অহংকার বেচে নিলামে
গল্প, শিক্ষণীয় গল্প

অহংকার বেচে নিলামে

অহংকার বেচে নিলামে আনোয়ার আল ফারুক এক. ভবনের নাম “অহংকার”। প্রথম নজরে অনেকে আবার অলংকারও পড়ে বসে। জেলা শহরে এই রকম আলিশান বাড়ি দু-চারটার বেশি নেই। ফেনী শহরের পশ্চিম উকিলপাড়ার দাউদপুরে এই বাড়ি। নব্বই দশকের শুরুর দিকে এই অঞ্চলে আধাপাকা, সেমিপাকা কিছু বাড়িঘর থাকলেও এত বিশাল অট্টালিকা আর দ্বিতীয়টি ছিল না। তাই প্রথম দেখায় এই ভবনটি সবার নজর কাড়ে। প্রধান সড়কের পাশঘেঁষা এই ভবনটি পথিকেরা একবার হলেও ঠায় দাঁড়িয়ে অপলক চোখে দেখে। বাড়ির সামনে রয়েছে বিশাল আঙিনা। দক্ষিণ পাশে একটি পুকুর, তারপর বিশাল বাগানবাড়ি। পুকুরের ঘাটে বসার জায়গাটা শ্বেত মার্বেল পাথরের নির্মিত। তাই এই বাড়ির রূপ-সৌন্দর্য যে কারো দৃষ্টি কাড়বে। বাড়ির মালিক আফজাল সাহেব তৎকালীন সড়ক ও জনপদ বিভাগের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। তাঁর রুজি-রুটি নিয়েও এলাকায় রয়েছে নানান কৌতুক। দশতলা বিশিষ্ট এই বাড়ির ২য় তলায় থাকেন আফজাল সাহেব ও তাঁর পরিবার। বাদবাকি ফ্লোরগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আফজাল সাহেবের এক ছেলে ও এক মেয়ে। তারা লেখাপড়ায় মাধ্যমিক ধাপ গড়ায়নি। এই নিয়েও আফজাল সাহেব প্রায় বড়াই করে বলেন, “আমার ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া না করলে কী হয়েছে? আমার যে সম্পদ আছে, তা তারা দশ জনম খেয়ে-পরে যেতে পারবে।” ইদানীং আফজাল সাহেবের বাড়ির প্রায় ফ্লোর খালি থাকছে। ভাড়াটিয়ারা এখানে খুব বেশিদিন টিকে না। দুই-তিন মাস থাকার পর অনেকেই বাসা ছেড়ে দেয়। এই বাড়ির নিয়মনীতি অবশ্যই বেশ জটিল। প্রথমে ভাড়াটিয়ারা আসলে এসব জটিল নিয়মকানুন গোপন রাখা হয়। বাসায় ওঠার পর একগাদা লিখিত নিয়মকানুন পড়ে তাদের অবহিত করে আসেন মিসেস আফজাল সায়েরা খানম। এখানে ভাড়াটিয়াদের বাসার ছাদ, উঠোনে, পুকুরঘাটে আসা-যাওয়া, বসা কিংবা পুকুরে গোসল করা শতভাগ নিষিদ্ধের আওতায়। অনেকে বাড়ির রূপ-সৌন্দর্যপূর্ণ পরিবেশ দেখে আকৃষ্ট হয়ে আসলেও পরে কিন্তু এসব কালাকানুন শুনে রীতিমতো থ বনে যান। আবার এক ভাড়াটিয়া অন্য ভাড়াটিয়ার বাসায়ও যেতে না পারা এখানের আরেকটি অলিখিত সাংবিধানিক মজবুত ধারা। মিসেস সায়েরা খানম এসব নিয়মকানুন সাংঘাতিকভাবে তদারকি করেন। সামান্য শব্দ কিংবা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ভাড়াটিয়াকে শাসিয়ে নেন দুস্তুরভাবে। আর এই ভবন নিয়ে শুনিয়ে দেন রুটিনমাফিক অহংকারের বেশ কিছু কমন পদাবলি। বৈশ্বিক করোনা মহামারি চলাকালীন নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে সামান্য হেরফের হওয়ায় বেশ কয়েকজন ভাড়াটিয়ার মালসামানা বাসায় রেখে