শিশু সাহিত্য

বিখ্যাতদের লেখা, শিশু সাহিত্য

এমন যদি হতো

এমন যদি হতো সুকুমার বড়ুয়া   এমন যদি হতো ইচ্ছে হলে আমি হতাম প্রজাপতির মতো নানান রঙের ফুলের পরে বসে যেতাম চুপটি করে খেয়াল মতো নানান ফুলের সুবাস নিতাম কতো । এমন হতো যদি পাখি হয়ে পেরিয়ে যেতাম কত পাহাড় নদী দেশ বিদেশের অবাক ছবি এক পলকের দেখে সবই সাতটি সাগর পাড়ি দিতাম উড়ে নিরবধি । এমন যদি হয় আমায় দেখে এই পৃথিবীর সবাই পেতো ভয় মন্দটাকে ধ্বংস করে ভালোয় দিতাম জগৎ ভরে খুশির জোয়ার বইয়ে দিতাম এই দুনিয়াময় । এমন হবে কি ? একটি লাফে হঠাৎ আমি চাঁদে পৌঁছেছি ! গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে দেখে শুনে ভালো করে লক্ষ যুগের অন্ত আদি জানতে ছুটেছি ।

লালকমল নীলকমল Bangla Golpo
গল্প, শিশু সাহিত্য

লালকমল নীলকমল

লালকমল নীলকমল সুব্রত দাস তোমরা তোনকা কে চেনো ? ওই যে সেন বাড়ির সেই দুষ্টুমিস্টি ছেলেটা গো। যার ভালো নাম রাজর্ষি সেন। ক্লাস সেভেনে পড়ে। ওদের বাড়ির রান্নাঘরে দুই বন্ধু থাকে। একটির নাম লালকমল। আরেকটি নীলকমল। দুটির মধ্যে খুব ভাব। লালুটা পড়েই থাকে সারাদিন। ওই রান্নাঘরে। নীলুটাই বাইরে বেরোয়। রাত সাড়ে দশটার সময় তোনকার বাবা রতনবাবুকে নিয়ে ফিরে আসে নীলু। তোনকার বাবা ওষুধের দোকানে কাজ করেন। দুপুর একটায় যান। রাতে বাড়ি ফেরেন নীলকমলে চ’ড়ে। তারপর বাড়ির সবার খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে যখন লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়েন, তারপর দুই বন্ধুর গল্প শুরু হয় রান্নাঘরে। লালকমল সারাদিন কেমন মন খারাপ অবস্থার মধ্যে থাকে। কেনই বা হবেনা, সেই কবে থেকে রান্নাঘরে জুবুথুবু হয়ে পড়ে আছে সে। এক দিন বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ ফটাস ক’রে পেছনের চাকা বাস্ট হয়ে গেল। বাড়ি ফিরতে দেরি হলো। কাজে যেতেও দেরি হলো সেদিন রতনবাবুর। যদিও সেদিন তোনকার স্কুলে যাওয়ার সাইকেল নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই থেকে লালকমল রান্নাঘরে বন্দী। রোজকার মতো আজকেও ফিরে এলো নীলকমল। লালুর একটু ঝিমুনি এসেছিলো। ঝড়াং ক’রে লালুর গায়ে প’ড়ে বললো, “কি রে, ঘুমোলি নাকি ? শিগগিরি ওঠ্, তোর জন্যে সুখবর আছে ! “ও, তাই ?” লালু বললো, ” তা আজকের সুখবরটা কী, শুনি !” “আজ আমাদের গিন্নি মা কত্তাবাবুরে খুব ক’রে দু’টো কথা শুনিয়ে ছেড়েছে। দুই দিনের মধ্যে তোকে যদি কত্তাবাবু না সারিয়ে তোলেন, তো গিন্নিমা সোজা বাপের বাড়ি চ’লে যাবেন, তাও আবার তোনকাকে নিয়ে।” লালু, মানে লালকমল আনন্দে ব’লে উঠলো, “সত্যি বলছিস?” “ওরে বাবা, হ্যা রে, আর তুই তো জানিস কত্তাবাবু গিন্নিমা ছাড়া এক পাও চলতে পারে না। আচ্ছা ঠিক আছে, কালকেই সারিয়ে দেবো ব’লে আমায় নিয়ে দে ছুট!” ফস ক’রে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লালু বললো, “রাখ তোর কত্তাবাবুর কথা, কতবারই সারাবার কথা উঠলো…. দেখবি এবারো ঠিক…..” লালুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে নীলু বললো, “নারে এবার ঠিক তোকে সারাবেই। গিন্নিমার রেগে যাওয়াতে কত্তাবাবু খুব ঘাবড়ে গিয়েছে। হারানের সাইকেলের দোকানে গিয়ে তোকে সারাবার জন্য কথা ব’লে এলো যে। দোকান থেকে এক ছোকরা কারিগর কাল সকালে তোকে নিতে আসবে।” লালু তো এসব শুনে আনন্দে আটখানা ! বাব্বা, কতদিন পর আবার লালু আগের মতো ঘুরে ফিরে বেড়াবে। কী যে আনন্দ হচ্ছে তার ! নীলুটা কি বুঝতে পারছে সব !     স্মেল রেকর্ডার-বাংলা গল্প  

