গল্প

একটি রহস্যময় ঘটনা – শুভ্রব্রত রায়

একটি রহস্যময় ঘটনা – শুভ্রব্রত রায় সময়টা বর্ষাকাল। এক তো রাত তার ওপর প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। সারাদিন প্রবল বৃষ্টির হওয়ার পর যখন খানিকটা বৃষ্টির পরিমাণ ও ঝড় হাওয়ার দাপট কমল, তখন প্লাটফর্মে একটাও লোক নেই। প্লাটফর্মের এদিক-ওদিক শুনশান। অর্ক বলে একটি ছেলে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে বাড়ি ফিরবে বলে। কারণ তার বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে। কিন্তু ট্রেন আসতে অনেক দেরী, তাই অর্ক প্লাটফর্মের একটি বেঞ্চে পা তুলে বসল, রাত্রি তখন প্রায় ঘড়ির কাঁটায় আটটা বাজে। তখন সে ভাবলো এই ঠান্ডা আবহাওয়াতে একটু চা পেলে ভালোই হতো, কথাটা ভাবা মাত্রই দেখল সে-খানিকটা দূরে একটি লোক চায়ের কাপ ও কেটলী হাতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছ। তৎক্ষণাৎ অর্ক হাত নেড়ে লোকটিকে ডাকল। অর্ক বলল এক কাপ চা দিন। লোকটি বলল চা নেই বাবু কফি আছে। অর্ক শুনে মনে মনে বেশ খুশি হয়ে ভাবলো “আরও ভালো”। এই ভেবে সে এক কাপ কফি কিনে খেতে লাগলো আর প্লাটফর্মেট পাইচারি করতে লাগলো। হঠাৎ খানিকটা দূরে তার দৃষ্টি পড়ল, সেখানে একটা একটা কী যেন একটা পড়ে আছে। দূর থেকে বিদ্যুতের আলোতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তাই অর্ক একটু এগিয়ে গেল সেই দিকে। আর দেখল একটি মানুষ পড়ে আছে রেল লাইনের ধারে। সে ভাবল লোকটি হয়তো অজ্ঞান হয়ে গেছে বা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। তখন প্রায় রাত্রি নটা বাজে। ঠিক আর একটু বাদেই রাত্রি সাড়ে নটা নাগাদ ট্রেন আসবে। তাই অঘটনের আশঙ্কায় তার বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল। তাই তাকে সেই রেল লাইন থেকে তোলার জন্য অনেক ডাকাডাকি করতে লাগলো। কিন্তু অর্ক লোকটির কোনো সাড়া পেলনা, সাড়া না পেয়ে লোকটির ডান হাতটি ধরে সজোরে হ্যাঁচকা টান দিল। এ কী! বরফের মতো ঠান্ডা তার হাত। কিন্তু তার শরীরের পোশাকটা তো ভদ্রলোকদের মতোই মনে হচ্ছে। আর একটি জিনিস তাকে অবাক করে দিল। লোকটির ডান হাতের তর্জনী যেন লাইনের পাশের ঝোপের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। সে অনেক চেষ্টা করে লোকেটির দুটি পা টেনে তাকে লাইনের বাইরে নিয়ে এল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার! তার তার ডান হাতের তর্জনী সেই ঝোপের দিকেই রয়েছে। সে তখন কৌতুহল বশত সেই ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল। পায়ে করে ঝোপগুলি সরাতেই তার চোখে পড়ল একটি কালো ব্যাগ। সে আরও কৌতুহল হয়ে পড়ল ব্যাগটি তাড়াতাড়ি খোলার জন্য। ব্যাগটি খুলে সে দেখল পাঁচ লক্ষ টাকা। অর্ক তখন ভাবতে লাগলো এত টাকা নিয়ে লোকটি কোথায় যাচ্ছিল? তার পরিচয়টাই বা কী? এইভাবেই সে ব্যাগটি আরও ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখল কয়েকটি বিবাহের কার্ড রয়েছে। তাতে পাত্র-পাত্রীর পিতা ও মাতার নাম লেখা। তবে কী লোকটির ছেলের বা মেয়ের বিবাহ? সে কৌতূহল হয়ে কার্ডটি পড়ল এবং ঠিক করল সব জেনে লোকটিকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। এই ভেবেই অর্ক যেই পিছনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে লোকটিকে দেখার জন্য যেখানে তাকে সে রেখেছিল। কিন্তু কোথায় কী? কেউ তো নেই! তন্ন তন্ন করে অর্ক খুঁজল চারপাশ। কিন্তু জড়াজীর্ণ লোকটিকে কোথাও দেখা গেল না। এখন সে কী করবে সেটাই ভাবতে লাগলো হতভম্ব হয়ে। ভাবতে ভাবতে কার্ডে লেখা ঠিকানাতেই সে যাবে মনস্থির করল। প্রথমে সে পাত্রীর পিতার ঠিকানাতেই যাবে বলে ঠিক করল। কারণ, তার মনে হচ্ছিল সেখানেই তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সে পাবে। রাত্রি অনেক হয়ে গিয়েছিল, সমস্ত ট্রেন চলে গিয়েছিল। তাই অর্ক ঠিক করে রাতটা এই করিমপুর প্লাটফর্মেই কাটিয়ে পরের দিন খুব ভোরের ট্রেনে সে রওনা দেবে সেই ঠিকানার উদ্দেশ্য। সেইমত পরের দিন রাত পোহাতেই ভোর হতেই অর্ক তার গন্তব্যের উদ্দেশ্য রওনা দিল। খোঁজ করতে করতে সে যখন সেই বাড়ির দিকে এগোচ্ছিল, তখন কিছু লোক তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দেখছিল। কারণ, অর্ক সেই এলাকাতে আগে কখনও যায়নি। বাড়ির সামনে আসতেই এক ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেসা করলেন-“আপনি কি বরপক্ষের কেউ?” অর্ক উত্তর দিতে উদ্যত হলে সেই ভদ্রলোকটি অর্ককে থামিয়ে দিয়ে বলল-“দেখুন, এখানে একটু অসুবিধা হয়ে গেছে। গত পরশুদিন থেকে ভুপেনবাবু নিখোঁজ, তিনি পরশুদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলেন কিছু নিমন্ত্রণপত্র বিলি করতে আর বরপনের টাকা যোগাড় করতে। কিন্তু দুটি রাত পেরিয়ে গেল, আজও তিনি ফেরেননি। সেক্ষেত্রে বিয়েটা যে কী করে হবে, তা বুঝতে পারছি না।” এই কথা শুনেই অর্ক সেই কালো ব্যাগটা তার দিকে এগিয়ে দিল এবং বলল, -” দেখুন তো, এই ব্যাগটি ভুপেনবাবুর ব্যাগ কিনা? টাকা-পয়সা যা ছিল, তা-ই-আছে। ব্যাগটি হাতে পেয়ে ভুপেনবাবুর বাড়ির সদস্যদের উজ্জ্বল মুখগুলো দেখে অর্ক তার পূর্বদিনের ঘটনার কথা আর বলতে পারল না। সে শুধু বলল, ভুপেনবাবু আমাকে পাঠিয়েছেন এটি দিয়ে। আর, বলেছেন যে বিয়েটা যেন সুষ্ঠুভাবে হয়। উনি একটু বিশেষ কাজে আটকে পড়েছেন, তাই নিজে আসতে পারেননি। তিনি খুব শীঘ্রই বাড়িতে ফিরবেন।”   আরও গল্প পড়তে ক্লিক করুন

