ফাইলের নিচে চাপা শব্দ

মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

কালের আলো যখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পুরোনো ভবনের দেয়ালে এসে পড়ে, তখন সেটি আর আলো থাকে না—হয়ে যায় এক ধরনের নিস্তেজ রং। দেয়ালের রং যেমন মলিন, ভেতরের বাতাসও তেমনি ভারী।

এখানে বাতাসে কাগজের গন্ধ নেই, শুধু আছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অনুচ্চারিত অভিশাপ আর ফিসফিসে হিসাব।

আব্দুল করিম দাঁড়িয়ে ছিলেন লম্বা লাইনে। হাতে একটি বাদামি ফাইল—বহুবার খোলা-বন্ধের দাগে যার কোণাগুলো নরম হয়ে গেছে।

এই ফাইলের ভেতরে জমির কাগজ, বাবার মৃত্যুসনদ আর করিমের নিজের অসহায়তা—সব একসঙ্গে চাপা পড়ে আছে।

তিনি জানেন, এই ফাইলের ওজন কাগজে নয়, টাকায় মাপা হয়।

টেবিলের ওপাশে বসে আছেন মনির হোসেন। টেবিলের ওপর ফাইলের পাহাড়, নিচে অদৃশ্য এক নদী—যার স্রোত কেবল টাকায় বয়ে চলে।

মনির কাগজে চোখ রাখেন, মানুষে নয়। কারণ মানুষে চোখ রাখলে বিবেক জেগে উঠতে পারে—আর এখানে বিবেক বড় ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু।

— “আসেন, পরে আসেন।”

মনিরের কণ্ঠে কোনো নিষ্ঠুরতা নেই, আছে নিয়মিত চর্চার স্বাচ্ছন্দ্য। যেন তিনি কোনো মানুষকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন না,

বরং একটি আবহাওয়া জানাচ্ছেন।

করিম কিছু বলেন না। কিছু বলার ভাষা এখানে নেই। বাইরে এসে তিনি বসেন লোহার বেঞ্চে।

বেঞ্চটি ঠান্ডা নয়, অথচ শীতল লাগে। পাশের লোকটি কানে কানে বলে—
— “পাঁচ হাজার দিলেই আজ শেষ।”

এই বাক্যটি করিমের কানে ঢোকে না, ঢুকে পড়ে বুকের ভেতর। সেখানে আগে থেকেই জমে থাকা হিসাবগুলো নড়েচড়ে বসে।

মেয়ের স্কুল ফি, স্ত্রীর ওষুধ, ঘরের চাল—সব হিসাবের ওপর নতুন এক কর বসে যায়।

মনির হোসেন একসময় এই বেঞ্চেই বসেছিলেন। বহু বছর আগে। তখন তাঁর চোখেও এমন দ্বিধা ছিল।

চাকরিতে ঢোকার প্রথম বছর তিনি ঘুষ নেননি। রাতে ঘুম হতো শান্ত। আয় কম ছিল, কিন্তু স্বপ্ন ছিল বড়।

তারপর ধীরে ধীরে অফিসের ভেতরকার অদৃশ্য পাঠশালায় তিনি নতুন অঙ্ক শিখলেন।
দুই শতাংশ, পাঁচ শতাংশ।
“কাজ ঠিক আছে” বলার দাম।
“কিছু দেখা হয়নি” বলার মূল্য।

ঘুষ তখন আর পাপ থাকল না—হয়ে উঠল নিয়ম। নিয়ম মানা আর অপরাধ নয়। এটাই তাঁকে শেখানো হলো।

মনির যখন প্রথম টাকা নিলেন, হাতে কাঁপুনি এসেছিল। কিন্তু আশ্চর্য—কাঁপুনি বেশি দিন টিকল না। অভ্যাস বড় নিষ্ঠুর শিক্ষক।

একদিন বড় প্রকল্প এলো—একটি স্কুল ভবন। শিশুরা যেখানে পড়বে, স্বপ্ন দেখবে। নকশায় সব ঠিক।

কাগজে সব নিখুঁত। বাস্তবে ইটের ভেতর ফাঁক। রডে জং। তবু ফাইল বলল—“সম্পন্ন।”

দু’বছর পর বর্ষার রাতে ভবনের এক কোণ ভেঙে পড়ল। দেয়ালের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ল কিছু অদৃশ্য বিশ্বাস।

তদন্ত হলো, রিপোর্ট হলো। দায় কারও ঘাড়ে পড়ল না। দায় বরাবরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল।

সেদিন মনির বাড়ি ফিরে ছেলের প্রশ্নের মুখে পড়লেন—
— “আব্বু, স্কুলটা ভেঙে গেল কেন?”

মনির উত্তর খুঁজে পেলেন না। কারণ উত্তরটা ছিল তাঁর নিজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।

অন্যদিকে করিম শেষমেশ টাকা দিলেন। ফাইল নড়ল। সই হলো। কাজ হয়ে গেল। সবাই বলল—“ভাগ্য ভালো।”

কিন্তু রাতে করিমের ঘুম এল না। মনে হলো, তিনি শুধু পাঁচ হাজার টাকা দেননি—নিজের নীরব প্রতিবাদটুকুও তুলে দিয়েছেন।

 

আরও গল্প পড়ুন

শেয়ার করুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও লেখা:

Scroll to Top