অহংকার বেচে নিলামে
আনোয়ার আল ফারুক
এক.
ভবনের নাম “অহংকার”। প্রথম নজরে অনেকে আবার অলংকারও পড়ে বসে। জেলা শহরে এই রকম আলিশান বাড়ি দু-চারটার বেশি নেই।
ফেনী শহরের পশ্চিম উকিলপাড়ার দাউদপুরে এই বাড়ি। নব্বই দশকের শুরুর দিকে এই অঞ্চলে আধাপাকা,
সেমিপাকা কিছু বাড়িঘর থাকলেও এত বিশাল অট্টালিকা আর দ্বিতীয়টি ছিল না।
তাই প্রথম দেখায় এই ভবনটি সবার নজর কাড়ে। প্রধান সড়কের পাশঘেঁষা এই ভবনটি পথিকেরা একবার হলেও ঠায় দাঁড়িয়ে অপলক চোখে দেখে।
বাড়ির সামনে রয়েছে বিশাল আঙিনা। দক্ষিণ পাশে একটি পুকুর, তারপর বিশাল বাগানবাড়ি।
পুকুরের ঘাটে বসার জায়গাটা শ্বেত মার্বেল পাথরের নির্মিত। তাই এই বাড়ির রূপ-সৌন্দর্য যে কারো দৃষ্টি কাড়বে।
বাড়ির মালিক আফজাল সাহেব তৎকালীন সড়ক ও জনপদ বিভাগের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। তাঁর রুজি-রুটি নিয়েও এলাকায় রয়েছে নানান কৌতুক।
দশতলা বিশিষ্ট এই বাড়ির ২য় তলায় থাকেন আফজাল সাহেব ও তাঁর পরিবার। বাদবাকি ফ্লোরগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
আফজাল সাহেবের এক ছেলে ও এক মেয়ে। তারা লেখাপড়ায় মাধ্যমিক ধাপ গড়ায়নি।
এই নিয়েও আফজাল সাহেব প্রায় বড়াই করে বলেন, “আমার ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া না করলে কী হয়েছে?
আমার যে সম্পদ আছে, তা তারা দশ জনম খেয়ে-পরে যেতে পারবে।”
ইদানীং আফজাল সাহেবের বাড়ির প্রায় ফ্লোর খালি থাকছে। ভাড়াটিয়ারা এখানে খুব বেশিদিন টিকে না।
দুই-তিন মাস থাকার পর অনেকেই বাসা ছেড়ে দেয়। এই বাড়ির নিয়মনীতি অবশ্যই বেশ জটিল।
প্রথমে ভাড়াটিয়ারা আসলে এসব জটিল নিয়মকানুন গোপন রাখা হয়।
বাসায় ওঠার পর একগাদা লিখিত নিয়মকানুন পড়ে তাদের অবহিত করে আসেন মিসেস আফজাল সায়েরা খানম।
এখানে ভাড়াটিয়াদের বাসার ছাদ, উঠোনে, পুকুরঘাটে আসা-যাওয়া, বসা কিংবা পুকুরে গোসল করা শতভাগ নিষিদ্ধের আওতায়।
অনেকে বাড়ির রূপ-সৌন্দর্যপূর্ণ পরিবেশ দেখে আকৃষ্ট হয়ে আসলেও পরে কিন্তু এসব কালাকানুন শুনে রীতিমতো থ বনে যান।
আবার এক ভাড়াটিয়া অন্য ভাড়াটিয়ার বাসায়ও যেতে না পারা এখানের আরেকটি অলিখিত সাংবিধানিক মজবুত ধারা।
মিসেস সায়েরা খানম এসব নিয়মকানুন সাংঘাতিকভাবে তদারকি করেন।
সামান্য শব্দ কিংবা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ভাড়াটিয়াকে শাসিয়ে নেন দুস্তুরভাবে।
আর এই ভবন নিয়ে শুনিয়ে দেন রুটিনমাফিক অহংকারের বেশ কিছু কমন পদাবলি।
বৈশ্বিক করোনা মহামারি চলাকালীন নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে সামান্য হেরফের হওয়ায় বেশ কয়েকজন ভাড়াটিয়ার মালসামানা বাসায় রেখে তাদের বের করে বাসায় তালা ঝুলিয়ে দেন মিসেস সায়েরা খানম।
