গল্প

বাংলা গল্প সমাহার

বাংলা গল্প সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ধারা। কালের সাঁকোতে প্রকাশিত হয় নতুন বাংলা গল্প, সমকালীন গল্প, গ্রামীণ জীবনভিত্তিক গল্প, শিশুতোষ গল্প, কিশো গল্প এবং সাহিত্যধর্মী বিভিন্ন সৃষ্টিশীল গল্প। দেশের ও প্রবাসের লেখকদের মৌলিক গল্প নিয়মিত প্রকাশিত হয় এখানে। বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের জন্য এটি একটি সমৃদ্ধ গল্পভাণ্ডার।

গল্প

মরিচ তোলার দিন

মরিচ তোলার দিন মুহাম্মদ ফজলুল হক   একটু পর পর মাথা উঁচু করে চারদিকে তাকাচ্ছে বেলা। আলো ক্রমশ কমে আসছে। দিনের শেষ রোদ মাঠের ওপর নরম সোনালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। আকাশ পরিষ্কার থাকায় কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই কাজে মগ্ন। রনি, শম্পা, ইয়াছমিন, ঊষা ও পরশ দ্রুত মরিচ তুলছে । হাসিঠাট্টা, প্রতিযোগিতা ও আন্তরিকতা মিলিয়ে মাঠজুড়ে এক অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য। মাঠের কাজে সবাই মগ্ন হলেও চারপাশের মগ্নতায় মুগ্ধ বেলা। কি অপরূপ চারপাশ! চোখ তুললেই নদী। তিতাস নদীর কাজল কালো পানি। নদীর পাড়ের জমিতে সবুজের বাড়াবাড়ি। নানা রঙের ফুলের বাহার। আঁকাবাকা মেঠোপথ। বাতাসে বসন্তের গন্ধ শুকে শুকেই একজীবন শেষ করা যায়।   রনি বলল, “দেখি আজ কে বেশি মরিচ তোলে!” পরশ তার কথা শুনে হেসে বলল, “তুই তো দিনশেষে দ্বিতীয় হস। প্রথম হওয়ার আশা বাদ দে রে ভাই!” ঊষা ঝুড়িতে মরিচ ফেলতে ফেলতে বলল, “আজ প্রথম হবে বেলা। ওকে কেউ ধরতে পারবে না।” বেলা অন্য দিনের মতো নেই। চোখ-মুখে অদ্ভুত অস্থিরতা । কাজে মন বসছে না। বারবার দৃষ্টি যাচ্ছে গ্রামমুখী সেই পথের দিকে।   শম্পা খেয়াল করে বলল, “কি হয়েছে, বেলা?” বেলা মৃদু হেসে বলল, “কিছু হয়নি রে।” ঊষা ঠাট্টা করে বলল, “কি জানি, কার কথা মনে পড়ছে!”   সবাই হেসে ওঠে। বেলাও যোগ দেয় হাসিতে। মনটি আজ তার সত্যি ভারী। অদৃশ্য কেউ তাকে টেনে রেখেছে বিষণ্ণতার গহ্বরে। মাঠজড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতির সীমাহীন সৌন্দর্য তার ভেতর অদ্ভুত আলোড়ন তুলেছে। দিগন্ত বিস্তৃত জমির বুক জুড়ে লাল-সবুজ মরিচ রোদের আলোয় ঝিলমিল করছে। পাশেই ধনেপাতার কোমল সবুজ শাখা দুলে দুলে নীরব সুর তোলছে। গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। পরেই সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা লালচে ও সাদা মূলার চারা। বাধাকপি আর ফুলকপি বেড়ে উঠছে। পাতা মেলে মনকাড়া আবেদন জানাচ্ছে। সরষে ফুলের কথা আলাদা করে বলাই যেন অন্যায়। নিজেই আলো ছড়ায়। স্বর্ণাভ, মায়াময় দীপ্তি। চোখে পড়লে মন অবধারিতভাবে থমকে যায়। বেলা তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ে।   মরিচ তুলতে তুলতে জমির ফাঁক দিয়ে লাইন দিয়ে এগোচ্ছে। হাতের ঝুড়ি ভর্তি হলে দৌড়ে গিয়ে বস্তায় ঢেলে আবার লাইনে নেমে আসে। রনি হঠাৎ বলে উঠল, “এই দেখ, আমার ঝুড়ি সবার আগে ভরছে!” পরশ বলে, “তা হবেই। তোমার গাছে মরিচ কম। দু-তিনটে তুললেই ভরে যায়!” হাসির রোল পড়ে মাঠে।   বেলা সচেতন হয়ে উঠে। সে নিজের গতি ধরে এগুলেও তার ভেতরে ছন্দ নেই। কিছুদূর এগিয়ে সে আকাশের দিকে তাকায়। এক ঝাঁক বক উড়ে আসছে। সন্ধ্যার আলোয় তাদের সাদা ডানা আরো সাদা মনে হচ্ছে।   বেলা ভাবতে থাকে, “ইস্! যদি পাখি হতে পারতাম! মনের সুখে উড়তে পারতাম।” তার কল্পনা হঠাৎ রূপ বদলায়। সে পাখিদের মনের কথা শুনতে শুরু করে।   “উড়তে আর ভালো লাগছে না। ডানা ব্যথা করছে। খাবারের জন্য প্রতিদিন দূরে যেতে হয়। কাছে যদি একটা বিল থাকত, তাহলে বাঁচতাম।”   বেলা হেসে ফেলল, “পাখিদের কত কষ্ট!”   ঊষা বলল, “কি হলো? একা একা হাসছ?”   “কিছু না রে। ওদের কথা ভাবছিলাম।”   কাজ শেষ। সবাই ক্লান্ত। আনন্দও কম নয়। মরিচ তোলা তাদের কাছে শুধু কাজ নয়, যেন উৎসব। বেলা বলল, “চল, নদীতে গিয়ে হাত-মুখ ধুই।”   তারা দ্রুত চলে যায় পুরাতন তিতাস নদীর কাছে।   এখানে নদী সরু হয়ে পূর্ব-পশ্চিমে দুই ধারায় ভাগ হয়েছে । পানি কম, স্রোত নেই। প্রাণহীন। তাদের উপস্থিতি এবং কোলাহলে নদী প্রাণ ফিরে পায়।   রনি পানিতে নেমেই চিৎকার করে উঠল, “পানি কিন্তু ঠান্ডা রে!”   পরশ দুষ্টুমি করে এক মুঠো পানি শম্পার গায়ে ছিটিয়ে দিল।   শম্পা চমকে উঠে বলল, “ওই! কি করছিস?”   ঊষা সাথে সাথে এগিয়ে গিয়ে পরশের গায়ে পানি ছুড়ে মারল।   পরশ বলল, “ওহ হো! তুই আমার শত্রু হয়ে গেলি কখন থেকে!”   হাসতে হাসতে সবাই পানিতে ছিটাছিটি করে।   কেউ কারো কথা শুনছে না। কয়েক মুহূর্ত তাদের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।   ধীরে ধীরে সবাই পানি থেকে উঠে আসে। কেউ চুল মুছছে । কেউ হাঁসের পালের দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ নদীর পানে তাকিয়ে গান গাইছে।   মরিচভর্তি বস্তা কাঁধে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়। শম্পা হাঁটতে হাঁটতে বলল, “আজ যদি মালিক একটু বেশি ভাগ দিত!”   পরশ বলল, “ওসব আশা করে লাভ নেই রে। সাতভাগের একভাগ ছাড়া কিছু দেবে না।”   রনি যোগ করল, “তাতেই বা কম কি!”   সবাই মাথা নেড়ে সায় দিল।   গ্রামের পথ ধরে তারা এগিয়ে চলে। সন্ধ্যার আবেশ চারপাশে নেমে আসছে। ক্ষেতের কোণের বকের দলও বাড়ি ফিরছে। বকের ডানার শব্দ, বাতাসের গন্ধ, স্নিগ্ধ পরিবেশ-সব মিলিয়ে বেলার মনটা নরম হয়ে ওঠে। সে মনে মনে বলে, “পাখিরাও ক্লান্ত, আমরাও ক্লান্ত। অথচ   তারা না পায় ভাগ, না পায় বিশ্রামের জায়গা।”   মালিকের বাড়িতে এসে সবাই নিঃশ্বাস ফেলল।   রনি দৌড়ে গিয়ে পানি এনে দিল। তখন সুরমা চাচী এসে বললেন, “শুধু পানি খেয়ে পেট ফুলাবে না। মুড়ি খাও।” শম্পা দৌড়ে গিয়ে তেল আর পেঁয়াজ নিয়ে এল। বলল, “মেখে দিচ্ছি। কেউ তাড়াহুড়ো করে গিলে ফেলবি না কিন্তু!”   পরশ হাসল, “আজ তোকে খুব উপদেশ দিতে দেখছি।”   মুড়ি খাওয়ার সময় সবাই মেতে ওঠে গল্প আর হাসিতে। খাওয়া শেষে সুরমা চাচী মরিচ ভাগ করতে আসেন। তিনি ছোট একটি বোল নিয়ে সবার সামনে বসে যত্নসহকারে এক এক করে সবার মরিচ ভাগ করছেন। চাচীর মুখে মমতা। এমন মায়াবতী মানুষ এই গ্রামে কম আছে।   চাচী বললেন, “এই নাও। সমান ভাগ করে দিলাম। কেউ কারো দিকে তাকিয়ো না।”   তারপর সবাই বেলার কাছে আসে। বেলা তাদের দলনেতা। & nbsp; রনি বলল, “বেলা, তোমারটা নাও।”   বেলা মাথা নেড়ে বলল, “আরে ধুর! আমায় কেন দিবে? আমি নিলে তোদের ভাগ কমে যাবে।” শম্পা প্রায় জোর করেই বলল, “আরো না! তুমি আমাদের কাজে নিয়ে আসো, সাহস দাও, কাজ শেখাও। তোমারে না দিলে আমাদের ভাল লাগে না।”   ঊষা মিষ্টি হেসে বলল, “তুমি না নিলে মনে হবে দলনেতা রাগ করেছে।”   বেলা অগত্যা সবার নিকট থেকে একটু একটু করে নেয়   বাড়ি ফেরার সময় বেলা বলল, “কাল সকাল সকাল বের হবো। দুই জমির মরিচ তুলতে হবে। দুপুরের খাবার সাথে নিও।”   কেউ কিছু বলে না। তারপর রনি বলে, “চল চল। ভাবলে হবে না। কাল আবার প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।” সবাই হেসে ওঠে।   বেলা আকাশের দিকে তাকায়। দূর থেকে ভেসে আসছে গানের সুর। সে মনে মনে বলে, “জীবন কত কষ্টের। তবু কত সুন্দর!” তার দলকে দেখে তার মন ভরে ওঠে । কত কষ্ট করে সবাই। অথচ মুখ ফুটে কেউ কিছু বলে না। অভাব-অনটন নিত্য হলেও স্পর্শ করতে পারে না কাউকে।   রাতের বাতাসে তখন ক্ষুধার গন্ধ। বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে তারা গল্পে মেতে উঠে। দিনের ক্লান্তি মুছে যায় ফেরার আনন্দে।   বেলা হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, “পাখির মতো ডানা নেই। জীবন আর ভালোবাসার