শিশুতোষ গল্প রাতুলের বন্ধু
গল্প, শিশু সাহিত্য

রাতুলের বন্ধু

রাতুলের বন্ধু হুমায়ুন আবিদ রাতুল তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। স্কুল বন্ধ তাই সারাদিন পাড়ার বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা আর হৈচৈ করে সময় কাটানোই এখন তার কাজ। রাতুল কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছে একটি অচেনা মা কুকুর প্রতিদিন সকালে নাস্তার সময় এবং দুপুরে খাওয়ার সময় তাদের বাড়ির রান্না ঘরের সামনে এসে বসে থাকে। কেহো লাঠি দিয়ে আঘাত করলেও যায় না শুধু কু কু শব্দ করে, যেনো কিছু বলতে চায়। কুকুরটিকে খাবার মাটিতে দিলে খায় না কিন্তু কোন পলিথিন কিংবা শক্ত কোন প্যাকেটে দিলে তা মুখে নিয়ে দ্রুত কোথাই যেনো দৌড়ে চলে যায়। রাতুল মা কুকুরের এই অদ্ভুত আচরণের বিষয়টি নিয়ে খুব ভাবতে থাকে। রাতুল একদিন তার বন্ধু রানাকে মা কুকুরের অদ্ভুত আচরণের বিষয়টি খুলে বললে, রানা একটু চিন্তা করে  বললো, চল একদিন মা কুকুরের পেছন পেছন গিয়ে দেখি খাবারের প্যাকেট নিয়ে সে কোথাই যায়। রাতুল বললো, তাহলে আগামীকাল নাস্তার সময় আমাদের বাড়িতে চলে আয় তারপর দু’জন মিলে মা কুকুরের পেছন পেছন গিয়ে দেখবো সে কোথাই যায়। পরদিন যথাসময়ে রানা এসে হাজির হলে পরিকল্পনামত মা  কুকুরকে খাবারের প্যাকেট দিলো। মা কুকুর খাবারের প্যাকেটটি মুখে নিয়ে যখন দৌড়াতে লাগলো, চুপিচুপি রাতুল আর রানাও তখন মা ককুরের পেছন পেছন দৌড়াতে লাগলো। মা কুকুরটি এক সময় গ্রামের শেষ প্রান্তে রাস্তার পাশে একটি পুরোনো ভাঙ্গা বাড়ির মধ্যে ডুকে পড়লো। রাতুল আর রানাও সেই পুরনো ভাঙ্গা বাড়ির ভিতর ডুকে পড়লো। দু’জন মিলে খুঁজতে খুঁজতে দেখলো একটি পরিত্যক্ত ঘরের কোনার মধ্যে মা কুকুরটি  তার দুইটি ছোট বাচ্চাকে খাবারের প্যাকেট ছিড়ে দিচ্ছে আর বাচ্চা দুটোও মজা করে খাচ্ছে । হঠাৎ মা কুকুর রাতুল আর রানাকে দেখে কু কু করতে করতে লেজ নাড়াতে থাকলো। রাতুল আর রানা মা কুকুরের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে এলো। নাদুসনুদুস সুন্দর