বৃষ্টি পড়ে মনে

উম্মুল খায়ের

ঘুম ভেঙেই ক্ষুদে বার্তা পেলাম। বার্তাটি খুব পরিচিত জনের। ফেসবুকে দীর্ঘদিনের পরিচয়। দেখা হয়নি, তবে কথা হয়েছে অনেক।

বার্তাটি পেয়ে মন খারাপ হয়ে গেল। জানালার পর্দা সরিয়ে তাকালাম আকাশের দিকে। মন খারাপ নিয়ে আকাশের দিকে তাকালে মন ভালো হয়ে যায়। ওমা, হঠাৎ আকাশটা কেমন যেন বদলে গেল! ঘোলাটে হয়ে গেল আকাশের চোখ।

মনে হচ্ছে এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে। আকাশের কান্নার চমৎকার একটা নাম আছে—বৃষ্টি। আকাশ কাঁদলে তার নাম হয় বৃষ্টি।

অথচ কিছু সময় আগেই কি ঝকঝকে ছিল! নীলাকাশে সাদা মেঘের ভরা যৌবন চলছিল।

এখন আঁধার কালো মেঘ; আষাঢ়ের আকাশ তো এমনই হয়। মেঘে মেঘে ছেয়ে থাকে আর বৃষ্টি ঝরে।

কখনো হালকা বৃষ্টি, আবার কখনো ভারি বৃষ্টি।

কোথায় যেন পড়েছিলাম, আকাশ বলে কিছু নেই। আকাশ মূলত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। বিভিন্ন ধরনের গ্যাস ও জলীয় বাষ্প দিয়ে বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়।

পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে এটা চারপাশ থেকে পৃথিবীকে ঘিরে আছে। এই বায়ুমণ্ডলকে সূর্যের আলোর কারণে আমরা আকাশ হিসেবে কল্পনা করি।

সূর্যের আলোর নীল রঙ বায়ুমণ্ডলে পড়ার কারণে বায়ুমণ্ডল নীল রঙের হয়, তাই আমরা আকাশকে নীল দেখি।

আমার মতো অতিসাধারণ মানুষের আকাশ হয় নীল, কিন্তু কবিদের আকাশ নিশ্চয়ই বিভিন্ন রঙের হয়।

কবিদের আকাশ তো গোলাপি, খয়েরি, সবুজ, পার্পেল, মেরুন—আরও কত রকমের হতে পারে।

কবি মন বলে কথা! আচ্ছা, কবি মাহবুবুর রহমানের আকাশটা কি রঙের? জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু জানা হবে না।

আজ থেকে দশ বছর আগের কথা। সেদিন ছিল শ্রাবণের মুষলধারা। মাঠ-ঘাট সব জলে টইটুম্বুর!

জানালা দিয়ে শ্রাবণ এসে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমাকে। শ্রাবণের পরশে অন্য রকম অনুভূতিতে মেতে ছিলাম।

ঠিক সেই সময় ম্যাসেঞ্জারে কেউ একজন বারবার কল দিচ্ছিলেন। এই একটা সমস্যা—ম্যাসেঞ্জার বাজতেই থাকে, বাজতেই থাকে।

ভীষণ বিরক্তিকর। মানুষ এত যন্ত্রণা করে কেন? আমি তো অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলি না, তাহলে কেন এত বিরক্ত করে?

বৃষ্টিময় সুন্দর শ্রাবণের আনন্দটা মাটি হয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিয়ে লাইন কেটে দিলাম। মুহূর্তেই আবারও কল ঢুকে গেল।

না! এবার আর সহ্য করা উচিত নয়। কলটা রিসিভ করলাম। অপরপ্রান্ত থেকে খুব সুন্দর একটা পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে এলো—

—ম্যাডাম, কেমন আছেন?

