গল্প

বাংলা গল্প সমাহার

বাংলা গল্প সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ধারা। কালের সাঁকোতে প্রকাশিত হয় নতুন বাংলা গল্প, সমকালীন গল্প, গ্রামীণ জীবনভিত্তিক গল্প, শিশুতোষ গল্প, কিশো গল্প এবং সাহিত্যধর্মী বিভিন্ন সৃষ্টিশীল গল্প। দেশের ও প্রবাসের লেখকদের মৌলিক গল্প নিয়মিত প্রকাশিত হয় এখানে। বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের জন্য এটি একটি সমৃদ্ধ গল্পভাণ্ডার।

ঘুম ও স্বপ্নের দোলাচলে
গল্প

ঘুম ও স্বপ্নের দোলাচলে

ঘুম ও স্বপ্ন ঘুম ও স্বপ্নের দোলাচলে চন্দনকৃষ্ণ পাল ঘুম ও স্বপ্ন ভবের বাজার এসে বাস থেকে নামলাম। নাড়িভূড়ি হজম হয়ে গেছে । পেট চো চো করছে। একটা বেকারীতে গিয়ে কিছু বিস্কুট নিয়ে বহু কষ্টে গলাধঃকরণ করি। আর মাত্র দেড় ঘণ্টা সময় আছে। ঠিক তিনটায় ইন্টারভিউ। এখন দেড়টা বাজে। যেতে হবে নৌকায় করে পুরো চার মাইল। ঘণ্টা সোয়া ঘন্টায় নাকি পৌঁছা যায়। কি জানি কি হবে। জীবনে এই প্রথম নৌকো চড়তে যাচ্ছি। নৌকার নাম গয়না। চমৎকার ঘোমটা দেয়া। আমার সাথে আরও চার পাঁচ জন নৌকোয় ওঠেন। নৌকা ভীষণ রকম দোলে। আমার ভয় লাগে, ছিটকে পড়ি কিনা। দুলুনি থামলে মাঝি নৌকো ছাড়ে। বেশ মসৃণ ভাবে এগোয় নৌকা। চমৎকার একটা অনুভূতি। আমি ঘোমটার বাইরে এসে দাড়াই। ভাদ্রের মেঘলা আকাশ। খালে টলটলে জল ভাটির দিকে বইছে। আমাদের নৌকার গতিও একই দিকে। খালের পাশেই রাস্তা। মাঝিকে জিজ্ঞস করে জানা যায় বেশ কটা ব্রীজ ভাঙ্গা। তাই বাস রিক্সা জগন্নাথপুর পর্যন্ত পৌঁছোয় না। শীতকালে রাস্তা কেটে ভাঙ্গা ব্রীজের পাশ দিয়ে বাস রিক্সা যাওয়া আসা করে। নৌকো এগোচ্ছে। দুপাশে বাড়ি ঘর গাছপালা। শৈশব স্মৃতি ও বিলের দৃশ্য পাখির ডাক। চমৎকার গ্রামীন পরিবেশ ভালো লাগে। একটা প্রাইমারী স্কুল পার হই আমরা। নানা বয়সের ছেলেমেয়ে রঙ্গিন জামা পরে কলরব করছে। বোধ হয় টিফিন আওয়ার চলছে। গ্রামের স্কুলে টিফিন আওয়ারে কোন বাচ্চারা কি টিফিন করে? আমরা তো করিনি। সকাল বেলা গরম ভাত খেয়ে স্কুলে গিয়েছি। টিফিন আওয়ারে হৈ চৈ দুষ্টুমী করে কাটিয়েছি। আবার বিকেল চারটার পর বাড়ি ফিরে ভাত খেয়েছি। শহরের টিফিন আওয়ার আর গ্রামের টিফিন আওয়ারে কতো পার্থক্য! একটা বিলের মতো জায়গার ওপর দিয়ে নৌকো যাচ্ছে। পানিতে প্রচুর সাদা শাপলা আর পানি ফল। তিরতির করছে জল পোকারা। আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ। দূরে জলের গা ছুঁয়ে গ্রাম আর গ্রাম। ঘুম ও স্বপ্ন এবং কিছু আশা ঘন্টা খানেক পর দূরে কিছু বিল্ডিং চোখে পড়ে। মাঝিকে জিজ্ঞস করলে জানায় ও গুলো উপজেলা অফিস। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌছে যাবো এ শান্তনা টুকু দিতেও ভুলেনা মাঝি। তিনটার মাত্র কমিনিট আগে নৌকা উপজেলার পাশে মাঠের গায়ে লাগে। উপজেলার যাত্রী আমি একাই। অন্যান্য বা বাজার পর্যন্ত যাবে । আমি কোণাকোণি মাঠ পাড়ি দিয়ে উপজেলায় পৌঁছাই। গেটে বড় করে লেখা জগন্নাথপুর উপজেলা কার্যালয়। পুরনো সিও অফিসে বসেন নির্বাহী অফিসার। বাকী সবাই স্কুল ঘরের মতো লম্বা টিনের দুচালা ঘরে বসে কাজ কর্ম চালান। পাশে বিশাল দুটো দুতিন তলা বিল্ডিং এর কাজ চলছে। আমার মতো ফাইল হাতে (কারো কারো হাতে ব্যাগ) ভদ্রলোকের সংখ্যা বেশ কজন। একজন মহিলাকেও ইতস্তত হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যাচ্ছে। ইন্টারভিউ নেবেন ইউএনও এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এটা বুঝাই যায়। ইন্টারভিউ শুরু হয়নি। কিছুক্ষণ কাটে। পেটের ভেতর ছুচুর দৌড়োদৌড়ি। হাঁটাহাঁটি করতে করতে চা স্টলের দেখা পাওয়া যায়। পাউরুটির টুকরো আর চা তে আপাততঃ ক্ষুন্নিবৃত্তির রফা। পূর্বস্থানে ফিরে আসতেই দেখা যায় হালকা পাতলা এক ভদ্রলোক ঢুকছেন ইউএনও সাহেবের রুমে। এই ভাদ্রের তালপাকা গরমেও কালো কোট কালো প্যান্ট। আশপাশের ফিসফিসানী জানান দেয় চেয়ারম্যান। উপজেলা না ইউনিয়ন পরিষদের বুঝা যায় না।  ইন্টারভিউ শুরু নির্বাহী সাহেবের পিয়ন সাহেব টুল নিয়ে দরোজায় বসতেই অনেকের এগিয়ে যাওয়া। সবার সাথে নিজেও। পিয়ন সাহেবের বক্তব্য ‘এক্ষণই ইন্টারভিউ শুরু অইব। পয়লা স্যার হকলোর এর পরে বাকী সব।’ আমি তো স্যার না কেরানী পদ প্রার্থী। মনটা দমে যায়। দুপুর সাড়ে তিন। ফিরে যেতে পারবো তো? ইন্টারভিউ শুরু হয়। তিন জনের পর সেই ম্যাডাম। বেশ দেরী করে ম্যাডাম বের হন। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। পিয়নের চিৎকার। আমার নিজের নাম শুনে গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতর ড্রামের শব্দ । ফাইল বগলে চেপে ভেতরে পদার্পন এবং জোর করেই স্লামালেকুম । এক সঙ্গে তিনটি কণ্ঠ বসুন বসুন। আমি নিজেকে চেয়ারে ছেড়ে হাফ ছাড়ি। একে একে চোখ রাখি কর্তাদের দিকে। নির্বাহী সাহেবকে উনার চেয়ারই চিনিয়ে দেয়। বাকী চারজনের তিনজনই কালো কোট। এর একজন সেই চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান সাহেবের ঠোঁটের কোণে পানের লালা প্রমাণ করে ভদ্রলোক পানের প্রতি ভীষণ আসক্ত। আমার দেয়া এপ্লিকেশন কাগজপত্রসহ ইউএনও সাহেবের সামনে। ভদ্রলোক সন্দেহ ভরা চোখে জিজ্ঞেস করেন- – এপ্লিকেশন নিজে লিখেছেন? -জী। ভদ্রলোকের চোখে মুখে অসন্তুষ্টি। -বর্তমানে কি করছেন? কালো তিন কোটের এক কোট। -জী টিউশনি। – অন্য কিছু নয়? -জী মাস্টার্সে এডমিশন আছে। তবে ঢাকায় থেকে ক্লাশ করা সম্ভব নয় বলে চাকুরীর চেষ্টা করছি। -হুম। খান সাব আপনি জিজ্ঞেস করেন। এক কোট অন্য কোটকে অনুরোধ করেন -পড়াশুনা তো করছেন, আবার চাকরির চেষ্টা করছেন কেন? -পড়াশুনা করছি ঠিক না। এডমিশন আছে। বেকার তাই। ইন্টারভিউ ও উৎকিণ্ঠা সবকিছু থমথমে। এরপর ইউএনও এবং ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব একে একে সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রশ্ন করেন। তিন কোট আমাকে দেখতেই থাকেন। এক সময় ইউএন ও সাহেব বাহিরে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেন। আমি বাইরে আসতেই কয়েক জন ছেকে ধরে। -কি বললো ভাই। -ভাই বহু কিছু। সব সাধারণ জ্ঞান। দুএক জন সাধারণ জ্ঞানের বই খুলে শেষ মুহূর্তের সঞ্চয়টা করে নেয় । আমি হাসি। চাকরি। চুপচাপ বসে থাকি। আধঘন্টার মধ্যে একাউন্টেন্টদের ইন্টারভিউ ফিনিস। আবার আমার ডাক পড়ে। যাই। -বসুন। আমি নিরবে বসে পড়ি। -চাকরি কি আপনি করবেন? করার জন্যই তো আসা। -কবে নাগাদ জয়েন করতে পারবেন। আমি একটু ভাবি। -দুতিন দিন সময় দিতে হবে। চাকরিটা হয়ে গেল নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলে নিচু গলায়। তিন কোট আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ পর ইউএনও সাহেব গলা খাকারি দেন। সবাই চুপ। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বক্তব্য শুরু করেন। -পাল বাবু আমরা আপনাকে জগন্নাথপুর কলেজের হিসাব রক্ষক হিসেবে নিয়োগ করতে একমত হয়েছি। বেতন ভাতা সরকারী স্কেলে পাবেন। থাকার খাওয়ার ব্যবস্থা আপনার নিজেকেই করতে হবে। অবশ্য আমরা সহযোগিতা করবো। আপনি আজ থেকে যান। আগামীকাল সকাল বেলা নিয়োগ পত্র পেয়ে সম্ভব হলে জয়েন করে যাবেন। আগামী শনিবার থেকে আমরা ক্লাশ করতে চাই। চাকরি হওয়ার পর ইউএনও সাহেব থামেন। আমি বলি ‘ধন্যবাদ স্যার।’ বুঝি কণ্ঠটা যান্ত্রিক হয়ে গেছে। মনের ভেতর একটা অজানা অনুভূতি। ওটা সুখের না দুঃখের তাৎক্ষণিক ভাবে আলাদা করতে পারি না । স্নালামালেকুম জানিয়ে বাইরে এসে নিঃশ্বাস ফেলি। বেশ কজন লোক ঘিরে ধরে। হলো ভাই, হলো। আমি নিরাসক্ত গলায় জানাই ‘না’। না টা মুখ ফসকে নয়, ইচ্ছে করেই বলি। কারণ এখনও নিয়োগ পত্র পাইনি। তিন কালো কোটকে আমার পছন্দ হয়নি। এদের হাব ভাব দেখে আমার মনে হয় ওরা সর্বদা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। এটা একান্তই আমার ভাবনা। ভুলও হতে পারে। ইউএনও অফিস থেকে বের হয়ে উচু ব্রীজ পার হই। সামনে কয়েকটা চা দোকান প্রতিটা দোকানেই কিছু সংখ্যক লোক আড্ডা দিচ্ছে। একটা দোকানে বেশ জোরে শোরে পংকজ উদাস এর এর গজল বাজছে। দোকানদার ভদ্রলোক বুড়ো। কাউন্টারে বসে ঢুলছেন। আমার পেটের ভেতর আবার ক্ষিধে। এবার ঝাল খাবার ইচ্ছে। কিন্তু আশে পাশে পাউরুটি আর বিস্কিট ছাড়া কিছু চোখে পড়ছে না। ধীর পায়ে

