর গড়িয়ে যাবে। তুই কৈ মাছ ঝোল করেছি সেটা দিয়ে খা। রাহাত বাধ্য ছেলের মতো তাই করলো। দিনটা এভাবে গেলো। সন্ধায়, শুরু হলো ভাবীর চেঁচামেচি। আম্মু কিছু বলছে না। ভাইয়া মন খারাপ করে বসে আছে। সবাই খাচ্ছিল। রাহাত তখনও খায়নি। মানে তার রুচি ছিল না। জ্বর হলে যা হয়। হঠাৎ চাচী এসে জোর করে বাসায় নিয়ে গেলো খাওয়ার জন্য। গেলো আর অল্প করে খেয়ে চলে আসলো। কিছুক্ষণ পর, ভাবী ডাকলো, ভাত খাবা না। রাহাতের উত্তর-না। -কেন খাবে না? -রুচি নাই। -খেতে হবে আমি বলছি। -না খাবো না প্লিজ। -তুই খাবি, তোর ভাই বলেছে তাই তোকে খেতে হবে। ভয়ে ভাত খেলো রাহাত। ভাবীর দিকে খেয়াল করলো সে। উনার মুখে ছিল বন্য পরিহাস আর তাচ্ছিল্য। রাতে শুরু হলো অস্বাভাবিক খারাপ লাগা। বমি বমি ভাব, গলা জ্বলে যাচ্ছিল, চোখে ঝাপসা দেখছিলো সে। মা রুমে এসে দেখে, প্রচুর খিচুনী হচ্ছে রাহাতের। আম্মু তাড়াতাড়ি ওকে টক আচার আর কি যেনো একটা গাছের পাতা খাইয়েছিলেন। ফলে ওর অনেক বমি হয় আর একটু সুস্থ ফিল করে। সেদিন সারা রাত আম্মু ঘুমায়নি। রাহাতের পাশে ছিলো আর দোয়া পড়ে ফুঁ দিচ্ছিলো। মজার ব্যাপার এই বিষয়টি বাসার কেউ জানতো না। রাহাত আম্মুকে প্রশ্ন করলে আম্মু বলেছিলো, বাবা, ইনকাম করতে পারলে তোর একথালা ভাতের অভাব হবে না। আজ ৪ বছরেরও বেশী সময় অতিবাহিত হয়েছে, আম্মু আর কখনও এসে বলবে না, খোকা ভাত খাবি না? শুধু ওর অসুস্থ বাবা জামিল সাহেব একবার রুমে এসে নক করে বলেন, কিরে ভাত খাসনি খোকা? খেয়ে নে বাবা, অনেক রাত হয়েছে। সারাদিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকিস । না খেলে টিকবি কিভাবে? এখন রাহাত দু’বেলা নয় তিন বেলায়ই ভাত খায় কিন্তু একা একা। খাওয়ার পর ছাদে যায়। আকাশের দিকে তাকালে দেখতে পায়, অনেক তারকা মিটমিট করে জ্বলছে। একটা শুকতারা যেনো ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। রাহাত আচমকা বলে উঠে, ওইতো! ওটাই আমার আম্মু। আম্মু কিছু বলতে চাইছে। মনে হয় বলছে, ভালো থাকিস ইদের দিন সকালের কথা। ভাইদের সাথে নামাজ পড়ে বাসায় আসলো রাহাত। বাড়ির বড়রা কুরবানির জন্য ব্যস্ত। রাহাত অসুস্থ থাকায় এগুলোর ধারের কাছে গেলো না। বাড়ির কাজের লোকেরাই ভাই ও বড় আব্বুদের সাথে ছিলো। রাহাত আম্মুর সাথে রান্নাঘরে গল্প করছিলো আর চা পান করছিলো। আম্মু বললো, মাংস রান্না হতে হতে দুপুর গড়িয়ে যাবে। তুই কৈ মাছ ঝোল করেছি সেটা দিয়ে খা। রাহাত বাধ্য ছেলের মতো তাই করলো। দিনটা এভাবে গেলো। সন্ধায়, শুরু হলো ভাবীর চেঁচামেচি। আম্মু কিছু বলছে না। ভাইয়া মন খারাপ করে বসে আছে। সবাই খাচ্ছিল। রাহাত তখনও খায়নি। মানে তার রুচি ছিল না। জ্বর হলে যা হয়। হঠাৎ চাচী এসে জোর করে বাসায় নিয়ে গেলো খাওয়ার জন্য। গেলো আর অল্প করে খেয়ে চলে আসলো। কিছুক্ষণ পর, ভাবী ডাকলো, ভাত