আমি একটু অবাক হলাম। এত সুন্দর করে কেউ কথা বলে! মেয়েরা সুন্দর করে এবং ঢং করে কথা বলে—এটা সবাই জানি।

কিন্তু ছেলেরাও যে এত সুন্দর করে কথা বলে, সেটা জানা ছিল না। সুন্দর বাচনভঙ্গির অসীম ক্ষমতা! আমি চুপ হয়ে গেলাম।

মেজাজ খারাপ ভাবটা চলে গেল। ওপাশ থেকে বলতে থাকলেন—

—আপনাকে আমি প্রতিদিন কল দিই। কিন্তু রিসিভ করেন না। কেন রিসিভ করেন না?

আমি বললাম—আসলে অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা হয় না।
—আপনি এমন কেন, সোহানা?
—কেমন?
—অন্য রকম।
—ওহ।
—সোহানা আপু, একটা কথা বলি?
—জি, বলুন।
—আপনাকে আমার ভালো লাগে। আপনার হাসি ভীষণ সুন্দর।
—ধন্যবাদ।
—আমি আপনার হাসির প্রেমে পড়েছি। অনেক দিন ধরে আপনাকে ফলো করি। ফেসবুকে যে সব ছবি পোস্ট করেন, সেগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখি। আপনি এত সুন্দর!
—Excuse me, আমি একটু বিজি আছি। আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব।
—ওহ, আচ্ছা। আবার কল দিলে রিসিভ করবেন তো?
—দেখা যাক। আল্লাহ হাফেজ।

মাহবুবুর রহমান তারপর থেকে প্রায়ই কল দিতেন। সকাল, দুপুর, বিকাল, রাত—যখন ইচ্ছে হতো তখনই!

এক ভোরে মর্নিং ওয়াকে বের হয়েছি, হঠাৎ ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি এল। অগত্যা আশ্রয় নিলাম অপরিচিত এক অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজে।

দারোয়ান গেট খুলে দিল। গ্যারেজে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতা নিয়ে বৃষ্টির উচ্ছ্বাস দেখছি, ঠিক তখনই এল মাহবুবুর রহমানের কল।

কল রিসিভ করে হাসিমুখে বললাম—

—কি খবর আপনার?

তিনি একটু অপ্রস্তুত হলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, আমি কল রিসিভ করব না। আমতা-আমতা করে বললেন—

—আসলে ভুলে চাপ লেগে কল চলে গিয়েছে। এত ভোরে কল দেওয়া উচিত হয়নি। সরি।

—অসুবিধা নেই, কবি। কেমন আছেন?
—আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপা, কিসের শব্দ? বৃষ্টি হচ্ছে নাকি?
—প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে, শ্রাবণের বৃষ্টি।
—আপা, কবিতা শুনবেন?
—কবিতা! আচ্ছা, শুনান তবে।

মাহবুবুর রহমান অসম্ভব সুন্দর ভরাট কণ্ঠে আবৃত্তি করতে লাগলেন—

বৃষ্টি পড়ে ঘর দুয়ারে
বৃষ্টি পড়ে বনে
বৃষ্টি পড়ে অন্ধকারে
বৃষ্টি পড়ে মনে।

রুক্ষ গেরস্থালি জুড়ে বৃষ্টি ঝমঝম
কলহ-কট খড়ো বাতাস আজকে কিছু দূরে—
বৃষ্টি এলে চুপ করে যায় অভিযোগের ঝড়
মুখের উপর, বুকের উপর—ও বৃষ্টি, তুই পড়।

মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। হঠাৎ থেমে গেলেন তিনি। আমি বললাম—

—থামলেন কেন?

