ঘুম ও স্বপ্ন
ঘুম ও স্বপ্নের দোলাচলে
চন্দনকৃষ্ণ পাল
ঘুম ও স্বপ্ন
ভবের বাজার এসে বাস থেকে নামলাম। নাড়িভূড়ি হজম হয়ে গেছে । পেট চো চো করছে। একটা বেকারীতে গিয়ে কিছু বিস্কুট নিয়ে বহু কষ্টে গলাধঃকরণ করি। আর মাত্র দেড় ঘণ্টা সময় আছে। ঠিক তিনটায় ইন্টারভিউ।
এখন দেড়টা বাজে। যেতে হবে নৌকায় করে পুরো চার মাইল। ঘণ্টা সোয়া ঘন্টায় নাকি পৌঁছা যায়। কি জানি কি হবে। জীবনে এই প্রথম নৌকো চড়তে যাচ্ছি।
নৌকার নাম গয়না। চমৎকার ঘোমটা দেয়া। আমার সাথে আরও চার পাঁচ জন নৌকোয় ওঠেন। নৌকা ভীষণ রকম দোলে।
আমার ভয় লাগে, ছিটকে পড়ি কিনা। দুলুনি থামলে মাঝি নৌকো ছাড়ে। বেশ মসৃণ ভাবে এগোয় নৌকা।
চমৎকার একটা অনুভূতি। আমি ঘোমটার বাইরে এসে দাড়াই। ভাদ্রের মেঘলা আকাশ। খালে টলটলে জল ভাটির দিকে বইছে।
আমাদের নৌকার গতিও একই দিকে। খালের পাশেই রাস্তা। মাঝিকে জিজ্ঞস করে জানা যায় বেশ কটা ব্রীজ ভাঙ্গা।
তাই বাস রিক্সা জগন্নাথপুর পর্যন্ত পৌঁছোয় না।
শীতকালে রাস্তা কেটে ভাঙ্গা ব্রীজের পাশ দিয়ে বাস রিক্সা যাওয়া আসা করে। নৌকো এগোচ্ছে। দুপাশে বাড়ি ঘর গাছপালা।
শৈশব স্মৃতি ও বিলের দৃশ্য
পাখির ডাক। চমৎকার গ্রামীন পরিবেশ ভালো লাগে। একটা প্রাইমারী স্কুল পার হই আমরা। নানা বয়সের ছেলেমেয়ে রঙ্গিন জামা পরে কলরব করছে। বোধ হয় টিফিন আওয়ার চলছে। গ্রামের স্কুলে টিফিন আওয়ারে কোন বাচ্চারা কি টিফিন করে?
আমরা তো করিনি। সকাল বেলা গরম ভাত খেয়ে স্কুলে গিয়েছি। টিফিন আওয়ারে হৈ চৈ দুষ্টুমী করে কাটিয়েছি।
আবার বিকেল চারটার পর বাড়ি ফিরে ভাত খেয়েছি। শহরের টিফিন আওয়ার আর গ্রামের টিফিন আওয়ারে কতো পার্থক্য!
