Author name: if0_39360873

জাদুকর বন্ধু ইরেজার
নির্বাচিত লেখা

জাদুকর বন্ধু ইরেজার

জাদুকর বন্ধু ইরেজার প্রিন্স মাহমুদ হাসান মনে করো তুমি ক্লাস টু-তে পড়ো। তোমার স্কুলের মিস তোমাকে পড়া লিখতে বললেন। তুমিও মিসের কথামতো দ্রুত লিখতে শুরু করলে। তুমি পেনসিল দিয়ে সবার আগে লিখে ফেললে কিন্তু খেয়াল করলে—লেখার মাঝখানে কোনো এক লাইনে বানান ভুল করে বসেছো। মিসের নির্দেশ ছিল—তাড়াতাড়ি লিখলেই হবে না, বানানেও নির্ভুল হতে হবে। এই মুহূর্তে কাটাকাটি সম্ভব নয়, নতুন করে লেখা তো নয়ই। এবার তুমি প্রথমেই যেই বন্ধুটির কথা মনে করবে, সে আর কেউ নয়—তোমার সেই প্রিয় বন্ধু ইরেজারের কথা। কেউ কেউ তাকে ‘রাবার’ বলেও ডাকে, যার অর্থ মোছার যন্ত্র বা মুছনির উপকরণ। তোমার স্কুলব্যাগে, পেনসিলের পাশেই সে সব সময় অবস্থান করে। ভুল সংশোধন করাই যেন তার একমাত্র কাজ। এসো, এবার জেনে নেওয়া যাক ইরেজার সম্পর্কে।   ধারণা করা হয়, পেনসিলের প্রয়োজনে ইরেজারের আবির্ভাব। রাবার দিয়ে তৈরি ইরেজার আবিষ্কৃত হয় এখন থেকে প্রায় ২৫৫ বছর আগে। আঠারো শতকের দিকে, ১৭৭০ সালে, সর্বপ্রথম পেনসিলের দাগ মুছতে এডওয়ার্ড নাইম্যান নামক এক ইংরেজ ভদ্রলোক রাবার দিয়ে ইরেজার তৈরি করেন। পেনসিল দিয়ে লিখতে বা আঁকতে গেলে ইরেজার এক অপরিহার্য উপকরণ হয়ে উঠেছে।  কিছু কিছু ইরেজার দিয়ে আবার কালি-ও মোছা যায়। রাবার দিয়ে ইরেজার তৈরির আগে মানুষ রুটি, বালি বা কাপড় ব্যবহার করে পেনসিলের দাগ মুছত।   ইরেজার ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন রং ও আকারের হয়ে থাকে। অনেক পেনসিলের পেছনে ছোট্ট একটি ক্যাপের মতো ইরেজার লাগানো থাকে, যা সবারই চেনা। অনেকেই এই অংশে মজার ছলে  চোখ, নাক ও মুখ আঁকতে ভালোবাসে। এছাড়াও, ইরেজার চৌকোনা, গোলাকার কিংবা ফলের আকৃতির হয়ে থাকে।   বিভিন্ন ইরেজার বিভিন্ন উপাদানে তৈরি হয়। সাধারণত ইরেজার প্রাকৃতিক রাবার, সিন্থেটিক রাবার, ভিনাইল বা প্লাস্টিক (PVC) দিয়ে তৈরি হয়। প্রয়োজন অনুসারে এতে খসখসে পদার্থ, আকর্ষণীয় রং বা সুগন্ধিও মেশানো হয়। অধিকাংশ আধুনিক ইরেজার পেট্রোলিয়ামজাত কেমিক্যাল থেকে তৈরি হয়, যা ‘সিন্থেটিক রাবার’ নামে পরিচিত। এটি বেশ টেকসই এবং বিভিন্ন আকৃতিতে তৈরি করা যায়। তবে কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি হওয়ায় ভুলেও ইরেজার মুখে নেওয়া উচিত নয়।   প্রকৃত বন্ধু সেই, যে ভালো বিষয়গুলো গ্রহণ করার পাশাপাশি ভুলগুলোও শুধরে দিতে পারে। ইরেজারের কল্যাণে আমরা বুঝতে পারি—ভুল হলেই থেমে যেতে হয় না। মানসিকভাবে দৃঢ় হলে অনেক ভুলই শুধরানো যায়। ইরেজার ঠিক যেন ভুল শুধরানোর এক জাদুকর বন্ধু। ইরেজার আমাদের শেখায়—ভুল থেকে কীভাবে শিক্ষা নিতে হয় এবং প্রতিটি ধাপে কীভাবে এগিয়ে যেতে হয়। (লেখাটি মাসিক কুঁড়িতে প্রকাশিত)       ভিন্ন স্বাদের গল্প

