খোকার বন্ধু এলিয়েন

প্রিন্স মাহমুদ হাসান

 

তোমরা খোকাকে হয়তো চিনবে না। সে ক্লাস ফোরে পড়ে। জঙ্গলের পথ ধরে খোকাদের স্কুল। ওই পথ ধরেই খোকা প্রতিদিন স্কুলে যায়।

জঙ্গলের পথ পেরুতেই সে ও তার কয়েকজন বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে স্কুলে যায়। খোকা খুব সাহসী ছেলে।

তাই তার বাবা-মা তার একা একা স্কুলে যাওয়া নিয়ে চিন্তা করে না।

সেদিন খুব বৃষ্টি পড়ছিল। খোকা ও তার বন্ধুরা ভাবল এমন বৃষ্টিতে ছাতা নিয়ে বাসায় যেতে চাওয়া বৃথা,

ভিজে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে সেটা তাদের জন্যই ভালো হবে।

যেমন ভাবা তেমন কাজ, তারা বৃষ্টির পরই বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কিন্তু ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা।

হাঁটতে হাঁটতে খোকা ও তার বন্ধুরা প্রায় জঙ্গলের কাছে চলে এলো।

খোকার বন্ধুরা খোকাকে এগিয়ে দিতে চাইলেও খোকা রাজি না হওয়ায় তারা যে যার বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগল।

খোকা জঙ্গলের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল।হঠাৎ সে অদ্ভুত একটা শব্দ শুনে থমকে দাঁড়াল। খোকা ‍সাহসী ছেলে হলেও সে শব্দ শুনে ভয় পেয়ে গেল।

ভয়ে ভয়ে জঙ্গলের ভেতরে তাকাতেই খেয়াল করল অদ্ভুত ও ছোট আকৃতির একটা প্রাণী তাকে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে দেখছে।

খোকা সাহসী হলেও সে এবার সত্যিই ভয় পাচ্ছে। কিছুক্ষণ ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে খেয়াল করল প্রাণীটি তার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করছে না।

খোকা এবার ভয় না পেয়ে ধীরে ধীরে প্রাণীটির কাছে এগিয়ে যেতে থাকল।

প্রাণীটির কাছে যাওয়ার পর সে আরও খেয়াল করল প্রাণীটির দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। খোকার এটা দেখে খুব মায়া হলো।

সে প্রাণীটির আরও কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ?’

প্রাণীটি আকাশের দিকে ইশারা করে জোরে জোর কাঁদতে শুরু করল। এতে খোকার বুঝতে আর বাকি রইল না যে,

প্রাণীটি এই পৃথিবীর কেউ নয়, প্রাণীটি এলিয়েনের বাচ্চা।

খোকা এলিয়েনের বাচ্চাটিকে অভয় দিয়ে তার ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে বাসায় নিয়ে আসলো।

কিছুদিন যেতেই এলিয়েনের বাচ্চাটির সঙ্গে খোকার বন্ধুত্ব গড়ে উঠল।

খোকা এলিয়েনের বাচ্চাটিকে ব্যাগের ভেতরে নিয়ে প্রতিদিন স্কুলে আসা যাওয়া করে।

সে ধীরে ধীরে এলিয়েনের ভাষা রপ্ত করতে শুরু করল। একদিন সে স্কুল থেকে আসার পর খেয়াল করল এলিয়েনের বাচ্চাটি কার যেন একটি পেন্সিল চুরি করে নিয়ে এসেছে।

খোকা তার খাটের নিচে তাকিয়ে খেয়াল করল অনেকগুলো পেন্সিল আর ইরেজার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

যেগুলোর কোনোটাই তার নয়। বাবার কাছে খোকা শুনেছে চুরি করা মহাপাপ।

তার প্রিয় বন্ধুটি এভাবে চুরি করে অন্যের জিনিস নিয়ে আসবে তা সে কখনোই কল্পনা করেনি।

প্রিয় বন্ধুর এমন কর্মকান্ডে সে খুবই দুঃখ পেল। খোকা চিন্তা করতে থাকল তার প্রিয় বন্ধুটিকে কীভাবে ভালো পথে ফিরিয়ে আনা যায়।

সে এলিয়েনের বাচ্চাটিকে মানুষের যত ভালো গুণাগুণ আছে সেই বিষয়ে শিক্ষা দিতে শুরু করল।

