হাসির গল্প

সমানে সমান
বিখ্যাতদের লেখা, হাসির গল্প

সমানে সমান

সমানে সমান জসীম উদ্দিন সমানে সমান ছোট্ট একটা নদী, হাঁটিয়াই পার হওয়া যায়। তার পশ্চিম পারে থাকে এক ট্যাটন, নাম ধূলি । পুব পারে থাকে আর এক ট্যাটন । তার নাম বালি । ট্যাটন মানে অতি চালাক। লোক ঠকাইয়া বেড়ানোই তাহার পেশা । বালি এক ছালা বিচেকলার বীজ মাথায় লইয়া নদীর ওপার দিয়া যাইতেছে। পশ্চিম পারের ট্যাটন ধূলি তেমনি আর এক ছালা গাবের পাতা মাথায় করিয়া নদীর এপার দিয়া যাইতেছে । কেউ কাহাকে জানে না ।   ধূলি বালিকে ডাক দিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার ছালায় কি লইয়া যাইতেছ ?” বালি উত্তর করিল, “একবস্তা গোলমরিচ লইয়া চলিয়াছি হাটে । তোমার মাথায় কি লইয়া যাইতেছ ভাই ?” ধূলি বলিল, “এক ছালা তেজপাতা লইয়া চলিয়াছি হাটে।”   সমানে সমান-জসীম উদ্দিন দুইজনে নদীর এপার ওপার পথ ধরিয়া চলিতেছে। আর প্রত্যেকে প্রত্যেকের বুদ্ধিতে শান দিতেছে, কি করিয়া একে অপরকে ঠাকইবে। ধূলি ভাবে, যদি আমার গাবের পাতার বস্তা বদল করিয়া ওর গোলমরিচের বস্তা লইতে পারিতাম! বালি ভাবে, যদি আমার কলার বীজের বস্তা বদল করিয়া ওর তেজপাতার বস্তা লইতে পারিতাম! কিন্তু কেউ কাহাকে কিছু বলে না, কেবল মনে মনে নানা ফন্দি ফিকির আঁটে। আর একথা সেকথা বলিয়া এ ওর আপন হইতে চায় ।   অনেকক্ষণ পর বালি ধূলিকে বলে, “আচ্ছা ভাই! তোমার সঙ্গে যখন এতই খাতির হইল, আইস আমরা একে অন্যের বোঝা বদলা-বদলি করি।” ধূলি ত তাহাই চায়! সে তাহার গাবের পাতার বস্তার বদলে যদি গোলমরিচের বস্তা লইতে পারে তবে ত পোয়াবারো । একটু কাশিয়া সে জবাব দেয়, “আগেকার দিনে রাজপুত্রেরা বন্ধুত্ব করিতে পাগড়ি বদল করিত, এসো ভাই আমাদের বন্ধুত্ব হোক ছালা বদল করিয়া ।” দুইজনেই দুইজনের কথায় খুশি ।   বালি তাহার কলাবীজের বস্তা বদল করিয়া ধূলির গাবের পাতার বস্তা লইল । এ বলে আমি ওকে ঠকাইয়াছি। ও বলে আমি তাকে ঠকাইয়াছি! সেইজন্য কেউ কারো বস্তা পরীক্ষা করিল না । বাড়িতে লইয়া গিয়া ধূলি দেখে, তার বস্তা ভরিয়া শুধু বিচেকলার বীজ। একটাও গোলমরিচের দানা নাই। বালি ও তেমনি দেখিল, তার বস্তা ভরিয়া শুধু গাবের পাতা। প্রত্যেকে মনে মনে হাসিল, আর এ ওর বুদ্ধির তারিফ করিতে লাগিল। কিন্তু দুইজনে মনে মনে ফন্দি আঁটিতে লাগিল, কি করিয়া একে অপরকে ঠাকইবে।   