একটা বিলের মতো জায়গার ওপর দিয়ে নৌকো যাচ্ছে। পানিতে প্রচুর সাদা শাপলা আর পানি ফল।
তিরতির করছে জল পোকারা। আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ। দূরে জলের গা ছুঁয়ে গ্রাম আর গ্রাম।
ঘুম ও স্বপ্ন এবং কিছু আশা
ঘন্টা খানেক পর দূরে কিছু বিল্ডিং চোখে পড়ে। মাঝিকে জিজ্ঞস করলে জানায় ও গুলো উপজেলা অফিস।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌছে যাবো এ শান্তনা টুকু দিতেও ভুলেনা মাঝি।
তিনটার মাত্র কমিনিট আগে নৌকা উপজেলার পাশে মাঠের গায়ে লাগে। উপজেলার যাত্রী আমি একাই।
অন্যান্য বা বাজার পর্যন্ত যাবে । আমি কোণাকোণি মাঠ পাড়ি দিয়ে উপজেলায় পৌঁছাই।
গেটে বড় করে লেখা জগন্নাথপুর উপজেলা কার্যালয়। পুরনো সিও অফিসে বসেন নির্বাহী অফিসার।
বাকী সবাই স্কুল ঘরের মতো লম্বা টিনের দুচালা ঘরে বসে কাজ কর্ম চালান। পাশে বিশাল দুটো দুতিন তলা বিল্ডিং এর কাজ চলছে। আমার মতো ফাইল হাতে (কারো কারো হাতে ব্যাগ) ভদ্রলোকের সংখ্যা বেশ কজন।
একজন মহিলাকেও ইতস্তত হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যাচ্ছে। ইন্টারভিউ নেবেন ইউএনও এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এটা বুঝাই যায়। ইন্টারভিউ শুরু হয়নি।
কিছুক্ষণ কাটে। পেটের ভেতর ছুচুর দৌড়োদৌড়ি। হাঁটাহাঁটি করতে করতে চা স্টলের দেখা পাওয়া যায়।
পাউরুটির টুকরো আর চা তে আপাততঃ ক্ষুন্নিবৃত্তির রফা। পূর্বস্থানে ফিরে আসতেই দেখা যায় হালকা পাতলা এক ভদ্রলোক ঢুকছেন ইউএনও সাহেবের রুমে। এই ভাদ্রের তালপাকা গরমেও কালো কোট কালো প্যান্ট।
আশপাশের ফিসফিসানী জানান দেয় চেয়ারম্যান। উপজেলা না ইউনিয়ন পরিষদের বুঝা যায় না।
ইন্টারভিউ শুরু
নির্বাহী সাহেবের পিয়ন সাহেব টুল নিয়ে দরোজায় বসতেই অনেকের এগিয়ে যাওয়া। সবার সাথে নিজেও।
পিয়ন সাহেবের বক্তব্য ‘এক্ষণই ইন্টারভিউ শুরু অইব। পয়লা স্যার হকলোর এর পরে বাকী সব।’
আমি তো স্যার না কেরানী পদ প্রার্থী। মনটা দমে যায়। দুপুর সাড়ে তিন। ফিরে যেতে পারবো তো?
ইন্টারভিউ শুরু হয়। তিন জনের পর সেই ম্যাডাম। বেশ দেরী করে ম্যাডাম বের হন। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।
পিয়নের চিৎকার। আমার নিজের নাম শুনে গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতর ড্রামের শব্দ । ফাইল বগলে চেপে ভেতরে পদার্পন এবং জোর করেই স্লামালেকুম । এক সঙ্গে তিনটি কণ্ঠ বসুন বসুন।
আমি নিজেকে চেয়ারে ছেড়ে হাফ ছাড়ি। একে একে চোখ রাখি কর্তাদের দিকে। নির্বাহী সাহেবকে উনার চেয়ারই চিনিয়ে দেয়।
বাকী চারজনের তিনজনই কালো কোট। এর একজন সেই চেয়ারম্যান।
চেয়ারম্যান সাহেবের ঠোঁটের কোণে পানের লালা প্রমাণ করে ভদ্রলোক পানের প্রতি ভীষণ আসক্ত।
আমার দেয়া এপ্লিকেশন কাগজপত্রসহ ইউএনও সাহেবের সামনে। ভদ্রলোক সন্দেহ ভরা চোখে জিজ্ঞেস করেন-
– এপ্লিকেশন নিজে লিখেছেন?
-জী। ভদ্রলোকের চোখে মুখে অসন্তুষ্টি।
-বর্তমানে কি করছেন? কালো তিন কোটের এক কোট।
-জী টিউশনি।
– অন্য কিছু নয়?
-জী মাস্টার্সে এডমিশন আছে। তবে ঢাকায় থেকে ক্লাশ করা সম্ভব নয় বলে চাকুরীর চেষ্টা করছি।
-হুম। খান সাব আপনি জিজ্ঞেস করেন। এক কোট অন্য কোটকে অনুরোধ করেন
-পড়াশুনা তো করছেন, আবার চাকরির চেষ্টা করছেন কেন?