বৃষ্টি পড়ে মনে
গল্প

বৃষ্টি পড়ে মনে

বৃষ্টি পড়ে মনে উম্মুল খায়ের ঘুম ভেঙেই ক্ষুদে বার্তা পেলাম। বার্তাটি খুব পরিচিত জনের। ফেসবুকে দীর্ঘদিনের পরিচয়। দেখা হয়নি, তবে কথা হয়েছে অনেক। বার্তাটি পেয়ে মন খারাপ হয়ে গেল। জানালার পর্দা সরিয়ে তাকালাম আকাশের দিকে। মন খারাপ নিয়ে আকাশের দিকে তাকালে মন ভালো হয়ে যায়। ওমা, হঠাৎ আকাশটা কেমন যেন বদলে গেল! ঘোলাটে হয়ে গেল আকাশের চোখ। মনে হচ্ছে এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে। আকাশের কান্নার চমৎকার একটা নাম আছে—বৃষ্টি। আকাশ কাঁদলে তার নাম হয় বৃষ্টি। অথচ কিছু সময় আগেই কি ঝকঝকে ছিল! নীলাকাশে সাদা মেঘের ভরা যৌবন চলছিল। এখন আঁধার কালো মেঘ; আষাঢ়ের আকাশ তো এমনই হয়। মেঘে মেঘে ছেয়ে থাকে আর বৃষ্টি ঝরে। কখনো হালকা বৃষ্টি, আবার কখনো ভারি বৃষ্টি। কোথায় যেন পড়েছিলাম, আকাশ বলে কিছু নেই। আকাশ মূলত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। বিভিন্ন ধরনের গ্যাস ও জলীয় বাষ্প দিয়ে বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে এটা চারপাশ থেকে পৃথিবীকে ঘিরে আছে। এই বায়ুমণ্ডলকে সূর্যের আলোর কারণে আমরা আকাশ হিসেবে কল্পনা করি। সূর্যের আলোর নীল রঙ বায়ুমণ্ডলে পড়ার কারণে বায়ুমণ্ডল নীল রঙের হয়, তাই আমরা আকাশকে নীল দেখি। আমার মতো অতিসাধারণ মানুষের আকাশ হয় নীল, কিন্তু কবিদের আকাশ নিশ্চয়ই বিভিন্ন রঙের হয়। কবিদের আকাশ তো গোলাপি, খয়েরি, সবুজ, পার্পেল, মেরুন—আরও কত রকমের হতে পারে। কবি মন বলে কথা! আচ্ছা, কবি মাহবুবুর রহমানের আকাশটা কি রঙের? জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু জানা হবে না। আজ থেকে দশ বছর আগের কথা। সেদিন ছিল শ্রাবণের মুষলধারা। মাঠ-ঘাট সব জলে টইটুম্বুর! জানালা দিয়ে শ্রাবণ এসে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমাকে। শ্রাবণের পরশে অন্য রকম অনুভূতিতে মেতে ছিলাম। ঠিক সেই সময় ম্যাসেঞ্জারে কেউ একজন বারবার কল দিচ্ছিলেন। এই একটা সমস্যা—ম্যাসেঞ্জার বাজতেই থাকে, বাজতেই থাকে। ভীষণ বিরক্তিকর। মানুষ এত যন্ত্রণা করে কেন? আমি তো অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলি না, তাহলে কেন এত বিরক্ত করে? বৃষ্টিময় সুন্দর শ্রাবণের আনন্দটা মাটি হয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিয়ে লাইন কেটে দিলাম। মুহূর্তেই আবারও কল ঢুকে গেল। না! এবার আর সহ্য করা উচিত নয়। কলটা রিসিভ করলাম। অপরপ্রান্ত থেকে খুব সুন্দর একটা পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে এলো— —ম্যাডাম, কেমন আছেন? আমি একটু অবাক হলাম। এত সুন্দর করে কেউ কথা বলে! মেয়েরা সুন্দর করে এবং ঢং করে কথা বলে—এটা সবাই জানি। কিন্তু ছেলেরাও যে এত সুন্দর করে কথা বলে, সেটা জানা ছিল না। সুন্দর বাচনভঙ্গির অসীম ক্ষমতা! আমি চুপ হয়ে গেলাম। মেজাজ খারাপ ভাবটা চলে গেল। ওপাশ থেকে বলতে থাকলেন— —আপনাকে আমি প্রতিদিন কল দিই। কিন্তু রিসিভ করেন না। কেন রিসিভ করেন না? আমি বললাম—আসলে অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা হয় না। —আপনি এমন কেন, সোহানা? —কেমন? —অন্য রকম। —ওহ। —সোহানা আপু, একটা কথা বলি? —জি, বলুন। —আপনাকে আমার ভালো লাগে। আপনার হাসি ভীষণ সুন্দর। —ধন্যবাদ। —আমি আপনার হাসির প্রেমে পড়েছি। অনেক দিন ধরে আপনাকে ফলো করি। ফেসবুকে যে সব ছবি পোস্ট করেন, সেগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখি। আপনি এত সুন্দর! —Excuse me, আমি একটু বিজি আছি। আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব। —ওহ, আচ্ছা। আবার কল দিলে রিসিভ করবেন তো? —দেখা যাক। আল্লাহ হাফেজ। মাহবুবুর রহমান তারপর থেকে প্রায়ই কল দিতেন। সকাল, দুপুর, বিকাল, রাত—যখন ইচ্ছে হতো তখনই! এক ভোরে মর্নিং ওয়াকে বের হয়েছি, হঠাৎ ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি এল। অগত্যা আশ্রয় নিলাম অপরিচিত এক অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজে। দারোয়ান গেট খুলে দিল। গ্যারেজে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতা নিয়ে বৃষ্টির উচ্ছ্বাস দেখছি, ঠিক তখনই এল মাহবুবুর রহমানের কল। কল রিসিভ করে হাসিমুখে বললাম— —কি খবর আপনার? তিনি একটু অপ্রস্তুত হলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, আমি কল রিসিভ করব না। আমতা-আমতা করে বললেন— —আসলে ভুলে চাপ লেগে কল চলে গিয়েছে। এত ভোরে কল দেওয়া উচিত হয়নি। সরি। —অসুবিধা নেই, কবি। কেমন আছেন? —আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপা, কিসের শব্দ? বৃষ্টি হচ্ছে নাকি? —প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে, শ্রাবণের বৃষ্টি। —আপা, কবিতা শুনবেন? —কবিতা! আচ্ছা, শুনান তবে। মাহবুবুর রহমান অসম্ভব সুন্দর ভরাট কণ্ঠে আবৃত্তি করতে লাগলেন— বৃষ্টি পড়ে ঘর দুয়ারে বৃষ্টি পড়ে বনে বৃষ্টি পড়ে অন্ধকারে বৃষ্টি পড়ে মনে। রুক্ষ গেরস্থালি জুড়ে বৃষ্টি ঝমঝম কলহ-কট খড়ো বাতাস আজকে কিছু দূরে— বৃষ্টি এলে চুপ করে যায় অভিযোগের ঝড় মুখের উপর, বুকের উপর—ও বৃষ্টি, তুই পড়। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। হঠাৎ থেমে গেলেন তিনি। আমি বললাম— —থামলেন কেন? তিনি বললেন— —আমার মন বলল, আপনি কবিতা পছন্দ করেন না, তাই— —ভালোই তো লাগছিল। আপনি ভালো আবৃত্তি করেন। —তাই? আপনি চাইলে আপনাকে প্রতিদিন একটি করে কবিতা শুনাতে পারি। —এত কষ্ট করতে হবে না। আজ বৃষ্টির দিনে বৃষ্টির কবিতা ভালো লাগল। তাই শুনলাম। তা ছাড়া আপনার উচ্চারণভঙ্গি বেশ ভালো। একটা জাদুকরী নেশা লেগে যায়। —তাই? —হুম। কবিতা আর কখনো শুনিনি, তবে তাঁর লেখা অনেক কবিতা পড়েছি। হয় বিরহের, নয় তো প্রেমের। অনেক অনেক প্রেমের কবিতা লিখে পাঠাতেন। পড়ে মনে হতো, আমাকে নিয়ে লেখা। মাঝ বয়সে এসে প্রতিদিন প্রেমের কবিতা পড়তে কোন মহিলার ভালো লাগে জানি না। তবে আমার মোটেই ভালো লাগত না। মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হতাম। ভাবতাম—পাগল কোথাকার! আমার মধ্যে কি এমন পেল? তার পাগলামি দেখতে দেখতে কেটে গেল চারটি বছর। একদিন আবারও খুব ভোরে মোবাইল বেজে ওঠে। আমরা তখন মর্নিং ওয়াকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার হাসব্যান্ড অত্যন্ত বাজেভাবে কড়া দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। সেদিন তাঁর চোখের ভাষাটা ভালো লাগেনি। তাই ব্লক লিস্টে ফেলে দিলাম কবিকে। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এতটা চাপ নিতে ভালো লাগে না। ঠিক করেছি—বেশ করেছি। এই বয়সে এসে এত কিসের ঢং? এত কিসের প্রেম? এত প্রেম কোথা থেকে আসে এদের? কবির জন্য মন কেমন করে ওঠেনি। বরং এক সময় ভুলে গিয়েছিলাম। সব কি আর ভোলা যায়? সব ভোলা যায় না। প্রেমিকের পাগলামি ভোলা সত্যি কঠিন। কেউ মন থেকে সত্যিকার ভালোবাসলে সেই ভালোবাসাটা অজান্তেই মনের মধ্যে থেকে যায়। ঘুগরা পোকা হয়ে সময় সময় ডেকে ওঠে। গত নয় বছরে মনের মধ্যে এই ঘুগরা পোকাটা কতবার ডেকে উঠেছে, তার হিসাব রাখা হয়নি। গত বছর আমার এক বন্ধুর আইডিতে হঠাৎ মাহবুবুর রহমানের ছবি দেখতে পাই। আমার বন্ধু কবিকে নিয়ে একটা পোস্ট করেছে। গভীর মন দিয়ে ওর লেখাটা পড়তে থাকি। শরীরের রক্ত কেমন যেন হিম হয়ে এল। ভেতরটা ওলট-পালট হয়ে গেল। নিজেকে অপরাধী মনে হলো। অফিসে গিয়েও কাজে মন বসাতে পারলাম না। বাসায় ফিরে আগে ফেসবুকে ঢুকলাম। মাহবুবুর রহমানকে আনফ্রেন্ড করে রেখেছিলাম; তাঁকে আবার ফ্রেন্ড করে নিলাম। অনেক বছর পরে তাঁর প্রোফাইলে ঢুকলাম একটা নরম, তুলতুলে, মোমের মতো হৃদয় নিয়ে। মায়াময় হৃদয় আমার। পুরো ফেসবুকে কবিতা আর কবিতা। এত্তগুলা কবিতা লিখেছেন তিনি! একটা একটা করে কবিতা পড়লাম। মোট ছিয়াশিটি কবিতা। এইট্টি সিক্স! ভাবা যায়? সবগুলো কবিতা বিষাদময় বিরহের কবিতা। কবিতা পড়ার সময় লক্ষ করলাম, হৃদয়ে ব্যথার পাহাড় জমতে শুরু করেছে। কখন যে চোখে আমার শ্রাবণের ধারা বইতে শুরু করেছে! টিস্যুতে চোখ মুছে বিড়বিড় করে

