নীল খাম
দেবাঞ্জন মোদক
স্টেশনের বেঞ্চে বসে ছিল অমল। হাতে একটা নীল খাম। খামের ওপর প্রেরকের নাম নেই। শুধু লেখা, ‘যে অপেক্ষায় আছে তার জন্য।’
অমলের বয়স ষাট পেরিয়েছে। রিটায়ার্ড পোস্টমাস্টার। চাকরিজীবনের শেষ দিনে টেবিলের ড্রয়ার গোছাতে গিয়ে এই খামটা পেয়েছিল। তিরিশ বছর আগের খাম। সিল করা। কারও দাবি আসেনি কোনোদিন।
নিয়ম বলে, বেওয়ারিশ চিঠি পুড়িয়ে ফেলতে হয়। কিন্তু অমল পারেনি। মনে হয়েছিল, এই চিঠির একটা গল্প আছে।
আজ রবীন্দ্রজয়ন্তী। স্টেশনে ভিড়। শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস একটু পরেই ছাড়বে। অমল ঠিক করেছে, আজ খামটা খুলবে। তিরিশ বছরের অপেক্ষার শেষ হবে আজ।
খাম খুলতেই বেরোল একটা হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—
‘মালতী,
তুই চলে যাওয়ার পর বাবা আমাকে জোর করে কলকাতায় পাঠিয়ে দিল। বলল, গান গেয়ে পেট চলবে না।
আমি পালিয়ে এসেছি। আজ রাতের ট্রেনে বোলপুর যাচ্ছি। কোপাইয়ের ধারে যে বকুল গাছটা, ওখানে সন্ধ্যায় দাঁড়াব।
তুই যদি আসিস, দুজনে শান্তিনিকেতনে ভর্তি হব। গানই আমাদের ভাত-কাপড় হবে। যদি না আসিস, বুঝব তোর বাবাই ঠিক।
ইতি—
তোর অতীন’
অমলের বুকটা ধক করে উঠল। মালতী। এই নামটা সে চেনে। স্টেশনের পাশেই মালতীদির চায়ের দোকান।
পঞ্চাশ বছর ধরে চা বেচছে। বিয়ে করেনি। সবাই বলে, মালতীদির নাকি এককালে গানের গলা ছিল খুব।
অমল ছুটল দোকানে। উনুনের ধারে বসে মালতীদি চা ছাঁকছে। চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু চোখ দুটো এখনও শান্ত দিঘির মতো।
— দিদি, এই চিঠিটা কি তোমার?
মালতী কাগজটা হাতে নিল। চোখ বোলাল। তারপর অনেকক্ষণ চুপ। শুধু উনুনের কাঠ পটপট করে ফুটল।
— কোথায় পেলেন, মাস্টারমশাই? গলাটা কাঁপল।
— আমার টেবিলে তিরিশ বছর ঘুমিয়ে ছিল, দিদি।
মালতী হাসল। সে হাসিতে জল আর রোদ্দুর একসঙ্গে খেলছে।
— সেদিন বাবা ঘরে তালা দিয়ে রেখেছিল। আমি জানালা দিয়ে দেখেছিলাম, অতীন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে একটা নীল খাম। ট্রেন ছেড়ে গেল। ও আর ফিরে আসেনি। আমি ভেবেছিলাম, ও ভুলে গেছে।
— আর অতীনদা? অমল জিজ্ঞেস করল।
— শুনেছিলাম, কলকাতার এক কলেজে গান শেখাত। বিয়ে করেনি। দুবছর হলো শান্তিনিকেতনে একটা গানের স্কুল খুলেছে। ‘কোপাই’ নাম।
অমলের হঠাৎ মনে পড়ল। গত মাসে পোস্ট অফিসে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, কাঁধে ঝোলা।
একটা রেজিস্ট্রি করতে দিয়েছিলেন। প্রাপকের নাম: মালতী দাস, স্টেশন চা দোকান। ভদ্রলোক বলেছিলেন, ‘খুব জরুরি চিঠি। তিরিশ বছর লেট।’ অমল তখন বোঝেনি।
— দিদি, তোমার নামে একটা রেজিস্ট্রি এসেছে গত সপ্তাহে। তুমি নাওনি?
মালতী চমকে উঠল।
— আমার নামে? কে পাঠাবে? আমার তো কেউ নেই।
— আছে, দিদি। তুমি পোস্ট অফিসে চলো আমার সঙ্গে।
পোস্ট অফিসে ধুলো জমা রেজিস্ট্রির বান্ডিল থেকে খামটা বের করল অমল। এবার খামের ওপর প্রেরকের নাম স্পষ্ট: শ্রী অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সঙ্গীত ভবন, কোপাই, শান্তিনিকেতন।
কাঁপা হাতে খাম খুলল মালতী। ভেতরে একটা ছোট্ট চিরকুট আর একটা টিকিট।
‘মালতী,
তিরিশ বছর আগে কোপাইয়ের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তুই আসিসনি। রাগ করিনি। ভয় পেয়েছিলাম, যদি তোকে পেয়ে যাই, তবে গানকে হারিয়ে ফেলব। আজ বুড়ো হয়েছি।
বুঝেছি, গান আর তুই আলাদা না। এই তিরিশ বছরে যত গান বেঁধেছি, সব তোর জন্য।
এক সপ্তাহ পর রবীন্দ্রজয়ন্তী। কোপাই স্কুলে আমার শেষ গানের ক্লাস। তুই যদি একবার আসিস, আমি ‘আমার মাথা নত করে দাও’ গাইব। শুধু তোর জন্য।
টিকিট পাঠালাম। জানি, তুই আসবি। কারণ তিরিশ বছর আগে যে ট্রেনটা মিস করেছিস, সেটা আজও স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে।
ইতি—
তোর গানপাগল অতীন’
স্টেশনে তখন শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস হুইসেল দিচ্ছে। মালতী টিকিটটা বুকে চেপে ধরল।
— মাস্টারমশাই, দোকানটা একটু দেখবেন? আমি আসছি।
অমল দেখল, পঞ্চাশ বছরের চায়ের দোকানি শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুঁজে ট্রেনের দিকে ছুটছে।
যেন এক কিশোরী। তিরিশ বছরের অপেক্ষা শেষে সে আজ তার গানের ক্লাসে যাচ্ছে।
অমল নীল খামটা পকেটে ভরল। ডিউটি শেষ। এবার সে চিঠিটা পুড়িয়ে ফেলতে পারবে। কারণ চিঠি তার ঠিকানায় পৌঁছে গেছে।
স্টেশনের মাইকে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে— ‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়…’
আরও বাংলা গল্প পড়ুন
