স্বর্গ কার্ড, নরক কার্ড

সত্যজিৎ বিশ্বাস

জন্ম নিলে মরতে হবে। এটাই সায়েন্স। এই সায়েন্স মেনে পৃথিবীর বিভিন্ন শহরের মানুষ দলে দলে অক্কা পাচ্ছে।

এবং অক্কা পেয়ে যথারীতি ছক্কা মারার আশায় স্বর্গের গেটের সামনে বিরাট বড় লাইনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

লাইন বিরাট হওয়ার অন্য কোনো কারণ নেই। প্রায় সাড়ে আটশ কোটি মানুষের পৃথিবী।

স্বাভাবিক, অস্বাভাবিক, ঘটনায়, দুর্ঘটনায়, স্বেচ্ছায়, কিচ্ছায়—রোজ কম মানুষ তো উপরে চলে যাচ্ছে না।

উপরেও ঝক্কিঝামেলা কম না। চাইলেই তো আর স্বর্গে যাওয়া যায় না। ভাইভা পরীক্ষা দিতে হয়।

মৃত্যুর পর তাদের সেই ভাইভা পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ ক্ষমতাধারী এক কর্মকর্তা ইন্টারভিউ নিচ্ছে।

সেই ভাইভা পরীক্ষায় যারা পাস করছে, তারা ‘স্বর্গ কার্ড’ নিয়ে খুশিতে লাফাতে লাফাতে সোজা স্বর্গে ঢুকে যাচ্ছে।

আর যারা ফেল করছে, তারা চোখ ভিজিয়ে, গাল ফুলিয়ে ‘নরক কার্ড’ নিয়ে নরকে যাচ্ছে।

ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রথমজন ঢুকতেই সেই বিশেষ ক্ষমতাধারী কর্মকর্তার প্রশ্ন:

— কোথা থেকে এসেছ?
— আমি এসেছি অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহর থেকে।
— স্বর্গে যে ঢুকতে চাও, কী কী ভালো কাজ করেছ?
— আমি সত্যবাদী ছিলাম। যতদিন বেঁচে ছিলাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সব নিয়ম মেনে চলেছি। কারও সঙ্গে কখনো ঝগড়া-বিবাদ করিনি। কারও একটা টাকাও মেরে খাইনি।
— ব্যস, এটুকুই?
— এগুলো কি ভালো গুণ না?
— অবশ্যই ভালো গুণ। তা, এতগুলো ভালো গুণের অধিকারী হয়ে দিনে-রাতে স্রষ্টার নাম কয়বার নিতে? বেঁচে থাকতে কার জন্য কী কী করেছ?
— আসলে আমার শহরের সিস্টেম এমন যে, কাজ নিয়ে সব সময়ই ব্যস্ত থাকতে হয়। অন্য কিছু নিয়ে ভাববার সময় কই?

ব্যস, হাতে লাল কার্ড ধরিয়ে দিল সেই কর্মকর্তা। পৃথিবীর সেরা নগরের অধিবাসীটি ‘নরক কার্ড’ হাতে নিয়ে হতভম্ব হয়ে মাথা নিচু করে চলে গেল।

ইন্টারভিউ বোর্ডে তারপরের জন:

— আমি এসেছি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহর থেকে।
— স্বর্গে যাওয়ার জন্য তোমার কী যোগ্যতা আছে? বিশেষ ক্ষমতাধারী কর্মকর্তা প্রশ্ন করল।
— আমি যখন পৃথিবীতে ছিলাম, তখন কারও সঙ্গে চিটারি-বাটপারি করিনি, দলাদলি করিনি, খুন, জখম, ধর্ষণ, মারপিট—কিছুই করিনি।
— তাই?