তাদের বের করে বাসায় তালা ঝুলিয়ে দেন মিসেস সায়েরা খানম। এই ভাড়াটিয়াদের অনেকে আত্মসম্মানের দিকে তাকিয়ে কোনো রূপ উচ্চবাচ্য না করে মালসামানা রেখে বাসা ত্যাগ করে চলে যান। পরে এই মালসামানা মিসেস সায়েরা বেগম নিলামে বিক্রিও করেন। স্থানীয় একটা বেসরকারি স্কুলের একজন শিক্ষককে যথাসময়ের তিন দিন বেশি সময় ভাড়া দিতে অপারগতার কারণে আফজালুর রহমান ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেন। ওই মাস্টার সাহেব রাগে-ক্ষোভে ওই এলাকা ত্যাগ করেন। শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে সারাজনমের জন্য নিজ গ্রামে চলে যান। যাওয়ার সময় মিসেস সায়েরা খানম বলেন, “আপনার বাসার মালসামানা নিলামে বেচে বকেয়া বাসা ভাড়া উশুল করে নেব।” ওই মাস্টার সাহেব অনেকক্ষণ চুপ থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছলোছলো চোখে বলেন, “আজ হয়তো অহংকার ও ক্ষমতার দাপটে আমার মালসামানা নিলামে বেচে দেবেন, আর আল্লাহ চাইলে এর ব্যতিক্রমও হতে পারে। আপনার বাড়িটাও একসময় হয়তো নিলামে বেচা হয়ে যেতে পারে।” কোনো রূপ প্রতিত্তরের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই দু বছরের শিশুবাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এই দৃশ্য অন্য ভাড়াটিয়াদের হৃদয়ে ভীষণ দাগ কাটে এবং অনেকে নীরবে চোখের পানি ছাড়লেও এই অহংকারী, দাপুটে বাড়ির মালিকের সামনে টুঁ শব্দ করার সৎ সাহস করেননি। দুই আফজাল সাহেবের একমাত্র ছেলে রিফাত বাবার সঞ্চিত ব্যাংক ব্যালেন্স ও বাড়ি মর্টগেজ দিয়ে ব্যাংক থেকে বিশ লক্ষ টাকা নিয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন। শহরের জিরো পয়েন্টে এই নামিদামি রেস্টুরেন্ট প্রথমে বেশ জমে উঠলেও ব্যবসা না জানা, না বোঝার কারণে প্রথম বছরেই ব্যবসায় বিশাল লোকসানি গুনতে হয়। এখানে শুধু ব্যবসা না বোঝার দোষ না। রিফাত বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে সময়-অসময়ে আড্ডা ও জুয়ায় আসক্তিতে মজে ওঠে। এতে করে ব্যবসা ধ্বংস হয় এবং ঋণের বোঝা ফুলে-ফেঁপে বড় থেকে বড় হতেই লাগল। এই বোঝা হালকা করতে গিয়ে আফজাল সাহেব বাড়ির পৈত্তিক সম্পত্তি ঘরভিটাও বেচে দেন। বর্তমানে শহরের এই বাড়ি ছাড়া তাদের আর একতিল জমিও নেই। এদিকে বছরের অধিকাংশ সময় বাড়ির প্রায় ইউনিট ভাড়াহীন থাকায় তাদের দিনকাল খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। দুর্বিষহ জীবনযাপন করলেও বাইরের হাঁকডাক ঠিকই বজায় রাখছেন আফজাল সাহেব। সকালবেলায় কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় হাঁটছেন আফজাল সাহেব। টার্গেট পূর্ব পাড়ার নবি ব্যাপারির চা-দোকান। ওখানে বেলা পর্যন্ত চা পান করে আড্ডায় কাটিয়ে দেন আফজাল সাহেব। ক্রিং