কে কত চালাক পরদিন ভোরবেলায় বালি নদীর ওপারে চুলা জ্বালাইয়া তার উপরে এক হাঁড়ি গরম পানি জ্বাল দিতে লাগিল। নদীর এপার হইতে ধূলি ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “দোস্ত! কি করিতেছ ?” বালি উত্তর করিল, “তোমার সঙ্গে গোলমরিচের বস্তা বদল করিয়া তেজপাতা লইয়া হাটে গিয়াছিলাম । আমার বেশ লাভ হইয়াছে । তাই সকাল সকাল ভাত রান্না করিতেছি।” ধূলি বলিল, “আমিও ভাই তোমার গোলমরিচ বেচিয়া বেশ কিছু পাইয়াছি। কিন্তু আমার ত চুলা নাই । আমার কাছে কিছু চাউল আছে। তোমার হাঁড়ির মধ্যে ছাড়িয়া দেই। দুইজনে একসঙ্গে ভাত খাইব ।”   বালি ভাবিল, “তা মন্দ কি! আমি ত শুধু পানি সিদ্ধ করিতেছি। ও যদি এর মধ্যে কিছু চাউল ছাড়িয়া দেয়, তবে ওর উপর দিয়াই আজিকার সকালের আহারটা সারিয়া লইব ।” প্রকাশ্যে বলিল, “তা বেশ ত তোমার চাউল লইয়া আইস। আমরা একসঙ্গে রান্না করিয়া খাই ।” নদীতে পানি অল্প । হাঁটিয়াই পার হওয়া যায়। এপার হইতে ধূলি আসিয়া সেই উনানের পাশে বসিল।   বালি যেই একটু ওদিকে তাকাইয়াছে, অমনি ধূলি তার কাপড়ের এক কানি একটা পোটলার মতো করিয়া ধরিল। যেন ধূলি বুঝিতে পারে, তার মধ্যে চাউল আছে । তারপর বালিকে বলিল, “দেখ— দেখ ভাই । অকাশ দিয়া কেমন একটা পাখি যাইতেছে।” পুব পারের ট্যাটন একটু চাহিয়াছে, অমনি ধূলি তার কাপড়ের পুটলি খুলিয়া হাঁড়ির মধ্যে চাউল ঢালিতেছে এরূপ ভান করিয়া কাপড় ঝাড়া দিতে লাগিল। তারপর হাঁড়ির মুখে ঢাকনি দিয়া দুইজন চুলায় জ্বাল দিতে লাগিল। অনেকক্ষণ চুলায় জ্বাল দিয়া যখন তাহারা ঢাকনি খুলিল, তখন দেখা গেল হাঁড়ির মধ্যে শুধুই গরম পানি সিদ্ধ হইতেছে। একটাও ভাত নাই । একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিয়া তাহারা সবই বুঝিতে পারিল ।   বালি তখন ধূলিকে বলিল, “দেখ ভাই ! এখন সত্যই বুঝিতে পারিলাম, আমরা কেহ কাহারও চাইতে বুদ্ধিতে কম না। আমাদের এই মূল্যবান বুদ্ধি একে অপরের উপর ছাড়িয়া শুধুই সময় নষ্ট করিতেছি। এসো আমরা সত্যিকার বন্ধু হই। আমাদের দুইজনের বুদ্ধি একসঙ্গে ব্যবহার করিলে আমরা অনেক লাভ করিতে পারিব।” ধূলি বলিল, “বেশ ভাই! আমি তাহাতে রাজি আছি ।”   তখন দুই বন্ধু অনেক পরামর্শ করিয়া এদেশ ছাড়িয়া বহু দূরে আর এক দেশে চলিয়া গেল । সেখানে যাইয়া শুনিল, এক বিদেশী সওদাগর কিছুদিন হইল মারা গিয়াছে । তাহার টাকা-পয়সার অন্ত ছিল না। আত্মীয়-স্বজনেরা তাহা ভাগ-বাটোয়ারা করিয়া লইয়াছে । চালাকির আরও নমুনা এক গাছতলায় বসিয়া দুই ট্যাটন নানারকম ফন্দি-ফিকির করিতে লাগিল । তারপর রাত্র হইলে সেই লোকটির কবর খুঁড়িয়া তার মধ্যে ধূলি লুকাইয়া রহিল ।   