কুকুরের বাচ্চাদের প্রতি রাতুলের বেশ মায়া পড়ে গেলো। বাড়ি ফেরার পথে রাতুল রানাকে বললো, এখানে কুকুরের বাচ্চাদুটো নিরাপদ না, শিয়াল যদি একবার খুঁজ পায় তাহলে বাচ্চাদুটোকে মেরে খেয়ে ফেলবে। রানা বললো, তাহলে কি করা যায়। রাতুল বললো, বাচ্চাদুটোকে যদি আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি তাহলে কেমন হয়। রানা বললো, খুব ভালো হয়। রাতুল এবং রানা ফিরে এসেই তাদের বাড়ির পেছনে একটি পরিত্যাক্ত জায়গায় পুরাতন ইট দিয়ে সুন্দর একটি ঘর তৈরী করলো। পুরাতন ইট দিয়ে ঘর তৈরী করতে দেখে রাতুলের আম্মু জিজ্ঞেস করলো, তোমরা এই ছোট্ট ঘর কিসের জন্য তৈরী করেছো। রাতুল বললো, জানো আম্মু আমাদের বাড়িতে সকালে এবং দুপুরে যে মা কুকুরটি এসে খাবার নিয়ে যায় তার না দুটো সুন্দর বাচ্চা আছে। রাস্তার পাশে পুরাতন ভাঙ্গা বাড়িতে তারা থাকে। সেখানে শিয়াল যদি খুঁজ পায় তবে বাচ্চাদুটোকে মেরে খেয়ে ফেলবে তাই এখানে নিয়ে আসবো। মা বললো, বাচ্চা আনার সময় যদি মা কুকুর তোমাদের কাঁমড়ে দেয়। রাতুল বললো, মা কুকুরটি যখন আমাদের বাড়ি থেকে খাবার নিতে আসবে তখন গিয়ে বাচ্চাদুটোকে নিয়ে আসবো। ও হ্যাঁ আমরা না আসা পর্যন্ত কিন্তু মা কুকুরকে খাবারের প্যাকেট দেবে না। পরদিন সকালের নাস্তার সময় মা কুকুরটি রাতুলদের বাড়িতে আসলে, রাতুল আর রানা দৌড়ে গিয়ে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে আসে। তারপর খাবারের প্যাকেট দেখিয়ে মা কুকুরকে পুরাতন ইট দিয়ে তৈরী ঘরের সামনে নিয়ে আসে। মা কুকুরটি খাবারের প্যাকেট নিতে এসে বাচ্চাদের দেখে লেজ নাড়িয়ে কু কু করতে থাকে। তারপর থেকে বাচ্চাদুটো রাতুলদের বাড়িতেই বড় হতে থাকে। মা কুকুর এবং বাচ্চাদুটো রাতুলের খুব ভক্ত হয়ে যায়। রাতুল বাচ্চা দুটোর নাম দেয় রাজু এবং সাজু। রাতুল বাচ্চাদুটোকে রাজু, সাজু  বলে ডাকলেই দৌড়ে চলে আসে। রাতুল যেখানেই যায় রাজু-সাজু সেখানে গিয়ে হাজির হয়। রাজু- সাজু এখন পাড়ার বন্ধুদের মতোই রাতুলের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু।     গল্প

