ডানা
নিরঞ্জন মণ্ডল
ডানা-নিরঞ্জন মণ্ডল
ছোট্ট একমাত্র জানালাটার পাশে এসে দাঁড়ায় মুন্নি। ডাগর দুটি চোখ মেলে তাকায় আকাশের দিকে।
ছাই রঙের মেঘের দঙ্গল এগিয়ে আসছে আকাশ বেয়ে। বিজলি চমকাচ্ছে মাঝে মাঝে।
শেষ বিকেলের আলোটাকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে মেঘ। অন্ধকার হয়ে আসবে এবার।
নড়বড়ে দুটি কাঠের পাল্লা জানালায়। সেগুলোকে দুপাশের দেয়ালে প্রায় লেপটে দেয় সে।
জং ধরা গ্রিলটা আঁকড়ে ধরে ছোট্ট দুটি হাতে। কাঠের পুরোনো পাল্লাগুলো পলেস্তারা খসতে থাকা দেয়ালে ঠকঠক করছে।
খসে পড়ছে বালির গুঁড়ো মেঝেতে। উদাস মুন্নির খেয়ালই নেই কোনো দিকে। ঠায় দাঁড়িয়ে সে, আকাশমুখী।
বড় অভিমান হয়েছে তার আকাশটার ওপর। কী সুন্দর খেলছিল সে!
ঘরের পাশের অপ্রশস্ত রাস্তাটার দুপাশে নাম না জানা ছোট ছোট গাছ। মাথা ছাঁটা। কোনটার পাতা সবুজ, আবার কোনটার রঙচঙে। কোন কোনটায় ছোট ছোট ফুলও ফুটেছে।
সেই ফুলের টানে ছোট ছোট প্রজাপতি উড়াউড়ি করছে। একটি-দুটি নয়—অনেকগুলো। কী সুন্দর রঙিন তাদের ডানা!
কখনো পাতায়, কখনো ফুলে বসে। ধরতে হাত বাড়ালেই উড়ে যায়। এ এক মজার খেলা।
তার তো কোনো ভাই-বোন নেই! তাই একাই সে সারা বিকেল এভাবেই খেলে, ঘরের পাশে।
গত বছর পর্যন্ত তার ঠাম্মি থাকতেন সঙ্গে। মাঝে মাঝে খবরদারি করতেন। কী যে হলো একদিন!
সারা রাত ঠাম্মির কাছেই ঘুমিয়েছিল সে, রোজকার মতো। ঘুম আসার আগে শুনেছে পরীদের গল্প।
প্রজাপতিরাই নাকি জাদুর ছোঁয়ায় পরী হয়ে যায়! কত গল্পই না জানা ছিল ঠাম্মির!
রাজপুত্তুর, পক্ষিরাজ, রাজকন্যে, রাক্ষস, খোক্কস, দত্যি-দানো—আরও কত কী! সব তো শোনা হলো না তার।
সকালে ঘুম ভাঙিয়ে মা বলেছিলেন, ঠাম্মি আর নড়াচড়া করছেন না, কথা বলছেন না।
সে জানতে চেয়েছিল—ঠাম্মি অসুখ করলেন কি? মা কোনো উত্তর দেননি।
কিছুক্ষণ পর কাঁচঘেরা এক গাড়িতে করে ক’জন লোক ঠাম্মিকে নিয়ে গেলেন।
ঠাম্মি তখনও শুয়ে ছিলেন। সেই যে গেলেন, আর ফিরলেন না।
এমন তো কতবার হয়েছে—ঠাম্মি গেছেন দেশের বাড়ি, পিসির বাড়ি। কদিন বাদেই তো ফিরে এসেছেন।
এবার আর কেন এলেন না! বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন—ঐ আকাশে তারা হয়ে আছেন ঠাম্মি।
সেদিন থেকেই রাতে আকাশে তারা দেখলেই সে ঠাম্মিকে খোঁজে, ডাকে। কিন্তু ঠাম্মি আসেন কোথায়!
ঠাম্মি কি রাগ করেছেন তার ওপর? গত বছর একদিন ঠাম্মির বারণ না শুনে রাস্তা ধরে খুব জোরে দৌড়েছিল সে প্রজাপতির পেছনে, ধরবে বলে।
রেগে গিয়েছিলেন ঠাম্মি। সে যে রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাঁটু কেটে ফেলেছিল।
কিন্তু এই এক বছরে তো সে কতবার ঠাম্মির কাছে মাফ চেয়েছে! তবু কি রাগ কমেনি ঠাম্মির?