ফাইলের নিচে চাপা শব্দ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
গল্প

ফাইলের নিচে চাপা শব্দ

ফাইলের নিচে চাপা শব্দ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ সকালের আলো যখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পুরোনো ভবনের দেয়ালে এসে পড়ে, তখন সেটি আর আলো থাকে না—হয়ে যায় এক ধরনের নিস্তেজ রং। দেয়ালের রং যেমন মলিন, ভেতরের বাতাসও তেমনি ভারী। এখানে বাতাসে কাগজের গন্ধ নেই, শুধু আছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অনুচ্চারিত অভিশাপ আর ফিসফিসে হিসাব। আব্দুল করিম দাঁড়িয়ে ছিলেন লম্বা লাইনে। হাতে একটি বাদামি ফাইল—বহুবার খোলা-বন্ধের দাগে যার কোণাগুলো নরম হয়ে গেছে। এই ফাইলের ভেতরে জমির কাগজ, বাবার মৃত্যুসনদ আর করিমের নিজের অসহায়তা—সব একসঙ্গে চাপা পড়ে আছে। তিনি জানেন, এই ফাইলের ওজন কাগজে নয়, টাকায় মাপা হয়। টেবিলের ওপাশে বসে আছেন মনির হোসেন। টেবিলের ওপর ফাইলের পাহাড়, নিচে অদৃশ্য এক নদী—যার স্রোত কেবল টাকায় বয়ে চলে। মনির কাগজে চোখ রাখেন, মানুষে নয়। কারণ মানুষে চোখ রাখলে বিবেক জেগে উঠতে পারে—আর এখানে বিবেক বড় ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু। — “আসেন, পরে আসেন।” মনিরের কণ্ঠে কোনো নিষ্ঠুরতা নেই, আছে নিয়মিত চর্চার স্বাচ্ছন্দ্য। যেন তিনি কোনো মানুষকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন না, বরং একটি আবহাওয়া জানাচ্ছেন। করিম কিছু বলেন না। কিছু বলার ভাষা এখানে নেই। বাইরে এসে তিনি বসেন লোহার বেঞ্চে। বেঞ্চটি ঠান্ডা নয়, অথচ শীতল লাগে। পাশের লোকটি কানে কানে বলে— — “পাঁচ হাজার দিলেই আজ শেষ।” এই বাক্যটি করিমের কানে ঢোকে না, ঢুকে পড়ে বুকের ভেতর। সেখানে আগে থেকেই জমে থাকা হিসাবগুলো নড়েচড়ে বসে। মেয়ের স্কুল ফি, স্ত্রীর ওষুধ, ঘরের চাল—সব হিসাবের ওপর নতুন এক কর বসে যায়। মনির হোসেন একসময় এই বেঞ্চেই বসেছিলেন। বহু বছর আগে। তখন তাঁর চোখেও এমন দ্বিধা ছিল। চাকরিতে ঢোকার প্রথম বছর তিনি ঘুষ নেননি। রাতে ঘুম হতো শান্ত। আয় কম ছিল, কিন্তু স্বপ্ন ছিল বড়। তারপর ধীরে ধীরে অফিসের ভেতরকার অদৃশ্য পাঠশালায় তিনি নতুন অঙ্ক শিখলেন। দুই শতাংশ, পাঁচ শতাংশ। “কাজ ঠিক আছে” বলার দাম। “কিছু দেখা হয়নি” বলার মূল্য। ঘুষ তখন আর পাপ থাকল না—হয়ে উঠল নিয়ম। নিয়ম মানা আর অপরাধ নয়। এটাই তাঁকে শেখানো হলো। মনির যখন প্রথম টাকা নিলেন, হাতে কাঁপুনি এসেছিল। কিন্তু আশ্চর্য—কাঁপুনি বেশি দিন টিকল না। অভ্যাস বড় নিষ্ঠুর শিক্ষক। একদিন বড় প্রকল্প এলো—একটি স্কুল ভবন। শিশুরা যেখানে পড়বে, স্বপ্ন দেখবে। নকশায় সব ঠিক। কাগজে সব নিখুঁত। বাস্তবে ইটের ভেতর ফাঁক। রডে জং। তবু ফাইল বলল—“সম্পন্ন।” দু’বছর পর বর্ষার রাতে ভবনের এক কোণ ভেঙে পড়ল। দেয়ালের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ল কিছু অদৃশ্য বিশ্বাস। তদন্ত হলো, রিপোর্ট হলো। দায় কারও ঘাড়ে পড়ল না। দায় বরাবরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল। সেদিন মনির বাড়ি ফিরে ছেলের প্রশ্নের মুখে পড়লেন— — “আব্বু, স্কুলটা ভেঙে গেল কেন?” মনির উত্তর খুঁজে পেলেন না। কারণ উত্তরটা ছিল তাঁর নিজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে করিম শেষমেশ টাকা দিলেন। ফাইল নড়ল। সই হলো। কাজ হয়ে গেল। সবাই বলল—“ভাগ্য ভালো।” কিন্তু রাতে করিমের ঘুম এল না। মনে হলো, তিনি শুধু পাঁচ হাজার টাকা দেননি—নিজের নীরব প্রতিবাদটুকুও তুলে দিয়েছেন।   আরও গল্প পড়ুন