গল্প, শিশু সাহিত্য

পাখিদের মিতা

পাখিদের মিতা মোস্তাফিজুল হক   ভোর ছয়টা। দোয়েল শিস কাটছে। বাতাসে ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে। আলো ঝলমলে ভোর। তাই পাখিরাও সুর ধরেছে। চড়ুই, শালিক আর টুনটুনি কিচিরমিচির করছে। একটানা গেয়ে চলেছে ওরা। অপু একটা মাটির পেয়ালায় কিছু খুদ ঢেলে নিলো। তারপর বাগানে চলে গেল। খুদগুলো পাখিদের খাবার। রোজ সে এভাবেই খাবার ছিটিয়ে দেয়। তখন পাখিরা বাগানে নেমে আসে। চড়ুই, টুনটুনি, বুলবুলি, দোয়েল, বনছাতারে, হলদে পাখি এমনকি লাজুক ঘুঘুও নেমে আসে। তবে অপু ছাড়া আর কেউ থাকলে নামে না। তখন শুধু দোয়েল নামে। ফিঙেটার রাজকীয় ভাব। ওটা কখনও নামে না। ওটা যেন মাঠের রাজা। আয়েশ করে গরুছাগলের পিঠে বসে থাকে। তারপর উড়ে গিয়ে ফড়িং নয়তো পোকামাকড় ধরে। ভাবটা যেন এরকম- রাজা হয়ে কেন খুদকুঁড়ো খেতে যাব? অপু যেন পাখিদের ভাষা বোঝে। পাখিরাও হয়তো অপুকে বোঝে। তেজপাতা গাছের আড়ালে লুকিয়ে ডাকে ফটিকজল। ভীষণ চড়া গলা। চড়া হলেও খুব সুমধুর গলার সুর। অতটুকুন পাখি। টুনটুনির চেয়ে কিছুটা বড়। দুপুরে সুর ধরে গায়। তখন মনে হয় অপুকেই বলে, ‘কী খাইছ?’ আষাঢ়ের দুপুর। ভোরেই মেঘ ঝরেছে। তবে তাপ একটুও কমেনি। ভীষণ গরম। হাঁসফাঁস করছিল অপু। কদম গাছের ছায়ায় এসে বসল সে। হঠাৎ করেই ওর নজর পড়ল একটা পাখি। ‘ইস্! কী মায়াবী পাখি। টকটকে লাল ঠোঁট। বড় দুটো গোলগাল চোখ। সবুজ পালক। ভোঁতা ভোঁতা ঠোঁটে কিছুটা লাজুক লাজুক…’ ‘এই যে, আমাকে নিয়ে ভাবছো?’ অপু অবাক হয়ে মনে মনে বলল, ‘এ যে কথা বলা পাখি!’ এই অপু, আমি নেচে নেচে গোসল করব। দেখবে তুমি? অপুর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না। বেরোবে কী? পাখিটা যে ওর নামও জানে। তাই সে অনেকটাই বোকা বনে গেছে। মুখে আওয়াজ না বেরুলেও মন বলেছে, ‘দেখাও দেখি! ওহ্! তোমার নামটাও তো জানা হলো না? আগে নামটা বলো।’ ‘আমি বৌরি। তোমাদের এই কদমগাছেই থাকি। খোঁড়লটা তো দেখাই যায়, তাই না? এই খোঁড়লে পানি জমেছে। এতেই আমি নেচে নেচে গোসল করব।’ পাখিটা দুটো ডুব দেয়। ডুব দিয়ে উঠে এসে ডালে বসে। পালক ঝাড়ে। ঠোঁট দিয়ে পালক ঘষে। তারপর আবারও ডোবাডুবি করে। এসব দেখে অপুর ভালো লাগে। সে মনে মনে বলে, ‘ভারী চমৎকার করে গোসল করলে তুমি।’ কেমন যেন আজব ঘটনা! অপু মনে মনে যা বলে, পাখিটা সে-ও বুঝে ফেলে। আর তাই পাখিটা বলে, ‘আমার গোসল করা দেখে তোমার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম। তুমিও তো গরমে ভিজে একদম জবজবে হয়ে গেলে। সাঁতার কেটে গোসলটা সেরে ফেলো? শরীর আর মন ফুরফুরে হবে। যাও ভাই।’ অপু ভাবলো, তাইতো। সাঁতার কেটে গোসল করলে গরমে কিছুটা আরাম পাওয়া যাবে। তারপর অপু চলে গেল ভাটিগাঙের ধারে। সেতু থেকে লাফিয়ে পড়ে ডুব সাঁতারে মেতে উঠল সে। এভাবে লাফাতে লাফাতে হঠাৎ একটা দারুণ ঘটনা ঘটে গেল। অপু যেন ডুব দিয়ে নতুন এক জগতের দেখা পেল। সবুজে ঘেরা মায়াবী এক বন। গাছে গাছে কতোই না রঙবেরঙের ফুল! মন ফুরফুরে করে দেওয়া সেসব ফুলের সুবাস। ডালে ডালে হাজারো রকমের পাখি। কতো রঙবেরঙের পালক ওদের! ওরা অপুকে দেখেই সুর ধরে বলল, পাখির মতো মনটা তোমার করবে পাখির রাজ, পালক দিয়ে গড়ব এসো পাখি রাজার তাজ। অপু তুমি পাখির মিতা পাখির আপনজন, তোমার হয়ে গাইবে পাখি সাজবে ফুলের বন। বনের পাখিদের আজ রঙিন ডানার মতোই রাঙানো মন। মনে যেন আজ কোনও ভয় নেই। যার যেমন মন চাইছে, অপুর কাঁধে, হাতে আর মাথায় বসছে। মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অপুর মুখও দেখছে। আহা রে! যেন কতদিন পরে কতটা আপনজনকে ফিরে পেয়েছে। পাখিরা অপুকে ভালোবেসে কতরকমের ফল খেতে দিলো। টুনটুনি আর বাবুইয়ের গড়া রাজসিক ঘরে নিয়ে বসতেও দিলো। ঘাসের ডগায় আর শিমুল তুলোয় গড়ানো গদির চেয়ার। সেরকম করেই গড়ানো বিছানা। তারপর কখন যেন ঘুমের গভীরে তলিয়ে গেল সে। অপু দুইদিন ধরে বিছানায় শুয়ে আছে। পাখিদের খাবারও দেওয়া হয় না। মা একা মানুষ। সবকিছু সামলে উঠতে পারেন না। এদিকে অপুর শরীরে রেশ উঠেছে। তাপও বেড়ে গেছে। পাখিদের খাবার কখন দেবেন? অনেকটাই অবচেতন অপুকে মা ডেকে বললেন, ‘বাবা, উঠে অষুধটা খেয়ে নাও। অষুধ না খেলে তাড়াতাড়ি ভালো হবে কী করে? তখন অপুর মনে পড়ে গেল পাখিদের কথা। ও ঘুমের গভীরে তলিয়ে গিয়ে যা দেখেছে, ওসব সঠিক নয়। তবে সে বাড়ির আশেপাশের পাখিদের মনে অনেক আগেই জায়গা করে নিয়েছে। সেই তাগিদ থেকে অপু এবার গা ঝাড়া দিয়ে বসল। তারপর বলল, ‘আহা! দুদিন থেকে পাখিদের খাবার দেওয়া হয় না!’       প্রিন্স মাহমুদ হাসান-এর গল্প

