Author name: if0_39360873

ছড়া নিয়ে ছড়া
ছড়া

ছড়া নিয়ে ছড়া

ছড়া নিয়ে ছড়া   ছড়া মানে আমিনুল ইসলাম মামুন কাব্যের নূপুরটা পরা আছে ছড়ারই পায়। ঝুমঝুম ছন্দে মনের আনন্দে নেচে নেচে আয় সবে, তার কাছে আয়। কাব্যের নূপুরটা পরা আছে ছড়ারই পায়। ছড়া ওড়ে ডানা মেলে আকাশে হাওয়ার ঝাপটা নিয়ে, ঢেউ খেলা পথ দিয়ে। মনপুরে নামে ছড়া, স্নিগ্ধতা মাখা যে। ছড়ার গায়ে ঐ দেখ, কত ছবি আঁকা যে। ছড়া মানে বাগানের ফুল, ছড়া মানে ঝুনঝুনি, কিংবা তা হারমুনি, কিংবা তা শিশুদের কানে পরা দুল। মাঝে মাঝে ফুটায় তা কারো গায়ে হুল। ছড়া উৎপলকান্তি বড়ুয়া মিষ্টি আমি মিষ্টিরে! তুই- টক তো ভারী তেঁতুল, আচ্ছারে বল স্বাদ নিয়ে তোর জন্যে করে কে তুল? গরম ডেকে ঠান্ডাকে কয় চরম তোমার রূপ তো! পৌষ আর মাঘ ছাড়া কোথায় দশ মাসে রও সুপ্ত? বৃষ্টি বলে, তুফান রে তোর সময়েই তো আসিস, যা করবি কর দুখীদেরও একটু ভালোবাসিস! আকাশ বলে, উঁচুতে রই পাতালরে তুই তলায়, কী করে তোর সঙ্গে রাখি ভাবটা গলায় গলায়? অসীম সাগর অটল পাহাড় মন থেকে না সরাই, সাগর পাহাড় তাদের বুঝি নেই রে অহং-বড়াই!