চোখে একটা ঘোর আসছে মুন্নির। সারা দুপুর ঘুমোয়নি সে। বাবা দুপুরে বাড়ি থাকেন না। সরকারি বাবুদের গাড়ি চালান তিনি।
এখানকার উঁচু উঁচু বাড়িগুলো কত সুন্দর রঙিন! তাদের ঘরটাই কেমন ভাঙাচোরা।
বাবা তো কতবার বলেছে—চলো না একটায় যাই! কিন্তু বাবা শোনেননি।
সকাল ন’টায় গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে যান বাবা, ফেরেন সন্ধে গিয়ে। মা দুপুরে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমোন।
সে মার পাশে বসে খেলে—ঘর আঁকা, পাতা আঁকা, প্রজাপতি আঁকা—আরও কত কী! বালিশ দিয়ে ঘর বানায়।
সে ঘরে কখনো শুয়ে পড়ে, কখনো গুছিয়ে রাখে। বিকেলে মা রান্নার কাজে ব্যস্ত হলে সে চলে যায় খেলতে, রাস্তাটার পাশে।
বাবা ফিরলে একটু অ-আ, ক-খ পড়া। একশো পর্যন্ত গোনা। তারপর খেয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া। কিন্তু আজ তো খেলাটাই হলো না ঠিক মতো!
বাবার ফিরতে এখনো অনেক দেরি। মা রান্না গোছাতে ব্যস্ত। মুন্নি একেবারে একা। ঠাম্মিটা যদি——!
হঠাৎ জানালার ওপারে চোখ পড়ে মুন্নির। একটু দূরে একটি বেশ বড়ো প্রজাপতি। কী সুন্দর রঙিন তার ডানা!
তার যদি এমন দুটো ডানা থাকত! প্রজাপতিটার ডানা দুটো পতপত করে নড়ছে। আরে! প্রজাপতিটা তো তার দিকেই এগিয়ে আসছে!নড়েচড়ে ওঠে মুন্নি। কী আশ্চর্য! যতই এগোচ্ছে, প্রজাপতির শরীর আর ডানা ততই বড় হচ্ছে।
জানালার চেয়েও বড় দেখাচ্ছে! তার দুটো পা আর দুটো হাতও আছে! তবে কি ওটা পরী?
আরও কাছে চলে আসছে সেটা। মুন্নি এখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, তার হাত দুটো তার দিকেই বাড়ানো। মুখটাও নড়ছে—সে কি কিছু বলছে?
উত্তেজিত হয়ে পড়ে মুন্নি। পিছন ফিরে তাকায়। মা আসছেন কি না দেখে নেয়। বারান্দা থেকে রান্নার ঠুকঠাক, টুংটাং শব্দ ভেসে আসে। মা রান্নায় ব্যস্ত। নাম ধরে কে যেন ডাকে তাকে। ঘুরে দাঁড়ায় মুন্নি।
আরে—পরীটা তো জানালার ওপারে এসে দাঁড়িয়েছে! কী সুন্দর দেখতে! তার সারা গা থেকে ভারী সুন্দর গন্ধ আসছে মুন্নির নাকে। আরামে যেন চোখ বন্ধ হয়ে আসছে তার। বাইরে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে জোরে, ভেজা বাতাস। বৃষ্টি আসবে বুঝি।
চোখের পাতা খোলে মুন্নি। তাকায় পরীর মুখের দিকে। গোলাপি মুখ, নীল চোখ, সারা গা থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে।
মুখে মিষ্টি হাসি। পরীটাও তাকিয়ে তার মুখের দিকে। বুকটা তোলপাড় করে ওঠে মুন্নির—তুমি কে গো? এখানে কেন এলে?
তুমি কি পরী? আমার বন্ধু হবে? তাহলে ভেতরে এসো, খেলি তোমার সঙ্গে।
নরম হাসিতে বাতাস ভরিয়ে দেয় পরী। বলে—খেলা পরে হবে মুন্নি। আমি তোমার বন্ধুই তো হতে চাই।
কিন্তু দেখ তো আমার এই ডানাটার দিকে। একটা ফুটো দেখতে পাচ্ছ?
আজ খেলতে গিয়ে তুমি আমার দিকে পাথরের টুকরো ছুঁড়লে। ডানায় লেগে ফুটো হয়ে গেল।
খুব কষ্ট পায় মুন্নি। বলে—ভুল হয়ে গেছে গো! আমি তোমাকে ধরতে চেয়েছিলাম, আদর করার জন্য।
তুমি উড়ে চলে যাচ্ছিলে বারবার। তাই রাগ হল। তখন তো বুঝিনি তুমি আমার বন্ধু হতে চাও। বুঝিনি তুমি পরী।
কিন্তু তখন তো তুমি খুব ছোটো ছিলে, এই টুকুন। এখন এত বড়ো হলে কী করে?
—ওটাই তো জাদু। আমরা তোমাদের সঙ্গে খেলব বলে ছোটো হয়ে তোমাদের কাছে আসি। ধরতে গেলে উড়ে যাই।
এটাই তো খেলা। তুমি দৌড়াও আমার পেছনে। এই দৌড়োদৌড়িতেই তো রাতে ভালো ঘুম হয় তোমার। ঘুমে স্বপ্ন আসে।
তোমার হাত-পা—গোটা শরীর শক্তপোক্ত হয়। ধরা দিলে তো এসব হয় না ভাই।
—তুমি আমাকে ভাই বললে?
—তাই তো বললাম। বন্ধু হলে তাই তো বলতে হয়।
—তুমি সত্যিই আমার বন্ধু?
