বাবা ক্লান্ত তেলের ঘানি

মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন ইবনে মোস্তাফিজ

সকালটা আজও সেই আগের মতো। দরজার পাশে রাখা জুতার শব্দে ঘুম ভাঙে। একটা সময় ছিল বাবা খুব ভোরে বাড়ির সকলে উঠার আগেই বেরিয়ে যেতেন। তখন ঘুম ভেঙে শুধু খালি দরজাটা দেখতাম।

আজ এত বছর পর আমি নিজেই সেই ভোরের পথিক। বাবা হয়ে ওঠার পথে হাঁটছি প্রতিদিন।

ছোটবেলায় যেমন বাবাকে দেখতাম নিঃশব্দ, গম্ভীর মুখে, কোনো অভিযোগ নেই, ঠিক তেমনই এক জীবনের পথে আমি এখন নিজেই।

ছেলেবেলায় বাবাকে একটা রহস্য মনে হতো। আমরা যখন জ্বরে কাঁপতাম, বাবা গায়ে কাপড় জড়িয়ে ঘর ঠেলে বেরিয়ে পড়তেন।

পেটের ব্যথায় কুঁকড়ে থাকতাম, বাবা হেঁটে যেতেন কর্মস্থলের দিকে।

কিছু বলতেন না, কিছু বুঝাতেন না, তবুও কী গভীর ভাষা ছিল তার নীরবতায়!

আমার এখন মনে হয়, পুরুষ মানুষ হয়তো কোনো এক জাদুর ছোঁয়ায় ব্যথাকে ভুলে যেতে শেখে।

নয়তো সমাজ তাকে সে পথেই ঠেলে দেয়। যেন একটা সময় আসে যখন তাকে আর ‘মানুষ’ ভাবা হয় না।

ভাবা হয় কেবল একটা যন্ত্র—উপার্জনের, সাহসের, নির্ভরতাই যার প্রকৃত পরিচয়।

বাবা যতোদিন জীবিত থাকেন, আত্মীয়-স্বজনদের আনাগোনা থাকে, ভালোবাসা থাকে, উৎসবের ডাক থাকে।

বাবা আছেন বলেই পরিবারটা পূর্ণ। বাবা চলে গেলেই যেন সব ছেঁড়াখোঁড়া হয়ে পড়বে।

ফুপির ভালোবাসা, চাচার হাসি সব যেন বাবার উপস্থিতির মধ্যেই বন্দি।

আজ আমি নিজেই সেই ছায়া হওয়ার চেষ্টা করছি। সন্তানরা ঘুমে। আমি আস্তে করে দরজা খুলে জুতা পায়ে গলিয়ে বের হই।

শহরমুখী পথটায় হাঁটতে হাঁটতে বুঝি, পুরুষ মানুষকে নিজের ব্যথার উপর সিমেন্ট ঢেলে চলতে হয়।

অসুখকে পাশ কাটিয়ে, ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে, হেরে গিয়েও জিতে যাওয়ার অভিনয় করতে হয় প্রতিদিন।

একদিন ছেলেটা প্রশ্ন করল, “বাবা, তোমার শরীর খারাপ হয় না?”
আমি হেসে বললাম, “হয়তো হয়, তবে বাবা নামক মানুষের অসুখ থাকতে নেই।” সে বিশ্বাস করল। যেমন আমিও একদিন করেছিলাম, আমার বাবার কাছে।

স্মৃতির পাতায় এখনো ভেসে আসে বিকেলের সময়টা। আমি বারান্দায় বসে থাকতাম, বাবার জন্য অপেক্ষা করতাম।

খালি হাতে ফিরলেও তিনি আমাকে এক টুকরো ভালোবাসা দিতেন—একটা চকলেট, কখনো একটা হাসি, কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া।

আজ আমি বুঝি, সেই ছোট্ট উপহারটার পেছনে ছিল দিনের সব ক্লান্তির বিনিময়ে কেনা সুখ।

একবার বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। পুরো বাড়ি চিন্তিত, মা চোখের কোণে জল নিয়ে দোয়া পড়ছেন। আর বাবা? তিনি নিঃশব্দ, শুধু বারবার বলছিলেন, “চিন্তা কোরো না, আমি ঠিক আছি।”