ব্যাঙের সমুদ্র দেখা
গল্প, নির্বাচিত লেখা, হাসির গল্প

ব্যাঙের সমুদ্র দেখা

ব্যাঙের সমুদ্র দেখা সুকুমার রায় (জাপানী গল্প) গ্রামের ধারে কবেকার পুরান এক পাতকুয়োর ফাটলের মধ্যে কোলাব্যাং তার পরিবার নিয়ে থাকত। গ্রামের মেয়েরা সেখানে জল তুলতে এসে যেসব কথাবার্তা বলত কোলাব্যাঙ তার ছেলেদের সেইসব কথা বুঝিয়ে দিত—আর ছেলেরা ভাবত ‘ইস্‌! বাবা কত জানে!’ একদিন সেই মেয়েরা সমুদ্রের কথা বলতে লাগল। ব্যাঙের ছানারা জিজ্ঞাসা করল—”হ্যাঁ বাবা! সমুদ্র কাকে বলে?” ব্যাঙ খানিক ভেবে বলল, “সমুদ্র? সে একরকম জন্তুর নাম।” তখন একটা ছানা বলল—”ওরা যে বলছিল সমুদ্র খুব ভয়ানক বড় হয়, আর তার মধ্যে অনেক জল থাকে—আর লোকেরা সাঁতার কেটে তা পার হতে পারে না।” তখন কোলাব্যাঙ মুশকিলে পড়ল। সে গাছপালা দেখেছে, বাড়িঘর দেখেছে—মানুষ কুকুর ঘটি বাটি নানারকম জিনিসপত্র দেখেছে, আর ছেলেবেলায় অনেকরকম জিনিসের গল্প শুনেছে। কিন্তু সমুদ্রের কথা ত কখন শোনেনি! তখন সে ভাবল সমুদ্রের কথা একটু খোঁজ করে দেখতে হবে। পরদিন সকালে উঠেই কোলাব্যাঙ তার ছাতা পোঁটলা নিয়ে বলল, “আমি সমুদ্রের সন্ধান করতে যাচ্ছি।” তার গিন্নী কত কাঁদল, ছেলেরা নানারকম সুর করে তাকে বারণ করল কিন্তু কোলাব্যাঙ বলল, “না, এতে আমার জ্ঞানলাভ হবে—তোমরা বাধা দিও না।” এই বলে সে পাতকুয়ো থেকে উঠে একটা মাঠের দিকে চলল। ব্যাঙ বাইরে এসেই দেখে মানুষ কুকুর গরু তারা কেউ তার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে চলে না—তাই দেখে সে ভাবল ‘লাফিয়ে চললে সবাই আমায় বেকুব ভাববে।’ এই ভেবে সে হেঁটে হেঁটে চলতে লাগল। কিন্তু অমন করে চলে ত তার অভ্যাস নেই—খানিক গিয়েই তার ভারই পরিশ্রম বোধ হল। মাঠের ওপারে আর এক গ্রামের কাছে এক গর্তের মধ্যে মেতে ব্যাঙদের বাসা ছিল। মেটে ব্যাঙেরাও সমুদ্রের কথা শুনেছে, তাই তাদের মধ্যে একজন বেরিয়েছে সমুদ্রটা দেখতে। মাঝখানে দুই ব্যাঙের দেখা হল। কোলাব্যাঙ বলল, “আমি ফাটল-কুয়োর কোলাব্যাঙ, যাচ্ছি সমুদ্রে।” মেটে ব্যাঙ বলল, “আমি মেঠো-ব্যাঙ, আমিও যাচ্ছি সমুদ্রে।” তখন তাদের ভারি ফূর্তি হল। কিন্তু সমুদ্রে যাবার পথ ত তারা জানে না। মাঠের মধ্যে একটা মস্ত ঢিপি ছিল; মেটে ব্যাঙ বলল, “ওর উপরে উঠে দেখি ত কিছু দেখা যায় কিনা।” এই বলে তারা অনেক কষ্টে সেই ঢিপির উপর চড়ে সেখান থেকে একটা গ্রাম দেখতে পেল। মেটে ব্যাঙ বলল, “আরে দুর ছাই! এরকম ত ঢের দেখেছি! আমার বাড়ির কাছেই ত অমন আছে।” কোলাব্যাঙ বলল, “তাই ত! আমিও ছেলেবেলা থেকে ওরকম কত দেখেছি। সব জায়গাই দেখছি একরকম। মিছামিছি আমরা হেঁটে মরলাম।” তখন তারা ভারই বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। কোলাব্যাঙ তার ছানাদের বলল, “সমুদ্র টমুদ্র কিছু নেই—ওসব মিছে কথা!”