বাবা ক্লান্ত তেলের ঘানি
গল্প

বাবা ক্লান্ত তেলের ঘানি

বাবা ক্লান্ত তেলের ঘানি মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন ইবনে মোস্তাফিজ সকালটা আজও সেই আগের মতো। দরজার পাশে রাখা জুতার শব্দে ঘুম ভাঙে। একটা সময় ছিল বাবা খুব ভোরে বাড়ির সকলে উঠার আগেই বেরিয়ে যেতেন। তখন ঘুম ভেঙে শুধু খালি দরজাটা দেখতাম। আজ এত বছর পর আমি নিজেই সেই ভোরের পথিক। বাবা হয়ে ওঠার পথে হাঁটছি প্রতিদিন। ছোটবেলায় যেমন বাবাকে দেখতাম নিঃশব্দ, গম্ভীর মুখে, কোনো অভিযোগ নেই, ঠিক তেমনই এক জীবনের পথে আমি এখন নিজেই। ছেলেবেলায় বাবাকে একটা রহস্য মনে হতো। আমরা যখন জ্বরে কাঁপতাম, বাবা গায়ে কাপড় জড়িয়ে ঘর ঠেলে বেরিয়ে পড়তেন। পেটের ব্যথায় কুঁকড়ে থাকতাম, বাবা হেঁটে যেতেন কর্মস্থলের দিকে। কিছু বলতেন না, কিছু বুঝাতেন না, তবুও কী গভীর ভাষা ছিল তার নীরবতায়! আমার এখন মনে হয়, পুরুষ মানুষ হয়তো কোনো এক জাদুর ছোঁয়ায় ব্যথাকে ভুলে যেতে শেখে। নয়তো সমাজ তাকে সে পথেই ঠেলে দেয়। যেন একটা সময় আসে যখন তাকে আর ‘মানুষ’ ভাবা হয় না। ভাবা হয় কেবল একটা যন্ত্র—উপার্জনের, সাহসের, নির্ভরতাই যার প্রকৃত পরিচয়। বাবা যতোদিন জীবিত থাকেন, আত্মীয়-স্বজনদের আনাগোনা থাকে, ভালোবাসা থাকে, উৎসবের ডাক থাকে। বাবা আছেন বলেই পরিবারটা পূর্ণ। বাবা চলে গেলেই যেন সব ছেঁড়াখোঁড়া হয়ে পড়বে। ফুপির ভালোবাসা, চাচার হাসি সব যেন বাবার উপস্থিতির মধ্যেই বন্দি। আজ আমি নিজেই সেই ছায়া হওয়ার চেষ্টা করছি। সন্তানরা ঘুমে। আমি আস্তে করে দরজা খুলে জুতা পায়ে গলিয়ে বের হই। শহরমুখী পথটায় হাঁটতে হাঁটতে বুঝি, পুরুষ মানুষকে নিজের ব্যথার উপর সিমেন্ট ঢেলে চলতে হয়। অসুখকে পাশ কাটিয়ে, ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে, হেরে গিয়েও জিতে যাওয়ার অভিনয় করতে হয় প্রতিদিন। একদিন ছেলেটা প্রশ্ন করল, “বাবা, তোমার শরীর খারাপ হয় না?” আমি হেসে বললাম, “হয়তো হয়, তবে বাবা নামক মানুষের অসুখ থাকতে নেই।” সে বিশ্বাস করল। যেমন আমিও একদিন করেছিলাম, আমার বাবার কাছে। স্মৃতির পাতায় এখনো ভেসে আসে বিকেলের সময়টা। আমি বারান্দায় বসে থাকতাম, বাবার জন্য অপেক্ষা করতাম। খালি হাতে ফিরলেও তিনি আমাকে এক টুকরো ভালোবাসা দিতেন—একটা চকলেট, কখনো একটা হাসি, কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া। আজ আমি বুঝি, সেই ছোট্ট উপহারটার পেছনে ছিল দিনের সব ক্লান্তির বিনিময়ে কেনা সুখ। একবার বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। পুরো বাড়ি চিন্তিত, মা চোখের কোণে জল নিয়ে দোয়া পড়ছেন। আর বাবা? তিনি নিঃশব্দ, শুধু বারবার বলছিলেন, “চিন্তা কোরো না, আমি ঠিক আছি।” তখন প্রথম বুঝেছিলাম, বাবার কষ্ট বোঝা এত সহজ নয়। তার কষ্ট শব্দে