পরদিন সকালবেলায় বালি সেই সওদাগরের বাড়ির সামনে যাইয়া ডাক ছাড়িয়া কাঁদিতে লাগিল । তাহার কান্না শুনিয়া পাড়ার সকলে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কাঁদ কেন ?” সে বলিল, “এ বাড়ির সওদাগর সাহেব ছিলেন আমার পিতা। তাঁর মরার খবর শুনিয়া আমি অমুক দেশ হইতে আসিয়াছি। কিন্তু আমার পিতার সমস্ত সম্পত্তি অপরে দখল করিয়া লইয়াছে। আমার জন্য কিছুই রাখে নাই।” এই বলিয়া সে আবার কাঁদিতে লাগিল। বিদেশী লোক বলিয়া সবারই একটু দয়ার ভাব! আর লোকটি অমন ইনাইয়া বিনাইয়া কাঁদিতেছে! তাহার কান্না শুনিয়া সকলের চোখে পানি আসিল । কিন্তু সওদাগরের আত্মীয়-স্বজনেরা বলিল, “ও যে সওদাগরের ছেলে তার প্রমাণ কি ?” বালি তখন কান্না থামাইয়া বলিল, “আমার পিতা আমাদের দেশে যাইয়া আমার মাকে বিবাহ করিয়াছিলেন । তারপর এদেশে আসিয়া আমাদের খবর লন নাই। আমি বিদেশী লোক । প্ৰমাণ কোথায় পাইব ? মৌলবি সাহেবেরা বলেন, মরা ব্যক্তির জান তার কবরের মধ্যে লুকাইয়া থাকে। আপনজনের ডাকে তাহারা কখনও কখনও গায়েবি আওয়াজ করিয়া থাকেন। আসুন আপনারা আমার সঙ্গে । বাপজানের কবরের কাছে যাইয়া একবার তাহাকে ডাক দেই। যদি তিনি কথা বলেন, তবে প্রমাণ হইবে আমি তাঁর সত্যিকার ছেলে ।” একথা শুনিয়া সকলেই রাজি হইল। কবরের কাছে আসিয়া বালি ডাক ছাড়িয়া কাঁদিতে লাগিল, “বাপজানগো! তুমি মরিয়া গিয়াছ। আমাকে কিছু দিয়া যাও নাই। আমি যদি তোমার সত্যিকার ছেলে হই, তবে আমার ডাকে সাড়া দাও।” গাঁয়ের লোকেরা অবাক হইয়া শুনিল, কবরের ভিতর হইতে গোঁ গোঁ আওয়াজ হইতেছে। বালি তখন বলিল, “বাপজানগো ! তোমার টাকা-পয়সা সকলে ভাগ করিয়া লইয়াছে । আমার কিছুই নাই । আমাকে কিছু দিয়া দাও ।” কবরের ভিতর হইতে ধূলি আওয়াজ করিল, “ও আমার সত্যিকার ছেলে। তোমরা ওকে সাত ছালা টাকা দাও। নতুবা তোমাদের খুব খারাপ হইবে।” সওদাগরের আত্মীয়-স্বজনেরা গ্রামবাসীদের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া বালিকে সাত ছালা টাকা দিয়া দিল। সেই টাকা গনিয়া গাঁথিয়া ছালায় পুরিয়া একটা গরুর গাড়িতে বোঝাই করিয়া বালি বাড়ি রওয়ানা হইল । ধূলি কবরের মধ্যেই পড়িয়া রহিল। একবারও বালি তাহার কথা মনে করিল না। দুপুরবেলায়, যখন কবরের কাছে কোনো জনমানব নাই, সেই সময় ধূলি কবর হইতে উঠিয়া জানিল, বালি আগেভাগেই টাকা লইয়া চলিয়া গিয়াছে । সে তখন শহরের দোকান হইতে খুব দামি একজোড়া জরির জুতা কিনিল ; তারপর যে পথ দিয়া বালি গরুর গাড়ি লইয়া গিয়াছিল, তাহারই চাকার দাগ দেখিয়া দৌড়াইতে লাগিল । অল্পক্ষণের মধ্যে সে বালির কাছাকাছি আসিয়া পৌঁছিল এবং অন্য পথে ঘুরিয়া দৌড়াইয়া তার খানিকটা সামনে যাইয়া একখানা জরির জুতা পথের মধ্যে রাখিয়া দিল । তারপর আরও মাইল খানেক