— হুম। আমাদের শহরের স্বাস্থ্যসেবার মান এত ভালো, শিক্ষার মান এত ভালো, পরিবেশ এত সুন্দর, সংস্কৃতির দিক থেকে এত উন্নত, আমাদের সিস্টেম এত চমৎকার যে, এসব খারাপ কাজের চিন্তা মাথায়ই আসে না।
— তা, প্রতিটি ভালো কাজের সময় স্রষ্টাকে স্মরণ করার চিন্তা কতবার আসত মাথায়?
— না, মানে মানুষ তো সমস্যায় পড়লেই সবচেয়ে বেশি স্রষ্টার নাম স্মরণ করে। পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় কখনও কোনো সমস্যায় পড়িনি, তাই ডাকাও হয়নি।

কর্মকর্তা ‘লাল কার্ড’ বাড়িয়ে দিল। মেলবোর্নবাসী ব্যক্তিটি লাল কার্ড হাতে পেয়ে হতাশ হয়ে মাথা নিচু করে চলে গেল।

ইন্টারভিউ বোর্ডে তারপরের জন:

— আমি এসেছি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর থেকে।
— কোথা থেকে বললে? বলতে বলতেই সেই কর্মকর্তা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।
— ঢাকা শহর থেকে।
— এই যে নাও ‘স্বর্গ কার্ড’। এই যে ডানদিকে গেট। সোজা স্বর্গে চলে যাও। আচ্ছা, একটু দাঁড়াও। চলো, আমিই তোমাকে স্বর্গে দিয়ে আসি।

এই ঘটনা দেখে বাইরে তুমুল হইচই শুরু হয়ে গেল। অপেক্ষমাণরা চিৎকার করে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলল, “এটা কী হলো? এই লোককে কোনো প্রশ্ন না করেই স্বর্গ কার্ড দেওয়ার মানে কী? এ কেমন স্বজনপ্রীতি?”

বিশেষ ক্ষমতাধারী কর্মকর্তা কোনো কথা না শুনে ‘ঢাকা’ শহরবাসীকে স্বর্গের গেটে ঢুকিয়ে দিয়ে ফিরে এল।

এবার ক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে বলল, আগে আমার কথা শোন, তারপর তোমাদের প্রশ্ন থাকলে শুনব।

যে শহরের মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল করতে গিয়ে দেখে, কলে পানি নেই; চুলায় রান্না করতে গিয়ে দেখে,

গ্যাস নেই; বাসা থেকে বের হয়ে জ্যামের কারণে আধঘণ্টার রাস্তা দুই ঘণ্টাতেও পৌঁছাতে পারে না; রাস্তায় হাঁটতে গেলে খানাখন্দে উল্টে পড়ে দশবার; একটু বেশি বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই—ভেসে ভেসে, হেসে হেসে পথ পাড়ি দেয়;

সারাদিনের কাজ শেষে বিধ্বস্ত হয়ে বাসায় এসে দেখে, বিদ্যুৎ নেই; রাতে ঘুমাতে গেলে নিত্য যাদের মশার সঙ্গে চলে যুদ্ধ—তারা প্রতিটি কাজে স্রষ্টাকে কীভাবে স্মরণ করে, জানো? যে শহরের বাচ্চারা খেলার মাঠে খেলে বড় হওয়ার সুযোগ পায় না,

যুবকরা যুবতীদের সঙ্গে ফুটপাথে পাশাপাশি হাঁটার জায়গা পায় না, বয়স্করা বাসার সামনে হাঁটার জায়গা পায় না—তারপরও সে শহরের বাচ্চা, জোয়ান, বুড়োদের যাপিত জীবন নিয়ে এতটুকুও প্রতিবাদ নেই।

দিব্যি সয়ে যায় সব। এ শহরের মানুষেরা বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে একে অপরের সঙ্গে লেপ্টে থেকেও কারও ওপর কোনো অভিযোগ করে না, হাসিমুখে ঝুলতে থাকে।

এবার তোমরাই বলো, যে শহর দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায়, ঘনবসতির তালিকায়, অবাসযোগ্য শহরের তালিকায় আজীবন

শীর্ষস্থান দখল করে থাকে, সেই নরকে কাটানো মানুষদের নতুন করে নরকে পাঠানোর দরকার আছে? ইন্টারভিউ নেওয়ার দরকার আছে?

সেরা সেরা শহরের অপেক্ষমাণ জনতা মাথা নিচু করে উত্তর খোঁজে।

 

আরও বাংলা গল্প পড়ুন

শেয়ার করুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও লেখা:

Scroll to Top