পথহারা
কবিতা

পথহারা

পথহারা কাজী নজরুল ইসলাম বেলা শেষে উদাস পথিক ভাবে, সে যেন কোন অনেক দূরে যাবে – উদাস পথিক ভাবে। ‘ঘরে এস’ সন্ধ্যা সবায় ডাকে, ‘নয় তোরে নয়’ বলে একা তাকে; পথের পথিক পথেই বসে থাকে, জানে না সে কে তাহারে চাবে। উদাস পথিক ভাবে। বনের ছায়া গভীর ভালোবেসে আঁধার মাথায় দিগবধূদের কেশে, ডাকতে বুঝি শ্যামল মেঘের দেশে শৈলমূলে শৈলবালা নাবে – উদাস পথিক ভাবে। বাতি আনি রাতি আনার প্রীতি, বধূর বুকে গোপন সুখের ভীতি, বিজন ঘরে এখন সে গায় গীতি, একলা থাকার গানখানি সে গাবে – উদাস পথিক ভাবে। হঠাত্‍ তাহার পথের রেখা হারায় গহন বাঁধায় আঁধার-বাঁধা কারায়, পথ-চাওয়া তার কাঁদে তারায় তারায় আর কি পূবের পথের দেখা পাবে উদাস পথিক ভাবে।     বাংলা কবিতা

