সুখ ও অসুখ
অবশেষ দাস
সুখ ও অসুখ (Kaler Sanko)
কয়েক কোটি টাকার বাড়ি। বলা ভাল প্রাসাদ। ছবির মতো ফুলের বাগান। ফলের বাগান।পুকুর ভর্তি মাছ।গা ভর্তি গহনা ।
সংসারে সুখ যেন ধরে না ।বাড়ির বউ রূপা খুব সাবধানী । অতিথির যাতায়াত অপছন্দ । বাগানে গরু-ছাগল ঢোকার জো নেই।
শ্বশুর -শাশুড়ি শুরুতেই তাড়িয়েছে। অন্দরের ধুলোবালি ঝেড়েই ফেলেছে । দুঃখের গল্প শোনার আশঙ্কায় সম্বন্ধ ও সম্পর্ক এড়িয়ে চলে।
স্বামীকে নিজের দিকে টেনে রেখেছে। স্বামীর অবস্থা ভাষাহীন শিশুর মতো, বলা ভাল গৃহপালিত স্বামী।
রোজগারের যন্ত্র হলেও সংসারে তার কোনও মতামত পাত্তা পায় না। সোনা বাঁধানো সংসারে বউ-ই শেষ কথা।
অহংকারী স্ত্রী
এ সংসারে কারও প্রবেশাধিকার নেই। শুধু বউয়ের বাপের বাড়ির লোকজন নয়নের মণি। এভাবেই চলছিল সোনার সংসার ।
তাদের একার সংসার । সংসারের আর কোনও কিছুর সঙ্গে তাদের যোগাযোগের প্রয়োজন নেই।
প্রাচুর্যের হুঙ্কারে বউয়ের পা জোড়া হয়তো মাটিতে পড়ে না। একদিন আকাশ থেকেই পড়তে হল।
সামান্য উপসর্গ নিয়ে নামকরা বেসরকারি হসপিটাল । ডক্টর বলেছেন, ” রূপার ব্লাড-ক্যানসার।” বড়জোর তিন মাস আয়ু।
সোনার সংসারে আজ ঘোর অমাবস্যা । মৃত্যু পথযাত্রী রূপার চোখে জল গড়িয়ে যাচ্ছে । সুখের ঘরে আজ শোক জ্বলজ্বল করছে ।
সব বন্ধ রাখা ছিল । এ বাড়িতে কেউই ঢুকতে পারেনি । ঢুকতে দেওয়াও হয়নি । তবু রোগ ঠিক ঢুকে গেছে।
রূপার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। কেউ তাকে দেখতে আসছে না। দেখতে আসছে না , ঠিক তা নয়।
স্ত্রীর বোধোদয়
এ বাড়িতে আসার পথ আগে থেকেই বন্ধ হয়ে আছে। বাধ্য স্বামী অরূপকে শয্যাশায়ী রূপা বলল, ” সবাইকে আসতে দাও।
কেউ যেন ফিরে না যায়। তোমার বাবা-মাকে বাড়িতে নিয়ে এসো। যে কদিন বাঁচব, একসাথে থাকব। ”
অরূপ বলল , ” বাবা-মা অনেক অভিমান নিয়ে গেছে।
যেভাবেই হোক, ফিরিয়ে আনব।”
এখন একটা কাজের মেয়ে রাখা হয়েছে। শুধু রূপাকে দেখাশোনা করবার জন্য। সেই মেয়েটি পাড়ার সব খবর রাখে।
পাড়ার লোকে বলছে, খুব অল্প বয়স্ক মেয়ে । জীবনের কিছুই তো দেখলো না। এইভাবে চলে যেতে দেখলে কষ্ট হয়।
আবার অনেকে বলছে, ঈশ্বর তো অহংকার সহ্য করে না। অমন স্বার্থপর মেয়ে খুব একটা দেখা যায় না।
আজকের অসুস্থ , তাই হয়তো মানসিকতা একটু বদলেছে। তা না হলে ধরাকে সরা জ্ঞান করত।
রূপার বাপের বাড়ির লোকজন খুব ভেঙে পড়েছে। অসুস্থ মেয়েটাকে নিয়ে লড়াই করবার আগেই যেন হেরে বসে আছে।
ব্রাহ্মণ এর আশাবাদ
এই বাড়ির ব্রাহ্মণ বেশ পন্ডিত মানুষ। পাড়ার লোকজন অনেকেই বলছে, প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
এই ব্রাহ্মণ কিছুতেই রাজি নন। তিনি বললেন, “এই দুরারোগ্য ব্যাধি সমাজে নতুন কিছু নয়। সব এলাকাতেই কমবেশি মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত।
ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শেষ বললেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। বরং এই কঠিন অবস্থা থেকে কিভাবে নতুন করে জীবন শুরু করা যায় , সেটাই দেখতে হবে।”