এই ভাড়াটিয়াদের অনেকে আত্মসম্মানের দিকে তাকিয়ে কোনো রূপ উচ্চবাচ্য না করে মালসামানা রেখে বাসা ত্যাগ করে চলে যান।
পরে এই মালসামানা মিসেস সায়েরা বেগম নিলামে বিক্রিও করেন।
স্থানীয় একটা বেসরকারি স্কুলের একজন শিক্ষককে যথাসময়ের তিন দিন বেশি সময় ভাড়া দিতে অপারগতার কারণে আফজালুর রহমান
ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেন। ওই মাস্টার সাহেব রাগে-ক্ষোভে ওই এলাকা ত্যাগ করেন।
শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে সারাজনমের জন্য নিজ গ্রামে চলে যান। যাওয়ার সময় মিসেস সায়েরা খানম বলেন, “আপনার বাসার মালসামানা নিলামে বেচে বকেয়া বাসা ভাড়া উশুল করে নেব।”
ওই মাস্টার সাহেব অনেকক্ষণ চুপ থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছলোছলো চোখে বলেন,
“আজ হয়তো অহংকার ও ক্ষমতার দাপটে আমার মালসামানা নিলামে বেচে দেবেন, আর আল্লাহ চাইলে এর ব্যতিক্রমও হতে পারে।
আপনার বাড়িটাও একসময় হয়তো নিলামে বেচা হয়ে যেতে পারে।”
কোনো রূপ প্রতিত্তরের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই দু বছরের শিশুবাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
এই দৃশ্য অন্য ভাড়াটিয়াদের হৃদয়ে ভীষণ দাগ কাটে এবং অনেকে নীরবে চোখের পানি ছাড়লেও এই অহংকারী,
দাপুটে বাড়ির মালিকের সামনে টুঁ শব্দ করার সৎ সাহস করেননি।
দুই
আফজাল সাহেবের একমাত্র ছেলে রিফাত বাবার সঞ্চিত ব্যাংক ব্যালেন্স ও বাড়ি মর্টগেজ দিয়ে ব্যাংক থেকে বিশ লক্ষ টাকা নিয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন।
শহরের জিরো পয়েন্টে এই নামিদামি রেস্টুরেন্ট প্রথমে বেশ জমে উঠলেও ব্যবসা না জানা, না বোঝার কারণে প্রথম বছরেই ব্যবসায় বিশাল লোকসানি গুনতে হয়। এখানে শুধু ব্যবসা না বোঝার দোষ না।
রিফাত বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে সময়-অসময়ে আড্ডা ও জুয়ায় আসক্তিতে মজে ওঠে। এতে করে ব্যবসা ধ্বংস হয় এবং ঋণের বোঝা ফুলে-ফেঁপে বড় থেকে বড় হতেই লাগল।
এই বোঝা হালকা করতে গিয়ে আফজাল সাহেব বাড়ির পৈত্তিক সম্পত্তি ঘরভিটাও বেচে দেন। বর্তমানে শহরের এই বাড়ি ছাড়া তাদের আর একতিল জমিও নেই।
এদিকে বছরের অধিকাংশ সময় বাড়ির প্রায় ইউনিট ভাড়াহীন থাকায় তাদের দিনকাল খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।
দুর্বিষহ জীবনযাপন করলেও বাইরের হাঁকডাক ঠিকই বজায় রাখছেন আফজাল সাহেব। সকালবেলায় কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় হাঁটছেন আফজাল সাহেব।
টার্গেট পূর্ব পাড়ার নবি ব্যাপারির চা-দোকান। ওখানে বেলা পর্যন্ত চা পান করে আড্ডায় কাটিয়ে দেন আফজাল সাহেব।