ডানা-নিরঞ্জন মণ্ডল
গল্প

ডানা-নিরঞ্জন মণ্ডল

ডানা নিরঞ্জন মণ্ডল ডানা-নিরঞ্জন মণ্ডল ছোট্ট একমাত্র জানালাটার পাশে এসে দাঁড়ায় মুন্নি। ডাগর দুটি চোখ মেলে তাকায় আকাশের দিকে। ছাই রঙের মেঘের দঙ্গল এগিয়ে আসছে আকাশ বেয়ে। বিজলি চমকাচ্ছে মাঝে মাঝে। শেষ বিকেলের আলোটাকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে মেঘ। অন্ধকার হয়ে আসবে এবার। নড়বড়ে দুটি কাঠের পাল্লা জানালায়। সেগুলোকে দুপাশের দেয়ালে প্রায় লেপটে দেয় সে। জং ধরা গ্রিলটা আঁকড়ে ধরে ছোট্ট দুটি হাতে। কাঠের পুরোনো পাল্লাগুলো পলেস্তারা খসতে থাকা দেয়ালে ঠকঠক করছে। খসে পড়ছে বালির গুঁড়ো মেঝেতে। উদাস মুন্নির খেয়ালই নেই কোনো দিকে। ঠায় দাঁড়িয়ে সে, আকাশমুখী। বড় অভিমান হয়েছে তার আকাশটার ওপর। কী সুন্দর খেলছিল সে! ঘরের পাশের অপ্রশস্ত রাস্তাটার দুপাশে নাম না জানা ছোট ছোট গাছ। মাথা ছাঁটা। কোনটার পাতা সবুজ, আবার কোনটার রঙচঙে। কোন কোনটায় ছোট ছোট ফুলও ফুটেছে। সেই ফুলের টানে ছোট ছোট প্রজাপতি উড়াউড়ি করছে। একটি-দুটি নয়—অনেকগুলো। কী সুন্দর রঙিন তাদের ডানা! কখনো পাতায়, কখনো ফুলে বসে। ধরতে হাত বাড়ালেই উড়ে যায়। এ এক মজার খেলা। তার তো কোনো ভাই-বোন নেই! তাই একাই সে সারা বিকেল এভাবেই খেলে, ঘরের পাশে। গত বছর পর্যন্ত তার ঠাম্মি থাকতেন সঙ্গে। মাঝে মাঝে খবরদারি করতেন। কী যে হলো একদিন! সারা রাত ঠাম্মির কাছেই ঘুমিয়েছিল সে, রোজকার মতো। ঘুম আসার আগে শুনেছে পরীদের গল্প। প্রজাপতিরাই নাকি জাদুর ছোঁয়ায় পরী হয়ে যায়! কত গল্পই না জানা ছিল ঠাম্মির! রাজপুত্তুর, পক্ষিরাজ, রাজকন্যে, রাক্ষস, খোক্কস, দত্যি-দানো—আরও কত কী! সব তো শোনা হলো না তার। সকালে ঘুম ভাঙিয়ে মা বলেছিলেন, ঠাম্মি আর নড়াচড়া করছেন না, কথা বলছেন না। সে জানতে চেয়েছিল—ঠাম্মি অসুখ করলেন কি? মা কোনো উত্তর দেননি। কিছুক্ষণ পর কাঁচঘেরা এক গাড়িতে করে ক’জন লোক ঠাম্মিকে নিয়ে গেলেন। ঠাম্মি তখনও শুয়ে ছিলেন। সেই যে গেলেন, আর ফিরলেন না। এমন তো কতবার হয়েছে—ঠাম্মি গেছেন দেশের বাড়ি, পিসির বাড়ি। কদিন বাদেই তো ফিরে এসেছেন। এবার আর কেন এলেন না! বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন—ঐ আকাশে তারা হয়ে আছেন ঠাম্মি। সেদিন থেকেই রাতে আকাশে তারা দেখলেই সে ঠাম্মিকে খোঁজে, ডাকে। কিন্তু ঠাম্মি আসেন কোথায়! ঠাম্মি কি রাগ করেছেন তার ওপর? গত বছর একদিন ঠাম্মির বারণ না শুনে রাস্তা ধরে খুব জোরে দৌড়েছিল সে প্রজাপতির পেছনে, ধরবে বলে। রেগে গিয়েছিলেন ঠাম্মি। সে যে রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাঁটু কেটে ফেলেছিল। কিন্তু এই এক বছরে তো সে কতবার ঠাম্মির কাছে মাফ চেয়েছে! তবু কি রাগ কমেনি ঠাম্মির? চোখে একটা ঘোর আসছে মুন্নির। সারা দুপুর ঘুমোয়নি সে। বাবা দুপুরে বাড়ি থাকেন না। সরকারি বাবুদের গাড়ি চালান তিনি। এখানকার উঁচু উঁচু বাড়িগুলো কত সুন্দর রঙিন! তাদের ঘরটাই কেমন ভাঙাচোরা। বাবা তো কতবার বলেছে—চলো না একটায় যাই! কিন্তু বাবা শোনেননি। সকাল ন’টায় গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে যান বাবা, ফেরেন সন্ধে গিয়ে। মা দুপুরে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমোন। সে মার পাশে বসে খেলে—ঘর আঁকা, পাতা আঁকা, প্রজাপতি আঁকা—আরও কত কী! বালিশ দিয়ে ঘর বানায়। সে ঘরে কখনো শুয়ে পড়ে, কখনো গুছিয়ে রাখে। বিকেলে মা রান্নার কাজে ব্যস্ত হলে সে চলে যায় খেলতে, রাস্তাটার পাশে। বাবা ফিরলে একটু অ-আ, ক-খ পড়া। একশো পর্যন্ত গোনা। তারপর খেয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া। কিন্তু আজ তো খেলাটাই হলো না ঠিক মতো! বাবার ফিরতে এখনো অনেক দেরি। মা রান্না গোছাতে ব্যস্ত। মুন্নি একেবারে একা। ঠাম্মিটা যদি——! হঠাৎ জানালার ওপারে চোখ পড়ে মুন্নির। একটু দূরে একটি বেশ বড়ো প্রজাপতি। কী সুন্দর রঙিন তার ডানা! তার যদি এমন দুটো ডানা থাকত! প্রজাপতিটার ডানা দুটো পতপত করে নড়ছে। আরে! প্রজাপতিটা তো তার দিকেই এগিয়ে আসছে!