নির্বাচিত লেখা, সমসাময়িক ভাবনা, সম্পাদকীয়

করোনার পর আতঙ্কের আরেক নাম কি জম্বি ভাইরাস

করোনার পর আতঙ্কের আরেক নাম কি জম্বি ভাইরাস? প্রিন্স মাহমুদ হাসান   জম্বি ভাইরাস? হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন। জম্বি মুভি দেখেননি বা জম্বির কথা শোনেননি এমন মানুষ খুব কমই আছে কিন্তু জম্বি ভাইরাস-এর নাম অনেকেই শোনেননি। সাধারণত হলিউড বা কোরিয়ান মুভিগুলোতে দেখানো হয় কোন একটি ভাইরাস এর সংক্রমনের কারণে মানুষ জম্বি বা দানবে পরিণত হচ্ছে। যা দ্রুত মানুষ থেকে পশু পাখিতেও ছড়াচ্ছে।   বর্তমানে প্রাপ্ত জম্বি ভাইরাসটি মুভিতে যেমন দেখা যায় ঠিক সেরকম না ঘটালেও বা মুভির মত এখনও সংক্রমিত না হলেও এর একটি বৈশিষ্ট্যের কারণে এর নাম জম্বি ভাইরাস রাখা হয়েছে। এই ভাইরাসের প্রথম বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে বরফের মধ্যেও এর বছরের পর বছর কোন রকম সংগ্রাম ছাড়াই সুপ্তাবস্থায় বেঁচে থাকা।   এবার আন্দাজ করে বলুন তো কত ব্ছর হতে পারে? বিশ, পঞ্চাশ বা একশ বছর। আসলে এর কোনটাই সঠিক নয়, যা আমাদের সবার কল্পনারও বাইরে। রাশিয়ায় প্রাপ্ত একটি জম্বি ভাইরাস ৪৮,৫০০ বছর ধরে আমাদের পৃথিবীতে ঠিকে আছে। আর এই কারণে এই ভাইরাসটিকে দৈত্য বা জম্বি ভাইরাস বলা হয়। ভাইরাসটি ছোটবেলায় পড়া পুকুরের তলদেশে কৌটার ভিতর ঘুমন্ত দৈত্যের মত সুদীর্ঘ বছর ঘুমিয়ে ছিল।   জম্বি ভাইরাস-এর উৎপত্তি: সম্প্রতি রাশিয়ার সাইবেরিয়াতে ৭ টি হিমায়িত হ্রদ বা পারমাফ্রস্টে বিজ্ঞানীরা সর্বমোট ১৩ ধরণের ভাইরাস এর সন্ধান পান। যার মধ্যে একটি জম্বি ভাইরাস ছিল যা ৪৮ হাজার ৫০০ বছরের পুরোনো অ্যামিবা ভাইরাস। পরবর্তীতে এই ভাইরাসটি কালচার এর মাধ্যমে জীবিত হয়ে ওঠে।   পারমাফ্রস্ট কী? এটি হল এমন কোন একটি ভূমি যা সম্পূর্ণরূপে ৩২°ফারেনহাইট (০°সেন্টিগ্রেড) বা তারও তারও কম তাপমাত্রায় দুই বছর বা তারও অধিক স্থায়ীভাবে হিমায়িত থাকে। এই স্থায়ীভাবে হিমায়িত স্থানগুলো পৃথিবীর উচ্চ অক্ষাংশের উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে উচ্চ পর্বতযুক্ত অঞ্চলে অবস্থিত।   তবে কি জম্বি ভাইরাস সংক্রামক? জ্বি, জম্বি ভাইরাস সংক্রামক। ধারণা করা হচ্ছে এটি কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস থেকেও মারাত্মক সংক্রামক। যা দ্রুত মানুষ থেকে পশু, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীতে ছড়াতে পারে।   তাহলে কি আতঙ্কের আরেক নাম হতে যাচ্ছে জম্বি ভাইরাস? এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে করোনাকালীন আমাদের লক ডাউনের ভিতর দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমরা এই সময় আমাদের অনেক প্রিয়জনদের হারিয়েছি, স্থবির হয়ে গিয়েছিল অনেক দেশের অর্থনীতি যার রেশ এখনও বিরাজমান।   সুতরাং বলা যায় একটি ভাইরাস আমাদের জন-জীবনের জন্য বড় ধরণের হুমকি স্বরূপ হতে পারে। জম্বি ভাইরাস করোনার চেয়ে বেশি সক্রিয় হওয়ায় বলা চলে এই ভাইরাসটি আমাদের জন্য ভয়ানক আকারে ছড়াতে পারে। তাছাড়া এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভাইরাসটির সাহায্যে জৈব অস্ত্র বা জীবানু বোমা নিক্ষেপের আশঙ্কাও রয়েছে।   দিনদিন বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে চলায় পারমাফ্রস্ট অতি দ্রুত গলতে শুরু করেছে। পারমাফ্রস্ট এর ভিতর আটকে থাকা জম্বি ভাইরাসগুলো অনুকূল পরিবেশ পেলে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠবে। এভাবে যতদিন গড়াবে সমস্যা আরও প্রকট আকারে ধারণ করবে।   প্রতিকার: ভাইরাসটিকে আটকাতে হলে সব সমাধান আমাদের কাছে না থাকলও কিছু সমাধান আমাদের কাছ আছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলে আমরা ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রতিকূল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব। তাছাড়া ভাইরাসটিকে রুখতে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক রাখা অতি জরুরী।