বাবা ক্লান্ত তেলের ঘানি
গল্প

বাবা ক্লান্ত তেলের ঘানি

বাবা ক্লান্ত তেলের ঘানি মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন ইবনে মোস্তাফিজ সকালটা আজও সেই আগের মতো। দরজার পাশে রাখা জুতার শব্দে ঘুম ভাঙে। একটা সময় ছিল বাবা খুব ভোরে বাড়ির সকলে উঠার আগেই বেরিয়ে যেতেন। তখন ঘুম ভেঙে শুধু খালি দরজাটা দেখতাম। আজ এত বছর পর আমি নিজেই সেই ভোরের পথিক। বাবা হয়ে ওঠার পথে হাঁটছি প্রতিদিন। ছোটবেলায় যেমন বাবাকে দেখতাম নিঃশব্দ, গম্ভীর মুখে, কোনো অভিযোগ নেই, ঠিক তেমনই এক জীবনের পথে আমি এখন নিজেই। ছেলেবেলায় বাবাকে একটা রহস্য মনে হতো। আমরা যখন জ্বরে কাঁপতাম, বাবা গায়ে কাপড় জড়িয়ে ঘর ঠেলে বেরিয়ে পড়তেন। পেটের ব্যথায় কুঁকড়ে থাকতাম, বাবা হেঁটে যেতেন কর্মস্থলের দিকে। কিছু বলতেন না, কিছু বুঝাতেন না, তবুও কী গভীর ভাষা ছিল তার নীরবতায়! আমার এখন মনে হয়, পুরুষ মানুষ হয়তো কোনো এক জাদুর ছোঁয়ায় ব্যথাকে ভুলে যেতে শেখে। নয়তো সমাজ তাকে সে পথেই ঠেলে দেয়। যেন একটা সময় আসে যখন তাকে আর ‘মানুষ’ ভাবা হয় না। ভাবা হয় কেবল একটা যন্ত্র—উপার্জনের, সাহসের, নির্ভরতাই যার প্রকৃত পরিচয়। বাবা যতোদিন জীবিত থাকেন, আত্মীয়-স্বজনদের আনাগোনা থাকে, ভালোবাসা থাকে, উৎসবের ডাক থাকে। বাবা আছেন বলেই পরিবারটা পূর্ণ। বাবা চলে গেলেই যেন সব ছেঁড়াখোঁড়া হয়ে পড়বে। ফুপির ভালোবাসা, চাচার হাসি সব যেন বাবার উপস্থিতির মধ্যেই বন্দি। আজ আমি নিজেই সেই ছায়া হওয়ার চেষ্টা করছি। সন্তানরা ঘুমে। আমি আস্তে করে দরজা খুলে জুতা পায়ে গলিয়ে বের হই। শহরমুখী পথটায় হাঁটতে হাঁটতে বুঝি, পুরুষ মানুষকে নিজের ব্যথার উপর সিমেন্ট ঢেলে চলতে হয়। অসুখকে পাশ কাটিয়ে, ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে, হেরে গিয়েও জিতে যাওয়ার অভিনয় করতে হয় প্রতিদিন। একদিন ছেলেটা প্রশ্ন করল, “বাবা, তোমার শরীর খারাপ হয় না?” আমি হেসে বললাম, “হয়তো হয়, তবে বাবা নামক মানুষের অসুখ থাকতে নেই।” সে বিশ্বাস করল। যেমন আমিও একদিন করেছিলাম, আমার বাবার কাছে। স্মৃতির পাতায় এখনো ভেসে আসে বিকেলের সময়টা। আমি বারান্দায় বসে থাকতাম, বাবার জন্য অপেক্ষা করতাম। খালি হাতে ফিরলেও তিনি আমাকে এক টুকরো ভালোবাসা দিতেন—একটা চকলেট, কখনো একটা হাসি, কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া। আজ আমি বুঝি, সেই ছোট্ট উপহারটার পেছনে ছিল দিনের সব ক্লান্তির বিনিময়ে কেনা সুখ। একবার বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। পুরো বাড়ি চিন্তিত, মা চোখের কোণে জল নিয়ে দোয়া পড়ছেন। আর বাবা? তিনি নিঃশব্দ, শুধু বারবার বলছিলেন, “চিন্তা কোরো না, আমি ঠিক আছি।” তখন প্রথম বুঝেছিলাম, বাবার কষ্ট বোঝা এত সহজ নয়। তার কষ্ট শব্দে ধরা দেয় না। বাবা শুধু বলেন, “ভালো আছি।” আর আমরাও তা বিশ্বাস করি, যেন এটুকুই যথেষ্ট। আজ আমি যখন বাজার করি, বাসা ভাড়া দেই, সন্তানের পড়াশোনার খরচ দেই, তখন বাবাকে আরও স্পষ্ট করে দেখি নিজের মাঝে। বুঝি, কেন তিনি গম্ভীর ছিলেন। কেন একা একাই রাতের অন্ধকারে সিগারেট ধরতেন। কেন চোখের কোণে কখনো কখনো লুকিয়ে রাখতেন ভেজা আবেশ। পুরুষ মানুষের কান্না যেমন অলিখিত নিষেধ, তেমনি তার কষ্টও কেবল তার একান্ত নিজস্ব। কেউ জানতে চায় না, জানলেও বুঝে না। আজ আমি একাকী বারান্দায় বসে নিজের ছেলেকে দেখি। সে আমাকে দেখে হাসে। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেই। ও জানে না, আমার পিঠে ব্যথা, বুকে চাপ, মাথায় দুশ্চিন্তা। তবু আমি হাসি। কারণ বাবা নামের মানুষের কাছে একটাই নিয়ম—নিজেকে ভাঙার আগে অন্যকে গড়ে তোলা। আমার বাবাও এমনই ছিলেন। তিলে তিলে নিজেকে ক্ষয় করে আমাদের আলো দিয়েছিলেন। এখন তার চুলে পাক ধরেছে, হাঁটার গতি কমেছে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়েছে, তবু তিনিই আমাদের আলো। একদিন হঠাৎ তিনি বলেন, “তুই তো এখন বুঝিস, বাবা কাকে বলে?” আমি মাথা নিচু করে বলেছিলাম, “তোমার ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকলেই তা বোঝা যায়, বাবা।” আজ আমি সেই ছায়া হয়ে উঠতে চাই। তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে অন্যকে ছায়া দিতে চাই। ক্লান্ত শরীরে সন্তানকে হাসি দিতে চাই। কোনো একদিন সেও যেন বলে, “আমার বাবা একজন নায়ক ছিলেন।” আমরা ভুলে যাই, জীবনের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে যে মানুষটা আমাদের পিঠে হাত রাখে, তার ভেতরে জমে থাকে শত ঝড়, শত হাহাকার। তবু তিনি বলেন, সব ঠিক আছে। তবু তিনি দেন ভালোবাসা, নিশ্চিন্ত ঘুম আর নির্ভরতার ছায়া। আমার বাবার নাম আজো উচ্চারণ করি শ্রদ্ধায়। তার জীবনের প্রতিটি দিন যেন ছিল একটি যুদ্ধ। প্রতিদিন সকালে ঘর ছাড়তেন, এক বোঝা দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। সন্ধ্যাবেলায় ফিরতেন একইভাবে। একবারও বলেননি, “আজ খুব ক্লান্ত লাগছে।” শুধু বলতেন, “তোমার জন্য চকলেট এনেছি।” আজ আমি বুঝি, সেই চকলেট ছিল এক টুকরো ভালোবাসার ভাণ্ডার। যার দাম আমি কখনো শোধ করতে পারব না। বাবা না থাকলে জীবন যে কতটা ফাঁকা, তা বোঝা যায় তার অনুপস্থিতিতে। আর বাবা থাকতে মাথার উপর একটা অদৃশ্য ছায়া থাকে, যার নিচে দাঁড়ালেই সব ভয়, সব কষ্ট ভুলে যাওয়া যায়। বাবা, তুমি সত্যিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। তুমি শেখালে—পুরুষ হওয়া মানেই শক্তির ছদ্মবেশে কষ্টকে গিলে ফেলা। তুমি বোঝালে—ছায়া হয়ে থাকলে অনেক মানুষ বাঁচে। আর সেই ছায়া তুমি। প্রিয় বাবা, তোমায় সালাম!   আরও বাংলা গল্প পড়ুন