নড়েচড়ে ওঠে মুন্নি। কী আশ্চর্য! যতই এগোচ্ছে, প্রজাপতির শরীর আর ডানা ততই বড় হচ্ছে। জানালার চেয়েও বড় দেখাচ্ছে! তার দুটো পা আর দুটো হাতও আছে! তবে কি ওটা পরী? আরও কাছে চলে আসছে সেটা। মুন্নি এখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, তার হাত দুটো তার দিকেই বাড়ানো। মুখটাও নড়ছে—সে কি কিছু বলছে? উত্তেজিত হয়ে পড়ে মুন্নি। পিছন ফিরে তাকায়। মা আসছেন কি না দেখে নেয়। বারান্দা থেকে রান্নার ঠুকঠাক, টুংটাং শব্দ ভেসে আসে। মা রান্নায় ব্যস্ত। নাম ধরে কে যেন ডাকে তাকে। ঘুরে দাঁড়ায় মুন্নি। আরে—পরীটা তো জানালার ওপারে এসে দাঁড়িয়েছে! কী সুন্দর দেখতে! তার সারা গা থেকে ভারী সুন্দর গন্ধ আসছে মুন্নির নাকে। আরামে যেন চোখ বন্ধ হয়ে আসছে তার। বাইরে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে জোরে, ভেজা বাতাস। বৃষ্টি আসবে বুঝি। চোখের পাতা খোলে মুন্নি। তাকায় পরীর মুখের দিকে। গোলাপি মুখ, নীল চোখ, সারা গা থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। মুখে মিষ্টি হাসি। পরীটাও তাকিয়ে তার মুখের দিকে। বুকটা তোলপাড় করে ওঠে মুন্নির—তুমি কে গো? এখানে কেন এলে? তুমি কি পরী? আমার বন্ধু হবে? তাহলে ভেতরে এসো, খেলি তোমার সঙ্গে। নরম হাসিতে বাতাস ভরিয়ে দেয় পরী। বলে—খেলা পরে হবে মুন্নি। আমি তোমার বন্ধুই তো হতে চাই। কিন্তু দেখ তো আমার এই ডানাটার দিকে। একটা ফুটো দেখতে পাচ্ছ? আজ খেলতে গিয়ে তুমি আমার দিকে পাথরের টুকরো ছুঁড়লে। ডানায় লেগে ফুটো হয়ে গেল। খুব কষ্ট পায় মুন্নি। বলে—ভুল হয়ে গেছে গো! আমি তোমাকে ধরতে চেয়েছিলাম, আদর করার জন্য। তুমি উড়ে চলে যাচ্ছিলে বারবার। তাই রাগ হল। তখন তো বুঝিনি তুমি আমার বন্ধু হতে চাও। বুঝিনি তুমি পরী। কিন্তু তখন তো তুমি খুব ছোটো ছিলে, এই টুকুন। এখন এত বড়ো হলে কী করে? —ওটাই তো জাদু। আমরা তোমাদের সঙ্গে খেলব বলে ছোটো হয়ে তোমাদের কাছে আসি। ধরতে গেলে উড়ে যাই। এটাই তো খেলা। তুমি দৌড়াও আমার পেছনে। এই দৌড়োদৌড়িতেই তো রাতে ভালো ঘুম হয় তোমার। ঘুমে স্বপ্ন আসে। তোমার হাত-পা—গোটা শরীর শক্তপোক্ত হয়। ধরা দিলে তো এসব হয় না ভাই। —তুমি আমাকে ভাই বললে? —তাই তো বললাম। বন্ধু হলে তাই তো বলতে হয়। —তুমি সত্যিই আমার বন্ধু? —হ্যাঁ গো। কত দিন ধরে তোমার বন্ধু হতে চাচ্ছি! তুমি বুঝতে পারোনি। তাই পাথর ছুঁড়ে ডানাটা ফুটো করে দিলে। এখন উড়তে আমার কত কষ্ট হচ্ছে। তুমি বুঝবে কি—? —আর বোলো না বন্ধু। আমারও কষ্ট হচ্ছে। এই কান মলছি। আর করব না ভাই। —বেশ। এখন তুমি চলো আমার সঙ্গে। —কোথায়? —তোমার ঠাম্মি তোমাকে আদর করার জন্য ডাকছে। ঐ দেখো, মেঘের মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন তোমার ঠাম্মি। পরীর আঙুল অনুসরণ করে দূরে মেঘের মাথায় তাকায় মুন্নি। দুধসাদা কাপড় পরে মেঘের মাথায় দাঁড়িয়ে তার ঠাম্মি। ঠাম্মির গা থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে আলো। ছড়িয়ে পড়ছে সারা আকাশে। ঠাম্মি যে সত্যিই তারাদের মতো! বাবা-মা ঠিকই বলেছিলেন তাকে! চোখ দুটো ভালো করে রগড়ে আবার তাকায় মুন্নি ঠাম্মির দিকে। দুই হাত বাড়িয়ে তাকেই ডাকছেন ঠাম্মি। ধড়াসধড়াস করে ওঠে মুন্নির বুক। ঠাম্মির কাছে যাবার প্রবল ইচ্ছেয় ছটফট করে ওঠে তার পা দুটো। কিন্তু জানালাটা যে গ্রিল দিয়ে আটকানো! যাবে কী করে সে? বারান্দা দিয়ে যেতে পারে অবশ্য। কিন্তু মা তো যেতেই দেবে না বাইরে, বৃষ্টি আসতে

