ভালোবাসা ফেরত হয় না
জাকিয়া শিমু
মায়ামি কোর্টে আজ একটি বিশেষ মামলার রায় হয়। আমি বাদীপক্ষ, এবং রায়ে আমি হেরে গেছি। কিন্তু রায় শেষে কোর্টের বাইরে সকল মিডিয়া আমাকে দমকলের মতো ঘিরে ধরে। এরা তোলপাড় কাণ্ড শুরু করে দেয়। আমার অত্যধিক প্রশংসা করে সরাসরি লাইভে চলে যায় এবং আমাকে অবাক করে দিয়ে সে লাইভে মুহূর্তে মিলিয়ন ভিউয়ার্স যুক্ত হয়ে পড়ে! অবশ্য এই মামলার শুরু থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম কভার করছিল। তাই বলে এত মানুষ রায় শুনতে উন্মুখ হয়ে আছে, ধারণা করিনি। এমনতর মামলা মানুষের জীবনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে-এসবই এরা বলছিল! তাদের নানান প্রশ্নের উত্তরে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আমাকে ফিরতে হয় অতীত দিনের কাছে।
নিঃসন্তান খালার আশ্রয়ে কিশোরীকাল পার করি। পনের বছর বয়সে খালার পরামর্শে ড্যানিয়েল গ্যাপের মতো দুর্গম পথ পেরিয়ে উরুগুয়ে থেকে আমেরিকায় আসি। স্বজন-পরিজনহীন এক দেশে খালি হাতের সেইসব দিনের অভিজ্ঞতা গল্পকেও হারিয়ে দেয়। নামমাত্র বেতনে এক গ্রোসারি স্টোরে কাজ পাই। সে দোকানের নিয়মিত ক্রেতা হোজে। একদিন আগবাড়িয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করে। তার ব্যবহারে মুগ্ধ হই। ধীরে ধীরে আমাদের বন্ধুত্ব হয়।
কাগজপত্রহীন আমি আমেরিকায় কোনোমতে টিকে থাকার একটা পথ খুঁজছি। হোজের এসব বিষয়ে বেশ জানাশোনা। সে নিজেও অবৈধ পথে এসে গ্রিন কার্ড পেয়েছে। বর্তমানে একটি কোম্পানির সুপারভাইজার। অল্পসময়ে তার সাহায্যে তার কোম্পানিতে একটি কাজ পেয়ে যাই। একই শিফটে কাজ করি এবং অবসরে আমরা বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াই। একসময়ে আমাদের প্রেমের সম্পর্ক হয়। আমরা এক কামরার একটি বাসা নিয়ে একত্রে বাস করতে শুরু করি। স্বর্গসুখে আমাদের দিন কাটে। এক বছরের মাথায় আমাদের মেয়ে আরিয়ানার জন্ম হয়। আমাদের তিনজনের নির্ভার একটি সংসার হয়।
প্রকৃতি একটানা সুখ সহ্য করে না। আরিয়ানার দু’বছরের মাথায় সুস্থ-সবল হোজের কিডনি বিকলের রোগ ধরা পড়ে! এবং তা দ্রুত ট্রান্সপ্ল্যান্টের পরামর্শ দেয়। সাধারণ সিস্টেমে কিডনি পেতে বছর পাঁচেক সময় লাগে। ডাক্তার নিজেদের মধ্যে থেকে কাউকে ডোনেট করার পরামর্শ দেন। হোজের পরিবারের কেউ কিডনি দিতে রাজি হয় না ওদিকে সপ্তাহের মধ্যে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট না করা গেলে হোজেকে বাঁচানো যাবে না।
হোজেকে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসি। হোজের ভালোবাসা ছাড়া আমার কিংবা আমার মেয়ের বেঁচে থাকা অসম্ভব।
মনস্থির করি, আমিই কিডনি দেব। দ্রুত টেস্ট করাই এবং আমার সঙ্গে কিডনি মিলে যায়। ডাক্তারের নির্দেশমতো অপারেশন শেষ হয়। প্রচণ্ড ধকল শেষে দু’জন সুস্থ হয়ে আমাদের স্বর্গের সংসারে ফিরে যাই। ডাক্তার আমাদের ছ’মাসের বিশ্রামের নির্দেশ দেন, কিন্তু হোজেকে সে সুযোগ দিয়ে আমি এক মাসের মাথায় কাজে ফিরতে বাধ্য হই! বাড়তি কাজ করে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করি।
এরমধ্যে প্রতিবেশীর কাছে হোজের এক বান্ধবীর খোঁজ পাই। আমি কাজে থাকি। আমার মেয়ে ডে-কেয়ার সেন্টারে থাকে। সে সুযোগে মেয়েটি আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া করে। ক্রমে হোজের মধ্যেও বিস্তর পরিবর্তন লক্ষ করি। আমার কিংবা আমাদের মেয়ের সংস্পর্শে সে অতিশয় বিরক্ত হয়। একদিন আমার শরীর খারাপ লাগাতে অবেলায় বাড়ি ফিরে হোজেকে তার বান্ধবির সঙ্গে আপত্তিকর হালে দেখতে পাই। অত্যন্ত অসম্মানিত হই। মর্মাহত হই।
এরপর একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছি। হোজেকে দান করা কিডনিটি কেবল আমার শরীরের একটি অংশ নয়। সেটা ছিল তার প্রতি আমার সর্বোচ্চ ভালোবাসার পবিত্র অর্ঘ্য। লম্পটের শরীরে আমার ভালোবাসার অংশ থাকতে পারে না। ধূর্ত প্রবঞ্চকের কাছে ভালোবাসায় সিক্ত পরশখণ্ড কিডনিটি বড্ড বেমানান। এ মর্মে আমার কিডনি ফেরত চেয়ে মায়ামি কোর্টে একটি মামলা করি হোজের বিরুদ্ধে । এবং দীর্ঘ তিন বছর পর আজ মামলার রায় হয়। রায়ে বলা হয়, ‘ভালোবাসা ফেরতযোগ্য নয়!’
এই বিভাগের আরও লেখা:
পাহাড়ের ভেতর লুকানো আলো
নীল খাম
স্বর্গ কার্ড, নরক কার্ড