পাহাড়ের ভেতর লুকানো আলো
রানা জামান
বান্দরবান—নামটা শুনলেই কানে ভেসে আসে ঝিরিঝিরি ঝর্ণার শব্দ, পাহাড়ি পাখির ডাক আর অচেনা ভাষায় বলা হাসির সুর। শহরের ব্যস্ততা, ধোঁয়া আর কংক্রিটের ভিড় থেকে পালিয়ে আসা মানুষের কাছে এই জায়গাটা শুধু ভ্রমণ নয়, যেন আত্মার এক পুনর্জন্ম।
আরিফ ঠিক সেই কারণেই এসেছে এখানে। তার জীবনে এক অদ্ভুত ক্লান্তি তাকে গ্রাস করেছে অনেক দিন ধরে। ঢাকা শহরের এক কর্পোরেট অফিসে কাজ করতে করতে সে নিজের ভেতরের মানুষটাকেই হারিয়ে ফেলেছিল, এমনটা মনে হচ্ছিল ওর। সবকিছু ছিল-ভালো বেতন, গাড়ি, ফ্ল্যাট-তবু কোথাও যেন একটা শূন্যতা ওকে গ্রাস করছিল ক্রমশ।
একদিন হঠাৎ করেই আরিফ সিদ্ধান্ত নিল-সবকিছু থেকে একটু দূরে যেতে হবে, বিশ্রাম প্রয়োজন ভিন্ন পরিবেশে। আর সেই দূরত্বের নাম হয়ে ওঠে বান্দরবান। এক রাতে চড়ে বসল বান্দরবানগামী স্লিপার কোচে। বাস এসে বান্দরবান শহরে পৌঁছাল পরদিন সকাল আটটায়।
আরিফ এর আগে অনেকবার বান্দরবান আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও আসা হয়ে ওঠেনি। এটাই ওর প্রথম বান্দরবানে পদার্পণ। বাস থেকে নামতেই ওর মনে হলো-এ যেন অন্য এক পৃথিবী। বাতাসে একটা স্বচ্ছতা, যা ঢাকা শহরে পাওয়া যায় না। চারদিকে সবুজ পাহাড় আর সেই পাহাড়ের কোলে ছোট ছোট গ্রাম।
হোটেলে উঠে সকাল ন’টায় নাস্তা সেরে আরিফ বেরিয়ে পড়ল। স্থানীয় একজন গাইড-লালথাং-তার সঙ্গে যোগ দিল। লালখাং মারমা সম্প্রদায়ের ছেলে। তার চোখে ছিল একধরনের সরলতা আর কথায় ছিল পাহাড়ের মতো গভীরতা। লালথাং জিজ্ঞেস করল, “আপনি ঢাকা থেকে এসেছেন, তাই না?”
আরিফ মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ ব্রাদার। একটু শান্তি পেতে “
লালথাং মাথা নেড়ে বলল, “শান্তি পেতে হলে পাহাড়ের ভাষা বুঝতে হবে আগে দাদা।”
এই কথাটা আরিফের মনে দাগ কাটল বেশ। ওরা পাশাপাশি হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা চলে গেল এক পাহাড়ি গ্রামে। সেখানে দেখা হলো এক বয়স্কা মহিলার সঙ্গে-নাম নাইংমেই। তিনি বসে বসে তাঁতে কাপড় বুনছিলেন। তাঁর হাতের নড়াচড়া ছিল একেবারে ঝানু শিল্পীর মতো।
আরিফ অবাক হয়ে দেখছিল ওঁর দুই হাতের কাব্যিক নড়াচড়া। হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, “হাতে বোনা তাঁতের কাপড়ে কি আপনার সংসার চলে?”