ধরা দেয় না। বাবা শুধু বলেন, “ভালো আছি।” আর আমরাও তা বিশ্বাস করি, যেন এটুকুই যথেষ্ট। আজ আমি যখন বাজার করি, বাসা ভাড়া দেই, সন্তানের পড়াশোনার খরচ দেই, তখন বাবাকে আরও স্পষ্ট করে দেখি নিজের মাঝে। বুঝি, কেন তিনি গম্ভীর ছিলেন। কেন একা একাই রাতের অন্ধকারে সিগারেট ধরতেন। কেন চোখের কোণে কখনো কখনো লুকিয়ে রাখতেন ভেজা আবেশ। পুরুষ মানুষের কান্না যেমন অলিখিত নিষেধ, তেমনি তার কষ্টও কেবল তার একান্ত নিজস্ব। কেউ জানতে চায় না, জানলেও বুঝে না। আজ আমি একাকী বারান্দায় বসে নিজের ছেলেকে দেখি। সে আমাকে দেখে হাসে। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেই। ও জানে না, আমার পিঠে ব্যথা, বুকে চাপ, মাথায় দুশ্চিন্তা। তবু আমি হাসি। কারণ বাবা নামের মানুষের কাছে একটাই নিয়ম—নিজেকে ভাঙার আগে অন্যকে গড়ে তোলা। আমার বাবাও এমনই ছিলেন। তিলে তিলে নিজেকে ক্ষয় করে আমাদের আলো দিয়েছিলেন। এখন তার চুলে পাক ধরেছে, হাঁটার গতি কমেছে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়েছে, তবু তিনিই আমাদের আলো। একদিন হঠাৎ তিনি বলেন, “তুই তো এখন বুঝিস, বাবা কাকে বলে?” আমি মাথা নিচু করে বলেছিলাম, “তোমার ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকলেই তা বোঝা যায়, বাবা।” আজ আমি সেই ছায়া হয়ে উঠতে চাই। তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে অন্যকে ছায়া দিতে চাই। ক্লান্ত শরীরে সন্তানকে হাসি দিতে চাই। কোনো একদিন সেও যেন বলে, “আমার বাবা একজন নায়ক ছিলেন।” আমরা ভুলে যাই, জীবনের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে যে মানুষটা আমাদের পিঠে হাত রাখে, তার ভেতরে জমে থাকে শত ঝড়, শত হাহাকার। তবু তিনি বলেন, সব ঠিক আছে। তবু তিনি দেন ভালোবাসা, নিশ্চিন্ত ঘুম আর নির্ভরতার ছায়া। আমার বাবার নাম আজো উচ্চারণ করি শ্রদ্ধায়। তার জীবনের প্রতিটি দিন যেন ছিল একটি যুদ্ধ। প্রতিদিন সকালে ঘর ছাড়তেন, এক বোঝা দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। সন্ধ্যাবেলায় ফিরতেন একইভাবে। একবারও বলেননি, “আজ খুব ক্লান্ত লাগছে।” শুধু বলতেন, “তোমার জন্য চকলেট এনেছি।” আজ আমি বুঝি, সেই চকলেট ছিল এক টুকরো ভালোবাসার ভাণ্ডার। যার দাম আমি কখনো শোধ করতে পারব না। বাবা না থাকলে জীবন যে কতটা ফাঁকা, তা বোঝা যায় তার অনুপস্থিতিতে। আর বাবা থাকতে মাথার উপর একটা অদৃশ্য ছায়া থাকে, যার নিচে দাঁড়ালেই সব ভয়, সব কষ্ট ভুলে যাওয়া যায়। বাবা, তুমি সত্যিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। তুমি শেখালে—পুরুষ হওয়া মানেই শক্তির ছদ্মবেশে কষ্টকে গিলে ফেলা। তুমি বোঝালে—ছায়া হয়ে থাকলে অনেক মানুষ বাঁচে। আর সেই ছায়া তুমি। প্রিয় বাবা, তোমায় সালাম!   আরও বাংলা গল্প পড়ুন