খাবা না। রাহাতের উত্তর-না। -কেন খাবে না? -রুচি নাই। -খেতে হবে আমি বলছি। -না খাবো না প্লিজ। -তুই খাবি, তোর ভাই বলেছে তাই তোকে খেতে হবে। ভয়ে ভাত খেলো রাহাত। ভাবীর দিকে খেয়াল করলো সে। উনার মুখে ছিল বন্য পরিহাস আর তাচ্ছিল্য। রাতে শুরু হলো অস্বাভাবিক খারাপ লাগা। বমি বমি ভাব, গলা জ্বলে যাচ্ছিল, চোখে ঝাপসা দেখছিলো সে। মা রুমে এসে দেখে, প্রচুর খিচুনী হচ্ছে রাহাতের। আম্মু তাড়াতাড়ি ওকে টক আচার আর কি যেনো একটা গাছের পাতা খাইয়েছিলেন। ফলে ওর অনেক বমি হয় আর একটু সুস্থ ফিল করে। সেদিন সারা রাত আম্মু ঘুমায়নি। রাহাতের পাশে ছিলো আর দোয়া পড়ে ফুঁ দিচ্ছিলো। মজার ব্যাপার এই বিষয়টি বাসার কেউ জানতো না। রাহাত আম্মুকে প্রশ্ন করলে আম্মু বলেছিলো, বাবা, ইনকাম করতে পারলে তোর একথালা ভাতের অভাব হবে না। আজ ৪ বছরেরও বেশী সময় অতিবাহিত হয়েছে, আম্মু আর কখনও এসে বলবে না, খোকা ভাত খাবি না? শুধু ওর অসুস্থ বাবা জামিল সাহেব একবার রুমে এসে নক করে বলেন, কিরে ভাত খাসনি খোকা? খেয়ে নে বাবা, অনেক রাত হয়েছে। সারাদিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকিস । না খেলে টিকবি কিভাবে? এখন রাহাত দু’বেলা নয় তিন বেলায়ই ভাত খায় কিন্তু একা একা। খাওয়ার পর ছাদে যায়। আকাশের দিকে তাকালে দেখতে পায়, অনেক তারকা মিটমিট করে জ্বলছে। একটা শুকতারা যেনো ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। রাহাত আচমকা বলে উঠে, ওইতো! ওটাই আমার আম্মু। আম্মু কিছু বলতে চাইছে। মনে হয় বলছে, ভালো থাকিস বাব। আম্মুর কাছে খুব জানতে ইচ্ছে হয় রাহাতের, সেদিন রাতে কি হয়েছিলো? আর, তাকেই বা কেনো বমি করিয়েছিলো? এর উত্তর আজও পায়নি সে। আর পেতেও চায় না সে। আসলে জীবনের কিছু হিসেব-নিকেশ সময়ের সাথে সাথে ঘৃণার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয় আর নোংরা মনের মানুষগুলো মানুষের ন্যায্য হককে বঞ্চিত করে তার প্রিয়ার সাথে জাগতিক সুখে লিপ্ত হয়ে ভুলে যায় জীবনের আসল উদ্দেশ্য। বৃদ্ধাশ্রম, আমার-তোমার ভবিষ্যৎ, নারী অধিকার, শ্বশুরবাড়ি এসব টার্ম আমরাই সমাজে সৃষ্টি করি। হয়তোবা এভাবে চলছে, চলবে হাজার বছর ধরে….   আরও গল্প

ভালোর সাথে মন্দ আসে
গল্প, শিশু সাহিত্য

ভালোর সাথে মন্দ আসে

ভালোর সাথে মন্দ আসে রানা জামান ভালোর সাথে মন্দ আসে কষ্টের অন্ত নেই শাহেদের। গায়ের রংটা বিচ্ছিরি রকমের কালো, নিগ্রোকেও হার মানায়।  মুখে লাবণ্যর পরিবর্তে ওমপুরির মতো মুখভর্তি ছোট ছোট গর্ত; একটা চোখের মণি শাদা। ডান পা টেনে হাঁটে আর বাম হাতের অনামিকা আঙ্গুলটা অনেক খাটো। অমন দৈহিক ত্রুটি নিয়ে জন্মের জন্য ও দায়ি না থাকলেও সবাই প্রকারান্তরে ওকেই দোষারোপ করে। অপরিচিত কেউ ওর দিকে তাকালে দ্রুত ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। অনেক ডাক্তারের সাথে আলোচনা করেও ওর খুঁতসমূহ প্লাস্টিক সার্জারি কিংবা অন্য কোনো কৃত্রিম পদ্ধতি প্রয়োগ করে সারানোর বা বাইরে যাবার সময় ঢাকার কোনো উপায় পাওয়া যায়নি। কী বলে শান্তনা দেবে মা-বাবা ওকে?   