ভালোর সাথে মন্দ আসে

রানা জামান

কষ্টের অন্ত নেই শাহেদের। গায়ের রংটা বিচ্ছিরি রকমের কালো, নিগ্রোকেও হার মানায়।  মুখে লাবণ্যর পরিবর্তে ওমপুরির মতো মুখভর্তি ছোট ছোট গর্ত; একটা চোখের মণি শাদা। ডান পা টেনে হাঁটে আর বাম হাতের অনামিকা আঙ্গুলটা অনেক খাটো।

অমন দৈহিক ত্রুটি নিয়ে জন্মের জন্য ও দায়ি না থাকলেও সবাই প্রকারান্তরে ওকেই দোষারোপ করে।

অপরিচিত কেউ ওর দিকে তাকালে দ্রুত ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়।

অনেক ডাক্তারের সাথে আলোচনা করেও ওর খুঁতসমূহ প্লাস্টিক সার্জারি কিংবা অন্য কোনো কৃত্রিম পদ্ধতি প্রয়োগ করে সারানোর বা বাইরে যাবার সময় ঢাকার কোনো উপায় পাওয়া যায়নি। কী বলে শান্তনা দেবে মা-বাবা ওকে?

 

মা-বাবা কিছু বললে শাহেদ উল্টো ওঁদের উপর ক্ষোভপ্রকাশ করে। মা-বাবার কষ্টটা ও বুঝতে পারে না এবং মা-বাবা ওর কষ্ট বুঝতে পেরেও অসহায় অবস্থায় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শুধু।

ছোটবেলায় এতো স্পর্শকাতর ছিলো না শাহেদ। সহপাঠীরা খোঁচা মেরে কথা বললেও তেমন রা করতো না।

তবে একবার এক সহপাঠীকে মেরে মারাত্মক জখম করে ফেলেছিলো। সালিশে মা-বাবা ক্ষমা চেয়েও পার পান নি-স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছে।

পরের স্কুলে ভর্তির আগে খুব করে বুঝিয়েছে যে, এমনটা ফের করলে ওকে আর কোনো স্কুলে ভর্তি করা যাবে না; তখন ওকে গণ্ডমুর্খ হয়েই থাকতে হবে।

শারীরিক এই ত্রুটি থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো লেখাপড়া করে বড় বিদ্বান হওয়া।

 

একমাত্র উচ্চশিক্ষাই পারে শারীরিক ত্রুটি ঢেকে দিতে; যেমন বার্নার্ড শ এবং স্টিভেন হকিং। এই দুই জনের ছবি দেখে ও জীবনী শোনার পর শাহেদ শান্ত হয়েছে।

কিন্তু কলেজে উঠার পর বয়স্ক ক্লাশমেটদের টিটকারি ওর পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়লো।

তাই সে কলেজে যাওয়া বাদ দিয়েছে; বলা যায় লেখাপড়াই বাদ দিয়েছে।

ছোটকালে বার্নার্ড শ ও স্টিভেন হকিং-এর জীবনি শান্তনা দিলেও এখন আর তা পারছে না।

 

শাহেদ একা একা বনবাদাড়ে, কখনোবা নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়ায়। একদিন শাহেদ প্যান্টের পকেটে ডান হাত ঢুকিয়ে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছে ।

পথিমধ্যে একটা সাপকে চিৎ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে ভাবলো মরে আছে।পাশ কাটিয়ে যাবার সময় সাপটাকে নড়তে দেখে এক লাফে সরে গেলো দূরে।

সাপটা সোজা হয়ে ফণা তুলতে গিয়ে নেতিয়ে গেলো ফের। একটা কাঁটা দুই চোয়াল একত্রিত করে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে আছে।

 

মানে সাপটা আহত! দুধকলা দিয়ে পোষলেও একদিন সাপ ছোবল মারেই। একে সুস্থ করলে কী করবে ও? ওর জীবনের এমনিতেই কী মূল্য আছে?

এই উছিলায় মরে যেতে পারলে জীবনের সমাপ্তি হবে সহজেই। এটাই দরকার ওর!

শাহেদ সাপের মাথার কাছে বসে হাত রাখলো মাথায়। এক টানে বের করে ফেললো কাঁটাটা। একটা সজারুর কাঁটা!

 

কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে সাপটা সোজা হয়ে একবার ফোঁস করে মাথা নোয়ালো। শাহেদ অবাক হলো সাপের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে।

সাপটা খোলস ছেড়ে ইশারায় ওকে বললো খোলসটা গায়ে জড়াতে।

শাহেদ ভাবলো: যার জীবনের কোনো মূল্য নেই, সে সাপ হয়ে গেলে ক্ষতি কী!

শাহেদ সাপের খোলসটা জড়িয়ে দেখলো সাপটা ও টের পাচ্ছে কেমন যেনো পরিবর্তন হচ্ছে শরীরে।

 

বাম হাতের অনামিকা আঙ্গুলটা বেড়ে ডান হাতের অনামিকা আঙ্গুলের সমান হয়ে গেলে সাপের খোলসটা ঝরে পড়লো ওর গা থেকে।

আর কী পরিবর্তন হলো ওর শরীরে? হাতে তাকিয়ে বেশ অবাক: গায়ের রংটা মিশকালো থেকে আস্তে আস্তে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ হয়ে গেলো! মুখের কিছু হয়েছে কি?মুখে হাত দিলো শাহেদ। মুখের গর্তগুলো নেই।

অত্যন্ত খুশি মনে শাহেদ ফিরে এলো বাড়িতে। কলবেল টেপার পর দরজা খুললে মাকে খুশির খবরটা বলতে চাইলে গলা দিয়ে স্বর বের হলো না ওর!

 

বাংলা গল্প

শেয়ার করুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও লেখা:

Scroll to Top