কবিতা

অভিশাপ

অভিশাপ কাজী নজরুল ইসলাম যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে! অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুঁছবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে। ছবি আমার বুকে বেঁধে পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে ফিরবে মরু কানন গিরি, সাগর আকাশ বাতাশ চিরি’ যেদিন আমায় খুঁজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! স্বপন ভেঙ্গে নিশুত রাতে, জাগবে হঠাৎ চমকে’ কাহার যেন চেনা ছোঁয়ায় উঠবে ও-বুক ছমকে’- জাগবে হঠাৎ চমকে’! ভাববে বুঝি আমিই এসে বসনু বুকের কোলটি ঘেঁষে ধরতে গিয়ে দেখবে যখন- শুন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন! বেদনাতে চোখ বুঁজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিঁড়ে আসবে যখন কান্না, বলবে সবাই- “সেই যে পথিক তার শোনানো গান না?-” আসবে ভেঙ্গে কান্না! প’ড়বে মনে আমার সোহাগ, কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ! পড়বে মনে আমার ফাঁকি অশ্রু-হারা কঠিন আঁখি ঘন ঘন মুছবে, বুঝবে সেদিন বুঝবে! আবার যেদিন শিউলী ফু’টে ভরবে তোমার অঙ্গন, তুলতে সে-ফুল গাঁথতে মালা, কাঁপবে তোমার কঙ্কণ- কাঁদবে কুটীর -অঙ্গন, শিউলী ঢাকা মোর সমাধি প’ড়বে মনে উঠবে কাঁদি’! বুকের মালা ক’রবে জ্বালা, চোখের জলে সেদিন বালা মুখের হাসি ঘুচবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! আসবে আবার আশিন হাওয়া, শিশির-ছেঁচা রাত্রি, থাকবে সবাই- থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রী! আসবে শিশির-রাত্রি! থাকবে পাশে বন্ধু-স্বজন, থাকবে রাত বাহুর বাধন, বঁধুর বুকের পরশনে আমার পরশ আনবে মনে- বিষিয়ে ও-বুক উঠবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! আসবে তোমার শীতের রাতি, আসবে না ক’ আর সে- তোমার সুখে পড়ত বাঁধা থাকলে যে-জন পার্শ্বে, আসবে না ক’ আর সে, পড়বে মনে, মোর বাহুতে মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে, মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়!- সেই স্মৃতি নিত এ-বিছানায় কাঁটা হয়ে ফুটবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে। আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে, সেই তরীতে হয়তো কেহ থাকবে তোমার সঙ্গে- দুলবে তরী রঙ্গে। প’ড়বে মনে, সে কোন রাতে এক তরীতে ছিলে সাথে, এমনি গাঙে ছিল জোয়ার নদীর দু’ধার এমনি আঁধার তেমনি তরী ছুটবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে। তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ, আমার মত কেঁদে কেঁদে হয়তো হবে অন্ধ- সখার কারা-বন্ধ! বন্ধু তোমার হানবে হেলা, ভাঙ্গবে তোমার সুখের মেলা; দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর, বইতে প্রাণের শ্রান্ত এ-ভার মরণ-সনে বুঝবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে। ফুটবে আবার দোলন-চাঁপা, চৈতি-রাতের চাঁদনী, আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদনি- চৈতী-রাতের চাঁদনী। ঋতুর পরে ফিরবে ঋতু, সেদিন হে-মোর সোহাগ-ভীতু! চাইবে কেঁদে নীল নভোগা’য় আমার মতন চোখ ভ’রে চায় যে-তারা, তায় খুঁজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! আসবে ঝড়ি, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন কাঁপবে কুটীর সেদিন ত্রাসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন- টুটবে যবে বন্ধন! পড়বে মনে, নেই সে সাথে বাধতে বুকে দুঃখ- রাতে।- আপনি গালে যাচবে চুমা, চাইবে আদর, মাগবে ছোঁওয়া, আপনি যেচে চুমবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! আমার বুকের যে কাঁটা ঘা তোমায় ব্যথা হানত, সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়তো হ’য়ে শ্রান্ত- আসব তখন পান্থ। হয়তো তখন আমার কোলে সোহাগ লোভে প’ড়বে ঢ’লে, আপনি সেদিন সেধে-কেঁদে চাপবে বুকে বাহুয় বেঁধে, চরন চু’মে পূজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে !     বিখ্যাতদের লেখা কবিতা

সাম্যবাদী
কবিতা

সাম্যবাদী

সাম্যবাদী কাজী নজরুল ইসলাম গাহি সাম্যের গান— যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম ক্রিশ্চান। গাহি সাম্যের গান! কে তুমি?— পার্সি? জৈন? ইহুদি? সাঁওতাল, ভীল, গারো? কন্ফুসিয়াস্? চার্বাক— চেলা? বলে যাও, বল আরও! বন্ধু, যা খুশি হও, পেটে-পিঠে, কাঁধে-মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও, কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক— জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থ-সাহেব পড়ে যাও যত সখ,— কিন্তু কেন এ পণ্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল? দোকানে কেন এ দর-কষাকষি?— পথে ফোটে তাজা ফুল! তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান, সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ! তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার, তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকলের দেবতার। কেন খুঁজে ফের দেবতা-ঠাকুর মৃত-পুথি-কঙ্কালে? হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে! বন্ধু, বলিনি ঝুট, এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন, বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা-ভবন, মস্জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়, এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়। এই রণ-ভূমে বাঁশির কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা, এই মাঠে হলো মেষের রাখাল নবিরা খোদার মিতা। এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি। এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান, এইখানে বসি গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান! মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নাই।     জোনাকিরা কবিতা