মা-বাবা কিছু বললে শাহেদ উল্টো ওঁদের উপর ক্ষোভপ্রকাশ করে। মা-বাবার কষ্টটা ও বুঝতে পারে না এবং মা-বাবা ওর কষ্ট বুঝতে পেরেও অসহায় অবস্থায় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শুধু। ছোটবেলায় এতো স্পর্শকাতর ছিলো না শাহেদ। সহপাঠীরা খোঁচা মেরে কথা বললেও তেমন রা করতো না। তবে একবার এক সহপাঠীকে মেরে মারাত্মক জখম করে ফেলেছিলো। সালিশে মা-বাবা ক্ষমা চেয়েও পার পান নি-স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছে। পরের স্কুলে ভর্তির আগে খুব করে বুঝিয়েছে যে, এমনটা ফের করলে ওকে আর কোনো স্কুলে ভর্তি করা যাবে না; তখন ওকে গণ্ডমুর্খ হয়েই থাকতে হবে। শারীরিক এই ত্রুটি থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো লেখাপড়া করে বড় বিদ্বান হওয়া।   একমাত্র উচ্চশিক্ষাই পারে শারীরিক ত্রুটি ঢেকে দিতে; যেমন বার্নার্ড শ এবং স্টিভেন হকিং। এই দুই জনের ছবি দেখে ও জীবনী শোনার পর শাহেদ শান্ত হয়েছে। কিন্তু কলেজে উঠার পর বয়স্ক ক্লাশমেটদের টিটকারি ওর পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়লো। তাই সে কলেজে যাওয়া বাদ দিয়েছে; বলা যায় লেখাপড়াই বাদ দিয়েছে। ছোটকালে বার্নার্ড শ ও স্টিভেন হকিং-এর জীবনি শান্তনা দিলেও এখন আর তা পারছে না।   শাহেদ একা একা বনবাদাড়ে, কখনোবা নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়ায়। একদিন শাহেদ প্যান্টের পকেটে ডান হাত ঢুকিয়ে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছে । পথিমধ্যে একটা সাপকে চিৎ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে ভাবলো মরে আছে।পাশ কাটিয়ে যাবার সময় সাপটাকে নড়তে দেখে এক লাফে সরে গেলো দূরে। সাপটা সোজা হয়ে ফণা তুলতে গিয়ে নেতিয়ে গেলো ফের। একটা কাঁটা দুই চোয়াল একত্রিত করে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে আছে।   মানে সাপটা আহত! দুধকলা দিয়ে পোষলেও একদিন সাপ ছোবল মারেই। একে সুস্থ করলে কী করবে ও? ওর জীবনের এমনিতেই কী মূল্য আছে? এই উছিলায় মরে যেতে পারলে জীবনের সমাপ্তি হবে সহজেই। এটাই দরকার ওর! শাহেদ সাপের মাথার কাছে বসে হাত রাখলো মাথায়। এক টানে বের করে ফেললো কাঁটাটা। একটা সজারুর কাঁটা!   কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে সাপটা সোজা হয়ে একবার ফোঁস করে মাথা নোয়ালো। শাহেদ অবাক হলো সাপের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে। সাপটা খোলস ছেড়ে ইশারায় ওকে বললো খোলসটা গায়ে জড়াতে। শাহেদ ভাবলো: যার জীবনের কোনো মূল্য নেই, সে সাপ হয়ে গেলে ক্ষতি কী! শাহেদ সাপের খোলসটা জড়িয়ে দেখলো সাপটা ও টের পাচ্ছে কেমন যেনো পরিবর্তন হচ্ছে শরীরে।   