গল্প

সুখ ও অসুখ

সুখ ও অসুখ অবশেষ দাস সুখ ও অসুখ (Kaler Sanko) কয়েক কোটি টাকার বাড়ি। বলা ভাল  প্রাসাদ। ছবির মতো ফুলের বাগান। ফলের বাগান।পুকুর ভর্তি মাছ।গা ভর্তি গহনা । সংসারে সুখ যেন ধরে না ।বাড়ির বউ রূপা খুব সাবধানী । অতিথির যাতায়াত অপছন্দ । বাগানে গরু-ছাগল ঢোকার জো নেই। শ্বশুর -শাশুড়ি শুরুতেই তাড়িয়েছে। অন্দরের ধুলোবালি ঝেড়েই ফেলেছে । দুঃখের গল্প শোনার আশঙ্কায় সম্বন্ধ ও সম্পর্ক এড়িয়ে চলে। স্বামীকে নিজের দিকে টেনে রেখেছে। স্বামীর অবস্থা ভাষাহীন শিশুর মতো, বলা ভাল গৃহপালিত স্বামী। রোজগারের যন্ত্র হলেও সংসারে তার কোনও মতামত পাত্তা পায় না। সোনা বাঁধানো সংসারে বউ-ই শেষ কথা। অহংকারী স্ত্রী এ সংসারে কারও প্রবেশাধিকার নেই। শুধু বউয়ের বাপের বাড়ির লোকজন নয়নের মণি। এভাবেই চলছিল সোনার সংসার । তাদের একার সংসার । সংসারের আর কোনও কিছুর সঙ্গে  তাদের যোগাযোগের প্রয়োজন নেই। প্রাচুর্যের হুঙ্কারে বউয়ের পা জোড়া হয়তো মাটিতে পড়ে না। একদিন আকাশ থেকেই পড়তে হল। সামান্য উপসর্গ নিয়ে  নামকরা বেসরকারি হসপিটাল । ডক্টর বলেছেন, ” রূপার ব্লাড-ক্যানসার।” বড়জোর তিন মাস আয়ু। সোনার সংসারে আজ ঘোর অমাবস্যা । মৃত্যু পথযাত্রী রূপার চোখে জল গড়িয়ে যাচ্ছে । সুখের ঘরে আজ শোক জ্বলজ্বল করছে । সব বন্ধ রাখা ছিল । এ বাড়িতে কেউই ঢুকতে পারেনি । ঢুকতে দেওয়াও হয়নি । তবু রোগ ঠিক ঢুকে গেছে। রূপার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। কেউ তাকে দেখতে আসছে না।‌ দেখতে আসছে না , ঠিক তা নয়। স্ত্রীর বোধোদয় এ বাড়িতে আসার পথ আগে থেকেই বন্ধ হয়ে আছে। বাধ্য স্বামী অরূপকে শয্যাশায়ী রূপা বলল, ” সবাইকে আসতে দাও। কেউ যেন ফিরে না যায়। তোমার বাবা-মাকে বাড়িতে নিয়ে এসো। যে কদিন বাঁচব, একসাথে থাকব। ” অরূপ বলল , ” বাবা-মা অনেক অভিমান নিয়ে গেছে।‌‌ যেভাবেই হোক, ফিরিয়ে আনব।” এখন একটা কাজের মেয়ে রাখা হয়েছে। শুধু রূপাকে দেখাশোনা করবার জন্য। সেই মেয়েটি পাড়ার সব খবর রাখে। পাড়ার লোকে বলছে,‌ খুব অল্প বয়স্ক মেয়ে । জীবনের কিছুই তো দেখলো না। এইভাবে চলে যেতে দেখলে কষ্ট হয়। আবার অনেকে বলছে, ঈশ্বর‌ তো অহংকার সহ্য করে না। অমন স্বার্থপর মেয়ে খুব একটা দেখা যায় না। আজকের অসুস্থ , তাই হয়তো মানসিকতা একটু বদলেছে। তা না হলে ধরাকে সরা জ্ঞান করত। রূপার বাপের বাড়ির লোকজন খুব ভেঙে পড়েছে। অসুস্থ মেয়েটাকে নিয়ে লড়াই করবার আগেই যেন হেরে বসে আছে। ব্রাহ্মণ এর আশাবাদ এই বাড়ির ব্রাহ্মণ বেশ পন্ডিত মানুষ। পাড়ার লোকজন অনেকেই বলছে, প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। এই ব্রাহ্মণ কিছুতেই রাজি নন। তিনি বললেন, “এই দুরারোগ্য ব্যাধি সমাজে নতুন কিছু নয়। সব এলাকাতেই কমবেশি মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শেষ বললেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। বরং এই কঠিন অবস্থা থেকে কিভাবে নতুন করে জীবন শুরু করা যায় , সেটাই দেখতে হবে।” ব্রাহ্মণের কথা শুনে বাড়ির সবাই যেন আশার আলো দেখে। ব্রাহ্মণ বললেন , ” সবাইকে আরো জোর ধরতে হবে। সবাই শক্ত হলে তবে তো বউমা মনে বল পাবে। জীবন কখনো ফুরিয়ে যাবার নয়। বরং সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে। গৃহস্থ বাড়ির দরজা-জানলা না রাখলে আলো-বাতাস প্রবেশ করবে কিভাবে। নিজেরাই বা ঢুকবে কোথা দিয়ে যদি ঘরের দরজা না থাকে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কখনো কখনো অসৎ কেউ ঢূকে পড়তেই পারে , তাই বলে ঘরের দরজা না রাখলে হবে কেমন করে। ঘরের জানলা দিয়ে আমরা জানি আলো বাতাস আসে, আর সেজন্যই তো জানলা ছাড়া ঘর হয় না। কিন্তু ধুলোবালি দুর্গন্ধ সবই জানলা দিয়ে আসে। ঠিক তেমনি জীবনের দরজা-জানলা সবই আছে, কখনো কখনো উল্টোটা ঘটে যায়। শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে, সমাধান নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।” এই কদিনে সবাই যেন কেমন সমব্যথী হয়ে উঠেছে। সবার চোখে বিন্দু বিন্দু করুণা জমে আছে। বাড়ির সুখ ও অসুখ সম্ভাব্য শোকের ছায়া এই বাড়ির সর্বত্র একে একে ছড়িয়ে পড়ছে। দক্ষিণের জানালার ঠিক পাশে রাস্তা পেরিয়ে বকুল গাছের ছায়া এসে পড়েছে। ছোট্ট বাগানে অজস্র জবা ফুল ফুটেছে। জবা গাছের পাতার ভিতরে কটা টুনটুনি বাসা করে আছে। তারা ফাঁকে ফাঁকে বেশ কথা বলে। আজ তারা যেন আশ্চর্যরকম চুপচাপ। শোক বড় ছোঁয়াচে। টুনটুনিরাও বুঝি , সব জানতে পেরেছে। নাকি তারা সংসার নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে ! পাড়াতে একটা পুরানো ফেরিওয়ালা এসেছে। এই বাড়ির দরজার সামনে কখনো দাঁড়ায় না। তিনিও জানেন ,  এই বাড়িটা মিশুকে নয়। এদের দরজায় কেউ আসে না। এ বাড়ির অসুস্থ বউ রুপা হঠাৎ বলল , ফেরিওয়ালার ডাকটা শুনে মনটা কেমন কেমন করছে। আজ একটু দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াব। বাইরের লোকজনগুলো দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। ফেরিওয়ালার কাছ থেকে আজ আলতা-সিঁদুর কিনব। পাড়ার বউদের সঙ্গে একটু কথা বলব। বাড়ির লোকজন আশ্চর্য হয়ে যায়। রুপা তো কখনো এইভাবে যেখানে সেখানে কেনাকাটা করে না। নিজের মধ্যে থাকতে ভালবাসে। নিজেকে নিয়েই থাকতে ভালবাসে। স্বামীর হাত ধরে দু তিনটে গেট পেরিয়ে একেবারে বাইরের দরজার সামনে এসে সে দাঁড়ায়। ততক্ষণে ফেরিওয়ালা অন্য পাড়ায় চলে গেছে। লোক পাঠিয়ে তাকে ডেকে আনা হয়। তার চোখে-মুখে বিস্ময়। আবার, কেমন একটা তৃপ্তির ছায়া। ফেরিওয়ালা বেশ স্বচ্ছন্দে বললেন, পাড়ার লোকের মুখে শুনেছি, “এই বাড়ির দিদিমণি খুব অসুস্থ। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, দিদিমণি আগে অসুস্থ ছিলেন। এখন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন। রুপা হাসিমুখে বলল,  ” ফেরিওয়ালা ঠিক কথা বলেছেন। আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছি। “