অহংকার বেচে নিলামে
গল্প, শিক্ষণীয় গল্প

অহংকার বেচে নিলামে

অহংকার বেচে নিলামে আনোয়ার আল ফারুক এক. ভবনের নাম “অহংকার”। প্রথম নজরে অনেকে আবার অলংকারও পড়ে বসে। জেলা শহরে এই রকম আলিশান বাড়ি দু-চারটার বেশি নেই। ফেনী শহরের পশ্চিম উকিলপাড়ার দাউদপুরে এই বাড়ি। নব্বই দশকের শুরুর দিকে এই অঞ্চলে আধাপাকা, সেমিপাকা কিছু বাড়িঘর থাকলেও এত বিশাল অট্টালিকা আর দ্বিতীয়টি ছিল না। তাই প্রথম দেখায় এই ভবনটি সবার নজর কাড়ে। প্রধান সড়কের পাশঘেঁষা এই ভবনটি পথিকেরা একবার হলেও ঠায় দাঁড়িয়ে অপলক চোখে দেখে। বাড়ির সামনে রয়েছে বিশাল আঙিনা। দক্ষিণ পাশে একটি পুকুর, তারপর বিশাল বাগানবাড়ি। পুকুরের ঘাটে বসার জায়গাটা শ্বেত মার্বেল পাথরের নির্মিত। তাই এই বাড়ির রূপ-সৌন্দর্য যে কারো দৃষ্টি কাড়বে। বাড়ির মালিক আফজাল সাহেব তৎকালীন সড়ক ও জনপদ বিভাগের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। তাঁর রুজি-রুটি নিয়েও এলাকায় রয়েছে নানান কৌতুক। দশতলা বিশিষ্ট এই বাড়ির ২য় তলায় থাকেন আফজাল সাহেব ও তাঁর পরিবার। বাদবাকি ফ্লোরগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আফজাল সাহেবের এক ছেলে ও এক মেয়ে। তারা লেখাপড়ায় মাধ্যমিক ধাপ গড়ায়নি। এই নিয়েও আফজাল সাহেব প্রায় বড়াই করে বলেন, “আমার ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া না করলে কী হয়েছে? আমার যে সম্পদ আছে, তা তারা দশ জনম খেয়ে-পরে যেতে পারবে।” ইদানীং আফজাল সাহেবের বাড়ির প্রায় ফ্লোর খালি থাকছে। ভাড়াটিয়ারা এখানে খুব বেশিদিন টিকে না। দুই-তিন মাস থাকার পর অনেকেই বাসা ছেড়ে দেয়। এই বাড়ির নিয়মনীতি অবশ্যই বেশ জটিল। প্রথমে ভাড়াটিয়ারা আসলে এসব জটিল নিয়মকানুন গোপন রাখা হয়। বাসায় ওঠার পর একগাদা লিখিত নিয়মকানুন পড়ে তাদের অবহিত করে আসেন মিসেস আফজাল সায়েরা খানম। এখানে ভাড়াটিয়াদের বাসার ছাদ, উঠোনে, পুকুরঘাটে আসা-যাওয়া, বসা কিংবা পুকুরে গোসল করা শতভাগ নিষিদ্ধের আওতায়। অনেকে বাড়ির রূপ-সৌন্দর্যপূর্ণ পরিবেশ দেখে আকৃষ্ট হয়ে আসলেও পরে কিন্তু এসব কালাকানুন শুনে রীতিমতো থ বনে যান। আবার এক ভাড়াটিয়া অন্য ভাড়াটিয়ার বাসায়ও যেতে না পারা এখানের আরেকটি অলিখিত সাংবিধানিক মজবুত ধারা। মিসেস সায়েরা খানম এসব নিয়মকানুন সাংঘাতিকভাবে তদারকি করেন। সামান্য শব্দ কিংবা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ভাড়াটিয়াকে শাসিয়ে নেন দুস্তুরভাবে। আর এই ভবন নিয়ে শুনিয়ে দেন রুটিনমাফিক অহংকারের বেশ কিছু কমন পদাবলি। বৈশ্বিক করোনা মহামারি চলাকালীন নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে সামান্য হেরফের হওয়ায় বেশ কয়েকজন ভাড়াটিয়ার মালসামানা বাসায় রেখে তাদের বের করে বাসায় তালা ঝুলিয়ে দেন মিসেস সায়েরা খানম। এই ভাড়াটিয়াদের অনেকে আত্মসম্মানের দিকে তাকিয়ে কোনো রূপ উচ্চবাচ্য না করে মালসামানা রেখে বাসা ত্যাগ করে চলে যান। পরে এই মালসামানা মিসেস সায়েরা বেগম নিলামে বিক্রিও করেন। স্থানীয় একটা বেসরকারি স্কুলের একজন শিক্ষককে যথাসময়ের তিন দিন বেশি সময় ভাড়া দিতে অপারগতার কারণে আফজালুর রহমান ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেন। ওই মাস্টার সাহেব রাগে-ক্ষোভে ওই এলাকা ত্যাগ করেন। শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে সারাজনমের জন্য নিজ গ্রামে চলে যান। যাওয়ার সময় মিসেস সায়েরা খানম বলেন, “আপনার বাসার মালসামানা নিলামে বেচে বকেয়া বাসা ভাড়া উশুল করে নেব।” ওই মাস্টার সাহেব অনেকক্ষণ চুপ থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছলোছলো চোখে বলেন, “আজ হয়তো অহংকার ও ক্ষমতার দাপটে আমার মালসামানা নিলামে বেচে দেবেন, আর আল্লাহ চাইলে এর ব্যতিক্রমও হতে পারে। আপনার বাড়িটাও একসময় হয়তো নিলামে বেচা হয়ে যেতে পারে।” কোনো রূপ প্রতিত্তরের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই দু বছরের শিশুবাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এই দৃশ্য অন্য ভাড়াটিয়াদের হৃদয়ে ভীষণ দাগ কাটে এবং অনেকে নীরবে চোখের পানি ছাড়লেও