বাম হাতের অনামিকা আঙ্গুলটা বেড়ে ডান হাতের অনামিকা আঙ্গুলের সমান হয়ে গেলে সাপের খোলসটা ঝরে পড়লো ওর গা থেকে। আর কী পরিবর্তন হলো ওর শরীরে? হাতে তাকিয়ে বেশ অবাক: গায়ের রংটা মিশকালো থেকে আস্তে আস্তে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ হয়ে গেলো! মুখের কিছু হয়েছে কি?মুখে হাত দিলো শাহেদ। মুখের গর্তগুলো নেই। অত্যন্ত খুশি মনে শাহেদ ফিরে এলো বাড়িতে। কলবেল টেপার পর দরজা খুললে মাকে খুশির খবরটা বলতে চাইলে গলা দিয়ে স্বর বের হলো না ওর!   বাংলা গল্প

সমানে সমান
বিখ্যাতদের লেখা, হাসির গল্প

সমানে সমান

সমানে সমান জসীম উদ্দিন সমানে সমান ছোট্ট একটা নদী, হাঁটিয়াই পার হওয়া যায়। তার পশ্চিম পারে থাকে এক ট্যাটন, নাম ধূলি । পুব পারে থাকে আর এক ট্যাটন । তার নাম বালি । ট্যাটন মানে অতি চালাক। লোক ঠকাইয়া বেড়ানোই তাহার পেশা । বালি এক ছালা বিচেকলার বীজ মাথায় লইয়া নদীর ওপার দিয়া যাইতেছে। পশ্চিম পারের ট্যাটন ধূলি তেমনি আর এক ছালা গাবের পাতা মাথায় করিয়া নদীর এপার দিয়া যাইতেছে । কেউ কাহাকে জানে না ।   ধূলি বালিকে ডাক দিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার ছালায় কি লইয়া যাইতেছ ?” বালি উত্তর করিল, “একবস্তা গোলমরিচ লইয়া চলিয়াছি হাটে । তোমার মাথায় কি লইয়া যাইতেছ ভাই ?” ধূলি বলিল, “এক ছালা তেজপাতা লইয়া চলিয়াছি হাটে।”   সমানে সমান-জসীম উদ্দিন দুইজনে নদীর এপার ওপার পথ ধরিয়া চলিতেছে। আর প্রত্যেকে প্রত্যেকের বুদ্ধিতে শান দিতেছে, কি করিয়া একে অপরকে ঠাকইবে। ধূলি ভাবে, যদি আমার গাবের পাতার বস্তা বদল করিয়া ওর গোলমরিচের বস্তা লইতে পারিতাম! বালি ভাবে, যদি আমার কলার বীজের বস্তা বদল করিয়া ওর তেজপাতার বস্তা লইতে পারিতাম! কিন্তু কেউ কাহাকে কিছু বলে না, কেবল মনে মনে নানা ফন্দি ফিকির আঁটে। আর একথা সেকথা বলিয়া এ ওর আপন হইতে চায় ।   অনেকক্ষণ পর বালি ধূলিকে বলে, “আচ্ছা ভাই! তোমার সঙ্গে যখন এতই খাতির হইল, আইস আমরা একে অন্যের বোঝা বদলা-বদলি করি।” ধূলি ত তাহাই চায়! সে তাহার গাবের পাতার বস্তার বদলে যদি গোলমরিচের বস্তা লইতে পারে তবে ত পোয়াবারো । একটু কাশিয়া সে জবাব দেয়, “আগেকার দিনে রাজপুত্রেরা বন্ধুত্ব করিতে পাগড়ি বদল করিত, এসো ভাই আমাদের বন্ধুত্ব হোক ছালা বদল করিয়া ।” দুইজনেই দুইজনের কথায় খুশি ।   বালি তাহার কলাবীজের বস্তা বদল করিয়া ধূলির গাবের পাতার বস্তা লইল । এ বলে আমি ওকে ঠকাইয়াছি। ও বলে আমি তাকে ঠকাইয়াছি! সেইজন্য কেউ কারো বস্তা পরীক্ষা করিল না । বাড়িতে লইয়া গিয়া ধূলি দেখে, তার বস্তা ভরিয়া শুধু বিচেকলার বীজ। একটাও গোলমরিচের দানা নাই। বালি ও তেমনি দেখিল, তার বস্তা ভরিয়া শুধু গাবের পাতা। প্রত্যেকে মনে মনে হাসিল, আর এ ওর বুদ্ধির তারিফ করিতে লাগিল। কিন্তু দুইজনে মনে মনে ফন্দি আঁটিতে লাগিল, কি করিয়া একে অপরকে ঠাকইবে।   