ওরা ক’জনের গল্প
গল্প, শিশু সাহিত্য

ওরা ক’জনের গল্প

ওরা ক’জনের গল্প উৎপলকান্তি বড়ুয়া ওরা তিনজন। থাকে একসাথে। ওরা ভাই বোন। দুই ভাই এক বোন। আচ্ছা, ওরা কারা? ওহ্ তাই তো! ওদের পরিচয় করিয়ে দেই। ওরা গ ল প। গ এবং প ভাই। ল বোন। গ এবং প -এর একমাত্র বোন ল। বড় আদরের বোন। ওরা খেলে একসাথে। বেড়ায় একসাথে। খায় একসাথে। ঘুমায় একসাথে। থাকে একসাথে। কাউকে ছাড়া কেউ ওরা একা কোথাও যায় না। তিন ভাইবোন একে অপরকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। গ এবং প দুই ভাইয়ের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। দুই ভাইয়ের-ই মাথায় চুল নেই। ওদের টেকো মাথা। টেকো মাথার গ আর প এর বোন ল তাদের খুব আদরের। চোখের আড়াল হতে দেয় না কোনো মতে। একদিন একা একা ফুল বাগানে খেলছিল বোন ল! বোশেখ মাস। দিনের গনগনে সূর্য চাপিয়ে, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হঠাৎ মেঘ ডেকে উঠলো গুড়ুম গুড়ুম। মেঘে ছেয়ে যায় চারদিক। বাতাসও যেনো রেগে ওঠে সে সময়! বইতে থাকে প্রচণ্ড বেগে। শুরু হয় ঝড়। ঝড়ের দাপটে ভেঙ্গে পড়ে পাতা, ডাল, শাখা গাছপালা। একা একা ফুল বাগানে খেলায় মশগুল ল’কে নীল প্রজাপতি বললো -ওহে ল, ঝড় প্রচণ্ড ঝড় যে এলো! আমি পালাই। তুমিও পালাও। ঘরে যাও। এই বলে নীল প্রজাপতি দুই পাখা মেলে চটজলদি তার ঘরে ফিরে যায়। প্রজাপতির কথায় এতক্ষণে ল বুঝতে পারে, তাইতো! ঝড় তো বেশি এলো! এবার উপায়! তড়িঘড়ি করে ল খেলনা ফেলে উঠে দেয় দৌঁড়। আর ঠিক সেই সময়েই ঘটে মহা বিপদ! কেউ কি জানতো এমন বিপদ এখানে ওঁত পেতে অপেক্ষা করছিলো? ঝড়ের দাপটে উপর থেকে বড় আমগাছের এক ডাল ভেঙ্গে পড়ে ল এর উপর! বিশাল চিৎকার করে ল লুটিয়ে পড়ে মাটিতে আম গাছের ভাঙ্গা ডালের নিচে। ব্যাস! সেই দূর্ঘটনায় ল এর এক পা গেলো ভেঙ্গে। সেই থেকে পা খোড়া হয়  ল’এর। হাঁটতে রীতিমত বেশ কষ্ট পোহাতে হয় প্রতিটা সময়। আর সেই থেকে ল কে হাঁটতে হয় কারোর সাহায্য নিয়ে। হাঁটে অবশ্য প এর কাঁধে ভর করে সবসময়। গ হাঁটে সামনে আর ল হাঁটে প এর কাঁধে ভর করে পিছু পিছু। সেই থেকেই সকলে ওরা তিনজনকে গল্প নামেই চেনে-ডাকে। গ আর প বরাবরই খুব শান্ত প্রকৃতির। কারোর সাতেও নেই পাঁচেও নেই। যাকে বলে একেবারে নিরীহ দু’জন। পাড়ার কিছু দুষ্টুরা মিলে গ এবং প কে প্রায় সময়েই দূর থেকে দাড়িয়ে , টেকো মাথা টেকো মাথা ঢেকে রেখো– বলে বলে ভেংচি কেটে, খোঁচা মারে। ওরা হলো ঙ ণ এবং ধ। গ এবং প শুনেও সেদিকে কর্ণপাত করে না। নীরব থাকে। কিন্তু প্রিয় ভাই গ আর প’কে কেউ এভাবে বলবে কেন! ল তা সহ্য করে না? এবার রুখে দাঁড়ায় সে পাড়ার দুষ্টু ঙ ণ এবং ধ বিরুদ্ধে। সাফ সাফ প্রতিবাদের সুরে জবাব দিয়ে দেয়, তোমরা কি চুলঅলা? তোমরাও টেকো! নিজ মাথাতেই নিজে হাত দিয়ে দেখো! কেন শুধু অন্যকে খোঁচা মেরে ঘাঁটো নিজে টেকো হয়ে কেনো ভেংচি কাটো? -আরে তাইতো! আমাদের মাথায়ও তো চুল নেই। সেটাই তো মনে ছিল না! লজ্জা পেয়ে যায় ঙ ণ এবং ধ। সেই থেকে ওরা গ আর প কে ভেংচি কেটে আর লজ্জা দেয় না। ওরাও বেশ ভালো হয়ে যায় তখন থেকে।   গ প আর ল কে দেখলে এখন ভালো করে, সুন্দর করে কথা বলে, কুশল‌ বিনিময় করে। খেলা করে একসাথে। গানে গলা মিলায় সুর করে। তাদের একটা প্রিয় গান আছে। গ ল আর প এবং ঙ ণ আর ধ একসাথে ইদানিং ওরা ছয়জন একসাথে হলে তাদের প্রিয় গানটি গায় মজা করে-   আমরা ক’জন সুখী, বুকে স্বপ্ন অফুরান হাত ধরে এক অপরের আজ গাইরে খুশির গান। ভালোবাসা ছাড়া ওরে কিচ্ছু তো নেই মনা, একসাথে এক পাড়ায় থাকি আমরা তো ছয়জনা। একসাথে এক পাড়ায় থাকি আমরা তো ছয়জনা।।     স্বপনকুমারের গল্প

