অনুভূতি
আবুল কালাম আজাদ
মিলনের ফুপু মারা গেছেন কিছুক্ষণ আগে। মিলন আতিউতি করে খুঁজছে তার মোবাইল ফোন। ফুপুকে নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেয়া দরকার।
যে কয়দিন ফুপু হাসপাতালে ছিলেন, বেশির ভাগ সময় মিলন ফুপুর পাশে থেকেছে।
ফুপুর চিকিৎসা নিয়ে ক্ষণে ক্ষণে আপডেট স্ট্যাটাস দিয়েছে। এখন ফুপুর মৃত্যু নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিতে না পারলে ব্যাপারটা খুব খারাপ দেখায়। নাকি মোবাইলটা কেউ নিয়ে গেল? আজকাল মানুষের ভেতর নীতিজ্ঞান বলে কিছু নেই।
অসুস্থ মানুষ,
এমনকি মৃত মানুষের ঘর থেকে একটা মোবাইল চুরি করার সুযোগ হাতছাড়া করবে না। মানুষগুলো দিন দিন লোভী ও স্বার্থপর হয়ে উঠছে।
এই ফুপু মিলনকে ছোটবেলায় অনেকদিন লালন-পালন করেছেন। মিলনের জন্মের পর ওর মা অনেকদিন খুব অসুস্থ ছিলেন।
মিলনের সেবাযত্ন তো দূরের কথা, কোলে পর্যন্ত নিতে পারতেন না।
এই ফুপু না থাকলে মিলনের বেঁচে থাকা অনিশ্চিত হয়ে যেত। তারপর থেকে মিলনের প্রতি ফুপুর কেমন অন্ধ স্নেহ-মায়া পড়ে যায়। নিজের ছেলে আর মিলনকে কখনোই আলাদা করে দেখতে পারেননি।
সেই মমতাময়ী ফুপুর মৃত্যুতে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিতে পারবে না—বিষয়টা খুব খারাপ দেখায়। লোকজন কী ভাববে?
এমন অবস্থায় মিলনের প্যান্টের পেছনের পকেটে ফোন বেজে উঠল। সে সাধারণত সামনের পকেটে মোবাইল ফোন রাখে।
পেছনের পকেটে কখন রেখেছে তা মনে নেই। ফোন করেছে মিলনের চাচাতো ভাই।
বলল— “কিরে মিলন, ফুপু নাকি মারা গেছে? তা তোর কাছ থেকে কোনো স্ট্যাটাস পেলাম না।
কি আশ্চার্য! ফুপু তোকে এত ভালোবাসতেন অথচ…”
“আরে, ফোনটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এইমাত্র পেলাম। এখনই স্ট্যাটাস দিচ্ছি।”
মিলন স্ট্যাটাস দিল— “ফুপু আমাকে নিজের সন্তানের মত কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন, তিনি আজ চিরদিনের মত হারিয়ে গেলেন।”
লাইনটা মিলন কয়েকবার পড়ল। ভালোই হয়েছে। কাব্যিকতা আছে কথার ভেতর। সাথে একটা কান্নার ইমোজি দিয়ে লেখাটা মিলন পোস্ট করে দিল।
আজকাল কান্না-হাসি-আনন্দ-বেদনা ইমোজি দিয়েই সেরে ফেলা যায়। প্রাকটিক্যালি না করলেও চলে। তারপর ক্ষণে ক্ষণে লাইক-কমেন্ট দেখা। লাইক-কমেন্টের অবস্থা ভাল না। খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
আজকাল মানুষগুলো যেন বদলে গেছে। সবাই বড্ড আত্মকেন্দ্রিক। কারও দুঃখ-কষ্ট কাউকে স্পর্শ করে না সেভাবে।
মৃত্যুর মতো একটা অমোঘ বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস, তাও লোকে লাইক দিতে চায় না, দু’টো কথা লিখে সান্ত্বনা দিতে চায় না।মানুষদের মন মরে যাচ্ছে।
যখন ফুপুর সব কার্যাদি শেষ করে তাকে কবরস্থানের দিকে বহন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন মিলন আরও একবার ফেসবুকের নোটিফিকেশন চেক করল—১৪৫টা লাইক আর ৬৭টা কমেন্ট। খুব কম।
একজন মানুষ চিরতরে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছেন, তার জন্য এই লাইক-কমেন্ট খুবই কম। মানুষের মন বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। মানুষগুলোর হৃদয় পাথর হয়ে যাচ্ছে।
ফুপুকে কবরে শুইয়ে দিয়ে ফেরার পথে সবার সাথে হাঁটতে হাঁটতে মিলন পিছিয়ে পড়তে লাগল। নিজের অজান্তেই তার পায়ের গতি শ্লো হয়ে যাচ্ছে।
পিছিয়ে পড়তে পড়তে মিলন একেবারে একা হয়ে গেল। আর তখনই তার ভেতর এক মহাশূন্যতা হাহাকার করে উঠল—ব্ল্যাকহোলের মত মহাশূন্যতা।
এই শূন্যতা যেন তাকে গিলে খাবে। কি একটা গাছ যেন। পাতা নেই। শুধু হিজিবিজি ডাল। সেই গাছের নিচে কোনো ঘাস নেই। ধুলো আর ধুলো। মিলন সেই ধুলোর উপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
ফুপুর মুখটা চোখের পাতায় কেমন স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। সেই হাসি, সেই কন্ঠ, সেই আদোর-স্নেহ, সেইসব মায়াভরা স্পর্শ!
মিলন পকেট থেকে ফোন বের করল। ফুপু বিষয়ক যত স্ট্যাটাস ছিল সব ডিলিট করে দিল।
মনে মনে বলল—”এসবের কোনো মানে নেই।
আমি যা হারিয়েছি তা শুধু আমিই অনুভব করতে পারব। আর কেউ তা পারবে না।
আমার শূন্যতা, আমার হারানোর কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা কারোই হবে না।
বাবাকে হারিয়েছি, মাকে হারিয়েছি, তবু আমার কিছু ছিল। আজ থেকে আমার আর কিছুই নেই।
এই না থাকার কোনো সান্ত্বনা হয় না। ইমোজির কান্না দিয়ে এই কান্না প্রকাশযোগ্য নয়।”
মিলন হাহাকার করে কাঁদতে লাগল।