অহংকার বেচে নিলামে
গল্প, শিক্ষণীয় গল্প

অহংকার বেচে নিলামে

অহংকার বেচে নিলামে আনোয়ার আল ফারুক এক. ভবনের নাম “অহংকার”। প্রথম নজরে অনেকে আবার অলংকারও পড়ে বসে। জেলা শহরে এই রকম আলিশান বাড়ি দু-চারটার বেশি নেই। ফেনী শহরের পশ্চিম উকিলপাড়ার দাউদপুরে এই বাড়ি। নব্বই দশকের শুরুর দিকে এই অঞ্চলে আধাপাকা, সেমিপাকা কিছু বাড়িঘর থাকলেও এত বিশাল অট্টালিকা আর দ্বিতীয়টি ছিল না। তাই প্রথম দেখায় এই ভবনটি সবার নজর কাড়ে। প্রধান সড়কের পাশঘেঁষা এই ভবনটি পথিকেরা একবার হলেও ঠায় দাঁড়িয়ে অপলক চোখে দেখে। বাড়ির সামনে রয়েছে বিশাল আঙিনা। দক্ষিণ পাশে একটি পুকুর, তারপর বিশাল বাগানবাড়ি। পুকুরের ঘাটে বসার জায়গাটা শ্বেত মার্বেল পাথরের নির্মিত। তাই এই বাড়ির রূপ-সৌন্দর্য যে কারো দৃষ্টি কাড়বে। বাড়ির মালিক আফজাল সাহেব তৎকালীন সড়ক ও জনপদ বিভাগের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। তাঁর রুজি-রুটি নিয়েও এলাকায় রয়েছে নানান কৌতুক। দশতলা বিশিষ্ট এই বাড়ির ২য় তলায় থাকেন আফজাল সাহেব ও তাঁর পরিবার। বাদবাকি ফ্লোরগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আফজাল সাহেবের এক ছেলে ও এক মেয়ে। তারা লেখাপড়ায় মাধ্যমিক ধাপ গড়ায়নি। এই নিয়েও আফজাল সাহেব প্রায় বড়াই করে বলেন, “আমার ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া না করলে কী হয়েছে? আমার যে সম্পদ আছে, তা তারা দশ জনম খেয়ে-পরে যেতে পারবে।” ইদানীং আফজাল সাহেবের বাড়ির প্রায় ফ্লোর খালি থাকছে। ভাড়াটিয়ারা এখানে খুব বেশিদিন টিকে না। দুই-তিন মাস থাকার পর অনেকেই বাসা ছেড়ে দেয়। এই বাড়ির নিয়মনীতি অবশ্যই বেশ জটিল। প্রথমে ভাড়াটিয়ারা আসলে এসব জটিল নিয়মকানুন গোপন রাখা হয়। বাসায় ওঠার পর একগাদা লিখিত নিয়মকানুন পড়ে তাদের অবহিত করে আসেন মিসেস আফজাল সায়েরা খানম। এখানে ভাড়াটিয়াদের বাসার ছাদ, উঠোনে, পুকুরঘাটে আসা-যাওয়া, বসা কিংবা পুকুরে গোসল করা শতভাগ নিষিদ্ধের আওতায়। অনেকে বাড়ির রূপ-সৌন্দর্যপূর্ণ পরিবেশ দেখে আকৃষ্ট হয়ে আসলেও পরে কিন্তু এসব কালাকানুন শুনে রীতিমতো থ বনে যান। আবার এক ভাড়াটিয়া অন্য ভাড়াটিয়ার বাসায়ও যেতে না পারা এখানের আরেকটি অলিখিত সাংবিধানিক মজবুত ধারা। মিসেস সায়েরা খানম এসব নিয়মকানুন সাংঘাতিকভাবে তদারকি করেন। সামান্য শব্দ কিংবা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ভাড়াটিয়াকে শাসিয়ে নেন দুস্তুরভাবে। আর এই ভবন নিয়ে শুনিয়ে দেন রুটিনমাফিক অহংকারের বেশ কিছু কমন পদাবলি। বৈশ্বিক করোনা মহামারি চলাকালীন নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে সামান্য হেরফের হওয়ায় বেশ কয়েকজন ভাড়াটিয়ার মালসামানা বাসায় রেখে তাদের বের করে বাসায় তালা ঝুলিয়ে দেন মিসেস সায়েরা খানম। এই ভাড়াটিয়াদের অনেকে আত্মসম্মানের দিকে তাকিয়ে কোনো রূপ উচ্চবাচ্য না করে মালসামানা রেখে বাসা ত্যাগ করে চলে যান। পরে এই মালসামানা মিসেস সায়েরা বেগম নিলামে বিক্রিও করেন। স্থানীয় একটা বেসরকারি স্কুলের একজন শিক্ষককে যথাসময়ের তিন দিন বেশি সময় ভাড়া দিতে অপারগতার কারণে আফজালুর রহমান ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেন। ওই মাস্টার সাহেব রাগে-ক্ষোভে ওই এলাকা ত্যাগ করেন। শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে সারাজনমের জন্য নিজ গ্রামে চলে যান। যাওয়ার সময় মিসেস সায়েরা খানম বলেন, “আপনার বাসার মালসামানা নিলামে বেচে বকেয়া বাসা ভাড়া উশুল করে নেব।” ওই মাস্টার সাহেব অনেকক্ষণ চুপ থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছলোছলো চোখে বলেন, “আজ হয়তো অহংকার ও ক্ষমতার দাপটে আমার মালসামানা নিলামে বেচে দেবেন, আর আল্লাহ চাইলে এর ব্যতিক্রমও হতে পারে। আপনার বাড়িটাও একসময় হয়তো নিলামে বেচা হয়ে যেতে পারে।” কোনো রূপ প্রতিত্তরের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই দু বছরের শিশুবাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এই দৃশ্য অন্য ভাড়াটিয়াদের হৃদয়ে ভীষণ দাগ কাটে এবং অনেকে নীরবে চোখের পানি ছাড়লেও