ক্রিং ক্রিং ক্রিং—বেজে উঠল আফজাল সাহেবের ফোন। রিসিভ করে ওপারের কথা শুনে যেন আফজাল সাহেবের পায়ের তলার মাটি সরে যায়।
থানায় থেকে ওসি সাহেব ফোন করছেন। তাঁর ছেলে রিফাতসহ দশজনের এক ডাকাত গ্রুপ হাইওয়ে গাড়ি ডাকাতিকালে র্যাবের হাতে ধরা পড়ে।
র্যাব জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দি গ্রহণের পর থানায় হস্তান্তর করলে তার নামে নিয়মিত ডাকাতি মামলা রুজু হয়।
আফজাল সাহেব রিকশায় চড়ে থানায় ছুটে যান। আইনের নিয়মে থানা রিফাতদের কোর্টে তুললে কোর্ট জামিন না মঞ্জুর করে জেলে পাঠিয়ে দেন।
এদিকে গোটা এলাকায় এই সংবাদ অল্প সময়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়, জাতীয় পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরিচিতজনরা আফজাল সাহেবকে বিষয়টি জানতে ফোন করেন।
আফজাল সাহেব লোকলজ্জায় নিজের ফোনের সিম বদলে ফেলেন। এই তো গত পনেরো- বিশ দিন আফজাল সাহেব ঘর থেকে খুব একটা বের হন না।
জরুরি প্রয়োজনে হাটে কিংবা ছেলের জামিনে কোর্টে যেতে হলে কাজ সেরেই ফের নিভৃতে বাসায় ফেরেন।
আফজাল সাহেব এই মানসিক চাপ একদমই নিতে পারছেন না। একদিকে ছেলের এই অবস্থা, অন্যদিকে দায়দেনার প্রচণ্ড চাপ।
প্রতিদিন কেউ না কেউ আসছে পাওনা টাকার জন্য। কেউ কেউ টাকা আদায়ে মামলারও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
কী করবেন, কোথায় যাবেন—ভেবে দিশা পাচ্ছেন না আফজাল সাহেব।
এদিকে কয়েক ডজন নোটিশের পর এক্সিম ব্যাংক, ফেনী শাখা ত্রিশ জুনের মধ্যে ব্যাংক লোনের সমুদয় টাকা পরিশোধের চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে।
অন্যথায় ব্যাংক এই বাড়িটি নিলামে বিক্রি করে দেবে। এসব ভাবতে ভাবতে আফজাল সাহেব বারান্দায় পায়চারি করছেন।
এমন সময় ফোন বেজে উঠলে ফোন রিসিভ করতেই ওপার থেকে তাঁদের আইনজীবী জানান,
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে তাঁর চেম্বারে দেখা করতে।
আফজাল সাহেব কোনো রকম প্রস্তুতি নিয়ে ছুটছেন জেলা জজকোর্টের দিকে।
আফজাল সাহেব এখন বাসা আর কোর্টের বারান্দায় দিন কাটান।
কোনো রকম তদবির করে হলেও ছেলের জামিনের জন্য ধারে-ধারে ঘুরছেন।
পায়ের তলার জুতো ক্ষয় হচ্ছে, কিন্তু ছেলের জামিনের কোনো কুলকিনারা হচ্ছে না।
চোখের পলকে যেন কেটে গেল দশটা বছর। এই দশ বছরে আফজাল সাহেবের ঋণের বোঝাও ঠিক আকাশ ছুঁইছুঁই।
কী করার আছে তাঁর? তবুও তিনি ঘুরছেন একমাত্র ছেলের জামিনের জন্য। দীর্ঘসূত্রিতার পর আজ মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার কথা। আফজাল সাহেবের মন ধুকপুক করছে।
মহামান্য জজ এজলাসে উঠেই নির্ধারিত এই মামলায় রায় পড়ে শোনান। রায়ে তাঁদের সবার বারো বছরের সাজা ঘোষণা করেন মহামান্য আদালত।