সাকিবের গল্প
গল্প, শিশু সাহিত্য

সাকিবের গল্প

সাকিবের গল্প আলমগীর কবির সাকিবুল ইসলাম সাকিব নাটোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। বিজ্ঞানে ওর ভীষণ আগ্রহ। ছোটমামা নাম দিয়েছেন ক্ষুদে বিজ্ঞানী। ছোটমামা যতখানি ওকে সহযোগিতা করেন, বাসার অন্য কেউ ততটা করেন না। এই নিয়ে মাঝে মাঝে সাকিবের মন খারাপ হয়। যদি সবাই ওর কাজে উৎসাহ দিতেন, তাহলে কাজগুলো অনেক সহজ হয়ে যেত। তখন কতই না মজা হতো! আজ শুক্রবার। ছুটির দিন। সাত সকালেই ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। রান্নাঘর থেকে খাবারের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। মা নিশ্চয়ই রান্নাঘরে। সাকিব দৌড়ে রান্নাঘরে গেল। রান্নাঘরে গিয়েই ওর চোখ ছানাবড়া! মা নেই কোথাও। একটি বাটিতে দুধ রাখা ছিল। বাসার বেড়ালটা চুপিচুপি সেটি খাচ্ছে। সাকিব ভালো করে লক্ষ্য করতে লাগল। — “আরে এ কী অবাক কাণ্ড! বেড়ালটা দুধ খেয়ে নিচ্ছে, কিন্তু বাটির মাঝে কোনো আলোড়ন তৈরি হচ্ছে না!” ঠিক তখনই ছোটভাই রাকিব এসে বলে উঠল—— “আরে ভাইয়া! বেড়াল দুধ খাচ্ছে আর তুমি চুপচাপ দেখছো? আবার এক্সপেরিমেন্ট করছো নাকি?” সাকিব উত্তর দিল—— “না রে, ভুল বুঝিস না। আমি আসতেই দেখি বেড়ালটা দুধ সাবাড় করছে। কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুতেই মাথায় আসছে না—বেড়াল দুধ খাচ্ছে অথচ বাটির মধ্যে কোনো আলোড়ন হচ্ছে না।” রাকিব বলল—— “দেখেছি, কিন্তু তুমি বেড়ালটাকে তাড়াচ্ছো না কেন ভাইয়া?” সাকিব হেসে বলল—— “আরে, আমি আসার আগেই দুষ্টু বেড়ালটা সব নষ্ট করে ফেলেছে। তাড়ালেও আর কেউ তো এটা খেতে পারবে না। যা হওয়ার হয়ে গেছে।” এমন সময় মা রান্নাঘরে এসে বললেন—— “কিরে, তোরা দুজন রান্নাঘরে কী করছিস?” সবটা শুনে মা কারো ওপরই রাগ করলেন না।— “আচ্ছা, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এবার তোরা দুটি যা, আমাকে কাজ করতে দে।” সারাদিন ভাইয়ে-ভাইয়ে খুনসুটি চলতে থাকল। মা রান্নায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে মার চোখে জল এলো। সাকিব তা দেখে কষ্ট পেল। সে মায়ের কাছে গিয়ে বলল—— “মা, তোমার তো অনেক কষ্ট হচ্ছে। এক কাজ করো, পেঁয়াজগুলো আগে পানিতে ভিজিয়ে রাখো তারপর কাটো। আচ্ছা, আমিই ভিজিয়ে দিচ্ছি।” মা অবাক হয়ে দেখলেন, সত্যিই এবার আর চোখ দিয়ে জল বেরোচ্ছে না। তিনি হাসলেন।— “বাবা, আমার ছেলে তো সত্যিই ক্ষুদে বিজ্ঞানী হয়ে গেছে।” রাতের আকাশে গোল চাঁদ উঠল। জোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। ছোটমামা এলেন। খাবার পর সবাই বারান্দায় বসে গল্প করছিল। সাকিব বলল—— “মামা, আমার একটা প্রশ্ন আছে।” মামা হেসে উত্তর দিলেন—— “নিশ্চয়ই কোনো বিজ্ঞান বিষয়ক। আচ্ছা, বলো।” সাকিব জিজ্ঞেস করল—— “আকাশের তারাগুলো মনে হয় মিটিমিটি জ্বলছে কেন? জোনাকি পোকার দেহে আলো জ্বলে কেন? কোন রঙের সাথে মিলে কোন রঙ তৈরি হয়? রংধনু সম্পর্কেও জানতে চাই।” মা মুচকি হেসে বললেন—— “সাকিব, মামাকে এত প্রশ্ন করছো কেন?” মামা হেসে বললেন—— “বুবু, ওকে প্রশ্ন করতে দাও। এখন তো প্রশ্ন করার বয়স। আচ্ছা সাকিব, কাল তোমার জন্য কিছু বিজ্ঞানবিষয়ক বই কিনে দেব।” সাকিব আনন্দে বলল—— “সত্যি মামা? তাহলে বেশ ভালো হবে!” রাকিবও লাফিয়ে উঠল—— “মামা, আমার জন্য কী কিনে দেবেন?” মামা হেসে বললেন—— “কি চাই তোমার?” রাকিব গম্ভীর হয়ে বলল—— “একটা খেলনা বিমান চাই। তারপর সেটা দেখে দেখে বিমান বানাবো। আমিও ভাইয়ার মতো বিজ্ঞানী হবো।” ওর কথা শুনে সবাই হেসে উঠলেন—— “বেশ, বেশ, তাই হবে।”