—হ্যাঁ গো। কত দিন ধরে তোমার বন্ধু হতে চাচ্ছি! তুমি বুঝতে পারোনি। তাই পাথর ছুঁড়ে ডানাটা ফুটো করে দিলে।
এখন উড়তে আমার কত কষ্ট হচ্ছে। তুমি বুঝবে কি—?
—আর বোলো না বন্ধু। আমারও কষ্ট হচ্ছে। এই কান মলছি। আর করব না ভাই।
—বেশ। এখন তুমি চলো আমার সঙ্গে।
—কোথায়?
—তোমার ঠাম্মি তোমাকে আদর করার জন্য ডাকছে। ঐ দেখো, মেঘের মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন তোমার ঠাম্মি।
পরীর আঙুল অনুসরণ করে দূরে মেঘের মাথায় তাকায় মুন্নি। দুধসাদা কাপড় পরে মেঘের মাথায় দাঁড়িয়ে তার ঠাম্মি।
ঠাম্মির গা থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে আলো। ছড়িয়ে পড়ছে সারা আকাশে। ঠাম্মি যে সত্যিই তারাদের মতো!
বাবা-মা ঠিকই বলেছিলেন তাকে! চোখ দুটো ভালো করে রগড়ে আবার তাকায় মুন্নি ঠাম্মির দিকে।
দুই হাত বাড়িয়ে তাকেই ডাকছেন ঠাম্মি। ধড়াসধড়াস করে ওঠে মুন্নির বুক। ঠাম্মির কাছে যাবার প্রবল ইচ্ছেয় ছটফট করে ওঠে তার পা দুটো। কিন্তু জানালাটা যে গ্রিল দিয়ে আটকানো! যাবে কী করে সে?
বারান্দা দিয়ে যেতে পারে অবশ্য। কিন্তু মা তো যেতেই দেবে না বাইরে, বৃষ্টি আসতে পারে বলে।
করুন চোখে সে তাকায় পরীর দিকে। বলে—জানালাটা গলে যেতে যে পারব না ভাই। তুমি ঠাম্মিকে একটু নিয়ে এসো না এখানে।
—তা তো হওয়ার নয় ভাই। তোমার ঠাম্মি যে আকাশের তারা। মাটির কাছে আসতে মানা। তুমিই চলো।
—কী করে যাব? ওদিকে মা, এখানে জানালায় গ্রিল। তা ছাড়া অত ওপরে আমি যাব কী করে? আমার তো তোমার মতো ডানা নেই যে উড়ে যাব।
—ভাবছ কেন বন্ধু? আমি তো আছি। আমার কাছে এই যে জাদু কাঠি দেখছ? এটা তোমাকে জানালা গলিয়ে বাইরে আনবে। আমার পাশে এসো। আমার গলা জড়িয়ে ধর হাত দিয়ে। আমি উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে।
আনন্দে নেচে ওঠে মুন্নির মন। সে আবার তাকায় দূর আকাশে ঠাম্মির দিকে। দেখতে পায় ঠাম্মিও করুন চোখে তাকিয়ে তার দিকে। চিৎকার করে ওঠে মুন্নি—কেঁদো না ঠাম্মি। আমি যাচ্ছি তোমার কাছে। কত দিন তোমাকে—! ঠা—ম্মি—ই—ই—!
ধপাস করে একটা শব্দ। শক্ত মেঝেয় পড়ে গেছে মুন্নি। মুখ দিয়ে তার বেরিয়ে আসে—উঃ—মা—আ—আ—আ—!
বারান্দায় রান্নায় ব্যস্ত মুন্নির মা দৌড়ে আসে রান্না ফেলে। মুন্নিকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে কাছে গিয়ে জড়িয়ে নেয় বুকে।
—কি হয়েছে মা? ব্যথা পেয়েছ তো! স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলে? কত করে বলি দুপুরে একটু ঘুমো—!
সন্ধ্যের পর মুন্নির বাবা বাড়ি ফেরে। বিছানায় শুয়ে মুন্নি। তার মা বাবাকে বলছে—জানো—মেয়েটার বেশ জ্বর। একটু ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
—সে কী! কখন থেকে?
—দুপুরে তো ঠিক ছিল। বিকেলে রাস্তায় খেলছিল। বৃষ্টির ভয়ে ধরে এনেছিলুম ঘরে। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ মেঝেতে পড়ে গেল। গিয়ে কোলে নিতেই বুঝলুম—!
—কোথায় সে?
—ঘরে শুয়ে আছে।
—নিয়ে এসো ওকে। ফিরে এসে হাত-মুখ ধোব, তখন না হয় চা—!
মুন্নির মা ঘরে ঢোকে। মুন্নি জ্বরের ঘোরে তখন বিড়বিড় করছে—তুমি চলে যাচ্ছ কেন ঠাম্মি? আমি যাচ্ছি তো তোমার কাছে।
একটু দাঁড়াও ঠাম্মি। তুমি ছিলে না বলে আমার কত কষ্ট—কেউ গল্প বলে না রাতে। খেলে না কেউ—! আমার হাতটা একটু—! রাগ কোরো না বন্ধু—আর পা—থ—র—ছুঁড়ব না। পরী ভাই আমাকে উ—ড়ি—য়ে—!