খোকার বন্ধু এলিয়েন ছবি: দৈনিক দেশ রূপান্তর
গল্প, শিশু সাহিত্য

খোকার বন্ধু এলিয়েন

খোকার বন্ধু এলিয়েন প্রিন্স মাহমুদ হাসান   তোমরা খোকাকে হয়তো চিনবে না। সে ক্লাস ফোরে পড়ে। জঙ্গলের পথ ধরে খোকাদের স্কুল। ওই পথ ধরেই খোকা প্রতিদিন স্কুলে যায়। জঙ্গলের পথ পেরুতেই সে ও তার কয়েকজন বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে স্কুলে যায়। খোকা খুব সাহসী ছেলে। তাই তার বাবা-মা তার একা একা স্কুলে যাওয়া নিয়ে চিন্তা করে না। সেদিন খুব বৃষ্টি পড়ছিল। খোকা ও তার বন্ধুরা ভাবল এমন বৃষ্টিতে ছাতা নিয়ে বাসায় যেতে চাওয়া বৃথা, ভিজে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে সেটা তাদের জন্যই ভালো হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ, তারা বৃষ্টির পরই বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কিন্তু ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। হাঁটতে হাঁটতে খোকা ও তার বন্ধুরা প্রায় জঙ্গলের কাছে চলে এলো। খোকার বন্ধুরা খোকাকে এগিয়ে দিতে চাইলেও খোকা রাজি না হওয়ায় তারা যে যার বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগল। খোকা জঙ্গলের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল।হঠাৎ সে অদ্ভুত একটা শব্দ শুনে থমকে দাঁড়াল। খোকা ‍সাহসী ছেলে হলেও সে শব্দ শুনে ভয় পেয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে জঙ্গলের ভেতরে তাকাতেই খেয়াল করল অদ্ভুত ও ছোট আকৃতির একটা প্রাণী তাকে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে দেখছে। খোকা সাহসী হলেও সে এবার সত্যিই ভয় পাচ্ছে। কিছুক্ষণ ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে খেয়াল করল প্রাণীটি তার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করছে না। খোকা এবার ভয় না পেয়ে ধীরে ধীরে প্রাণীটির কাছে এগিয়ে যেতে থাকল। প্রাণীটির কাছে যাওয়ার পর সে আরও খেয়াল করল প্রাণীটির দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। খোকার এটা দেখে খুব মায়া হলো। সে প্রাণীটির আরও কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ?’ প্রাণীটি আকাশের দিকে ইশারা করে জোরে জোর কাঁদতে শুরু করল। এতে খোকার বুঝতে আর বাকি রইল না যে, প্রাণীটি এই পৃথিবীর কেউ নয়, প্রাণীটি এলিয়েনের বাচ্চা। খোকা এলিয়েনের বাচ্চাটিকে অভয় দিয়ে তার ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে বাসায় নিয়ে আসলো। কিছুদিন যেতেই এলিয়েনের বাচ্চাটির সঙ্গে খোকার বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। খোকা এলিয়েনের বাচ্চাটিকে ব্যাগের ভেতরে নিয়ে প্রতিদিন স্কুলে আসা যাওয়া করে। সে ধীরে ধীরে এলিয়েনের ভাষা রপ্ত করতে শুরু করল। একদিন সে স্কুল থেকে আসার পর খেয়াল করল এলিয়েনের বাচ্চাটি কার যেন একটি পেন্সিল চুরি করে নিয়ে এসেছে। খোকা তার খাটের নিচে তাকিয়ে খেয়াল করল অনেকগুলো পেন্সিল আর ইরেজার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেগুলোর কোনোটাই তার নয়। বাবার কাছে খোকা শুনেছে চুরি করা মহাপাপ। তার প্রিয় বন্ধুটি এভাবে চুরি করে অন্যের জিনিস নিয়ে আসবে তা সে কখনোই কল্পনা করেনি। প্রিয় বন্ধুর এমন কর্মকান্ডে সে খুবই দুঃখ পেল। খোকা চিন্তা করতে থাকল তার প্রিয় বন্ধুটিকে কীভাবে ভালো পথে ফিরিয়ে আনা যায়। সে এলিয়েনের বাচ্চাটিকে মানুষের যত ভালো গুণাগুণ আছে সেই বিষয়ে শিক্ষা দিতে শুরু করল। এলিয়েনের বাচ্চাটিও ধীরে ধীরে মানুষের সব ভালো গুণগুলো রপ্ত করতে থাকল। সে তার চুরি করা সব পেন্সিল ও ইরেজার জাদু দিয়ে আবার সবার ব্যাগে