সমসাময়িক বাংলা গল্প দূরদৃষ্টি
গল্প

দূরদৃষ্টি

দূরদৃষ্টি রানা জামান দূরদৃষ্টি সমসাময়িক বাংলা গল্প প্রিয় নেতার আশীর্বাদ নিতে ছেলে নবীনকে সঙ্গে করে হরিহরবাবু স্থানীয় সাংসদ রবিশঙ্করের শহরের বাড়িতে এলেন। হাতে ছিল মিষ্টির প্যাকেট। দারোয়ান তাদের আটকে দিল। কিন্তু হরিহরবাবু জানেন, দারোয়ান বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারবে না—সাংসদ তাঁর নাম শুনলেই ভেতরে ডেকে নেবেন। কারণ, সাংসদ জানেন, হরিহরের হাতে কতটা ক্ষমতা! এই ক্ষমতা হলো ভোট। হরিহরবাবুর এলাকায় হাজারখানেক ভোটার রয়েছে, যা প্রতিবছর বাড়ছে। এই ভোটাররা হরিহরবাবুকে দেবতার মতো মানে এবং তাঁর কথামতো ভোট দেয়। ঘটনাচক্রে নবীনের জন্মও হয়েছে রবিশঙ্করের গাড়িতে। সেদিন অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি হওয়ায় রবিশঙ্কর তাঁর গাড়ি দিয়ে হরিহরের সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে হাসপাতালে পাঠান; কিন্তু গাড়িতেই নবীনের জন্ম হয়ে যায়। হরিহরবাবুর আগমন হরিহরবাবু বললেন, “স্যার আমাদের চেনেন। আমরা হরিগাতি গ্রাম থেকে এসেছি। আমার নাম হরিহর।” এই বলে তিনি দারোয়ানের হাতে পঞ্চাশ টাকা গুঁজে দেন। দারোয়ান ওদের ভেতরে ঢুকতে দেয়। নবীনসহ হরিহর ভেতরে ঢুকতেই স্থানীয় এক নেতা ঘরে ঢুকে রাগত কণ্ঠে বলে উঠল, “উপজেলা ইলেকশনে এবার আমাকে নমিনেশন না দিলে খবর আছে আপনার, নেতা!” সাংসদ রবিশঙ্করও রগচটা, এবং তিনি এক কাঠি উপরে।তিনি নেতার মাথা ধরে টি-টেবিলে আঘাত করে চিৎকার করে বললেন, “তুই আমাকে ভয় দেখাস! কী করবি তুই আমার?” নেতা নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। তাঁর মাথায় ঢুকে গেছে টি-টেবিলের কাঁচের একটি ভাঙা টুকরো। হতভম্ব রবিশঙ্কর নেতার নাড়ি টিপে বুঝলেন—মারা গেছে।তিনি আতঙ্কিত চোখে হরিহরদের দিকে তাকালে, হরিহর বললেন,“স্যার, আপনি ওকে মেরে ফেলেছেন!” রবিশঙ্কর বললেন, “তুমি তো আমাকে খুব পছন্দ করো, তাই না হরিহর?”“জি স্যার।”“এই খুনের দায়ে আমি জেলে গেলে এলাকার অনেক ক্ষতি হবে। তুমি এই খুনের দায় নিয়ে নাও। আমি তোমার পরিবারের সব দায়িত্ব নিলাম, আর তোমার ছেলেকে ডাক্তার বানানোর প্রতিশ্রুতি দিলাম।” এ সময় নবীন এক কদম এগিয়ে এসে বলল,“বাবা না স্যার, আমি নেব। কিশোর অপরাধী হিসেবে আমার কয়েক বছরের সাজা হবে। তবে একটা শর্ত আছে।”“কী শর্ত?”“উপজেলা ইলেকশনে বাবাকে নমিনেশন দিতে হবে। এখনই বাইরে জনতার সামনে গিয়ে এই ঘোষণা দেবেন। তারপর পুলিশে খবর দিন!”   বাংলা গল্প

লালকমল নীলকমল Bangla Golpo
গল্প, শিশু সাহিত্য

লালকমল নীলকমল

লালকমল নীলকমল সুব্রত দাস তোমরা তোনকা কে চেনো ? ওই যে সেন বাড়ির সেই দুষ্টুমিস্টি ছেলেটা গো। যার ভালো নাম রাজর্ষি সেন। ক্লাস সেভেনে পড়ে। ওদের বাড়ির রান্নাঘরে দুই বন্ধু থাকে। একটির নাম লালকমল। আরেকটি নীলকমল। দুটির মধ্যে খুব ভাব। লালুটা পড়েই থাকে সারাদিন। ওই রান্নাঘরে। নীলুটাই বাইরে বেরোয়। রাত সাড়ে দশটার সময় তোনকার বাবা রতনবাবুকে নিয়ে ফিরে আসে নীলু। তোনকার বাবা ওষুধের দোকানে কাজ করেন। দুপুর একটায় যান। রাতে বাড়ি ফেরেন নীলকমলে চ’ড়ে। তারপর বাড়ির সবার খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে যখন লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়েন, তারপর দুই বন্ধুর গল্প শুরু হয় রান্নাঘরে। লালকমল সারাদিন কেমন মন খারাপ অবস্থার মধ্যে থাকে। কেনই বা হবেনা, সেই কবে থেকে রান্নাঘরে জুবুথুবু হয়ে পড়ে আছে সে। এক দিন বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ ফটাস ক’রে পেছনের চাকা বাস্ট হয়ে গেল। বাড়ি ফিরতে দেরি হলো। কাজে যেতেও দেরি হলো সেদিন রতনবাবুর। যদিও সেদিন তোনকার স্কুলে যাওয়ার সাইকেল নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই থেকে লালকমল রান্নাঘরে বন্দী। রোজকার মতো আজকেও ফিরে এলো নীলকমল। লালুর একটু ঝিমুনি এসেছিলো। ঝড়াং ক’রে লালুর গায়ে প’ড়ে বললো, “কি রে, ঘুমোলি নাকি ? শিগগিরি ওঠ্, তোর জন্যে সুখবর আছে ! “ও, তাই ?” লালু বললো, ” তা আজকের সুখবরটা কী, শুনি !” “আজ আমাদের গিন্নি মা কত্তাবাবুরে খুব ক’রে দু’টো কথা শুনিয়ে ছেড়েছে। দুই দিনের মধ্যে তোকে যদি কত্তাবাবু না সারিয়ে তোলেন, তো গিন্নিমা সোজা বাপের বাড়ি চ’লে যাবেন, তাও আবার তোনকাকে নিয়ে।” লালু, মানে লালকমল আনন্দে ব’লে উঠলো, “সত্যি বলছিস?” “ওরে বাবা, হ্যা রে, আর তুই তো জানিস কত্তাবাবু গিন্নিমা ছাড়া এক পাও চলতে পারে না। আচ্ছা ঠিক আছে, কালকেই সারিয়ে দেবো ব’লে আমায় নিয়ে দে ছুট!” ফস ক’রে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লালু বললো, “রাখ তোর কত্তাবাবুর কথা, কতবারই সারাবার কথা উঠলো…. দেখবি এবারো ঠিক…..” লালুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে নীলু বললো, “নারে এবার ঠিক তোকে সারাবেই। গিন্নিমার রেগে যাওয়াতে কত্তাবাবু খুব ঘাবড়ে গিয়েছে। হারানের সাইকেলের দোকানে গিয়ে তোকে সারাবার জন্য কথা ব’লে এলো যে। দোকান থেকে এক ছোকরা কারিগর কাল সকালে তোকে নিতে আসবে।” লালু তো এসব শুনে আনন্দে আটখানা ! বাব্বা, কতদিন পর আবার লালু আগের মতো ঘুরে ফিরে বেড়াবে। কী যে আনন্দ হচ্ছে তার ! নীলুটা কি বুঝতে পারছে সব !     স্মেল রেকর্ডার-বাংলা গল্প  