এই অহংকারী, দাপুটে বাড়ির মালিকের সামনে টুঁ শব্দ করার সৎ সাহস করেননি। দুই আফজাল সাহেবের একমাত্র ছেলে রিফাত বাবার সঞ্চিত ব্যাংক ব্যালেন্স ও বাড়ি মর্টগেজ দিয়ে ব্যাংক থেকে বিশ লক্ষ টাকা নিয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন। শহরের জিরো পয়েন্টে এই নামিদামি রেস্টুরেন্ট প্রথমে বেশ জমে উঠলেও ব্যবসা না জানা, না বোঝার কারণে প্রথম বছরেই ব্যবসায় বিশাল লোকসানি গুনতে হয়। এখানে শুধু ব্যবসা না বোঝার দোষ না। রিফাত বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে সময়-অসময়ে আড্ডা ও জুয়ায় আসক্তিতে মজে ওঠে। এতে করে ব্যবসা ধ্বংস হয় এবং ঋণের বোঝা ফুলে-ফেঁপে বড় থেকে বড় হতেই লাগল। এই বোঝা হালকা করতে গিয়ে আফজাল সাহেব বাড়ির পৈত্তিক সম্পত্তি ঘরভিটাও বেচে দেন। বর্তমানে শহরের এই বাড়ি ছাড়া তাদের আর একতিল জমিও নেই। এদিকে বছরের অধিকাংশ সময় বাড়ির প্রায় ইউনিট ভাড়াহীন থাকায় তাদের দিনকাল খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। দুর্বিষহ জীবনযাপন করলেও বাইরের হাঁকডাক ঠিকই বজায় রাখছেন আফজাল সাহেব। সকালবেলায় কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় হাঁটছেন আফজাল সাহেব। টার্গেট পূর্ব পাড়ার নবি ব্যাপারির চা-দোকান। ওখানে বেলা পর্যন্ত চা পান করে আড্ডায় কাটিয়ে দেন আফজাল সাহেব। ক্রিং ক্রিং ক্রিং—বেজে উঠল আফজাল সাহেবের ফোন। রিসিভ করে ওপারের কথা শুনে যেন আফজাল সাহেবের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। থানায় থেকে ওসি সাহেব ফোন করছেন। তাঁর ছেলে রিফাতসহ দশজনের এক ডাকাত গ্রুপ হাইওয়ে গাড়ি ডাকাতিকালে র‍্যাবের হাতে ধরা পড়ে। র‍্যাব জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দি গ্রহণের পর থানায় হস্তান্তর করলে তার নামে নিয়মিত ডাকাতি মামলা রুজু হয়। আফজাল সাহেব রিকশায় চড়ে থানায় ছুটে যান। আইনের নিয়মে থানা রিফাতদের কোর্টে তুললে কোর্ট জামিন না মঞ্জুর করে জেলে পাঠিয়ে দেন। এদিকে গোটা এলাকায় এই সংবাদ অল্প সময়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়, জাতীয় পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরিচিতজনরা আফজাল সাহেবকে বিষয়টি জানতে ফোন করেন। আফজাল সাহেব লোকলজ্জায় নিজের ফোনের সিম বদলে ফেলেন। এই তো গত পনেরো- বিশ দিন আফজাল সাহেব ঘর থেকে খুব একটা বের হন না। জরুরি প্রয়োজনে হাটে কিংবা ছেলের জামিনে কোর্টে যেতে হলে কাজ সেরেই ফের নিভৃতে বাসায় ফেরেন। আফজাল সাহেব এই মানসিক চাপ একদমই নিতে পারছেন না। একদিকে ছেলের এই অবস্থা, অন্যদিকে দায়দেনার প্রচণ্ড চাপ। প্রতিদিন কেউ না কেউ আসছে পাওনা টাকার জন্য। কেউ কেউ টাকা আদায়ে মামলারও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। কী করবেন, কোথায় যাবেন—ভেবে দিশা পাচ্ছেন না আফজাল সাহেব। এদিকে কয়েক ডজন নোটিশের পর এক্সিম ব্যাংক, ফেনী শাখা ত্রিশ জুনের মধ্যে ব্যাংক লোনের সমুদয় টাকা পরিশোধের চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে। অন্যথায় ব্যাংক এই বাড়িটি নিলামে বিক্রি করে দেবে। এসব ভাবতে ভাবতে আফজাল সাহেব বারান্দায় পায়চারি করছেন। এমন সময় ফোন বেজে উঠলে ফোন রিসিভ করতেই ওপার থেকে তাঁদের আইনজীবী জানান, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে তাঁর চেম্বারে দেখা করতে। আফজাল সাহেব কোনো রকম প্রস্তুতি নিয়ে ছুটছেন জেলা জজকোর্টের দিকে। আফজাল সাহেব এখন বাসা আর কোর্টের বারান্দায় দিন কাটান। কোনো রকম তদবির করে হলেও ছেলের জামিনের জন্য ধারে-ধারে ঘুরছেন। পায়ের তলার জুতো ক্ষয় হচ্ছে, কিন্তু ছেলের জামিনের কোনো কুলকিনারা হচ্ছে না। চোখের পলকে যেন কেটে গেল দশটা বছর। এই দশ বছরে আফজাল সাহেবের ঋণের বোঝাও ঠিক আকাশ ছুঁইছুঁই। কী করার আছে তাঁর? তবুও তিনি ঘুরছেন একমাত্র ছেলের জামিনের জন্য। দীর্ঘসূত্রিতার পর আজ মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার কথা। আফজাল সাহেবের মন ধুকপুক করছে। মহামান্য জজ এজলাসে উঠেই নির্ধারিত এই মামলায় রায় পড়ে শোনান। রায়ে তাঁদের সবার বারো বছরের সাজা ঘোষণা করেন মহামান্য