ফিরিয়ে দিল। খোকা এতে খুব খুশি হয়ে এলিয়েনের বাচ্চাটিকে তার প্রিয় কিছু চকলেট উপহার দিল। এর ফলে এলিয়েনের বাচ্চাটি খুব খুশি হয়ে খোকাকে জড়িয়ে ধরল। একদিন রাতে খোকা হঠাৎ খেয়াল করল এলিয়েনের বাচ্চাটি খাটের নিচে এক কোনায় গিয়ে কান্না করছে। খোকা বাচ্চাটিকে সেখান থেকে কুড়িয়ে এনে তার বিছানার ওপর রাখল। খোকা বাচ্চাটিকে তার কান্নার কারণ জানতে চাইলে সে বলল, ‘আমি সৌরজগতের বামন গ্রহ এরিস থেকে এসেছি। সেখানে আমি খুব দুষ্টামি করতাম। দুষ্টামি করার সময় খেলোচ্ছলে প্রায়ই বিভিন্ন অপরাধ করে ফেলতাম। যেগুলো আমার কাছে অপরাধ মনে হতো না। যার শাস্তিস্বরূপ আমাকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজ এরিস গ্রহ থেকে সিগন্যাল এসেছে তারা আমার ভালো হয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছে। তাই তারা আমার সব অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছে এবং এরিসের রাজা আবার আমাকে ওই গ্রহে থাকার অনুমতি দিয়েছেন। খোকা বলল, ‘সেটা তো ভালো খবর কিন্তু তুমি মন খারাপ করছ কেন? এতে তো তোমার খুশি হওয়ার কথা।’ ‘খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু সেখানে তো তোমার মতো এমন ভালো বন্ধু পাবো না। তোমার কারণেই তো আমি আমার গ্রহে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছি।’ ‘তুমি যদি সেখানে গিয়ে সৎ থাকো তাহলে তোমার ভালো বন্ধুর অভাব হবে না। সেখানে সবাই আমার মতো তোমাকে আপন করে নেবে। তখন সবাই তোমার সঙ্গে খেলবে, একসঙ্গে হাসবে, এমনকি দুঃখের দিনেও তোমার পাশে থাকবে।’ খোকার কথা শুনে এলিয়েনের বাচ্চাটির যেন আরও কান্না পাচ্ছে। সে কিছুতেই তার এমন ভালো বন্ধুকে হারাতে চায় না কিন্তু তার মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ে। তার মা-বাবার কাছে যেতে হলে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সে খোকাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি তোমার ঋণ কখনো ভুলব না। তোমার মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। তোমাকে ছেড়ে আমাকে যেতেই হচ্ছে। আমাকে ক্ষমা করে দিও। আশা করি শিগগিরই তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে।’ খোকা তখন আর কোনো কথা বলতে পারছিল না। তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল। পরদিন সন্ধ্যাবেলায় খোকা এলিয়েনের বাচ্চাটিকে নিয়ে জঙ্গলে চলে গেল। হঠাৎ কোথা থেকে ছোট একটা স্পেসশিপ উড়ে এলো। জঙ্গলের মাঝখানে একটা খালি জায়গায় স্পেসশিপটা অবতরণ করতেই দুটি এলিয়েন পৃথিবীর মাটিতে পা রাখল। এলিয়েনের বাচ্চাটি খোকাকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরে বিদায় জানিয়ে এলিয়েনদের কোলে উঠে পড়ল। তাকে বিদায় জানাতে খোকার খুব কষ্ট হচ্ছিল। সে তার জন্মদিনে বাবার কাছ থেকে উপহার পাওয়া প্রিয় একটি কলম এলিয়েনের বাচ্চাটিকে উপহার দিল। এলিয়েনের বাচ্চাটি স্পেসশিপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্পেসশিপের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। দরজা বন্ধ হতেই স্পেসশিপটি দ্রুত শূন্যে ভেসে অদৃশ্য হয়ে গেল। খোকা আকাশে তাকিয়ে তাকিয়ে প্রিয় বন্ধুটিকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানাল। খোকা প্রতিদিন বাড়ি ফেরার সময় এলিয়েনের বাচ্চাটিকে দেখার আশা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ জঙ্গলে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু তার প্রিয় বন্ধুটি আর আসে না।   (গল্পটি দৈনিক দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত)     লেখকের আরও গল্প

Scroll to Top