তিনি বললেন—

—আমার মন বলল, আপনি কবিতা পছন্দ করেন না, তাই—

—ভালোই তো লাগছিল। আপনি ভালো আবৃত্তি করেন।
—তাই? আপনি চাইলে আপনাকে প্রতিদিন একটি করে কবিতা শুনাতে পারি।
—এত কষ্ট করতে হবে না। আজ বৃষ্টির দিনে বৃষ্টির কবিতা ভালো লাগল। তাই শুনলাম। তা ছাড়া আপনার উচ্চারণভঙ্গি বেশ ভালো।

একটা জাদুকরী নেশা লেগে যায়।
—তাই?
—হুম।

কবিতা আর কখনো শুনিনি, তবে তাঁর লেখা অনেক কবিতা পড়েছি। হয় বিরহের, নয় তো প্রেমের। অনেক অনেক প্রেমের কবিতা লিখে পাঠাতেন।

পড়ে মনে হতো, আমাকে নিয়ে লেখা। মাঝ বয়সে এসে প্রতিদিন প্রেমের কবিতা পড়তে কোন মহিলার ভালো লাগে জানি না।

তবে আমার মোটেই ভালো লাগত না। মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হতাম। ভাবতাম—পাগল কোথাকার! আমার মধ্যে কি এমন পেল?

তার পাগলামি দেখতে দেখতে কেটে গেল চারটি বছর। একদিন আবারও খুব ভোরে মোবাইল বেজে ওঠে।

আমরা তখন মর্নিং ওয়াকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার হাসব্যান্ড অত্যন্ত বাজেভাবে কড়া দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে।

সেদিন তাঁর চোখের ভাষাটা ভালো লাগেনি। তাই ব্লক লিস্টে ফেলে দিলাম কবিকে। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

এতটা চাপ নিতে ভালো লাগে না। ঠিক করেছি—বেশ করেছি। এই বয়সে এসে এত কিসের ঢং? এত কিসের প্রেম? এত প্রেম কোথা থেকে আসে এদের?

কবির জন্য মন কেমন করে ওঠেনি। বরং এক সময় ভুলে গিয়েছিলাম। সব কি আর ভোলা যায়? সব ভোলা যায় না।

প্রেমিকের পাগলামি ভোলা সত্যি কঠিন। কেউ মন থেকে সত্যিকার ভালোবাসলে সেই ভালোবাসাটা অজান্তেই মনের মধ্যে থেকে যায়।

ঘুগরা পোকা হয়ে সময় সময় ডেকে ওঠে। গত নয় বছরে মনের মধ্যে এই ঘুগরা পোকাটা কতবার ডেকে উঠেছে, তার হিসাব রাখা হয়নি।

গত বছর আমার এক বন্ধুর আইডিতে হঠাৎ মাহবুবুর রহমানের ছবি দেখতে পাই। আমার বন্ধু কবিকে নিয়ে একটা পোস্ট করেছে।

গভীর মন দিয়ে ওর লেখাটা পড়তে থাকি। শরীরের রক্ত কেমন যেন হিম হয়ে এল। ভেতরটা ওলট-পালট হয়ে গেল। নিজেকে অপরাধী মনে হলো।

অফিসে গিয়েও কাজে মন বসাতে পারলাম না। বাসায় ফিরে আগে ফেসবুকে ঢুকলাম। মাহবুবুর রহমানকে আনফ্রেন্ড করে রেখেছিলাম;

তাঁকে আবার ফ্রেন্ড করে নিলাম। অনেক বছর পরে তাঁর প্রোফাইলে ঢুকলাম একটা নরম, তুলতুলে, মোমের মতো হৃদয় নিয়ে।

মায়াময় হৃদয় আমার। পুরো ফেসবুকে কবিতা আর কবিতা। এত্তগুলা কবিতা লিখেছেন তিনি! একটা একটা করে কবিতা পড়লাম।

মোট ছিয়াশিটি কবিতা। এইট্টি সিক্স! ভাবা যায়? সবগুলো কবিতা বিষাদময় বিরহের কবিতা।

কবিতা পড়ার সময় লক্ষ করলাম, হৃদয়ে ব্যথার পাহাড় জমতে শুরু করেছে। কখন যে চোখে আমার শ্রাবণের ধারা বইতে শুরু করেছে! টিস্যুতে চোখ মুছে বিড়বিড় করে বললাম—

—জীবন এত ছোট কেন?

দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। কবির ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়েছে। একতরফা প্রেমিক আমার। আহা, একটু পর পর মনটা হু হু করে উঠছে!