গোপালের পড়া
বিখ্যাতদের লেখা, বিখ্যাতদের লেখা গল্প, হাসির গল্প

গোপালের পড়া

গোপালের পড়া সুকুমার রায় দুপুরের খাওয়া শেষ হইতেই গোপাল অত্যন্ত ভালোমানুষের মতন মুখ করিয়া দু-একখানা পড়ার বই হাতে লইয়া তিনতলায় চলিল। মামা জিজ্ঞাসা করিলেন, কিরে গোপলা, এই দুপুর রোদে কোথায় যাচ্ছিস? গোপাল বলিল, তিনতলায় পড়তে যাচ্ছি। মামা: পড়বি তো তিনতলায় কেন? এখানে বসে পড় না। গোপাল: এখানে লোকজন যাওয়া-আসা করে, ভোলা গোলমাল করে, পড়বার সুবিধা হয় না। মামা: আচ্ছা, যা মন দিয়ে পড়গে। গোপাল চলিয়া গেল, মামাও মনে মনে একটু খুশি হইয়া বলিলেন, যাক, ছেলেটার পড়াশুনোয় মন আছে। এমন সময় ভোলাবাবুর প্রবেশ বয়স তিন কি চার, সকলের খুব আদুরে। সে আসিয়াই বলিল, দাদা কই গেল? মামা বলিলেন, দাদা এখন তিনতলায় পড়াশুনা করছে, তুমি এইখানে বসে খেলা কর। ভোলা ততক্ষনাৎ মেঝের উপর বসিয়া প্রশ্ন আরম্ভ করিল, দাদা কেন পড়াশুনা করছে, পড়াশুনা করলে কি হয়? কি করে পড়াশুনা করে? ইত্যাদি। মামার তখন কাগজ পড়িবার ইচ্ছা, তিনি প্রশ্নের চোটে অস্থির হইয়া শেষটায় বলিলেন, আচ্ছা ভোলাবাবু, তুমি ভোজিয়ার সঙ্গে খেলা কর গিয়ে, বিকেলে তোমায় লজেঞ্চুস এনে দেব। ভোলা চলিয়া গেল। আধঘণ্টা পর ভোলাবাবুর পুনঃপ্রবেশ। সে আসিয়াই বলিল, মামা, আমিও পড়াশুনা করব। মামা বলিলেন, বেশ তো আর একটু বড় হও, তোমায় রঙচঙে সব পড়ার বই কিনে এনে দেব। ভোলা: না সেরকম পড়াশুনা নয়, দাদা যে রকম পড়াশুনা করে সেইরকম। মামা: সে আবার কি রে? ভোলা: হ্যাঁ, সেই যে পাতলা-পাতলা রঙিন কাগজ থাকে আর কাঠি থাকে, আর কাগজে আঠা মাখায় আর তার মধ্যে কাঠি লাগায়, সেই রকম। দাদার পড়াশুনার বর্ণনা শুনিয়া মামার চক্ষু স্থির হইয়া গেল। তিনি আস্তে আস্তে পা টিপিয়া টিপিয়া তিনতলায় উঠিলেন, চুপি চুপি ঘরের মধ্যে উঁকি মারিয়া দেখিলেন, তাঁর ধনুর্ধর ভাগ্নেটি জানালার সামনে বসিয়া একমনে ঘুড়ি বানাইতেছে। বই দুটি ঠিক দরজার কাছে তক্তপোশের উপর পড়িয়া আছে। মামা অতি সাবধানে বই দুখানা দখল করিয়া নিচে নামিয়া আসিলেন। খানিক পরে গোপালচন্দ্রের ডাক পড়িল। গোপাল আসিতেই মামা জিজ্ঞাসা করিলেন, তোর ছুটির আর কদিন বাকি আছে? গোপাল বলিল,আঠারো দিন। মামা: বেশ পড়াশুনা করছিস তো? না কেবল ফাঁকি দিচ্ছিস? গোপাল: না, এইতো এতক্ষণ পড়ছিলাম। মামা: কি বই পড়ছিলি? গোপাল: সংস্কৃত। মামা: সংস্কৃত পড়তে বুঝি বই লাগে না? আর অনেকগুলো পাতলা কাগজ, আঠা আর কাঠি নিয়ে নানা রকম কারিকুরি করার দরকার হয়? গোপালের চক্ষু তো স্থির ! মামা বলে কি? সে একেবারে হতভম্ব হইয়া হাঁ করিয়া মামার দিকে তাকাইয়া রহিল। মামা বলিলেন, বই কোথায়? গোপাল বলিল, তিনতলায়। মামা বই বাহির করিয়া বলিলেন, এগুলো কি? তারপর তাহার কানে ধরিয়া ঘরের এক কোণে বসাইয়া দিলেন। গোপালের ঘুড়ি লাটাই সুতো ইত্যাদি সরঞ্জাম আঠারো দিনের জন্য মামার জিম্মায় বন্ধ রহিল। লেখা ও ছবি: সংগৃহীত বাংলা গল্প