এলিয়েনের বাচ্চাটিও ধীরে ধীরে মানুষের সব ভালো গুণগুলো রপ্ত করতে থাকল।

সে তার চুরি করা সব পেন্সিল ও ইরেজার জাদু দিয়ে আবার সবার ব্যাগে ফিরিয়ে দিল।

খোকা এতে খুব খুশি হয়ে এলিয়েনের বাচ্চাটিকে তার প্রিয় কিছু চকলেট উপহার দিল।

এর ফলে এলিয়েনের বাচ্চাটি খুব খুশি হয়ে খোকাকে জড়িয়ে ধরল।

একদিন রাতে খোকা হঠাৎ খেয়াল করল এলিয়েনের বাচ্চাটি খাটের নিচে এক কোনায় গিয়ে কান্না করছে।

খোকা বাচ্চাটিকে সেখান থেকে কুড়িয়ে এনে তার বিছানার ওপর রাখল।

খোকা বাচ্চাটিকে তার কান্নার কারণ জানতে চাইলে সে বলল, ‘আমি সৌরজগতের বামন গ্রহ এরিস থেকে এসেছি। সেখানে আমি খুব দুষ্টামি করতাম।

দুষ্টামি করার সময় খেলোচ্ছলে প্রায়ই বিভিন্ন অপরাধ করে ফেলতাম। যেগুলো আমার কাছে অপরাধ মনে হতো না।

যার শাস্তিস্বরূপ আমাকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজ এরিস গ্রহ থেকে সিগন্যাল এসেছে তারা আমার ভালো হয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছে।

তাই তারা আমার সব অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছে এবং এরিসের রাজা আবার আমাকে ওই গ্রহে থাকার অনুমতি দিয়েছেন।

খোকা বলল, ‘সেটা তো ভালো খবর কিন্তু তুমি মন খারাপ করছ কেন? এতে তো তোমার খুশি হওয়ার কথা।’

‘খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু সেখানে তো তোমার মতো এমন ভালো বন্ধু পাবো না।

তোমার কারণেই তো আমি আমার গ্রহে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছি।’

‘তুমি যদি সেখানে গিয়ে সৎ থাকো তাহলে তোমার ভালো বন্ধুর অভাব হবে না।

সেখানে সবাই আমার মতো তোমাকে আপন করে নেবে। তখন সবাই তোমার সঙ্গে খেলবে, একসঙ্গে হাসবে, এমনকি দুঃখের দিনেও তোমার পাশে থাকবে।’

খোকার কথা শুনে এলিয়েনের বাচ্চাটির যেন আরও কান্না পাচ্ছে।

সে কিছুতেই তার এমন ভালো বন্ধুকে হারাতে চায় না কিন্তু তার মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ে।

তার মা-বাবার কাছে যেতে হলে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সে খোকাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

‘আমি তোমার ঋণ কখনো ভুলব না। তোমার মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। তোমাকে ছেড়ে আমাকে যেতেই হচ্ছে।

আমাকে ক্ষমা করে দিও। আশা করি শিগগিরই তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে।’

খোকা তখন আর কোনো কথা বলতে পারছিল না। তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল।

পরদিন সন্ধ্যাবেলায় খোকা এলিয়েনের বাচ্চাটিকে নিয়ে জঙ্গলে চলে গেল। হঠাৎ কোথা থেকে ছোট একটা স্পেসশিপ উড়ে এলো।

জঙ্গলের মাঝখানে একটা খালি জায়গায় স্পেসশিপটা অবতরণ করতেই দুটি এলিয়েন পৃথিবীর মাটিতে পা রাখল।

এলিয়েনের বাচ্চাটি খোকাকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরে বিদায় জানিয়ে এলিয়েনদের কোলে উঠে পড়ল।

তাকে বিদায় জানাতে খোকার খুব কষ্ট হচ্ছিল।

সে তার জন্মদিনে বাবার কাছ থেকে উপহার পাওয়া প্রিয় একটি কলম এলিয়েনের বাচ্চাটিকে উপহার দিল।

এলিয়েনের বাচ্চাটি স্পেসশিপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্পেসশিপের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হতেই স্পেসশিপটি দ্রুত শূন্যে ভেসে অদৃশ্য হয়ে গেল।

খোকা আকাশে তাকিয়ে তাকিয়ে প্রিয় বন্ধুটিকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানাল।

খোকা প্রতিদিন বাড়ি ফেরার সময় এলিয়েনের বাচ্চাটিকে দেখার আশা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ জঙ্গলে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু তার প্রিয় বন্ধুটি আর আসে না।

 

(গল্পটি দৈনিক দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত)

 

 

লেখকের আরও গল্প

শেয়ার করুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও লেখা:

Scroll to Top