অবশ্যই যে সাজা ইতিমধ্যে খাটছে, তা মূল সাজা হিসেবে কাউন্ট করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আর বছরখানেক সাজা খাটলে বের হতে পারবে রিফাত।
আফজাল সাহেব কোর্ট চত্বর, উকিলের চেম্বারে আর দৌড়াতে রাজি নয়। অনেকে উচ্চ আদালতে আপিলের পরামর্শ দিলেও তিনি সেটা আর কানে তুলছেন না।
আজ যেন তিনি অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর বনে গেছেন।
তিন
আকরাম আলী মাস্টারের শরীরটা কয়েক দিন খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।
বাবার শারীরিক এই অবস্থা শুনে মাস্টার সাহেবের ছেলে শরিফুল ইসলাম সুদূর সাইপ্রাস থেকে ছুটে এসেছেন।
শরিফুল ইসলাম বাবার ডান পাশে বসে আলতো করে বাবার হাত-পা টিপে দিচ্ছেন।
আকরাম আলী মাস্টার ছেলেকে কাছে টেনে বলছেন, “বাবা, ঘরের চালার অধিকাংশ টিন ফুটো হয়ে গেছে। গত বর্ষায় খুব পানি পড়ছে।
সম্ভব হলে এই সফরে ঘরের টিনের চালটা ঠিক করে দে।”
— বাবা, এই নিয়ে তুমি একদম ভেবো না। এসব নিয়ে টেনশন করলে তোমার সুগার বেড়ে যাবে। যা করার আমি করব।
আমি আর দেশের বাইরে যাচ্ছি না। আমি একবারে চলে আসছি।
— কেন বাবা, হুটহাট এমন সিদ্ধান্ত নিলে?
>>>>>>>>— হুটহাট না বাবা। খুব ভেবে-চিন্তে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গত সফরে গিয়ে মাকে হারিয়েছি,
তাই বাবাকে কাছে রেখেই থাকতে চাই। আর এক জীবনের জন্য আর কত টাকাইবা লাগে?
— তাহলে এবার আমার কথাটা রাখবি, বল—বলে আকরাম আলী মাস্টার ছেলে শরিফুলের হাত চেপে মুঠোয় ধরে রাখেন।
— অবশ্যই বাবা। আমি কি কখনো তোমার কথার বাইরে গেছি? বল বাবা, কী বলতে চাইছ?
— আমার শরীরটাও খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। তোর মাও চাইছিল ছেলের বউ দেখে যেতে,
কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি—বলতেই আকরাম আলী মাস্টারের চোখের কোণে জমে গেল বিন্দু বিন্দু জল।
আকরাম সাহেব আর কিছুই বলতে পারেননি। শরিফুল ইসলাম কিছুটা স্বলজ্জায় বলল, “বাবা, তোমরা যা ভালো মনে করো তাই করো।
আমার ব্যক্তিগত কোনো মতামতের প্রয়োজন নেই। তোমার মতই আমার মত।” বলে শরিফুল ইসলাম বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
মোবারক চাচা দু’ কাপ চা আর আজকের খবরের কাগজটা নিয়ে হাজির। মোবারক চাচা গত বিশ বছর যাবৎ এই বাড়িতে থাকছেন।
তাঁর আবার স্ত্রী, ছেলে-সন্তান কেউই নেই। এই বাড়ির টুকটাক কাজকর্ম করেন। এখন আকরাম আলী মাস্টার সাহেবের হাতের লাঠিও বলা যায়।
মোবারক চাচার কাছ থেকে শরিফুল ইসলাম খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে পড়তে গিয়ে এক বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে গেল।
বিজ্ঞাপনটি হলো—শহরের আলিশান ভবন নিলামে বিক্রি। শরিফুল ইসলাম বাবার কাছাকাছি গিয়ে আবার বসল।
খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল, “বাবা, তুমি আমার কাছে যা চাইছ তার সম্মতি আমি দিয়েছি। এবার আমি একটা জিনিস চাইব, তার সম্মতিও তোমাকে দিতে হবে।”
— কী সেটা? খুলে বল—বললেন আকরাম আলী মাস্টার সাহেব।
— বাবা, দেখো, শহরের এই বাড়িটি নিলামে বিক্রি হবে। আমি এই বাড়িটি কিনতে চাই।
— ঠিক আছে বাবা, কিন্তু তোমাকে তো আরও শক্ত হতে হবে। যা ইনকাম করছ, তা দিয়ে আগে ভালো একটা ব্যবসা-বাণিজ্য করো, তারপর না হয় বাড়ি কিনো।
এই বাড়ি না হলে হয়তো এর চেয়েও আরও ভালো লোকেশনে ভালো বাড়ি কিনতে পারবে।
— বাবা, আমি ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা ভাবছি। সেটা হবে। তবে কেন জানি এই বাড়িটার প্রতি আমার একটা আগ্রহ জাগছে।
— আচ্ছা, যা ভালো হয় তাই করো বাবা।
— তাহলে বাবা, চলো আজ আমরা নিলামে অংশগ্রহণ করব।
— না রে বাবা, আমার শারীরিক অবস্থা তেমনটা নেই। তুমি যাও, আমি প্রাণভরে দোয়া করব।
— বাবা, আল্লাহর অফুরন্ত রহমত আর তোমাদের দোয়ায় আমি এতটুকু পর্যন্ত এগিয়েছি। আমি তোমাকে আজ নিয়ে যাব। তুমি একটুও কষ্ট অনুভব করবে না।
শরিফুল ইসলাম তার এক বন্ধুকে ফোন করে গাড়ি নিয়ে আসতে বলে আকরাম সাহেবকে নতুন একটি পাঞ্জাবি পরিয়ে প্রস্তুত করে নিলেন।
ততক্ষণে উঠোনে গাড়ি এসে হাজির। বাতাসে শোঁ শোঁ শব্দ তুলে গাড়ি এগিয়ে চলছে ফেনী শহরের দিকে।
এভাবে রাস্তা ফাঁকা থাকলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তারা ফেনী পৌঁছে যাবে। গাড়িতে বসে আকরাম সাহেব আনমনে ভাবছেন—এখন থেকে ত্রিশ বছর আগে যথাসময়ে ভাড়া দিতে না পারায় শহরের একটি বাড়ি থেকে মালসামানা রেখে তাঁকে রিক্তহস্তে বের করে দেওয়া হয়েছিল। আজ তাঁর সন্তান সেই শহরেই একটি বাড়ি কিনতে যাচ্ছে।
উনাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার কাহিনি আশরাফুল ইসলাম বাবার ডায়েরিতে পড়ার পর থেকেই সংকল্প করে বাবার হায়াতে এই শহরেই বাবাকে একটি বাড়ি কিনে দেবেন। আশরাফুল ইসলাম বাবার দিকে মুখ করে বললেন, “বাবা, আজকে আপনার অনুভূতি কী?”
আকরাম আলী মাস্টার তাঁর দিকে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, “সন্তানের সফলতায় সব বাবারাই খুশি হয়ে থাকে। আমার বেলাতেও এর ব্যতিক্রম নয়।”
আশরাফুল ইসলাম খেয়াল করল, এর মধ্যেও বাবার চেহারাতে খানিকটা বিষণ্নতা ভেসে আসছে।
আশরাফুল আবার কথা টেনে নিয়ে বললেন, “বাবা, অন্য কোনো চিন্তা করছেন?”
“না রে বাবা, আজকে তোমার এই সফলতা দেখে সবচেয়ে খুশি হতো তোমার মা।
আজ সে নেই…” বলতে আকরাম আলী মাস্টারের চোখ দুটো আবার ঝাপসা হয়ে ওঠে।
আশরাফুল ইসলাম বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে বাবার চোখ মুছে বললেন, “বাবা, বারবার আমার সফলতা বলছেন কেন?