অভাগিনীর অসমাপ্ত জীবন
গল্প, নারী বিষয়ক সাহিত্য

অভাগিনীর অসমাপ্ত জীবন – প্রান্ত দত্ত

অভাগিনীর অসমাপ্ত জীবন প্রান্ত দত্ত অপরূপ সৌন্দর্য্যে ঘেরা বৈচিত্র্যময় এই গ্রাম। সে গ্রামে জন্মগ্রহণ করে ফুটফুটে সুন্দর এক মেয়ে। নম্র-শান্তশিষ্ট ছিলো মেয়েটির স্বভাব। মেয়েটি ছিলো বড়ই দুখিনী। নাম ছিলো তার প্রীতিলতা। ডাক নাম ছিলো তার প্রীতি। তার বাবার পরিবারে অর্থ-বিত্ত জায়গা জমি যথেষ্ট পরিমাণ ছিল। কিন্তু সুখের পরিমানটা যথেষ্ট পরিমাণ ছিল না। তার জন্মলগ্ন থেকে জীবনের সাথে লড়াই এবং সংগ্রাম শুরু হয়। তার জন্মগ্রহণ করার পর তিন মাস পর্যন্ত অজ্ঞান থাকে। এই তিন মাস শুধু তার মুখ থেকে সাদা ফেনা বের হতো। যাইহোক, সে বিপদ কাটিয়ে উঠার পর তার জীবনের আরেকটি ধাপের যাত্রা শুরু হয়। ছোটবেলায় থেকে প্রীতি বাবা-মায়ের অনেক ভক্ত ছিলো। বাবা মায়ের পাশে সর্বোক্ষণ থাকতো প্রীতি। সে বাবা-মায়ের সকল কাজে সহযোগিতা করার চেষ্টা করতো। প্রীতি ছোটবেলা থেকে ছিলো ভোজনরসিক একজন মানুষ। খেতে খুব পছন্দ করতো। তার কোনদিনও ভালো ভালো খাবারের কোন আবদার ছিলো না। শুধু কোন কিছু সামান্য তরকারী দিয়ে বেশি করে ভাত খেয়ে নিতো। এতে তার খাওয়ার তৃপ্তি মিটতো। কিন্তু তার এই স্বভাবটা পরিবারের অনেক জনের কাছে ভালো লাগতো না। সে আবার স্পষ্টবাদী লোক ছিলো। অন্যায় দেখলে সামনাসামনি প্রতিবাদ করতো। এগুলো দেখে অনেকে অপছন্দ এবং ঘৃণা করতো তাকে। সেগুলোকে নিয়ে সে মনে কিছু ভাবতো না। কারণ সে যে কাজগুলো করতো যা এগুলো পুরুষদের কাজের সমান। তার ভাইবোনরা এসব কাজ করতো না। সে ভাবতো আমিও যদি কাজ না করি তাহলে বাবা একা কিভাবে সবগুলো কাজ সামলাবে। কারণ তার বাবা ছিল একজন পঙ্গু মানুষ। সেজন্য বাবার সকল কাজে সহযোগিতা করার চেষ্টা করতো। এভাবে সে দিনরাত বাবা মায়ের সাথে সব কাজে চালিয়ে যায়। শৈশব জীবনটা অনেকেরই কাটে খেলাধুলায়। কিন্তু তার জীবনটা তেমন ছিল না। খেলাধুলায় সময় কাটতো বাবা মায়ের সেবায়। এভাবে দিন যায় রাত হয়। বছরের পর বছর শেষ হতে লাগলো। শৈশব জীবন পার করে ধীরে ধীরে সে বিবাহযোগ্য হয়ে উঠেছে। এদিকে তার বড় বোনকে বিয়ে দেওয়া হয়। এবার মা-বাবা তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য যোগ্য পাত্রের খোঁজ করে কিন্তু তার জন্য যোগ্য পাত্র জোগাড় করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এদিকে গ্রামের মানুষ নানা ধরনের কথা বলে তার বিবাহ ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। নানান ফন্দি আঁটতে থাকে তারা। বিবাহ সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্ভব হয় না। মা-বাবা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে। অবশেষে খুঁজতে খুঁজতে মা-বাবার মনের মতো একজন উপযুক্ত পাত্রকে খুঁজে পায়। তার বিয়ে হলো। নানান ঘটনার মধ্যে দিয়ে তার বিবাহ সম্পন্ন হয়। যাইহোক, সে মনে মনে ভেবেছিলো স্বামীর বাড়িতে এসে কপালে সুখটুকু জুটবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সেখানেও সুখ তার কপালে জুটলো না। বিয়ে হওয়ার সেদিন থেকে শুরু হয় তার জীবনের আরও একটি কঠিন যুদ্ধ। স্বামীর বাড়িতো নয় ছিলো যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। তার স্বামীর ছিলো চার ভাই, তিন বোন। তার স্বামী ছিলো সেজো। তার দুই জ্যা ছিলো।  