খোকার বন্ধু এলিয়েন ছবি: দৈনিক দেশ রূপান্তর
গল্প, শিশু সাহিত্য

খোকার বন্ধু এলিয়েন

খোকার বন্ধু এলিয়েন প্রিন্স মাহমুদ হাসান   তোমরা খোকাকে হয়তো চিনবে না। সে ক্লাস ফোরে পড়ে। জঙ্গলের পথ ধরে খোকাদের স্কুল। ওই পথ ধরেই খোকা প্রতিদিন স্কুলে যায়। জঙ্গলের পথ পেরুতেই সে ও তার কয়েকজন বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে স্কুলে যায়। খোকা খুব সাহসী ছেলে। তাই তার বাবা-মা তার একা একা স্কুলে যাওয়া নিয়ে চিন্তা করে না। সেদিন খুব বৃষ্টি পড়ছিল। খোকা ও তার বন্ধুরা ভাবল এমন বৃষ্টিতে ছাতা নিয়ে বাসায় যেতে চাওয়া বৃথা, ভিজে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে সেটা তাদের জন্যই ভালো হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ, তারা বৃষ্টির পরই বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কিন্তু ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। হাঁটতে হাঁটতে খোকা ও তার বন্ধুরা প্রায় জঙ্গলের কাছে চলে এলো। খোকার বন্ধুরা খোকাকে এগিয়ে দিতে চাইলেও খোকা রাজি না হওয়ায় তারা যে যার বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগল। খোকা জঙ্গলের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল।হঠাৎ সে অদ্ভুত একটা শব্দ শুনে থমকে দাঁড়াল। খোকা ‍সাহসী ছেলে হলেও সে শব্দ শুনে ভয় পেয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে জঙ্গলের ভেতরে তাকাতেই খেয়াল করল অদ্ভুত ও ছোট আকৃতির একটা প্রাণী তাকে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে দেখছে। খোকা সাহসী হলেও সে এবার সত্যিই ভয় পাচ্ছে। কিছুক্ষণ ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে খেয়াল করল প্রাণীটি তার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করছে না। খোকা এবার ভয় না পেয়ে ধীরে ধীরে প্রাণীটির কাছে এগিয়ে যেতে থাকল। প্রাণীটির কাছে যাওয়ার পর সে আরও খেয়াল করল প্রাণীটির দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। খোকার এটা দেখে খুব মায়া হলো। সে প্রাণীটির আরও কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ?’ প্রাণীটি আকাশের দিকে ইশারা করে জোরে জোর কাঁদতে শুরু করল। এতে খোকার বুঝতে আর বাকি রইল না যে, প্রাণীটি এই পৃথিবীর কেউ নয়, প্রাণীটি এলিয়েনের বাচ্চা। খোকা এলিয়েনের বাচ্চাটিকে অভয় দিয়ে তার ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে বাসায় নিয়ে আসলো। কিছুদিন যেতেই এলিয়েনের বাচ্চাটির সঙ্গে খোকার বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। খোকা এলিয়েনের বাচ্চাটিকে ব্যাগের ভেতরে নিয়ে প্রতিদিন স্কুলে আসা যাওয়া করে। সে ধীরে ধীরে এলিয়েনের ভাষা রপ্ত করতে শুরু করল। একদিন সে স্কুল থেকে আসার পর খেয়াল করল এলিয়েনের বাচ্চাটি কার যেন একটি পেন্সিল চুরি করে নিয়ে এসেছে। খোকা তার খাটের নিচে তাকিয়ে খেয়াল করল অনেকগুলো পেন্সিল আর ইরেজার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেগুলোর কোনোটাই তার নয়। বাবার কাছে খোকা শুনেছে চুরি করা মহাপাপ। তার প্রিয় বন্ধুটি এভাবে চুরি করে অন্যের জিনিস নিয়ে আসবে তা সে কখনোই কল্পনা করেনি। প্রিয় বন্ধুর এমন কর্মকান্ডে সে খুবই দুঃখ পেল। খোকা চিন্তা করতে থাকল তার প্রিয় বন্ধুটিকে কীভাবে ভালো পথে ফিরিয়ে আনা যায়। সে এলিয়েনের বাচ্চাটিকে মানুষের যত ভালো গুণাগুণ আছে সেই বিষয়ে শিক্ষা দিতে শুরু করল। এলিয়েনের বাচ্চাটিও ধীরে ধীরে মানুষের সব ভালো গুণগুলো রপ্ত করতে থাকল। সে তার চুরি করা সব পেন্সিল ও ইরেজার জাদু দিয়ে আবার সবার ব্যাগে