শিশুতোষ গল্প রাতুলের বন্ধু
গল্প, শিশু সাহিত্য

রাতুলের বন্ধু

রাতুলের বন্ধু হুমায়ুন আবিদ রাতুল তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। স্কুল বন্ধ তাই সারাদিন পাড়ার বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা আর হৈচৈ করে সময় কাটানোই এখন তার কাজ। রাতুল কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছে একটি অচেনা মা কুকুর প্রতিদিন সকালে নাস্তার সময় এবং দুপুরে খাওয়ার সময় তাদের বাড়ির রান্না ঘরের সামনে এসে বসে থাকে। কেহো লাঠি দিয়ে আঘাত করলেও যায় না শুধু কু কু শব্দ করে, যেনো কিছু বলতে চায়। কুকুরটিকে খাবার মাটিতে দিলে খায় না কিন্তু কোন পলিথিন কিংবা শক্ত কোন প্যাকেটে দিলে তা মুখে নিয়ে দ্রুত কোথাই যেনো দৌড়ে চলে যায়। রাতুল মা কুকুরের এই অদ্ভুত আচরণের বিষয়টি নিয়ে খুব ভাবতে থাকে। রাতুল একদিন তার বন্ধু রানাকে মা কুকুরের অদ্ভুত আচরণের বিষয়টি খুলে বললে, রানা একটু চিন্তা করে  বললো, চল একদিন মা কুকুরের পেছন পেছন গিয়ে দেখি খাবারের প্যাকেট নিয়ে সে কোথাই যায়। রাতুল বললো, তাহলে আগামীকাল নাস্তার সময় আমাদের বাড়িতে চলে আয় তারপর দু’জন মিলে মা কুকুরের পেছন পেছন গিয়ে দেখবো সে কোথাই যায়। পরদিন যথাসময়ে রানা এসে হাজির হলে পরিকল্পনামত মা  কুকুরকে খাবারের প্যাকেট দিলো। মা কুকুর খাবারের প্যাকেটটি মুখে নিয়ে যখন দৌড়াতে লাগলো, চুপিচুপি রাতুল আর রানাও তখন মা ককুরের পেছন পেছন দৌড়াতে লাগলো। মা কুকুরটি এক সময় গ্রামের শেষ প্রান্তে রাস্তার পাশে একটি পুরোনো ভাঙ্গা বাড়ির মধ্যে ডুকে পড়লো। রাতুল আর রানাও সেই পুরনো ভাঙ্গা বাড়ির ভিতর ডুকে পড়লো। দু’জন মিলে খুঁজতে খুঁজতে দেখলো একটি পরিত্যক্ত ঘরের কোনার মধ্যে মা কুকুরটি  তার দুইটি ছোট বাচ্চাকে খাবারের প্যাকেট ছিড়ে দিচ্ছে আর বাচ্চা দুটোও মজা করে খাচ্ছে । হঠাৎ মা কুকুর রাতুল আর রানাকে দেখে কু কু করতে করতে লেজ নাড়াতে থাকলো। রাতুল আর রানা মা কুকুরের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে এলো। নাদুসনুদুস সুন্দর কুকুরের বাচ্চাদের প্রতি রাতুলের বেশ মায়া পড়ে গেলো। বাড়ি ফেরার পথে রাতুল রানাকে বললো, এখানে কুকুরের বাচ্চাদুটো নিরাপদ না, শিয়াল যদি একবার খুঁজ পায় তাহলে বাচ্চাদুটোকে মেরে খেয়ে ফেলবে। রানা বললো, তাহলে কি করা যায়। রাতুল বললো, বাচ্চাদুটোকে যদি আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি তাহলে কেমন হয়। রানা বললো, খুব ভালো হয়। রাতুল এবং রানা ফিরে এসেই তাদের বাড়ির পেছনে একটি পরিত্যাক্ত জায়গায় পুরাতন ইট দিয়ে সুন্দর একটি ঘর তৈরী করলো। পুরাতন ইট দিয়ে ঘর তৈরী করতে দেখে রাতুলের আম্মু জিজ্ঞেস করলো, তোমরা এই ছোট্ট ঘর কিসের জন্য তৈরী করেছো। রাতুল বললো, জানো আম্মু আমাদের বাড়িতে সকালে এবং দুপুরে যে মা কুকুরটি এসে খাবার নিয়ে যায় তার না দুটো সুন্দর বাচ্চা আছে। রাস্তার পাশে পুরাতন ভাঙ্গা বাড়িতে তারা থাকে। সেখানে শিয়াল যদি খুঁজ পায় তবে বাচ্চাদুটোকে মেরে খেয়ে ফেলবে তাই এখানে নিয়ে আসবো। মা বললো, বাচ্চা আনার সময় যদি মা কুকুর তোমাদের কাঁমড়ে দেয়। রাতুল বললো, মা কুকুরটি যখন আমাদের বাড়ি থেকে খাবার নিতে আসবে তখন গিয়ে বাচ্চাদুটোকে নিয়ে আসবো। ও হ্যাঁ আমরা না আসা পর্যন্ত কিন্তু মা কুকুরকে খাবারের প্যাকেট দেবে না। পরদিন সকালের নাস্তার সময় মা কুকুরটি রাতুলদের বাড়িতে আসলে, রাতুল আর রানা দৌড়ে গিয়ে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে আসে। তারপর খাবারের প্যাকেট দেখিয়ে মা কুকুরকে পুরাতন ইট দিয়ে তৈরী ঘরের সামনে নিয়ে আসে। মা কুকুরটি খাবারের প্যাকেট নিতে এসে বাচ্চাদের দেখে লেজ নাড়িয়ে কু কু করতে থাকে। তারপর থেকে বাচ্চাদুটো রাতুলদের বাড়িতেই বড় হতে থাকে। মা কুকুর এবং বাচ্চাদুটো রাতুলের খুব ভক্ত হয়ে যায়। রাতুল বাচ্চা দুটোর নাম দেয় রাজু এবং সাজু। রাতুল বাচ্চাদুটোকে রাজু, সাজু  বলে ডাকলেই দৌড়ে চলে আসে। রাতুল যেখানেই যায় রাজু-সাজু সেখানে গিয়ে হাজির হয়। রাজু- সাজু এখন পাড়ার বন্ধুদের মতোই রাতুলের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু।     গল্প

Scroll to Top