নাইংমেই হেসে বললেন, “হ্যাঁ, আমাদের জীবনের গল্প এই কাপড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”
নাইংমেই একটি নকশা দেখালেন। সেখানে পাহাড়, নদী আর মানুষের চিত্র ফুটে উঠেছে সুতোয় সুতোয়।
আরিফ বুঝতে পারল-এই মানুষগুলো হাতে চালানো তাঁতে শুধু বাঁচে না, তারা তাদের জীবনকে শিল্পে পরিণত করে।
লালথাং বলল, “আমাদের উৎসবগুলো দেখলে আপনি আরও অনেক কিছু বুঝতে পারবেন আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে।”
কয়েকদিন পরেই ছিল একটি স্থানীয় উৎসব। পুরো গ্রাম নানান রকম রঙে রঙিন হয়ে উঠল। মেয়েরা পরেছে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘থামি’ ও ‘আঙ্গি’। মারমা নারীরা কোমরে ‘থামি’ (একধরনের স্কার্ট) এবং ওপরে ‘আঙ্গি’ (কলারবিহীন জ্যাকেট) পরে থাকে। পুরুষরা লুঙ্গি ও শার্ট বা জ্যাকেট পরে এবং মাথায় পাগড়ি। ছেলেদের ঢোল বাজানোর তালে তালে মেয়েরা নেচে যাচ্ছিল ধীর লয়ে।
সন্ধ্যা নামতেই শুরু হলো নাচের আসল অনুষ্ঠান। আগুন জ্বালিয়ে তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে সবাই নেচে যাচ্ছিল। সেই নাচে ছিল ইতিহাস, প্রেম, যুদ্ধ আর বেঁচে থাকার গল্প 1
আরিফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল-সে যেন কোনো প্রাচীন সময়ের মধ্যে ঢুকে গেছে।
একসময় লালথাং তাকে বলল, “আপনিও নাচুন।”
প্রথমে একটু অস্বস্তি লাগলেও পরে সে নিজেকে ছেড়ে দিল। অচেনা মানুষদের সঙ্গে, অচেনা ভাষার মধ্যে থেকেও সে এক দারুণ সংযোগ অনুভব করল।
সেই রাতেই আরিফ বুঝতে পারল-সংস্কৃতি মানে শুধু গান, নাচ বা পোশাক নয়; এটা মানুষের আত্মার প্রকাশ। দিন যেতে লাগল। আরিফ ধীরে ধীরে এই পাহাড়ি জীবনের সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। সে দেখতে পেল-কীভাবে তারা প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। সকালে কাজ, বিকেলে বিশ্রাম, রাতে গল্প আর গান। কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো কৃত্রিমতা নেই।
একদিন আরিফ লালথাংকে জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের জীবনে কি কোনো দুঃখ নেই?”
লালথাং একটু চুপ করে থেকে বলল, “দুঃখ আছে, কিন্তু আমরা তাকে জীবনের অংশ হিসেবে নিয়ে থাকি। শহরের মানুষের মতো তাকে লুকিয়ে রাখি না।”
লালথাং-এর এই কথাগুলো আরিফকে গভীরভাবে নাড়া দিল। সে বুঝতে পারল-তার নিজের জীবনে সমস্যা ছিল না, ছিল দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। এক সন্ধ্যায়, পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিল আরিফ। আকাশ লাল হয়ে গেছে, নিচে সবুজ পাহাড় ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। তার মনে হলো-এই সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার নয়, হৃদয়ে ধারণ করার। সে সিদ্ধান্ত নিল-এই অভিজ্ঞতা সে নিজের মধ্যে রাখবে না। ঢাকায় ফিরে গিয়ে সে তার জীবনের ধরণ বদলাতে শুরু করল।
অফিসের কাজ করলেও সে এখন সময় বের করে লেখালেখি করে। বান্দরবানের মানুষ, তাদের সংস্কৃতি, তাদের জীবন-সবকিছু নিয়ে সে গল্প লিখতে শুরু করল । তার লেখাগুলো ধীরে ধীরে মানুষের কাছে পৌঁছাতে লাগল।
মানুষ জানতে পারল-বাংলাদেশের এক কোণে আছে এমন এক পৃথিবী, যেখানে মানুষ এখনো প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বেঁচে আছে, যেখানে সংস্কৃতি শুধু অতীত নয়, বর্তমানেরও অংশ।
একদিন লালথাংয়ের কাছ থেকে একটি চিঠি পেল আরিফ । তাতে লেখা:
“আপনি আমাদের গল্প লিখছেন শুনে খুব ভালো লাগছে। কিন্তু মনে রাখবেন, গল্প যেন শুধু শব্দ না হয়-হৃদয়ের স্পর্শ থাকে।”
চিঠিটা পড়ে আরিফ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে ছিল। সে বুঝতে পারল-বান্দরবান তাকে শুধু সৌন্দর্য দেখায়নি, তাকে নতুন করে মানুষ হতে শিখিয়েছে।
তার জীবনের শূন্যতা এখন আর নেই। কারণ সে জানে-যখনই ক্লান্ত লাগবে, সে চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাবে সেই পাহাড়, শুনতে পাবে সেই ঢোলের শব্দ আর অনুভব করবে সেই মানুষের আন্তরিকতা। বান্দরবান তার জন্য আর কোনো জায়গা নয়-এটা এখন তার ভেতরের এক স্থায়ী আলো।
এই বিভাগের আরও লেখা:
নীল খাম
স্বর্গ কার্ড, নরক কার্ড
উপলব্ধি