দুইজনই ছিলো খুবই দুষ্টু প্রকৃতির লোক। স্বামীর বাড়িতে তাকে নিম্ন বর্ণের জাত বলে অ্যাখ্যায়িত করে তার জা, ভাসুররা বিভিন্ন ভাবে অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে। অকথ্য ভাষায় তার সাথে কথা বলতো তারা। তাদের সাথে যৌথ অবস্থায় থাকাকালীন তারা ভালোভাবে খেতে দিতো না। শুধু ছোট জাতের মেয়ে বলে তাকে কটুক্তি করতো। সংসার ভিন্ন হয়েও সুখ হয়ে নি তাদের। জা, ভাসুর এবং বাড়ির অনেকে দুষ্টপ্রকৃতিদের পক্ষ নিয়ে এক পর্যায়ে তাকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে তারা নির্যাতন শুরু করে। স্বামী না থাকার সুযোগ নিয়ে তাকে তারা মারধর শুরু করতো। বিভিন্নভাবে তাকে নির্যাতন করতো। সে একা তাদের সাথে পেরে উঠতো না। তারা চেয়েছিল তাকে বাড়ি থেকে একেবারে উচ্ছেদ করে দিতে। যেন তার স্বামীর জায়গা সম্পত্তিগুলো একাই ভোগ করে পেতে পারে। তার পাশে সহযোগিতা করার মতো কেউই ছিল না। তার স্বামীটিও তেমন প্রতিবাদী ছিলো না। এরই মধ্যে তার কোল আলো করে জন্মনিলো পুত্র সন্তান। যা দেখে তার জা, ভাসুররা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তার সন্তানকে তারা মেরে ফেলতে চেয়েছিলো। তার বড় জার কন্যা তার পেটে সন্তান থাকাকালীন পেটের মধ্যে লাথি মেরে তাকে এবং তার সন্তানকে পৃথিবীতে থেকে বিদায় করে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু কপাল ভালো থাকায় সে যাত্রায় বেঁচে গেল। সন্তানকে নিয়েও বিভিন্ন ঘটনার সম্মুখীন হয় প্রীতি। সে ভাবলো আমি না হয় এখানে যুদ্ধ করে থাকলাম, কিন্তু এখানে থাকলেতো আমার স্বামী ও সন্তানকে হারাতে হবে। এর দেড় বছর পর, নিরূপায় হয়ে সে একদিন তার স্বামী সন্তানদের নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু যাবে কোথায়? বাড়ি থেকে বের হয়ে এদিকে ওদিকে পাগলের মতো স্বামী সন্তানদের নিয়ে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে থাকে। আজ এই জায়গায়তো কাল অন্য জায়গায়। সেখানে সুখ নেই! মানুষের নানা রকম গালমন্দ কথা সবসময় শুনতে হয় তাকে। এদিকে এই জীবন সংগ্রামের মাঝে দ্বিতীয় সন্তানের জননী হয় সে। শুরু হয় তাদের জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়। এভাবে আজও তার দিন কাটছে। তার জীবনকথার গল্প আজও অসমাপ্ত রয়ে গেল। আজও প্রীতি তার স্বামী সন্তানদের নিয়ে দেশে দেশে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু একটু সুখের ঠিকানায়। আরও বাংলা গল্প পড়ুন এখানে