ফিরিয়ে দিল। খোকা এতে খুব খুশি হয়ে এলিয়েনের বাচ্চাটিকে তার প্রিয় কিছু চকলেট উপহার দিল। এর ফলে এলিয়েনের বাচ্চাটি খুব খুশি হয়ে খোকাকে জড়িয়ে ধরল। একদিন রাতে খোকা হঠাৎ খেয়াল করল এলিয়েনের বাচ্চাটি খাটের নিচে এক কোনায় গিয়ে কান্না করছে। খোকা বাচ্চাটিকে সেখান থেকে কুড়িয়ে এনে তার বিছানার ওপর রাখল। খোকা বাচ্চাটিকে তার কান্নার কারণ জানতে চাইলে সে বলল, ‘আমি সৌরজগতের বামন গ্রহ এরিস থেকে এসেছি। সেখানে আমি খুব দুষ্টামি করতাম। দুষ্টামি করার সময় খেলোচ্ছলে প্রায়ই বিভিন্ন অপরাধ করে ফেলতাম। যেগুলো আমার কাছে অপরাধ মনে হতো না। যার শাস্তিস্বরূপ আমাকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজ এরিস গ্রহ থেকে সিগন্যাল এসেছে তারা আমার ভালো হয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছে। তাই তারা আমার সব অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছে এবং এরিসের রাজা আবার আমাকে ওই গ্রহে থাকার অনুমতি দিয়েছেন। খোকা বলল, ‘সেটা তো ভালো খবর কিন্তু তুমি মন খারাপ করছ কেন? এতে তো তোমার খুশি হওয়ার কথা।’ ‘খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু সেখানে তো তোমার মতো এমন ভালো বন্ধু পাবো না। তোমার কারণেই তো আমি আমার গ্রহে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছি।’ ‘তুমি যদি সেখানে গিয়ে সৎ থাকো তাহলে তোমার ভালো বন্ধুর অভাব হবে না। সেখানে সবাই আমার মতো তোমাকে আপন করে নেবে। তখন সবাই তোমার সঙ্গে খেলবে, একসঙ্গে হাসবে, এমনকি দুঃখের দিনেও তোমার পাশে থাকবে।’ খোকার কথা শুনে এলিয়েনের বাচ্চাটির যেন আরও কান্না পাচ্ছে। সে কিছুতেই তার এমন ভালো বন্ধুকে হারাতে চায় না কিন্তু তার মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ে। তার মা-বাবার কাছে যেতে হলে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সে খোকাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি তোমার ঋণ কখনো ভুলব না। তোমার মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। তোমাকে ছেড়ে আমাকে যেতেই হচ্ছে। আমাকে ক্ষমা করে দিও। আশা করি শিগগিরই তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে।’ খোকা তখন আর কোনো কথা বলতে পারছিল না। তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল। পরদিন সন্ধ্যাবেলায় খোকা এলিয়েনের বাচ্চাটিকে নিয়ে জঙ্গলে চলে গেল। হঠাৎ কোথা থেকে ছোট একটা স্পেসশিপ উড়ে এলো। জঙ্গলের মাঝখানে একটা খালি জায়গায় স্পেসশিপটা অবতরণ করতেই দুটি এলিয়েন পৃথিবীর মাটিতে পা রাখল। এলিয়েনের বাচ্চাটি খোকাকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরে বিদায় জানিয়ে এলিয়েনদের কোলে উঠে পড়ল। তাকে বিদায় জানাতে খোকার খুব কষ্ট হচ্ছিল। সে তার জন্মদিনে বাবার কাছ থেকে উপহার পাওয়া প্রিয় একটি কলম এলিয়েনের বাচ্চাটিকে উপহার দিল। এলিয়েনের বাচ্চাটি স্পেসশিপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্পেসশিপের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। দরজা বন্ধ হতেই স্পেসশিপটি দ্রুত শূন্যে ভেসে অদৃশ্য হয়ে গেল। খোকা আকাশে তাকিয়ে তাকিয়ে প্রিয় বন্ধুটিকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানাল। খোকা প্রতিদিন বাড়ি ফেরার সময় এলিয়েনের বাচ্চাটিকে দেখার আশা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ জঙ্গলে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু তার প্রিয় বন্ধুটি আর আসে না।   (গল্পটি দৈনিক দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত)     লেখকের আরও গল্প

Scroll to Top