-পড়াশুনা করছি ঠিক না। এডমিশন আছে। বেকার তাই।
ইন্টারভিউ ও উৎকিণ্ঠা
সবকিছু থমথমে। এরপর ইউএনও এবং ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব একে একে সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রশ্ন করেন।
তিন কোট আমাকে দেখতেই থাকেন। এক সময় ইউএন ও সাহেব বাহিরে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেন। আমি বাইরে আসতেই কয়েক জন ছেকে ধরে।
-কি বললো ভাই।
-ভাই বহু কিছু। সব সাধারণ জ্ঞান।
দুএক জন সাধারণ জ্ঞানের বই খুলে শেষ মুহূর্তের সঞ্চয়টা করে নেয় । আমি হাসি। চাকরি। চুপচাপ বসে থাকি।
আধঘন্টার মধ্যে একাউন্টেন্টদের ইন্টারভিউ ফিনিস। আবার আমার ডাক পড়ে। যাই।
-বসুন।
আমি নিরবে বসে পড়ি।
-চাকরি কি আপনি করবেন?
করার জন্যই তো আসা।
-কবে নাগাদ জয়েন করতে পারবেন।
আমি একটু ভাবি।
-দুতিন দিন সময় দিতে হবে।
চাকরিটা হয়ে গেল
নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলে নিচু গলায়। তিন কোট আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে থাকেন।
কিছুক্ষণ পর ইউএনও সাহেব গলা খাকারি দেন। সবাই চুপ। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বক্তব্য শুরু করেন।
-পাল বাবু আমরা আপনাকে জগন্নাথপুর কলেজের হিসাব রক্ষক হিসেবে নিয়োগ করতে একমত হয়েছি।
বেতন ভাতা সরকারী স্কেলে পাবেন। থাকার খাওয়ার ব্যবস্থা আপনার নিজেকেই করতে হবে।
অবশ্য আমরা সহযোগিতা করবো। আপনি আজ থেকে যান। আগামীকাল সকাল বেলা নিয়োগ পত্র পেয়ে সম্ভব হলে জয়েন করে যাবেন। আগামী শনিবার থেকে আমরা ক্লাশ করতে চাই।
চাকরি হওয়ার পর
ইউএনও সাহেব থামেন। আমি বলি ‘ধন্যবাদ স্যার।’ বুঝি কণ্ঠটা যান্ত্রিক হয়ে গেছে। মনের ভেতর একটা অজানা অনুভূতি।
ওটা সুখের না দুঃখের তাৎক্ষণিক ভাবে আলাদা করতে পারি না । স্নালামালেকুম জানিয়ে বাইরে এসে নিঃশ্বাস ফেলি।
বেশ কজন লোক ঘিরে ধরে। হলো ভাই, হলো। আমি নিরাসক্ত গলায় জানাই ‘না’। না টা মুখ ফসকে নয়, ইচ্ছে করেই বলি।
কারণ এখনও নিয়োগ পত্র পাইনি। তিন কালো কোটকে আমার পছন্দ হয়নি। এদের হাব ভাব দেখে আমার মনে হয় ওরা সর্বদা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। এটা একান্তই আমার ভাবনা। ভুলও হতে পারে।
ইউএনও অফিস থেকে বের হয়ে উচু ব্রীজ পার হই। সামনে কয়েকটা চা দোকান প্রতিটা দোকানেই কিছু সংখ্যক লোক আড্ডা দিচ্ছে। একটা দোকানে বেশ জোরে শোরে পংকজ উদাস এর এর গজল বাজছে।
দোকানদার ভদ্রলোক বুড়ো। কাউন্টারে বসে ঢুলছেন। আমার পেটের ভেতর আবার ক্ষিধে। এবার ঝাল খাবার ইচ্ছে।
কিন্তু আশে পাশে পাউরুটি আর বিস্কিট ছাড়া কিছু চোখে পড়ছে না। ধীর পায়ে এগোই। শেষ বিকেল।
সূর্য হাওরের কোলে ঢলে পড়ার অপেক্ষায়। পিছনে ‘স্যার’ ডাক শুনে চমকাই। আমার বয়সী এক তরণ। আমাকেই ডাকছে। দাঁড়াই।

-স্যার আপনার তো চাকুরী হয়েছে।
-আপনি কি করে জানলেন
-স্যার আমিও কলেজের পিয়ন হিসেবে সিলেক্ট হয়েছি। চেয়ারম্যান সাহেব বললেন। আমাকে স্যার ফজলু বলে ডাকবেন।
আমাদের, হ্যাঁ আমাদেরই তো কলেজের পিয়ন ফজলু। আমি একাউন্টেন্ট বাবু। ফজলুর হেলপ নেয়া যায়। ফজলুর দিকে তাকাই আমি। সাধারণ। কিন্তু বুদ্ধিমান বুঝা যায়।
-ফজলু আশে পাশে ভালো হোটেল নাই? থাকা খাওয়ার জন্য।
-থাকার হোটেল স্যার একটা মাত্র চালু হয়েছে। দুই সীট। খাওয়ার অবশ্য ভালো হোটেল আছে।
-কোথায়?
