কবিতা

বাংলা কবিতা সমাহার

বাংলা কবিতা মানুষের অনুভূতি, প্রেম, প্রকৃতি, জীবনবোধ ও সমাজচেতনার গভীর প্রকাশ। কালের সাঁকোর কবিতা বিভাগে প্রকাশিত হয় নতুন বাংলা কবিতা, আধুনিক কবিতা, প্রেমের কবিতা, প্রকৃতির কবিতা, দেশপ্রেমের কবিতা এবং বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কবিদের নির্বাচিত রচনা। পাঠকদের জন্য নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে মৌলিক ও মানসম্মত বাংলা কবিতার সমৃদ্ধ সংগ্রহ।

পথহারা
কবিতা

পথহারা

পথহারা কাজী নজরুল ইসলাম বেলা শেষে উদাস পথিক ভাবে, সে যেন কোন অনেক দূরে যাবে – উদাস পথিক ভাবে। ‘ঘরে এস’ সন্ধ্যা সবায় ডাকে, ‘নয় তোরে নয়’ বলে একা তাকে; পথের পথিক পথেই বসে থাকে, জানে না সে কে তাহারে চাবে। উদাস পথিক ভাবে। বনের ছায়া গভীর ভালোবেসে আঁধার মাথায় দিগবধূদের কেশে, ডাকতে বুঝি শ্যামল মেঘের দেশে শৈলমূলে শৈলবালা নাবে – উদাস পথিক ভাবে। বাতি আনি রাতি আনার প্রীতি, বধূর বুকে গোপন সুখের ভীতি, বিজন ঘরে এখন সে গায় গীতি, একলা থাকার গানখানি সে গাবে – উদাস পথিক ভাবে। হঠাত্‍ তাহার পথের রেখা হারায় গহন বাঁধায় আঁধার-বাঁধা কারায়, পথ-চাওয়া তার কাঁদে তারায় তারায় আর কি পূবের পথের দেখা পাবে উদাস পথিক ভাবে।     বাংলা কবিতা

কবিতা

অভিশাপ

অভিশাপ কাজী নজরুল ইসলাম যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে! অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুঁছবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে। ছবি আমার বুকে বেঁধে পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে ফিরবে মরু কানন গিরি, সাগর আকাশ বাতাশ চিরি’ যেদিন আমায় খুঁজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! স্বপন ভেঙ্গে নিশুত রাতে, জাগবে হঠাৎ চমকে’ কাহার যেন চেনা ছোঁয়ায় উঠবে ও-বুক ছমকে’- জাগবে হঠাৎ চমকে’! ভাববে বুঝি আমিই এসে বসনু বুকের কোলটি ঘেঁষে ধরতে গিয়ে দেখবে যখন- শুন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন! বেদনাতে চোখ বুঁজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিঁড়ে আসবে যখন কান্না, বলবে সবাই- “সেই যে পথিক তার শোনানো গান না?-” আসবে ভেঙ্গে কান্না! প’ড়বে মনে আমার সোহাগ, কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ! পড়বে মনে আমার ফাঁকি অশ্রু-হারা কঠিন আঁখি ঘন ঘন মুছবে, বুঝবে সেদিন বুঝবে! আবার যেদিন শিউলী ফু’টে ভরবে তোমার অঙ্গন, তুলতে সে-ফুল গাঁথতে মালা, কাঁপবে তোমার কঙ্কণ- কাঁদবে কুটীর -অঙ্গন, শিউলী ঢাকা মোর সমাধি প’ড়বে মনে উঠবে কাঁদি’! বুকের মালা ক’রবে জ্বালা, চোখের জলে সেদিন বালা মুখের হাসি ঘুচবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! আসবে আবার আশিন হাওয়া, শিশির-ছেঁচা রাত্রি, থাকবে সবাই- থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রী! আসবে শিশির-রাত্রি! থাকবে পাশে বন্ধু-স্বজন, থাকবে রাত বাহুর বাধন, বঁধুর বুকের পরশনে আমার পরশ আনবে মনে- বিষিয়ে ও-বুক উঠবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! আসবে তোমার শীতের রাতি, আসবে না ক’ আর সে- তোমার সুখে পড়ত বাঁধা থাকলে যে-জন পার্শ্বে, আসবে না ক’ আর সে, পড়বে মনে, মোর বাহুতে মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে, মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়!- সেই স্মৃতি নিত এ-বিছানায় কাঁটা হয়ে ফুটবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে। আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে, সেই তরীতে হয়তো কেহ থাকবে তোমার সঙ্গে- দুলবে তরী রঙ্গে। প’ড়বে মনে, সে কোন রাতে এক তরীতে ছিলে সাথে, এমনি গাঙে ছিল জোয়ার নদীর দু’ধার এমনি আঁধার তেমনি তরী ছুটবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে। তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ, আমার মত কেঁদে কেঁদে হয়তো হবে অন্ধ- সখার কারা-বন্ধ! বন্ধু তোমার হানবে হেলা, ভাঙ্গবে তোমার সুখের মেলা; দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর, বইতে প্রাণের শ্রান্ত এ-ভার মরণ-সনে বুঝবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে। ফুটবে আবার দোলন-চাঁপা, চৈতি-রাতের চাঁদনী, আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদনি- চৈতী-রাতের চাঁদনী। ঋতুর পরে ফিরবে ঋতু, সেদিন হে-মোর সোহাগ-ভীতু! চাইবে কেঁদে নীল নভোগা’য় আমার মতন চোখ ভ’রে চায় যে-তারা, তায় খুঁজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! আসবে ঝড়ি, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন কাঁপবে কুটীর সেদিন ত্রাসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন- টুটবে যবে বন্ধন! পড়বে মনে, নেই সে সাথে বাধতে বুকে দুঃখ- রাতে।- আপনি গালে যাচবে চুমা, চাইবে আদর, মাগবে ছোঁওয়া, আপনি যেচে চুমবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! আমার বুকের যে কাঁটা ঘা তোমায় ব্যথা হানত, সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়তো হ’য়ে শ্রান্ত- আসব তখন পান্থ। হয়তো তখন আমার কোলে সোহাগ লোভে প’ড়বে ঢ’লে, আপনি সেদিন সেধে-কেঁদে চাপবে বুকে বাহুয় বেঁধে, চরন চু’মে পূজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে !     বিখ্যাতদের লেখা কবিতা

সাম্যবাদী
কবিতা

সাম্যবাদী

সাম্যবাদী কাজী নজরুল ইসলাম গাহি সাম্যের গান— যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম ক্রিশ্চান। গাহি সাম্যের গান! কে তুমি?— পার্সি? জৈন? ইহুদি? সাঁওতাল, ভীল, গারো? কন্ফুসিয়াস্? চার্বাক— চেলা? বলে যাও, বল আরও! বন্ধু, যা খুশি হও, পেটে-পিঠে, কাঁধে-মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও, কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক— জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থ-সাহেব পড়ে যাও যত সখ,— কিন্তু কেন এ পণ্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল? দোকানে কেন এ দর-কষাকষি?— পথে ফোটে তাজা ফুল! তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান, সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ! তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার, তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকলের দেবতার। কেন খুঁজে ফের দেবতা-ঠাকুর মৃত-পুথি-কঙ্কালে? হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে! বন্ধু, বলিনি ঝুট, এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন, বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা-ভবন, মস্জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়, এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়। এই রণ-ভূমে বাঁশির কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা, এই মাঠে হলো মেষের রাখাল নবিরা খোদার মিতা। এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি। এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান, এইখানে বসি গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান! মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নাই।     জোনাকিরা কবিতা

Scroll to Top