অথচ এই মানুষটার উপরে কত্ত বিরক্ত হয়েছি। আর আজ তাঁর জন্য খারাপ লাগছে। সে চলে যাবে অন্য ভুবনে।

এজন্য এই কষ্ট, এই খারাপ লাগা। মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি মানুষকে বদলে দেয়। কঠিন হৃদয়ও নরম হয়ে যায়।

মৃত্যুর আগাম খবর আমাদের অহংকার ধ্বংস করে দেয়। বিরক্তিকর মানুষের জন্যও মায়া হয়।

একদিন ভরদুপুরে তাঁকে অনেক বকা দিয়েছিলাম। বকা শুনে সে শিশুর মতো হাউমাউ করে কান্না করেছিলেন।

কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন—যত বকাই দেন না কেন, তবুও ভালোবেসে যাব। আমৃত্যু ভালোবাসব।

আহারে, এই মানুষটা গত দশ বছর ধরে একই কথা বলে যাচ্ছে। ভালোবাসা গভীর হলেই কেবল এটা সম্ভব।

তাঁর লেখা কবিতা পড়তে পড়তে মনটা কেমন যেন করে ওঠে। এই কেমন করে ওঠার নামই হয়তো মায়া। মায়ার কারণে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠি। ক্ষুদে বার্তার লেখাটা বড় মায়াময়।

আকাশ থেকে কান্না ঝরছে। আমি ভেজা চোখে দেখছি আকাশের কান্না। ও আকাশ, তুমি আজ আর কেঁদো না।

আমার মন ভালো নেই। তুমি কাঁদলে তো আমার বর বলবেন—সোহানা, বৃষ্টি নেমেছে। খিচুড়ি রান্না কর। আলুবোখারার চাটনি কর।

গরুর মাংস ভুনা কর। মন খারাপ নিয়ে এত আয়োজন করতে ইচ্ছে করে না, বরং বিছানায় শুয়ে থাকতেই বেশি ভালো লাগবে।

একা থাকতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু উপায় নেই। ছয় বছর বয়সী জেনিভা আমার একমাত্র মেয়ে, মামণি মামণি করে ডাকছে।

উত্তর দিতে পারছি না। কান্না যেন কণ্ঠস্বরকে চেপে ধরেছে। জেনিভা বলল—

—কাঁদছ কেন? কে মেরেছে?

তবুও কিছু বলতে পারছি না। ছোট হাত দিয়ে সে আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে আমার গালে চুমু দিল। মেয়েকে প্রচণ্ড আবেগে জড়িয়ে ধরলাম। বুকের সঙ্গে লেপ্টে নিলাম। সে আবারও বলল—

—কে মেরেছে তোমাকে?

—কেউ না, মা।

জানালার পর্দা দুলে ওঠে। সেটা দেখে সে আমার কোল থেকে নেমে জানালার কাছে ছুটে যায়। গ্রিলের ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দু’হাত প্রসারিত করে বলতে লাগল—

—মামণি, বৃষ্টি! ঝমঝম বৃষ্টি! চলো ভিজি।

আমার ভালো লাগছে না। বারবার কবি মাহবুবুর রহমানের আজকের বার্তার লাইনগুলো ভেসে উঠছে মনের কোণে। সে লিখেছে—

“আমি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমাকেই ভালোবেসে যাব। তবে আমার খুব ইচ্ছে—তোমার সুন্দর মুখটি দেখেই যেন আমার মৃত্যু হয়। আসবে তো?”

আমি মনে মনে ঠিক করলাম—আর কোনোদিন বৃষ্টিতে ভিজব না। মনের ভেতরে সেই কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—

বৃষ্টি পড়ে ঘর দুয়ারে
বৃষ্টি পড়ে বনে
বৃষ্টি পড়ে অন্ধকারে
বৃষ্টি পড়ে মনে…

 

 

 

আরও গল্প পড়ুন

শেয়ার করুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও লেখা:

Scroll to Top