কে কত চালাক পরদিন ভোরবেলায় বালি নদীর ওপারে চুলা জ্বালাইয়া তার উপরে এক হাঁড়ি গরম পানি জ্বাল দিতে লাগিল। নদীর এপার হইতে ধূলি ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “দোস্ত! কি করিতেছ ?” বালি উত্তর করিল, “তোমার সঙ্গে গোলমরিচের বস্তা বদল করিয়া তেজপাতা লইয়া হাটে গিয়াছিলাম । আমার বেশ লাভ হইয়াছে । তাই সকাল সকাল ভাত রান্না করিতেছি।” ধূলি বলিল, “আমিও ভাই তোমার গোলমরিচ বেচিয়া বেশ কিছু পাইয়াছি। কিন্তু আমার ত চুলা নাই । আমার কাছে কিছু চাউল আছে। তোমার হাঁড়ির মধ্যে ছাড়িয়া দেই। দুইজনে একসঙ্গে ভাত খাইব ।”   বালি ভাবিল, “তা মন্দ কি! আমি ত শুধু পানি সিদ্ধ করিতেছি। ও যদি এর মধ্যে কিছু চাউল ছাড়িয়া দেয়, তবে ওর উপর দিয়াই আজিকার সকালের আহারটা সারিয়া লইব ।” প্রকাশ্যে বলিল, “তা বেশ ত তোমার চাউল লইয়া আইস। আমরা একসঙ্গে রান্না করিয়া খাই ।” নদীতে পানি অল্প । হাঁটিয়াই পার হওয়া যায়। এপার হইতে ধূলি আসিয়া সেই উনানের পাশে বসিল।   বালি যেই একটু ওদিকে তাকাইয়াছে, অমনি ধূলি তার কাপড়ের এক কানি একটা পোটলার মতো করিয়া ধরিল। যেন ধূলি বুঝিতে পারে, তার মধ্যে চাউল আছে । তারপর বালিকে বলিল, “দেখ— দেখ ভাই । অকাশ দিয়া কেমন একটা পাখি যাইতেছে।” পুব পারের ট্যাটন একটু চাহিয়াছে, অমনি ধূলি তার কাপড়ের পুটলি খুলিয়া হাঁড়ির মধ্যে চাউল ঢালিতেছে এরূপ ভান করিয়া কাপড় ঝাড়া দিতে লাগিল। তারপর হাঁড়ির মুখে ঢাকনি দিয়া দুইজন চুলায় জ্বাল দিতে লাগিল। অনেকক্ষণ চুলায় জ্বাল দিয়া যখন তাহারা ঢাকনি খুলিল, তখন দেখা গেল হাঁড়ির মধ্যে শুধুই গরম পানি সিদ্ধ হইতেছে। একটাও ভাত নাই । একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিয়া তাহারা সবই বুঝিতে পারিল ।   বালি তখন ধূলিকে বলিল, “দেখ ভাই ! এখন সত্যই বুঝিতে পারিলাম, আমরা কেহ কাহারও চাইতে বুদ্ধিতে কম না। আমাদের এই মূল্যবান বুদ্ধি একে অপরের উপর ছাড়িয়া শুধুই সময় নষ্ট করিতেছি। এসো আমরা সত্যিকার বন্ধু হই। আমাদের দুইজনের বুদ্ধি একসঙ্গে ব্যবহার করিলে আমরা অনেক লাভ করিতে পারিব।” ধূলি বলিল, “বেশ ভাই! আমি তাহাতে রাজি আছি ।”   তখন দুই বন্ধু অনেক পরামর্শ করিয়া এদেশ ছাড়িয়া বহু দূরে আর এক দেশে চলিয়া গেল । সেখানে যাইয়া শুনিল, এক বিদেশী সওদাগর কিছুদিন হইল মারা গিয়াছে । তাহার টাকা-পয়সার অন্ত ছিল না। আত্মীয়-স্বজনেরা তাহা ভাগ-বাটোয়ারা করিয়া লইয়াছে । চালাকির আরও নমুনা এক গাছতলায় বসিয়া দুই ট্যাটন নানারকম ফন্দি-ফিকির করিতে লাগিল । তারপর রাত্র হইলে সেই লোকটির কবর খুঁড়িয়া তার মধ্যে ধূলি লুকাইয়া রহিল ।   