এই অহংকারী, দাপুটে বাড়ির মালিকের সামনে টুঁ শব্দ করার সৎ সাহস করেননি। দুই আফজাল সাহেবের একমাত্র ছেলে রিফাত বাবার সঞ্চিত ব্যাংক ব্যালেন্স ও বাড়ি মর্টগেজ দিয়ে ব্যাংক থেকে বিশ লক্ষ টাকা নিয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন। শহরের জিরো পয়েন্টে এই নামিদামি রেস্টুরেন্ট প্রথমে বেশ জমে উঠলেও ব্যবসা না জানা, না বোঝার কারণে প্রথম বছরেই ব্যবসায় বিশাল লোকসানি গুনতে হয়। এখানে শুধু ব্যবসা না বোঝার দোষ না। রিফাত বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে সময়-অসময়ে আড্ডা ও জুয়ায় আসক্তিতে মজে ওঠে। এতে করে ব্যবসা ধ্বংস হয় এবং ঋণের বোঝা ফুলে-ফেঁপে বড় থেকে বড় হতেই লাগল। এই বোঝা হালকা করতে গিয়ে আফজাল সাহেব বাড়ির পৈত্তিক সম্পত্তি ঘরভিটাও বেচে দেন। বর্তমানে শহরের এই বাড়ি ছাড়া তাদের আর একতিল জমিও নেই। এদিকে বছরের অধিকাংশ সময় বাড়ির প্রায় ইউনিট ভাড়াহীন থাকায় তাদের দিনকাল খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। দুর্বিষহ জীবনযাপন করলেও বাইরের হাঁকডাক ঠিকই বজায় রাখছেন আফজাল সাহেব। সকালবেলায় কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় হাঁটছেন আফজাল সাহেব। টার্গেট পূর্ব পাড়ার নবি ব্যাপারির চা-দোকান। ওখানে বেলা পর্যন্ত চা পান করে আড্ডায় কাটিয়ে দেন আফজাল সাহেব। ক্রিং ক্রিং ক্রিং—বেজে উঠল আফজাল সাহেবের ফোন। রিসিভ করে ওপারের কথা শুনে যেন আফজাল সাহেবের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। থানায় থেকে ওসি সাহেব ফোন করছেন। তাঁর ছেলে রিফাতসহ দশজনের এক ডাকাত গ্রুপ হাইওয়ে গাড়ি ডাকাতিকালে র‍্যাবের হাতে ধরা পড়ে। র‍্যাব জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দি গ্রহণের পর থানায় হস্তান্তর করলে তার নামে নিয়মিত ডাকাতি মামলা রুজু হয়। আফজাল সাহেব রিকশায় চড়ে থানায় ছুটে যান। আইনের নিয়মে থানা রিফাতদের কোর্টে তুললে কোর্ট জামিন না মঞ্জুর করে জেলে পাঠিয়ে দেন। এদিকে গোটা এলাকায় এই সংবাদ অল্প সময়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়, জাতীয় পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরিচিতজনরা আফজাল সাহেবকে বিষয়টি জানতে ফোন করেন। আফজাল সাহেব লোকলজ্জায় নিজের ফোনের সিম বদলে ফেলেন। এই তো গত পনেরো- বিশ দিন আফজাল সাহেব ঘর থেকে খুব একটা বের হন না। জরুরি প্রয়োজনে হাটে কিংবা ছেলের জামিনে কোর্টে যেতে হলে কাজ সেরেই ফের নিভৃতে বাসায় ফেরেন। আফজাল সাহেব এই মানসিক চাপ একদমই নিতে পারছেন না। একদিকে ছেলের এই অবস্থা, অন্যদিকে দায়দেনার প্রচণ্ড চাপ। প্রতিদিন কেউ না কেউ আসছে পাওনা টাকার জন্য। কেউ কেউ টাকা আদায়ে মামলারও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। কী করবেন, কোথায় যাবেন—ভেবে দিশা পাচ্ছেন না আফজাল সাহেব। এদিকে কয়েক ডজন নোটিশের পর এক্সিম ব্যাংক, ফেনী শাখা ত্রিশ জুনের মধ্যে ব্যাংক লোনের সমুদয় টাকা পরিশোধের চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে। অন্যথায় ব্যাংক এই বাড়িটি নিলামে বিক্রি করে দেবে। এসব ভাবতে ভাবতে আফজাল সাহেব বারান্দায় পায়চারি করছেন। এমন সময় ফোন বেজে উঠলে ফোন রিসিভ করতেই ওপার থেকে তাঁদের আইনজীবী জানান, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে তাঁর চেম্বারে দেখা করতে। আফজাল সাহেব কোনো রকম প্রস্তুতি নিয়ে ছুটছেন জেলা জজকোর্টের দিকে। আফজাল সাহেব এখন বাসা আর কোর্টের বারান্দায় দিন কাটান। কোনো রকম তদবির করে হলেও ছেলের জামিনের জন্য ধারে-ধারে ঘুরছেন। পায়ের তলার জুতো ক্ষয় হচ্ছে, কিন্তু ছেলের জামিনের কোনো কুলকিনারা হচ্ছে না। চোখের পলকে যেন কেটে গেল দশটা বছর। এই দশ বছরে আফজাল সাহেবের ঋণের বোঝাও ঠিক আকাশ ছুঁইছুঁই। কী করার আছে তাঁর? তবুও তিনি ঘুরছেন একমাত্র ছেলের জামিনের জন্য। দীর্ঘসূত্রিতার পর আজ মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার কথা। আফজাল সাহেবের মন ধুকপুক করছে। মহামান্য জজ এজলাসে উঠেই নির্ধারিত এই মামলায় রায় পড়ে শোনান। রায়ে তাঁদের সবার বারো বছরের সাজা ঘোষণা করেন মহামান্য