ফুলের নদী কেউকেনহফ
নির্বাচিত লেখা, ফিচার, ভ্রমণ

ফুলের নদী কেউকেনহফ

ফুলের নদী কেউকেনহফ শাকেরা বেগম শিমু নদী বলতে বুঝায় বহমান স্বচ্ছ পানির ধারা, যা গিয়ে শেষ হয়েছে কোনো সাগর বা মহাসাগরে। যদিও নদীর মধ্যে কখনো রং বেরঙের পানিও প্রবাহিত হয়, যেমন কলোম্বিয়ার “রেইনবো রিভার”। যেখানে একসাথে রংধনুর সাতটি রঙের পানি প্রবাহিত হয়। তাই অনেকে একে রংধনু নদী নামেও অভিহিত করে থাকে। কিন্তু এখন যে নদীটির কথা বলতে যাচ্ছি, সেটা রঙিন বা স্বচ্ছ কোনোরকম পানির নদীই নয়। সেটা হচ্ছে “ফুলের নদী”! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। বিচিত্র এই পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই আছে, যা দেখলে স্রষ্টার সৃষ্টি নিয়ে মন ভাবনায় পড়তে বাধ্য। তবে এ সবই একমাত্র মহান রবের কুদরতের নিশানা। আজ পরিচয় করিয়ে দেবো এরকমই এক নদীর সাথে, যেখানে কোনো পানি নেই। আছে শুধু ফুল আর ফুল। এতে আছে চেরি, নীল অপরাজিতা, টিউলিপ ও নদীর মতো বেয়ে আসা ছোট ছোট নীল ফুলের সারি। চমৎকার এই নীলাভ ফুলটি এক ধরণের ঘাসফুল, যা হাঁটার সময় পায়ের তলায় চুরচুর করে ভেঙে পড়তে চায়। এই পুষ্পদ্বয়ের দোলায়িত দীর্ঘ ও প্রশস্ত বাগান দেখলে যে কেউই ভাববে, এটা কোনো ফুলের নদীই হবে, যা বয়ে চলেছে কোনো পুষ্পসাগরে মিলিত হবার জন্য। অবস্থান অপূর্ব, অসাধারণ, অপরূপা সুন্দর এই ফুলের বাগানটি অবস্থিত ইউরোপ মহাদেশের নেদারল্যান্ডসের “কেউকেনহফ” শহরে। এ জায়গাটি পুষ্পসম্ভারে এতই মনোরম ও মনোমুগ্ধকর যে, তা যে কারো স্বপ্নকেও হার মানায়। এখানে আছে নানা প্রজাতির রঙ-বেরঙের হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ টিউলিপ ফুলের বাগান। এ ফুলগুলো সাদা, লাল, গোলাপী, নীল, হলুদ, দুধে-আলতা প্রভৃতি হরেক রঙের হয়ে থাকে। এই এলাকা থেকে প্রতিবছর এসব টিউলিপ ফুল আমেরিকা ও জাপানে রপ্তানি করা হয়। এছাড়াও আরো অনেক ফুলপ্রেমি দেশ ও রাজ্য নেদারল্যান্ডসের এই ‘কেউকেনহফ’ থেকে টিউলিপ আমদানি করে নিয়ে যায়। একে ফুলপ্রেমিদের জন্য একটি ফুলের স্বর্গই বলা যায়। যেদিকে চোখ যায়, শুধু ফুল আর ফুল। অনেকে এই ফুলের সমাহারের সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করার জন্য এই কেউকেনহফ শহরে এসে অনেকদিন থেকেও যায়। বসন্তে এর রূপ একে তো এই অঞ্চলটি ফুলের জন্য বিখ্যাত, তার উপর বসন্ত এলে এখানে যেন ফুলপরীরা অসংখ্য ডানা মেলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বসন্তে এর রূপ অনন্য হয়ে চোখে ধরা দেয়। সাথে মন-মাতানো সৌরভে চারদিকের বাতাস ভরভর করে। আর তাই এসময় এখানে পর্যটকের সংখ্যাও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটা বেড়ে যায়। যেদিকে চোখ যায়, শুধু রঙ-বেরঙের আর নানা প্রজাতির ফুল যেন চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। তখন দূর থেকে “কেউকেনহফ”-এর ঘরবাড়িগুলোকে দেখলে মনে হবে, ফুলের এক মহাসাগরের মাঝখানে ছোট ছোট কয়েকটি মাত্র দ্বীপ গড়ে উঠেছে। বাকি পুরোটাই ভর্তি শুধু চোখ ধাঁধানো রঙ-বেরঙের ফুল আর ফুলের সমাহারে। এসব ফুলে যেমন প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকে, তেমনি প্রকৃতিকে অপরূপ সাজে সজ্জিত করে দেয়। বহু সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটায়। আর তাই একে সমগ্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুলের বাগান-এর খেতাবটি দেওয়া হয়েছে। যা ফুলপ্রিয় ও ফুলচাষের দেশ জাপানকেও দেওয়া হয়নি। নদীতে ভ্রমণ “কেউকেনহফ”-এ এলে শুধু ফুল দেখেই যে চোখ জুড়াবে তা নয়, এখানে ফুলের স্বর্গীয় নদীর পাশাপাশি আছে ছোট ছোট সত্যিকারের নদী, যেগুলোর দুই তীর শুধু বাহারী রঙের ফুলে ফুলে সজ্জিত। এ নদীতে নৌকায় করে ভ্রমণ করলে আশেপাশের প্রকৃতি দেখে মনে হবে, এটা হয়তো পৃথিবীর বাইরের অন্য কোনো জগতে চলে এসেছি। যেখানে শুধু ফুলের বিছানা বিছানো, ফুলের নদী প্রবাহিত। আর সাথে বাতাসে রয়েছে মন-মাতাল করা ফুলের সুগন্ধ। এরকম স্বর্গীয় ফুলের রাজ্যে গেলে মন হারিয়ে যাবে এর অনুপম সৌন্দর্যের মাঝে। ফুলের চাষ প্রতিবছর এ অঞ্চলে প্রায় সত্তর লক্ষের মতো ফুলের বীজ ও চারাগাছ রোপণ করা হয়। স্বভাবতই সেজন্যই এটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাগান হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এখানে ফুলের আকর্ষণে আগত পর্যটকদের জন্য উপযুক্ত সময়টা হলো মার্চ মাস থেকে শুরু করে মধ্য মে পর্যন্ত। এসময় দর্শনার্থীদের জন্য ফুলের বাগান উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। যা দর্শনার্থীদের শুধু চোখ জুড়ায় না, মনও ভরায়। ফুলের মধ্যে থেকে শুধু এক টিউলিপই ফুটে কয়েক লক্ষেরও বেশি। মার্চের শেষের দিক থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্ত সময়টা হলো টিউলিপ ফুটার উপযুক্ত সময়। এসময় ‘কেউকেনহফ’-এর প্রধান বাগান, যেটা প্রায় আড়াইশ বিঘা জমির উপরিভাগ জুড়ে রয়েছে, তার উপরিভাগ পুরোটাই জুড়ে থাকে শুধু এই হরেক রঙের টিউলিপ ফুলের সমাহার। এর সাথে নদীর তীরে, পার্কে বা মাঠে রয়েছে অজস্র অপরাজিতা, চেরি বা নীলাভ রঙের ঘাসফুলের বাহার। সবকিছু মিলিয়ে এ ‘কেউকেনহফ’-কে শুধু “ফুলের নদী” নয়, পুরো একটি ফুলের সাগরও বলা যায়।   ফিচার পোস্ট