তখন প্রথম বুঝেছিলাম, বাবার কষ্ট বোঝা এত সহজ নয়। তার কষ্ট শব্দে ধরা দেয় না। বাবা শুধু বলেন, “ভালো আছি।” আর আমরাও তা বিশ্বাস করি, যেন এটুকুই যথেষ্ট।

আজ আমি যখন বাজার করি, বাসা ভাড়া দেই, সন্তানের পড়াশোনার খরচ দেই, তখন বাবাকে আরও স্পষ্ট করে দেখি নিজের মাঝে।

বুঝি, কেন তিনি গম্ভীর ছিলেন। কেন একা একাই রাতের অন্ধকারে সিগারেট ধরতেন। কেন চোখের কোণে কখনো কখনো লুকিয়ে রাখতেন ভেজা আবেশ।

পুরুষ মানুষের কান্না যেমন অলিখিত নিষেধ, তেমনি তার কষ্টও কেবল তার একান্ত নিজস্ব। কেউ জানতে চায় না, জানলেও বুঝে না।

আজ আমি একাকী বারান্দায় বসে নিজের ছেলেকে দেখি। সে আমাকে দেখে হাসে। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেই।

ও জানে না, আমার পিঠে ব্যথা, বুকে চাপ, মাথায় দুশ্চিন্তা। তবু আমি হাসি। কারণ বাবা নামের মানুষের কাছে একটাই নিয়ম—নিজেকে ভাঙার আগে অন্যকে গড়ে তোলা।

আমার বাবাও এমনই ছিলেন। তিলে তিলে নিজেকে ক্ষয় করে আমাদের আলো দিয়েছিলেন।

এখন তার চুলে পাক ধরেছে, হাঁটার গতি কমেছে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়েছে, তবু তিনিই আমাদের আলো।

একদিন হঠাৎ তিনি বলেন, “তুই তো এখন বুঝিস, বাবা কাকে বলে?”
আমি মাথা নিচু করে বলেছিলাম, “তোমার ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকলেই তা বোঝা যায়, বাবা।”

আজ আমি সেই ছায়া হয়ে উঠতে চাই। তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে অন্যকে ছায়া দিতে চাই।

ক্লান্ত শরীরে সন্তানকে হাসি দিতে চাই। কোনো একদিন সেও যেন বলে, “আমার বাবা একজন নায়ক ছিলেন।”

আমরা ভুলে যাই, জীবনের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে যে মানুষটা আমাদের পিঠে হাত রাখে, তার ভেতরে জমে থাকে শত ঝড়, শত হাহাকার।

তবু তিনি বলেন, সব ঠিক আছে। তবু তিনি দেন ভালোবাসা, নিশ্চিন্ত ঘুম আর নির্ভরতার ছায়া।

আমার বাবার নাম আজো উচ্চারণ করি শ্রদ্ধায়। তার জীবনের প্রতিটি দিন যেন ছিল একটি যুদ্ধ।

প্রতিদিন সকালে ঘর ছাড়তেন, এক বোঝা দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। সন্ধ্যাবেলায় ফিরতেন একইভাবে।

একবারও বলেননি, “আজ খুব ক্লান্ত লাগছে।” শুধু বলতেন, “তোমার জন্য চকলেট এনেছি।”

আজ আমি বুঝি, সেই চকলেট ছিল এক টুকরো ভালোবাসার ভাণ্ডার। যার দাম আমি কখনো শোধ করতে পারব না।

বাবা না থাকলে জীবন যে কতটা ফাঁকা, তা বোঝা যায় তার অনুপস্থিতিতে। আর বাবা থাকতে মাথার উপর একটা অদৃশ্য ছায়া থাকে, যার নিচে দাঁড়ালেই সব ভয়, সব কষ্ট ভুলে যাওয়া যায়।

বাবা, তুমি সত্যিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। তুমি শেখালে—পুরুষ হওয়া মানেই শক্তির ছদ্মবেশে

কষ্টকে গিলে ফেলা। তুমি বোঝালে—ছায়া হয়ে থাকলে অনেক মানুষ বাঁচে। আর সেই ছায়া তুমি।

প্রিয় বাবা, তোমায় সালাম!

 

আরও বাংলা গল্প পড়ুন

শেয়ার করুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও লেখা:

Scroll to Top