এটা তো স্পষ্টতই আপনার সফলতা। হুম, ঠিক বলছেন—মা বেঁচে থাকলে অনেক অনেক খুশি হতেন।
আজ তিনি ওপার থেকে দেখবেন আপনার হৃদয়ের গহীনে লুকায়িত কষ্টটা খানিকটা হলেও কাটছে।”
“সেটা কী? না বাবা, কী বলতে কী বলে ফেলছি। এই তো আমরা এস.এস.কে. রোডে এসে গেছি। এই তো একশ গজ সামনে ডান পার্শ্বেই এক্সিম ব্যাংকের প্রধান শাখা।”
চার
পূর্বনির্ধারিত সময়ে নিলাম কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আশরাফুল ইসলাম অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকে বাড়ি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিয়েছেন।
নিলামে দাম যাই উঠুক, আশরাফুল এক টাকা বেশি দিয়ে হলেও সেই নিলাম নিজের পক্ষে নিয়ে নেবেন বলেই আজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
এই যাবৎ বাড়িটির মূল্য উঠেছে এক কোটি টাকা। আশরাফুল ইসলাম এক কোটি এক টাকা দিয়ে বাড়িটি নিলামে কিনে নিলেন।
ব্যাংকের ম্যানেজার শাহ আলমের চেম্বারে দু’ পক্ষের চুক্তি সম্পাদিত হবে বলে সবাই ম্যানেজারের চেম্বারে প্রবেশ করছেন।
আকরাম আলী মাস্টার চেম্বারে প্রবেশ করেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ব্যাংক ম্যানেজার শাহ আলম বাড়ির মালিক আফজালুর রহমান ও মিসেস সায়েরা খানমের দিকে ইশারা করে নিলামগ্রহীতা আকরাম আলী মাস্টারকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “আপনাদের বাড়িটা উনি কিনেছেন।”
আফজালুর রহমান ও মিসেস সায়েরা খানম সমস্বরে বললেন, “স্বাগতম স্যার, বসেন।”
আকরাম আলী মাস্টার বললেন, “আমাকে আজ স্যার বলছেন—সত্যিই আমি আশ্চর্য হচ্ছি।
নিকট অতীতে বাড়ি ভাড়া দিতে মাত্র তিন দিন দেরি হওয়ায় শতাধিক বার ‘ফকিন্নির বাচ্চা’ বলে গালি দিয়ে আমার দুই বছরের অসুস্থ বাচ্চাসহ আমাদেরকে আপনার বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন।
আর বলেছিলেন, আমাদের বাসার আসবাবপত্রগুলো নিলামে বেচে বাসা ভাড়া বুঝে নেবেন।
আর সময়ের ব্যবধানে আপনাদের সেই শখের বাড়ি ‘অহংকার’ নিলামে বেচে দিলেন! আচ্ছা, বাড়ি তো বিক্রি করে দিলেন—আপনারা এখন কোথায় থাকবেন?”
“সরি, আমরা আমাদের সেই দিনের আচরণের জন্য সত্যিই দুঃখিত।
আপনি সেই দিন অভিশাপের মতোই বলছিলেন—আল্লাহ চাইলে এই বাড়িটিও হয়তো নিলামে বেচে দেবেন।
এটা সত্যি হয়ে গেছে। স্যার, আমাদের মাফ করে দিন। আমরা খুব অনুতপ্ত।” বললেন আফজালুর রহমান।
— মাফের বিষয় না। বাড়ির নামটা অহংকার রাখছেন, আর এই নিয়ে মারাত্মক অহংবোধের নোংরা সাগরে ডুবে ছিলেন—যা আদৌ ঠিক হয়নি।
আচ্ছা, আপনারা এখন কোথায় উঠবেন?
— কোথাও ওঠার জায়গা নেই। ব্যাংকের দায়দেনা কেটে রাখার পর যৎসামান্য টাকা থাকবে, তা দিয়ে অন্য ঋণও শোধ হবে না।
তা ছাড়া গ্রামের বাড়িটাও বিক্রি হয়ে গেছে সেই অনেক আগে—বললেন মিসেস সায়েরা খানম।
আকরাম আলী মাস্টার আফজালুর রহমানকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “টেনশন নেবেন না।
আপনারা এখন বাড়ির যে ফ্লোরে আছেন, ঠিক সেই ফ্লোরেই থাকবেন।
আমি ওই ফ্লোরটা আপনাদের নামে হেবা দলিলে লিখে দেব।”
আফজালুর রহমান আর মিসেস সায়েরা খানম থ হয়ে তাঁর দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। আর ভাবলেন—তিনি তো মানুষ নন, যেন এক অতি মানব।
আশরাফুল ইসলাম তাঁর বাবার কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বললেন, “বাবা, তুমি সত্যিই মহান। আর তোমাকে নিয়ে আমরা গর্বিত।”