কাব্যছড়া ভাবনা ও কিশোর কবিতার অপ্রাসঙ্গিকতা
নির্বাচিত লেখা

কাব্যছড়া ভাবনা ও কিশোর কবিতার অপ্রাসঙ্গিকতা

কাব্যছড়া ভাবনা ও কিশোর কবিতার অপ্রাসঙ্গিকতা – জগলুল হায়দার শূন্য দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। সে সময় প্রায়ই যুগান্তরে যাই। আড্ডা জমতো পিনটু ভাইয়ের (শিশুসাহিত্যিক আশরাফুল আলম পিন্টু) ওইখানে। একদিন টেলিফোনে কোন সাহিত্য কাগজের সম্পাদকের সংগে কথা শেষ কইরাই বললেন – কিশোর কবিতা দিতে পারবেন? ব্যাপারটা আমার কাছে দিতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তবুও বিনয়ের সাথে বললাম – কিশোর কবিতা লেখি না তো। পিনটু ভাই ভালোবাসেন তাই ভালোবাসার অধিকারে একটু শক্ত গলায়ই বললেন- এত সুন্দর ছড়া লেখেন, কিশোর কবিতা লেখেন না ক্যান? সেদিন তাকে আর কিছু বলি নাই। কি বলবো, আসলে কিশোর কবিতা পদব্যাচ্যটাই আমি মানতে পারতাম না। তাই অই জাতীয় কবিতা টুকটাক লেখলেও আমি ছড়ার বাইরে অইসবের আলাদা কোন পরিচয়ও দিতাম না। আমার কাছে অইগুলা ছড়াই। যাক পিনটু ভাইয়ের সেই পরামর্শ আমারে কিশোর কবিতা নিয়া ভাবার অবকাশ তৈরি কইরা দিলো। তিনি চান আমি এই ধারার লেখা বেশি কইরাই লেখি। আমিও মনস্থির লেখতে হইব। তবে এই নামে লেখব না। কারণ নামটা আমার যৌক্তিক মনে হয় না। কি নামে লেখব তাইলে? এই ধারার কবিতা লেখায় অই সময় জোর একটু বাইরাও গেলো। তবে তখনো লেখাগুলার শিরোনাম ঠিক করতে পারি নাই। এই অবস্থায় কথিত কিশোর কবিতা আর তার ইতিহাস সম্পর্কে খোঁজ খবর একটু বাড়াইলাম। দেখলাম এসবের অস্তিত্ব রবীন্দ্রনাথেও ছিল নজরুলেও ছিল। ছিল জসীমউদ্দিন সহ আরও অনেকের মধ্যেই। কিন্তু সে যুগের কোথাও কিশোর কবিতা নামের সন্ধান পাইলাম না। এর পর ৪৭ উত্তর সময়ে সৈয়দ আলী আহসান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল থেকে আহসান হাবীব সহ আরও অনেকেই এই ধারায় চিহ্নিত করা হয় এমন অনেক সার্থক কবিতা লেখছেন। কিন্তু সেখানেও এগুলাকে আলাদা কোন ধারা হিসাবে উল্লেখ করে নাই কেউ। বলা যায় ৭০ এর দশকে আইসা এই নামের আওয়াজ উঠছে। আর সম্ভবত এর আমদানী হইছে পশ্চিম বঙ্গ থেকে। আর একশ্রেনীর লেখক এইসব কবিতা চর্চায় যতোটা না মন দিছেন তার চাইতে ঢের দিছেন এর নাম কীর্তনে। নাম কীর্তনের পাশাপাশি কেউ আবার এগুলাকে নিজের দখলের বিষয় হিসাবে দেখাইবার অপচেষ্টাও করছেন। যেহেতু নাম ছিল না। তাই এই প্রবন্ধে এগুলারে আমরা কিশোর কবিতা না বইলা কিশোর কবিতা হিসাবে চিহ্নিত কবিতাই বলবো। এই ধারার কবিতার মেজাজ আর মর্ম বোঝার জন্য কিছু উদাহরণ দেখা যাক। সোম মঙ্গল বুধ এরা সব/আসে তাড়াতাড়ি এদের ঘরে আছে বুঝি/ মস্ত হাওয়া গাড়ি? রবিবার সে কেন মাগো,/এমন দেরী করে? ধীরে ধীরে পৌঁছায় সে/সকল বারের পরে আকাশ পাড়ে তার বাড়িটি/দূর কি সবার চেয়ে? সে বুঝি, মা তোমার মতো/গরীব ঘরের মেয়ে। মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে টগবগিয়ে তোমার পাশে, পাশে। (রবিবার ও বীরপুরুষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। আমি হব সকাল বেলার পাখি সবার আগে কুসুম বাগে উঠব আমি ডাকি সূয্যি মামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে ’ হয়নি সকাল ঘুমো এখন’ মা-বলবেন রেগে। কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও? গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি নেবু? লাউ? বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও?- ডাইনি তুমি হোঁৎকা পেটুক, খাও একা পাও যেথায় যেটুক! ( খোকার সাধ ও খুকি ও কাঠবিড়ালি, কাজী নজরুল ইসলাম) ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি ও সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি সে যে আমার জন্মভূমি, সে যে আমার জন্মভূমি।। ( ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা, দিজেন্দ্রলাল রায়)। গোপালটা কি হিংসুটে মা! খাবার দিলেম ভাগ করে বল্লে নাকো মুখেও কিছু, ফেল্লে ছুঁড়ে রাগ করে জ্যাঠাইমা যে মিঠাই দিলেন ‘দুই ভায়েতে খাও’ বলে- দশটি ছিল একটি তাহার চাখতে দিলাম ‘ফাও’ বলে.. তাও মানে না কেবল কাঁদে স্বার্থপরের শয়তানী শেষটা আমায় মিঠাইগুলো খেতেই হল সবখানি                                           ( নিঃস্বার্থ, সুকুমার রায়) এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে। এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ, পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক। এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা, সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা। ( কবর, জসীমউদ্দীন)। করিতে পারি না কাজ /সদা ভয় সদা লাজ সংশয়ে সংকল্প সদা টলে – পাছে লোকে কিছু বলে। (পাছে লোকে কিছু বলে, কামিনী রায়)। বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?পুকুর ধারে, নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাই জ্বলে, ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই; মাগো, আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই? (কাজলা দিদি, যতীন্দ্রমোহন বাগচী)। বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র, নানান ভাবে নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র। এইপৃথিবীর বিরাট খাতায়, পাঠ্য যেসব পাতায় পাতায় শিখছি সে সব কৌতূহলে, নেই দ্বিধা লেশমাত্র।                  ( সবার আমি ছাত্র, সুনির্মল বসু)। আলোর পাখি নাম জোনাকি জাগি রাতের বেলা নিজকে জ্বেলে এই আমাদের ভালোবাসার খেলা।                            (জোনাকিরা, আহসান হাবীব)। ট্রেন যায় হিশ হিশ/ বায়ু যায় ফিশ ফিশ/ ট্রাক যায় ধুপ ধাপ/ গরিবের দিন যায়/ কী কর/ কী করে/ কী করে/ জানবার সাধ হলে/ হাত দাও শিকড়ে/ শিকড়ে/ শিকড়ে। (শিকড়ে, আসাদ চৌধুরী)। উদাহরণের ভার আর বাড়াইতে চাই না। তবে এরকম আরও অনেক আছে। এবার একদম নির্ভেজাল কিছু ছড়ার উদাহরণ দেখা যাক। আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে / ঢাক -ঢোল ঝাঁঝর বাজে বাজতে বাজতে চলল ঢুলি /ঢুলি গেল কমলাফুলি কমলাফুলির টিয়েটা /সুর্যি মামার বিয়েটা । ( লোকো ছড়া) আজগুবি নয়, আজগুবি নয়, সত্যিকারের কথা- ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যাথা। ছায়া ধরার ব্যবসা করি, তাও জাননা বুঝি? রোদের ছায়া, চাঁদের ছায়া, হরেক রকম পুঁজি! শিশির ভেজা সদ্য ছায়া, সকাল বেলায় তাজা, গ্রীষ্মকালে শুকনো ছায়া ভীষণ রোদে ভাজা। (ছায়াবাজি, সুকুমার রায়)। সফদার ডাক্তার/মাথা ভরা টাক তার খিদে পেলেপানি খায় চিবিয়ে। চেয়ারেতে রাত দিন /বসে গুনে দুই তিন পড়ে বইআলোটারে নিভিয়ে। (সফদার ডাক্তার, হোসনে আরা বেগম) ঐ দেখা যায় তালগাছ /ঐ আমাদের গাঁ ঐ খানেতে বাস করে /কানা বগীর ছা। ও বগী তুই খাস কী? /পানতা ভাত চাস কি? পানতা আমি খাই না /পুঁটিমাছ পাই না একটা যদি পাই /অমনি ধরে গাপুস গুপুস খাই।                             (কানা বগীর ছা, খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন)। ঝালের পিঠা ঝালের পিঠা /কে রেঁধেছে কে?এক কামুড়ে একটুখানি /আমায় এনে দে। কোথায় পাবো লঙ্কাবাটা /কোথায় আতপ চাল, কর্ণফুলির ব্যাঙ ডাকছে /হাঁড়িতে আজ কাল। (ঝালের পিঠা, আল মাহমুদ)। এরকম অজস্র ছড়া