-বাজারে। চলুন আমিও ওদিকে যাবো।
উপজেলা অফিস ও ইন্টারভিউ
ফজলু আমাকে নদীর ঘাটে নিয়ে আসে। সন্তর্পণে নৌকায় চড়ি। ছোট নদী। পার হতে বেশী সময় লাগে না। নদীর পাড়েই জগন্নাথপুর থানা । নদীতে স্পীড বোট বাঁধা। থানার সামনে ইট বিছানো রাস্তা ধরে দুজন বাজারে আসি। বেশ গোছানো সুন্দর জগন্নাথপুর বাজার। উপজেলা হওয়ার পর জৌলুশ একটু বেড়েছে মনে হয়। সার বাধা ইঞ্জিনের নৌকা। একটা ভালো হোটেলে ফজলু নিয়ে আসে। সারাদিনের ক্ষিধে। আমি ভাত দিতে বলি। ফজলু চা খায়। সন্ধ্যা নেমে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। খাওয়ার পর বিল দিতে গিয়ে চমকাই। ফজলু বিল দিয়ে দিয়েছে।
-এটা কি হলো ফজলু।
-স্যার আপনি আমাদের মেহমান। বুঝি ফজুলুকে বুঝানো যাবে না।
আন্তরিকতাকে খাটো করতে নেই।
-চলো।
তাকে মনে পড়ল
দুজনে জগন্নাথপুরের দুই সিটওলা এক মাত্র হোটেলে পৌঁছাই। হোটেলের দুটো সিটই খালি। ত্রিশ টাকা এডভান্স দিয়ে একটা সিট বুক করে ফজলুকে বিদায় জানাই। ফজলু চলে গেলে রুমে আসি। সিঙ্গেল রুম। ভাগের ফ্যান। ফ্যানটা ছেড়ে শার্ট খুলে বিছানায় বসি। সাথে লুঙ্গি নেই। প্যান্ট পরেই ঘুমাতে হবে। স্যান্ডেলটা খুলে রেখে শুয়ে পড়ি। বিদঘুটে শব্দ করে ভাগের ফ্যানটা চলছে। শুয়ে বুঝতে পারি প্রচুর অবসাদ শরীরে। চোখ দুটো জোড়া লাগার অপেক্ষা। মনে মনে বলি শুভরাত্রি। কাকে? কে জানে!
মিতু আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে। আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়। তাহলে কি হলো ব্যাপারটা? ওর বিয়েটা ফাইনাল হয়ে গেলো? আর ও মেনে নিলো? না ওর সাথে আমার কথা বলা দরকার। আমি দ্রুত পা চালাই। কিন্তু ও আজ অনেক দ্রুত হাঁটছে। আমি মিতু বলে ডাক দেই। কিন্তু ও ফিরেও তাকায় না। হঠাৎ করেই ও ডান পাশের একটা গলিতে ঢুকে পড়ে। আমি গায়ের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে ডাক দেই মি…তু….।
ঘুমটা ভেঙে যায়। সারা শরীর ঘেমে জবজবে হয়ে গেছে। ভাগের ফ্যানটা বিশ্রি শব্দে ঘুরেই চলছে। দূরে মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। রাত পোহানোর দেরী নেই আর।