পরদিন সকালবেলায় বালি সেই সওদাগরের বাড়ির সামনে যাইয়া ডাক ছাড়িয়া কাঁদিতে লাগিল । তাহার কান্না শুনিয়া পাড়ার সকলে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কাঁদ কেন ?” সে বলিল, “এ বাড়ির সওদাগর সাহেব ছিলেন আমার পিতা। তাঁর মরার খবর শুনিয়া আমি অমুক দেশ হইতে আসিয়াছি। কিন্তু আমার পিতার সমস্ত সম্পত্তি অপরে দখল করিয়া লইয়াছে। আমার জন্য কিছুই রাখে নাই।” এই বলিয়া সে আবার কাঁদিতে লাগিল। বিদেশী লোক বলিয়া সবারই একটু দয়ার ভাব! আর লোকটি অমন ইনাইয়া বিনাইয়া কাঁদিতেছে! তাহার কান্না শুনিয়া সকলের চোখে পানি আসিল । কিন্তু সওদাগরের আত্মীয়-স্বজনেরা বলিল, “ও যে সওদাগরের ছেলে তার প্রমাণ কি ?” বালি তখন কান্না থামাইয়া বলিল, “আমার পিতা আমাদের দেশে যাইয়া আমার মাকে বিবাহ করিয়াছিলেন । তারপর এদেশে আসিয়া আমাদের খবর লন নাই। আমি বিদেশী লোক । প্ৰমাণ কোথায় পাইব ? মৌলবি সাহেবেরা বলেন, মরা ব্যক্তির জান তার কবরের মধ্যে লুকাইয়া থাকে। আপনজনের ডাকে তাহারা কখনও কখনও গায়েবি আওয়াজ করিয়া থাকেন। আসুন আপনারা আমার সঙ্গে । বাপজানের কবরের কাছে যাইয়া একবার তাহাকে ডাক দেই। যদি তিনি কথা বলেন, তবে প্রমাণ হইবে আমি তাঁর সত্যিকার ছেলে ।” একথা শুনিয়া সকলেই রাজি হইল। কবরের কাছে আসিয়া বালি ডাক ছাড়িয়া কাঁদিতে লাগিল, “বাপজানগো! তুমি মরিয়া গিয়াছ। আমাকে কিছু দিয়া যাও নাই। আমি যদি তোমার সত্যিকার ছেলে হই, তবে আমার ডাকে সাড়া দাও।” গাঁয়ের লোকেরা অবাক হইয়া শুনিল, কবরের ভিতর হইতে গোঁ গোঁ আওয়াজ হইতেছে। বালি তখন বলিল, “বাপজানগো ! তোমার টাকা-পয়সা সকলে ভাগ করিয়া লইয়াছে । আমার কিছুই নাই । আমাকে কিছু দিয়া দাও ।” কবরের ভিতর হইতে ধূলি আওয়াজ করিল, “ও আমার সত্যিকার ছেলে। তোমরা ওকে সাত ছালা টাকা দাও। নতুবা তোমাদের খুব খারাপ হইবে।” সওদাগরের আত্মীয়-স্বজনেরা গ্রামবাসীদের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া বালিকে সাত ছালা টাকা দিয়া দিল। সেই টাকা গনিয়া গাঁথিয়া ছালায় পুরিয়া একটা গরুর গাড়িতে বোঝাই করিয়া বালি বাড়ি রওয়ানা হইল । ধূলি কবরের মধ্যেই পড়িয়া রহিল। একবারও বালি তাহার কথা মনে করিল না। দুপুরবেলায়, যখন কবরের কাছে কোনো জনমানব নাই, সেই সময় ধূলি কবর হইতে উঠিয়া জানিল, বালি আগেভাগেই টাকা লইয়া চলিয়া গিয়াছে । সে তখন শহরের দোকান হইতে খুব দামি একজোড়া জরির জুতা কিনিল ; তারপর যে পথ দিয়া বালি গরুর গাড়ি লইয়া গিয়াছিল, তাহারই চাকার দাগ দেখিয়া দৌড়াইতে লাগিল । অল্পক্ষণের মধ্যে সে বালির কাছাকাছি আসিয়া পৌঁছিল এবং অন্য পথে ঘুরিয়া দৌড়াইয়া তার খানিকটা সামনে যাইয়া একখানা জরির জুতা পথের মধ্যে রাখিয়া দিল । তারপর আরও মাইল খানেক

Scroll to Top