গল্প

একটি রহস্যময় ঘটনা – শুভ্রব্রত রায়

একটি রহস্যময় ঘটনা – শুভ্রব্রত রায় সময়টা বর্ষাকাল। এক তো রাত তার ওপর প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। সারাদিন প্রবল বৃষ্টির হওয়ার পর যখন খানিকটা বৃষ্টির পরিমাণ ও ঝড় হাওয়ার দাপট কমল, তখন প্লাটফর্মে একটাও লোক নেই। প্লাটফর্মের এদিক-ওদিক শুনশান। অর্ক বলে একটি ছেলে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে বাড়ি ফিরবে বলে। কারণ তার বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে। কিন্তু ট্রেন আসতে অনেক দেরী, তাই অর্ক প্লাটফর্মের একটি বেঞ্চে পা তুলে বসল, রাত্রি তখন প্রায় ঘড়ির কাঁটায় আটটা বাজে। তখন সে ভাবলো এই ঠান্ডা আবহাওয়াতে একটু চা পেলে ভালোই হতো, কথাটা ভাবা মাত্রই দেখল সে-খানিকটা দূরে একটি লোক চায়ের কাপ ও কেটলী হাতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছ। তৎক্ষণাৎ অর্ক হাত নেড়ে লোকটিকে ডাকল। অর্ক বলল এক কাপ চা দিন। লোকটি বলল চা নেই বাবু কফি আছে। অর্ক শুনে মনে মনে বেশ খুশি হয়ে ভাবলো “আরও ভালো”। এই ভেবে সে এক কাপ কফি কিনে খেতে লাগলো আর প্লাটফর্মেট পাইচারি করতে লাগলো। হঠাৎ খানিকটা দূরে তার দৃষ্টি পড়ল, সেখানে একটা একটা কী যেন একটা পড়ে আছে। দূর থেকে বিদ্যুতের আলোতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তাই অর্ক একটু এগিয়ে গেল সেই দিকে। আর দেখল একটি মানুষ পড়ে আছে রেল লাইনের ধারে। সে ভাবল লোকটি হয়তো অজ্ঞান হয়ে গেছে বা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। তখন প্রায় রাত্রি নটা বাজে। ঠিক আর একটু বাদেই রাত্রি সাড়ে নটা নাগাদ ট্রেন আসবে। তাই অঘটনের আশঙ্কায় তার বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল। তাই তাকে সেই রেল লাইন থেকে তোলার জন্য অনেক ডাকাডাকি করতে লাগলো। কিন্তু অর্ক লোকটির কোনো সাড়া পেলনা, সাড়া না পেয়ে লোকটির ডান হাতটি ধরে সজোরে হ্যাঁচকা টান দিল। এ কী! বরফের মতো ঠান্ডা তার হাত। কিন্তু তার শরীরের পোশাকটা তো ভদ্রলোকদের মতোই মনে হচ্ছে। আর একটি জিনিস তাকে অবাক করে দিল। লোকটির ডান হাতের তর্জনী যেন লাইনের পাশের ঝোপের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। সে অনেক চেষ্টা করে লোকেটির দুটি পা টেনে তাকে লাইনের বাইরে নিয়ে এল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার! তার তার ডান হাতের তর্জনী সেই ঝোপের দিকেই রয়েছে। সে তখন কৌতুহল বশত সেই ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল। পায়ে করে ঝোপগুলি সরাতেই তার চোখে পড়ল একটি কালো ব্যাগ। সে আরও কৌতুহল হয়ে পড়ল ব্যাগটি তাড়াতাড়ি খোলার জন্য। ব্যাগটি খুলে সে দেখল পাঁচ লক্ষ টাকা। অর্ক তখন ভাবতে লাগলো এত টাকা নিয়ে লোকটি কোথায় যাচ্ছিল? তার পরিচয়টাই বা কী? এইভাবেই সে ব্যাগটি আরও ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখল কয়েকটি বিবাহের কার্ড রয়েছে। তাতে পাত্র-পাত্রীর পিতা ও মাতার নাম লেখা। তবে কী লোকটির ছেলের বা মেয়ের বিবাহ? সে কৌতূহল হয়ে কার্ডটি পড়ল এবং ঠিক করল সব জেনে লোকটিকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। এই ভেবেই অর্ক যেই পিছনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে লোকটিকে দেখার জন্য যেখানে তাকে সে রেখেছিল। কিন্তু কোথায় কী? কেউ তো নেই! তন্ন তন্ন করে অর্ক খুঁজল চারপাশ। কিন্তু জড়াজীর্ণ লোকটিকে কোথাও দেখা গেল না। এখন সে কী করবে সেটাই ভাবতে লাগলো হতভম্ব হয়ে। ভাবতে ভাবতে কার্ডে লেখা ঠিকানাতেই সে যাবে মনস্থির করল। প্রথমে সে পাত্রীর পিতার ঠিকানাতেই যাবে বলে ঠিক করল। কারণ, তার মনে হচ্ছিল সেখানেই তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সে পাবে। রাত্রি অনেক হয়ে গিয়েছিল, সমস্ত ট্রেন চলে গিয়েছিল। তাই অর্ক ঠিক করে রাতটা এই করিমপুর প্লাটফর্মেই কাটিয়ে পরের দিন খুব ভোরের ট্রেনে সে রওনা দেবে সেই ঠিকানার উদ্দেশ্য। সেইমত পরের দিন রাত পোহাতেই ভোর হতেই অর্ক তার গন্তব্যের উদ্দেশ্য রওনা দিল। খোঁজ করতে করতে সে যখন সেই বাড়ির দিকে এগোচ্ছিল, তখন কিছু লোক তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দেখছিল। কারণ, অর্ক সেই এলাকাতে আগে কখনও যায়নি। বাড়ির সামনে আসতেই এক ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেসা করলেন-“আপনি কি বরপক্ষের কেউ?” অর্ক উত্তর দিতে উদ্যত হলে সেই ভদ্রলোকটি অর্ককে থামিয়ে দিয়ে বলল-“দেখুন, এখানে একটু অসুবিধা হয়ে গেছে। গত পরশুদিন থেকে ভুপেনবাবু নিখোঁজ, তিনি পরশুদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলেন কিছু নিমন্ত্রণপত্র বিলি করতে আর বরপনের টাকা যোগাড় করতে। কিন্তু দুটি রাত পেরিয়ে গেল, আজও তিনি ফেরেননি। সেক্ষেত্রে বিয়েটা যে কী করে হবে, তা বুঝতে পারছি না।” এই কথা শুনেই অর্ক সেই কালো ব্যাগটা তার দিকে এগিয়ে দিল এবং বলল, -” দেখুন তো, এই ব্যাগটি ভুপেনবাবুর ব্যাগ কিনা? টাকা-পয়সা যা ছিল, তা-ই-আছে। ব্যাগটি হাতে পেয়ে ভুপেনবাবুর বাড়ির সদস্যদের উজ্জ্বল মুখগুলো দেখে অর্ক তার পূর্বদিনের ঘটনার কথা আর বলতে পারল না। সে শুধু বলল, ভুপেনবাবু আমাকে পাঠিয়েছেন এটি দিয়ে। আর, বলেছেন যে বিয়েটা যেন সুষ্ঠুভাবে হয়। উনি একটু বিশেষ কাজে আটকে পড়েছেন, তাই নিজে আসতে পারেননি। তিনি খুব শীঘ্রই বাড়িতে ফিরবেন।”   আরও গল্প পড়তে ক্লিক করুন