ক্রিং ক্রিং—বেজে উঠল আফজাল সাহেবের ফোন। রিসিভ করে ওপারের কথা শুনে যেন আফজাল সাহেবের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। থানায় থেকে ওসি সাহেব ফোন করছেন। তাঁর ছেলে রিফাতসহ দশজনের এক ডাকাত গ্রুপ হাইওয়ে গাড়ি ডাকাতিকালে র‍্যাবের হাতে ধরা পড়ে। র‍্যাব জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দি গ্রহণের পর থানায় হস্তান্তর করলে তার নামে নিয়মিত ডাকাতি মামলা রুজু হয়। আফজাল সাহেব রিকশায় চড়ে থানায় ছুটে যান। আইনের নিয়মে থানা রিফাতদের কোর্টে তুললে কোর্ট জামিন না মঞ্জুর করে জেলে পাঠিয়ে দেন। এদিকে গোটা এলাকায় এই সংবাদ অল্প সময়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়, জাতীয় পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরিচিতজনরা আফজাল সাহেবকে বিষয়টি জানতে ফোন করেন। আফজাল সাহেব লোকলজ্জায় নিজের ফোনের সিম বদলে ফেলেন। এই তো গত পনেরো- বিশ দিন আফজাল সাহেব ঘর থেকে খুব একটা বের হন না। জরুরি প্রয়োজনে হাটে কিংবা ছেলের জামিনে কোর্টে যেতে হলে কাজ সেরেই ফের নিভৃতে বাসায় ফেরেন। আফজাল সাহেব এই মানসিক চাপ একদমই নিতে পারছেন না। একদিকে ছেলের এই অবস্থা, অন্যদিকে দায়দেনার প্রচণ্ড চাপ। প্রতিদিন কেউ না কেউ আসছে পাওনা টাকার জন্য। কেউ কেউ টাকা আদায়ে মামলারও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। কী করবেন, কোথায় যাবেন—ভেবে দিশা পাচ্ছেন না আফজাল সাহেব। এদিকে কয়েক ডজন নোটিশের পর এক্সিম ব্যাংক, ফেনী শাখা ত্রিশ জুনের মধ্যে ব্যাংক লোনের সমুদয় টাকা পরিশোধের চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে। অন্যথায় ব্যাংক এই বাড়িটি নিলামে বিক্রি করে দেবে। এসব ভাবতে ভাবতে আফজাল সাহেব বারান্দায় পায়চারি করছেন। এমন সময় ফোন বেজে উঠলে ফোন রিসিভ করতেই ওপার থেকে তাঁদের আইনজীবী জানান, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে তাঁর চেম্বারে দেখা করতে। আফজাল সাহেব কোনো রকম প্রস্তুতি নিয়ে ছুটছেন জেলা জজকোর্টের দিকে। আফজাল সাহেব এখন বাসা আর কোর্টের বারান্দায় দিন কাটান। কোনো রকম তদবির করে হলেও ছেলের জামিনের জন্য ধারে-ধারে ঘুরছেন। পায়ের তলার জুতো ক্ষয় হচ্ছে, কিন্তু ছেলের জামিনের কোনো কুলকিনারা হচ্ছে না। চোখের পলকে যেন কেটে গেল দশটা বছর। এই দশ বছরে আফজাল সাহেবের ঋণের বোঝাও ঠিক আকাশ ছুঁইছুঁই। কী করার আছে তাঁর? তবুও তিনি ঘুরছেন একমাত্র ছেলের জামিনের জন্য। দীর্ঘসূত্রিতার পর আজ মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার কথা। আফজাল সাহেবের মন ধুকপুক করছে। মহামান্য জজ এজলাসে উঠেই নির্ধারিত এই মামলায় রায় পড়ে শোনান। রায়ে তাঁদের সবার বারো বছরের সাজা ঘোষণা করেন মহামান্য