ব্যাঙের সমুদ্র দেখা
গল্প, নির্বাচিত লেখা, হাসির গল্প

ব্যাঙের সমুদ্র দেখা

ব্যাঙের সমুদ্র দেখা সুকুমার রায় (জাপানী গল্প) গ্রামের ধারে কবেকার পুরান এক পাতকুয়োর ফাটলের মধ্যে কোলাব্যাং তার পরিবার নিয়ে থাকত। গ্রামের মেয়েরা সেখানে জল তুলতে এসে যেসব কথাবার্তা বলত কোলাব্যাঙ তার ছেলেদের সেইসব কথা বুঝিয়ে দিত—আর ছেলেরা ভাবত ‘ইস্‌! বাবা কত জানে!’ একদিন সেই মেয়েরা সমুদ্রের কথা বলতে লাগল। ব্যাঙের ছানারা জিজ্ঞাসা করল—”হ্যাঁ বাবা! সমুদ্র কাকে বলে?” ব্যাঙ খানিক ভেবে বলল, “সমুদ্র? সে একরকম জন্তুর নাম।” তখন একটা ছানা বলল—”ওরা যে বলছিল সমুদ্র খুব ভয়ানক বড় হয়, আর তার মধ্যে অনেক জল থাকে—আর লোকেরা সাঁতার কেটে তা পার হতে পারে না।” তখন কোলাব্যাঙ মুশকিলে পড়ল। সে গাছপালা দেখেছে, বাড়িঘর দেখেছে—মানুষ কুকুর ঘটি বাটি নানারকম জিনিসপত্র দেখেছে, আর ছেলেবেলায় অনেকরকম জিনিসের গল্প শুনেছে। কিন্তু সমুদ্রের কথা ত কখন শোনেনি! তখন সে ভাবল সমুদ্রের কথা একটু খোঁজ করে দেখতে হবে। পরদিন সকালে উঠেই কোলাব্যাঙ তার ছাতা পোঁটলা নিয়ে বলল, “আমি সমুদ্রের সন্ধান করতে যাচ্ছি।” তার গিন্নী কত কাঁদল, ছেলেরা নানারকম সুর করে তাকে বারণ করল কিন্তু কোলাব্যাঙ বলল, “না, এতে আমার জ্ঞানলাভ হবে—তোমরা বাধা দিও না।” এই বলে সে পাতকুয়ো থেকে উঠে একটা মাঠের দিকে চলল। ব্যাঙ বাইরে এসেই দেখে মানুষ কুকুর গরু তারা কেউ তার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে চলে না—তাই দেখে সে ভাবল ‘লাফিয়ে চললে সবাই আমায় বেকুব ভাববে।’ এই ভেবে সে হেঁটে হেঁটে চলতে লাগল। কিন্তু অমন করে চলে ত তার অভ্যাস নেই—খানিক গিয়েই তার ভারই পরিশ্রম বোধ হল। মাঠের ওপারে আর এক গ্রামের কাছে এক গর্তের মধ্যে মেতে ব্যাঙদের বাসা ছিল। মেটে ব্যাঙেরাও সমুদ্রের কথা শুনেছে, তাই তাদের মধ্যে একজন বেরিয়েছে সমুদ্রটা দেখতে। মাঝখানে দুই ব্যাঙের দেখা হল। কোলাব্যাঙ বলল, “আমি ফাটল-কুয়োর কোলাব্যাঙ, যাচ্ছি সমুদ্রে।” মেটে ব্যাঙ বলল, “আমি মেঠো-ব্যাঙ, আমিও যাচ্ছি সমুদ্রে।” তখন তাদের ভারি ফূর্তি হল। কিন্তু সমুদ্রে যাবার পথ ত তারা জানে না। মাঠের মধ্যে একটা মস্ত ঢিপি ছিল; মেটে ব্যাঙ বলল, “ওর উপরে উঠে দেখি ত কিছু দেখা যায় কিনা।” এই বলে তারা অনেক কষ্টে সেই ঢিপির উপর চড়ে সেখান থেকে একটা গ্রাম দেখতে পেল। মেটে ব্যাঙ বলল, “আরে দুর ছাই! এরকম ত ঢের দেখেছি! আমার বাড়ির কাছেই ত অমন আছে।” কোলাব্যাঙ বলল, “তাই ত! আমিও ছেলেবেলা থেকে ওরকম কত দেখেছি। সব জায়গাই দেখছি একরকম। মিছামিছি আমরা হেঁটে মরলাম।” তখন তারা ভারই বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। কোলাব্যাঙ তার ছানাদের বলল, “সমুদ্র টমুদ্র কিছু নেই—ওসব মিছে কথা!”

Scroll to Top