অভাগিনীর অসমাপ্ত জীবন
গল্প, নারী বিষয়ক সাহিত্য

অভাগিনীর অসমাপ্ত জীবন – প্রান্ত দত্ত

অভাগিনীর অসমাপ্ত জীবন প্রান্ত দত্ত অপরূপ সৌন্দর্য্যে ঘেরা বৈচিত্র্যময় এই গ্রাম। সে গ্রামে জন্মগ্রহণ করে ফুটফুটে সুন্দর এক মেয়ে। নম্র-শান্তশিষ্ট ছিলো মেয়েটির স্বভাব। মেয়েটি ছিলো বড়ই দুখিনী। নাম ছিলো তার প্রীতিলতা। ডাক নাম ছিলো তার প্রীতি। তার বাবার পরিবারে অর্থ-বিত্ত জায়গা জমি যথেষ্ট পরিমাণ ছিল। কিন্তু সুখের পরিমানটা যথেষ্ট পরিমাণ ছিল না। তার জন্মলগ্ন থেকে জীবনের সাথে লড়াই এবং সংগ্রাম শুরু হয়। তার জন্মগ্রহণ করার পর তিন মাস পর্যন্ত অজ্ঞান থাকে। এই তিন মাস শুধু তার মুখ থেকে সাদা ফেনা বের হতো। যাইহোক, সে বিপদ কাটিয়ে উঠার পর তার জীবনের আরেকটি ধাপের যাত্রা শুরু হয়। ছোটবেলায় থেকে প্রীতি বাবা-মায়ের অনেক ভক্ত ছিলো। বাবা মায়ের পাশে সর্বোক্ষণ থাকতো প্রীতি। সে বাবা-মায়ের সকল কাজে সহযোগিতা করার চেষ্টা করতো। প্রীতি ছোটবেলা থেকে ছিলো ভোজনরসিক একজন মানুষ। খেতে খুব পছন্দ করতো। তার কোনদিনও ভালো ভালো খাবারের কোন আবদার ছিলো না। শুধু কোন কিছু সামান্য তরকারী দিয়ে বেশি করে ভাত খেয়ে নিতো। এতে তার খাওয়ার তৃপ্তি মিটতো। কিন্তু তার এই স্বভাবটা পরিবারের অনেক জনের কাছে ভালো লাগতো না। সে আবার স্পষ্টবাদী লোক ছিলো। অন্যায় দেখলে সামনাসামনি প্রতিবাদ করতো। এগুলো দেখে অনেকে অপছন্দ এবং ঘৃণা করতো তাকে। সেগুলোকে নিয়ে সে মনে কিছু ভাবতো না। কারণ সে যে কাজগুলো করতো যা এগুলো পুরুষদের কাজের সমান। তার ভাইবোনরা এসব কাজ করতো না। সে ভাবতো আমিও যদি কাজ না করি তাহলে বাবা একা কিভাবে সবগুলো কাজ সামলাবে। কারণ তার বাবা ছিল একজন পঙ্গু মানুষ। সেজন্য বাবার সকল কাজে সহযোগিতা করার চেষ্টা করতো। এভাবে সে দিনরাত বাবা মায়ের সাথে সব কাজে চালিয়ে যায়। শৈশব জীবনটা অনেকেরই কাটে খেলাধুলায়। কিন্তু তার জীবনটা তেমন ছিল না। খেলাধুলায় সময় কাটতো বাবা মায়ের সেবায়। এভাবে দিন যায় রাত হয়। বছরের পর বছর শেষ হতে লাগলো। শৈশব জীবন পার করে ধীরে ধীরে সে বিবাহযোগ্য হয়ে উঠেছে। এদিকে তার বড় বোনকে বিয়ে দেওয়া হয়। এবার মা-বাবা তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য যোগ্য পাত্রের খোঁজ করে কিন্তু তার জন্য যোগ্য পাত্র জোগাড় করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এদিকে গ্রামের মানুষ নানা ধরনের কথা বলে তার বিবাহ ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। নানান ফন্দি আঁটতে থাকে তারা। বিবাহ সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্ভব হয় না। মা-বাবা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে। অবশেষে খুঁজতে খুঁজতে মা-বাবার মনের মতো একজন উপযুক্ত পাত্রকে খুঁজে পায়। তার বিয়ে হলো। নানান ঘটনার মধ্যে দিয়ে তার বিবাহ সম্পন্ন হয়। যাইহোক, সে মনে মনে ভেবেছিলো স্বামীর বাড়িতে এসে কপালে সুখটুকু জুটবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সেখানেও সুখ তার কপালে জুটলো না। বিয়ে হওয়ার সেদিন থেকে শুরু হয় তার জীবনের আরও একটি কঠিন যুদ্ধ। স্বামীর বাড়িতো নয় ছিলো যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। তার স্বামীর ছিলো চার ভাই, তিন বোন। তার স্বামী ছিলো সেজো। তার দুই জ্যা ছিলো।  দুইজনই ছিলো খুবই দুষ্টু প্রকৃতির লোক। স্বামীর বাড়িতে তাকে নিম্ন বর্ণের জাত বলে অ্যাখ্যায়িত করে তার জা, ভাসুররা বিভিন্ন ভাবে অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে। অকথ্য ভাষায় তার সাথে কথা বলতো তারা। তাদের সাথে যৌথ অবস্থায় থাকাকালীন তারা ভালোভাবে খেতে দিতো না। শুধু ছোট জাতের মেয়ে বলে তাকে কটুক্তি করতো। সংসার ভিন্ন হয়েও সুখ হয়ে নি তাদের। জা, ভাসুর এবং বাড়ির অনেকে দুষ্টপ্রকৃতিদের পক্ষ নিয়ে এক পর্যায়ে তাকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে তারা নির্যাতন শুরু করে। স্বামী না থাকার সুযোগ নিয়ে তাকে তারা মারধর শুরু করতো। বিভিন্নভাবে তাকে নির্যাতন করতো। সে একা তাদের সাথে পেরে উঠতো না। তারা চেয়েছিল তাকে বাড়ি থেকে একেবারে উচ্ছেদ করে দিতে। যেন তার স্বামীর জায়গা সম্পত্তিগুলো একাই ভোগ করে পেতে পারে। তার পাশে সহযোগিতা করার মতো কেউই ছিল না। তার স্বামীটিও তেমন প্রতিবাদী ছিলো না। এরই মধ্যে তার কোল আলো করে জন্মনিলো পুত্র সন্তান। যা দেখে তার জা, ভাসুররা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তার সন্তানকে তারা মেরে ফেলতে চেয়েছিলো। তার বড় জার কন্যা তার পেটে সন্তান থাকাকালীন পেটের মধ্যে লাথি মেরে তাকে এবং তার সন্তানকে পৃথিবীতে থেকে বিদায় করে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু কপাল ভালো থাকায় সে যাত্রায় বেঁচে গেল। সন্তানকে নিয়েও বিভিন্ন ঘটনার সম্মুখীন হয় প্রীতি। সে ভাবলো আমি না হয় এখানে যুদ্ধ করে থাকলাম, কিন্তু এখানে থাকলেতো আমার স্বামী ও সন্তানকে হারাতে হবে। এর দেড় বছর পর, নিরূপায় হয়ে সে একদিন তার স্বামী সন্তানদের নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু যাবে কোথায়? বাড়ি থেকে বের হয়ে এদিকে ওদিকে পাগলের মতো স্বামী সন্তানদের নিয়ে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে থাকে। আজ এই জায়গায়তো কাল অন্য জায়গায়। সেখানে সুখ নেই! মানুষের নানা রকম গালমন্দ কথা সবসময় শুনতে হয় তাকে। এদিকে এই জীবন সংগ্রামের মাঝে দ্বিতীয় সন্তানের জননী হয় সে। শুরু হয় তাদের জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়। এভাবে আজও তার দিন কাটছে। তার জীবনকথার গল্প আজও অসমাপ্ত রয়ে গেল। আজও প্রীতি তার স্বামী সন্তানদের নিয়ে দেশে দেশে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু একটু সুখের ঠিকানায়। আরও বাংলা গল্প পড়ুন এখানে

Scroll to Top