শৈশবের দিনগুলো
ছড়া

শৈশবের দিনগুলো

শৈশবের দিনগুলো শফিকুল মুহাম্মদ ইসলাম শৈশবের দিনগুলো ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে কেটেছে ছেলেবেলা, খেলার ছলে পাঠশালাতে করেছি ঢের হেলা। সঙ্গের সাথী নিয়ে রোজই দুষ্টুমিতে মেতে, পুতুল খেলার ছল করেছি আনন্দটা পেতে। কলাপাতার ছাউনি দিয়ে ঘর বানাতাম কত, দু’চোখ জুড়ে স্বপ্ন তখন ছিল অবিরত! মাটির হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে করতো সাথী রান্না, তার পুতুলের বিয়ে হবে কী— করেছে কান্না! পুতুল বিয়ের ইতিকথা আজও মনে পড়ে, বিষাদগীতি ভেসে উঠে মনটা কেমন করে। নদ-নদীতে সাঁতার কাটি ডুবুরিরই মতো, পিতামাতার বারণ ছিল নিত্য, ক্রমাগত। বৃষ্টি এলে পাড়াগাঁয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে, শ্রাবণধারা শরীর বেয়ে যেতো কত বয়ে। বন-বাদাড়ে খোলামাঠে খুঁজতাম পাখির বাসা, পেয়ে গেলে ছানা ধরে দিতাম ভালোবাসা। সারাদিনের কর্ম সেরে ফিরতাম যখন বাড়ি, মা-জননী রাগের বশে ধরতেন শত আড়ি। সন্ধ্যা হলেই উঠোনজুড়ে বসতো পুঁথির আসর; গল্পের ফাঁকে চাঁদটা দেখে হতো স্বপ্নের বাসর।   আরও পড়ুন

ভাইফোঁটা
ছড়া

ভাইফোঁটা

ভাইফোঁটা সুব্রত দাস ভাইফোঁটা উৎসব নীল আকাশে রোদ ঝিকমিক, ধানের শীষে হাওয়া, হিম জড়ানো দূরের মাঠে হারিয়ে কোথায় যাওয়া! উৎসবের বিষয়বস্তু কোথায় কোথায় ভাইয়ের ভালে চন্দনেরই টিপ, ভাইফোঁটা দিই ভোর শিশিরে— জ্বালিয়ে রাখি দীপ! জ্বালিয়ে রাখি, স্বপ্ন আঁকি ধান–দুব্বো–শাঁখে, আশীষ যেন ভাই সোনাদের সতেজ সবুজ রাখে!!       নোট: ভাইফোঁটা হলো বাঙালির এক আবেগঘন পারিবারিক উৎসব, যা মূলত ভাই–বোনের ভালোবাসা, স্নেহ ও মঙ্গলকামনার প্রতীক। ভাইফোঁটা কী? উৎসবটি পালিত হয় কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে, দীপাবলির দু’দিন পর। এই দিনে বোনেরা ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেয়—চন্দন, সিঁদুর, ধান, দূর্বা ইত্যাদি দিয়ে—আর ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবনের জন্য প্রার্থনা করে। ভাইফোঁটার প্রচলিত রীতি- সকালে স্নান করে সব বোনেরা পূজার উপকরণ প্রস্তুত করে বোনেরা ভাইকে সামনে বসিয়ে কপালে ফোঁটা দেয় মন্ত্র বা শুভকামনা উচ্চারণ করা হয় ভাই বোনকে উপহার দেয় ও আশীর্বাদ করে পৌরাণিক গল্প ভাইফোঁটার পেছনে যম ও যমুনার কাহিনি প্রচলিত। যমুনা তার ভাই যমরাজকে এই দিনে ফোঁটা দিলে যম তাকে অমরত্বের আশীর্বাদ দেন। তখন থেকেই বিশ্বাস—এই দিনে ফোঁটা নিলে অকালমৃত্যু দূরে থাকে। সামাজিক ও মানসিক গুরুত্ব ভাইফোঁটা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়— উৎসবটি পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করে উৎসবটির ফলে দূরে থাকা ভাই-বোনকে কাছে আনে যা ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের স্মারক হয়ে থাকে সংক্ষেপে, ভাইফোঁটা মানে রক্তের সম্পর্কের বাইরে গিয়ে এক অটুট আবেগের বন্ধন—যেখানে ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় উৎসব।     আরও ছড়া পড়ুন এই বিষয়ে আরও পড়ুন 