ব্রাহ্মণের কথা শুনে বাড়ির সবাই যেন আশার আলো দেখে। ব্রাহ্মণ বললেন , ” সবাইকে আরো জোর ধরতে হবে।
সবাই শক্ত হলে তবে তো বউমা মনে বল পাবে। জীবন কখনো ফুরিয়ে যাবার নয়। বরং সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে।
গৃহস্থ বাড়ির দরজা-জানলা না রাখলে আলো-বাতাস প্রবেশ করবে কিভাবে। নিজেরাই বা ঢুকবে কোথা দিয়ে যদি ঘরের দরজা না থাকে।
কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কখনো কখনো অসৎ কেউ ঢূকে পড়তেই পারে , তাই বলে ঘরের দরজা না রাখলে হবে কেমন করে।
ঘরের জানলা দিয়ে আমরা জানি আলো বাতাস আসে, আর সেজন্যই তো জানলা ছাড়া ঘর হয় না।
কিন্তু ধুলোবালি দুর্গন্ধ সবই জানলা দিয়ে আসে। ঠিক তেমনি জীবনের দরজা-জানলা সবই আছে, কখনো কখনো উল্টোটা ঘটে যায়।
শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে, সমাধান নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।”
এই কদিনে সবাই যেন কেমন সমব্যথী হয়ে উঠেছে। সবার চোখে বিন্দু বিন্দু করুণা জমে আছে।
বাড়ির সুখ ও অসুখ
সম্ভাব্য শোকের ছায়া এই বাড়ির সর্বত্র একে একে ছড়িয়ে পড়ছে। দক্ষিণের জানালার ঠিক পাশে রাস্তা পেরিয়ে বকুল গাছের ছায়া এসে পড়েছে।
ছোট্ট বাগানে অজস্র জবা ফুল ফুটেছে। জবা গাছের পাতার ভিতরে কটা টুনটুনি বাসা করে আছে।
তারা ফাঁকে ফাঁকে বেশ কথা বলে। আজ তারা যেন আশ্চর্যরকম চুপচাপ। শোক বড় ছোঁয়াচে।
টুনটুনিরাও বুঝি , সব জানতে পেরেছে। নাকি তারা সংসার নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে !
পাড়াতে একটা পুরানো ফেরিওয়ালা এসেছে। এই বাড়ির দরজার সামনে কখনো দাঁড়ায় না।
তিনিও জানেন , এই বাড়িটা মিশুকে নয়। এদের দরজায় কেউ আসে না।
এ বাড়ির অসুস্থ বউ রুপা হঠাৎ বলল , ফেরিওয়ালার ডাকটা শুনে মনটা কেমন কেমন করছে।
আজ একটু দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াব। বাইরের লোকজনগুলো দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।
ফেরিওয়ালার কাছ থেকে আজ আলতা-সিঁদুর কিনব। পাড়ার বউদের সঙ্গে একটু কথা বলব।
বাড়ির লোকজন আশ্চর্য হয়ে যায়। রুপা তো কখনো এইভাবে যেখানে সেখানে কেনাকাটা করে না।
নিজের মধ্যে থাকতে ভালবাসে। নিজেকে নিয়েই থাকতে ভালবাসে।
স্বামীর হাত ধরে দু তিনটে গেট পেরিয়ে একেবারে বাইরের দরজার সামনে এসে সে দাঁড়ায়।
ততক্ষণে ফেরিওয়ালা অন্য পাড়ায় চলে গেছে।
লোক পাঠিয়ে তাকে ডেকে আনা হয়। তার চোখে-মুখে বিস্ময়। আবার, কেমন একটা তৃপ্তির ছায়া।
ফেরিওয়ালা বেশ স্বচ্ছন্দে বললেন, পাড়ার লোকের মুখে শুনেছি, “এই বাড়ির দিদিমণি খুব অসুস্থ।
কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, দিদিমণি আগে অসুস্থ ছিলেন। এখন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন।
রুপা হাসিমুখে বলল, ” ফেরিওয়ালা ঠিক কথা বলেছেন। আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছি। “