প্রমথ চৌধুরী ও সবুজপত্র—বাংলা সাহিত্যে চলিত রীতির হোতা সুদেব চক্রবর্তী
প্রবন্ধ

প্রমথ চৌধুরী ও সবুজপত্র—বাংলা সাহিত্যে চলিত রীতির হোতা-  সুদেব চক্রবর্তী

প্রমথ চৌধুরী ও সবুজপত্র—বাংলা সাহিত্যে চলিত রীতির হোতা সুদেব চক্রবর্তী বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সমালোচক ও লেখক প্রমথ চৌধুরী যে কারণে বার বার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন, সেটি হলো চলিত গদ্যরীতির প্রতিষ্ঠা। এই কাজটি করতে গিয়ে তাঁর হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল সবুজপত্র সাহিত্য পত্রিকা। এই কাজটিতেও বিরোধিতা ছিল। কিন্তু প্রমথ চৌধুরী মনে করতেন, ‘ভাষা মানুষের মুখ থেকে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ থেকে মানুষের মুখে নয়।’ প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্র পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। চলিত রীতির প্রসারে সবুজপত্র মূখ্য ভূমিকা পালন করে এবং ওই সময়ে সবুজপত্র এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে শিবরাম চক্রবর্তী ওই সময়কে চিহ্নিত করেছিলেন প্রমথ চৌধুরীর ‘বীরবলী আমল’ হিসেবে। বীরবল ছিল প্রমথ চৌধুরীর ছদ্মনাম। সাহিত্যে আমাদের আদিরূপটি হলো কাব্য, গদ্য এসেছে অনেক পরে। বাংলা ভাষায় প্রথম যে গদ্যের নিদর্শন আমরা পাই —সেটি হলো ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে আসামের রাজা কর্তৃক কোচবিহারে রাজার নিকট লেখা একটি পত্র। আসামের একটি পত্রিকা থেকে এই তথ্যটি জানা যায় ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে। আজকে ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রের কাছে ভাষার রূপ হলো এমন—মৌখিক ও লৈখিক। মৌখিক দু ধরনের—আঞ্চলিক ও প্রমিত। একইভাবে লৈখিকও দু ধরনের—সাধু ও চলিত। চলিত ভাষা সম্পর্কে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন— ‘দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গে ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী স্থানের ভদ্র ও শিক্ষিত সমাজে ব্যবহৃত মৌখিক ভাষা, সমগ্র বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ মৌখিক ভাষা বলিয়া গৃহীত হইয়াছে। এই মৌখিক ভাষাকে বিশেষভাবে ‘চলিত ভাষা’ বলা হয়।’ উনিশ শতকের তৃতীয় দশকে ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায়ের হাতে এ রীতির প্রথম ব্যবহার হয়। তারপর এই রীতির আরও বিকাশ ঘটান প্যারীচাঁদ মিত্র এবং কালীপ্রসন্ন সিংহ। আর সবশেষে এ রীতির পূর্ণ সাহিত্যিক বিকাশ ঘটে প্রমথ চৌধুরীর হাতে। বিবর্তনের ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—শ্রুতির যুগ পেরিয়ে সাহিত্য লিখিত রূপ পায়, বাংলা ভাষায় যার প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ। এর অনেক পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে গদ্যের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ছিল তৎসম শব্দে ঠাসা —সাধুভাষা কিংবা এসবের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণ। সাধুভাষার দীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষে আজকের গদ্য থিতু হয়েছে চলিত রীতিতে। এই চলিত গদ্যরীতি প্রতিষ্ঠায় প্রমথ চৌধুরীর মাধ্যম ছিল—সবুজপত্র। যার ফলস্বরূপ আমরা দেখি ১৯৭০-এর দশক থেকে চলিত গদ্যরীতি এক প্রকার স্বীকৃতি পেয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রিকা সাধু ভাষার বাইরে ভাবতেই পারত না। ৬০-এর দশকে তো স্কুল-কলেজের সকল পাঠ্যবই উঁচু রীতির সাধু ভাষায় লেখা হতো। প্রমথ চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়ের। সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথের জামাতা। সেই হিসেবে তিনি রবীন্দ্রনাথেরও জামাতা। কিন্তু একই সময়ের হলেও, আত্মীয়তার বন্ধনজনিত কারণে কাছাকাছি থাকলেও প্রমথ চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্র-প্রভাবের বাইরে। নিজেই একটা স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বরং রবীন্দ্রনাথই প্রমথ চৌধুরী দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন, বিশেষ করে ভাষার চলিত রীতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’, ‘সেঁজুতি’, ‘আকাশ প্রদীপ’, ‘শেষ লেখা’ প্রভৃতি রচনায় যে চলিত রীতি আমরা দেখি, তার পেছনে অবদান প্রমথ চৌধুরীর প্রভাব। এ কথা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ অকপটে স্বীকার করেছেন। প্রমথ চৌধুরী বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক ও সমালোচক—এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর সমালোচনা ছিল গঠনমূলক। এটা করতে গিয়ে তিনি যে ছদ্মনামটি ধারণ করেছিলেন, তার সার্থকতাও প্রমাণিত হয়েছে। বীরবল—সম্রাট আকবরের সভার নবরত্নের একজন। প্রমথ চৌধুরীও বাংলা সাহিত্যের একজন রত্ন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সম্রাট আকবরের বীরবল কেবল বিদূষকই ছিলেন না, একজন তুখোড় যোদ্ধাও ছিলেন। প্রমথ চৌধুরীও ছিলেন সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিচরণকারী। বীরবল ছদ্মনাম কেন গ্রহণ করলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায় না। তবে তিনি একবার জানিয়েছিলেন, ‘আমি যখন দেশের লোককে রসিকতাচ্ছলে কতকগুলি সত্য কথা শোনাতে মনস্থ করি, তখন আমি না ভেবে-চিন্তে বীরবলের নাম অবলম্বন করলুম।’ পরবর্তীতে তাঁর রচনাশৈলী ‘বীরবলী স্ট্যাইল’ নামে পরিচিত হলো। এই স্ট্যাইলটাই হলো চলিত গদ্যরীতি, যা বাংলা সাহিত্যের গদ্য রচনায় বড় অবদান। যার ফলেই আজকে সর্বত্র চলিত রীতির ছড়াছড়ি। প্রসঙ্গত বলা যায়, বাংলাদেশের জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাক-এর সম্পাদকীয় লেখা হতো সাধু ভাষায়। প্রমথ চৌধুরীর চলিত রীতির প্রভাবের ফলে দীর্ঘদিন সাধুভাষায় সম্পাদকীয় লেখা ইত্তেফাক ফিরে এসেছে চলিত ভাষায়। প্রমথ চৌধুরীর সময়কার অনেক লেখকই সে সময় আপত্তি তুলেছিলেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সাধু ভাষার পক্ষে। তাঁর কাছে চলিত ভাষা ‘কঠিন’ মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে জয়টা চলিত ভাষারই হয়েছে। যারা চলিত ভাষার বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরবর্তীতে চলিত রীতিতে লিখেছেন। সেই সময়ে যারা নিজেদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা ভাবতেন, তারা কেবল সাধু ভাষায় লিখতেন। তবে সুকুমার রায়, রবীন্দ্রনাথ, পরশুরাম, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ প্রমুখ লেখকেরা চলিত ভাষায় ফিরেছিলেন। প্রমথ চৌধুরীর সফলতার জায়গা এইখানেই। আরও প্রবন্ধ পড়ুন