শূন্যতা
গল্প

অনুভূতি

অনুভূতি আবুল কালাম আজাদ   মিলনের ফুপু মারা গেছেন কিছুক্ষণ আগে। মিলন আতিউতি করে খুঁজছে তার মোবাইল ফোন। ফুপুকে নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেয়া দরকার। যে কয়দিন ফুপু হাসপাতালে ছিলেন, বেশির ভাগ সময় মিলন ফুপুর পাশে থেকেছে।   ফুপুর চিকিৎসা নিয়ে ক্ষণে ক্ষণে আপডেট স্ট্যাটাস দিয়েছে। এখন ফুপুর মৃত্যু নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিতে না পারলে ব্যাপারটা খুব খারাপ দেখায়। নাকি মোবাইলটা কেউ নিয়ে গেল? আজকাল মানুষের ভেতর নীতিজ্ঞান বলে কিছু নেই।   অসুস্থ মানুষ, এমনকি মৃত মানুষের ঘর থেকে একটা মোবাইল চুরি করার সুযোগ হাতছাড়া করবে না। মানুষগুলো দিন দিন লোভী ও স্বার্থপর হয়ে উঠছে।   এই ফুপু মিলনকে ছোটবেলায় অনেকদিন লালন-পালন করেছেন। মিলনের জন্মের পর ওর মা অনেকদিন খুব অসুস্থ ছিলেন। মিলনের সেবাযত্ন তো দূরের কথা, কোলে পর্যন্ত নিতে পারতেন না।   এই ফুপু না থাকলে মিলনের বেঁচে থাকা অনিশ্চিত হয়ে যেত। তারপর থেকে মিলনের প্রতি ফুপুর কেমন অন্ধ স্নেহ-মায়া পড়ে যায়। নিজের ছেলে আর মিলনকে কখনোই আলাদা করে দেখতে পারেননি।   সেই মমতাময়ী ফুপুর মৃত্যুতে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিতে পারবে না—বিষয়টা খুব খারাপ দেখায়। লোকজন কী ভাববে? এমন অবস্থায় মিলনের প্যান্টের পেছনের পকেটে ফোন বেজে উঠল। সে সাধারণত সামনের পকেটে মোবাইল ফোন রাখে।   পেছনের পকেটে কখন রেখেছে তা মনে নেই। ফোন করেছে মিলনের চাচাতো ভাই। বলল— “কিরে মিলন, ফুপু নাকি মারা গেছে? তা তোর কাছ থেকে কোনো স্ট্যাটাস পেলাম না। কি আশ্চার্য! ফুপু তোকে এত ভালোবাসতেন অথচ…” “আরে, ফোনটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এইমাত্র পেলাম। এখনই স্ট্যাটাস দিচ্ছি।” মিলন স্ট্যাটাস দিল— “ফুপু আমাকে নিজের সন্তানের মত কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন, তিনি আজ চিরদিনের মত হারিয়ে গেলেন।” লাইনটা মিলন কয়েকবার পড়ল। ভালোই হয়েছে। কাব্যিকতা আছে কথার ভেতর। সাথে একটা কান্নার ইমোজি দিয়ে লেখাটা মিলন পোস্ট করে দিল।   আজকাল কান্না-হাসি-আনন্দ-বেদনা ইমোজি দিয়েই সেরে ফেলা যায়। প্রাকটিক্যালি না করলেও চলে। তারপর ক্ষণে ক্ষণে লাইক-কমেন্ট দেখা। লাইক-কমেন্টের অবস্থা ভাল না। খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে।   আজকাল মানুষগুলো যেন বদলে গেছে। সবাই বড্ড আত্মকেন্দ্রিক। কারও দুঃখ-কষ্ট কাউকে স্পর্শ করে না সেভাবে। মৃত্যুর মতো একটা অমোঘ বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস, তাও লোকে লাইক দিতে চায় না, দু’টো কথা লিখে সান্ত্বনা দিতে চায় না।মানুষদের মন মরে যাচ্ছে।   যখন ফুপুর সব কার্যাদি শেষ করে তাকে কবরস্থানের দিকে বহন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন মিলন আরও একবার ফেসবুকের নোটিফিকেশন চেক করল—১৪৫টা লাইক আর ৬৭টা কমেন্ট। খুব কম।   একজন মানুষ চিরতরে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছেন, তার জন্য এই লাইক-কমেন্ট খুবই কম। মানুষের মন বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। মানুষগুলোর হৃদয় পাথর হয়ে যাচ্ছে।   ফুপুকে কবরে শুইয়ে দিয়ে ফেরার পথে সবার সাথে হাঁটতে হাঁটতে মিলন পিছিয়ে পড়তে লাগল। নিজের অজান্তেই তার পায়ের গতি শ্লো হয়ে যাচ্ছে।   পিছিয়ে পড়তে পড়তে মিলন একেবারে একা হয়ে গেল। আর তখনই তার ভেতর এক মহাশূন্যতা হাহাকার করে উঠল—ব্ল্যাকহোলের মত মহাশূন্যতা।   এই শূন্যতা যেন তাকে গিলে খাবে। কি একটা গাছ যেন। পাতা নেই। শুধু হিজিবিজি ডাল। সেই গাছের নিচে কোনো ঘাস নেই। ধুলো আর ধুলো। মিলন সেই ধুলোর উপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।   ফুপুর মুখটা চোখের পাতায় কেমন স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। সেই হাসি, সেই কন্ঠ, সেই আদোর-স্নেহ, সেইসব মায়াভরা স্পর্শ! মিলন পকেট থেকে ফোন বের করল। ফুপু বিষয়ক যত স্ট্যাটাস ছিল সব ডিলিট করে দিল। মনে মনে বলল—”এসবের কোনো মানে নেই।   আমি যা হারিয়েছি তা শুধু আমিই অনুভব করতে পারব। আর কেউ তা পারবে না। আমার শূন্যতা, আমার হারানোর কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা কারোই হবে না।   বাবাকে হারিয়েছি, মাকে হারিয়েছি, তবু আমার কিছু ছিল। আজ থেকে আমার আর কিছুই নেই। এই না থাকার কোনো সান্ত্বনা হয় না। ইমোজির কান্না দিয়ে এই কান্না প্রকাশযোগ্য নয়।” মিলন হাহাকার করে কাঁদতে লাগল।   আরও গল্প পড়ুন….

Scroll to Top