ঈদ এলে মো. দিদারুল ইসলাম
ছড়া

ঈদ এলে মো. দিদারুল ইসলাম

ঈদ এলে মো. দিদারুল ইসলাম ঈদ এলে ছেলে-বুড়ো রাত করে ভোর, খুকুমণি হাতে তোলে মেহেদির ফোঁড়। ঈদ এলে শহরের অলি-গলি ফাঁকা, অনেকেই ছেড়ে যায় রাজধানী ঢাকা। ঈদ এলে সারা গাঁয়ে পড়ে যায় ধুম, খোকনের চোখ জুড়ে নাহি থাকে ঘুম। ঈদ এলে গরীবের মনে নাই সুখ, আঁখি সদা জলে ভরা দুখ আর দুখ।

ঈদের দিনে আল মাহমুদ
বিখ্যাতদের ছড়া, বিখ্যাতদের লেখা

ঈদের দিনে আল মাহমুদ

ঈদের দিনে আল মাহমুদ জিদ ধরি না আর কানে আমার বাজে না সেই মায়ের অলঙ্কার। কেউ বলে না খাও পাতের ভেতর ঠাণ্ডা হলো কোর্মা ও পোলাও। কোথায় যেন মন চলে যায় মেঘের ওপর ভেসে দুয়ার ধরে দাঁড়িয়ে আছে মাতৃছায়া এসে। ছায়া কেবল ছায়া ছায়ার ভেতর বসত করে চিরকালের মায়া। মায়ার মোহে মুগ্ধ আমি মায়ায় ডুবে থাকি মায়ার ঘোরে বন্দী আমি নিজকে বেঁধে রাখি ৷৷  

Scroll to Top