গিট্টুভূতের রাস্তা কাণ্ড-১

চন্দনকৃষ্ণ পাল

 

১.
বারান্দাতেই গিট্টুর সাথে দেখা হয়ে যায় চান্দুমামার।মামাকে বারান্দায় দেখেই আওয়াজ দেয় গিট্টু।

– শুভ বিকেল মামা।

– ও গিট্টু! মেজাজটা খুব খারাপ রে বাপ।

– কেন মামা ?

– আর কেন? রাস্তার অবস্থা দেখেছিস? সবাই মিলে সমস্ত নিচু জমি ভরাট করে ফেলেছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেস ভরাট করেছে রেলের জমি।

বনরূপাসহ অন্যান্য কোম্পানিও চারপাশের জমে ভরাট করে ফেলেছে। এখন পানি যাবার কোন রাস্তা নেই।

সব পানি রাস্তায় আর গলিতে। পানি থাকতে থাকতে রাস্তায় ভয়াবহ গর্ত।অটো উল্টাচ্ছে রিক্সা উল্টাচ্ছে।

এইমাত্র রাস্তার পচা পানিতে ডুব দিয়ে এলাম। সারা শরীরে দুর্গন্ধ।

– আহা মামা খুব বাজে অবস্থা তো আপনার। তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকেন।

– হ্যাঁ দেখার কেউ নেই রে গিট্টু। কেউ নেই। প্রতিদিন অফিস যেতে আসতে চরম ভোগান্তি।

– কিন্তু মামা লেকসিটির কাছে ব্রীজের পাশে দেখলাম পাইপ ফেলেছে। পাইপলাইন বসাবে।

মাটি কাটার মেশিনও এনেছে একটা।

– শুনেছি কিন্তু তাতে কী? একটা মেশিনে মাটি কাটলে এই তিন কিলোমিটার রাস্তা কেটে পাইপ বসাতে তিন বছর লাগবে।

এই তিন বছরে আমরা তো শেষ।

– তাহলে?

– তাহলে আর কী? আমি এ এলাকা ছেড়ে দিবো।

– এটা কোন সমাধান হলো মামা?

– তো আমি কী করবো। নেতারা তো চুপচাপ। ঠিকাদারকে কে বলবে যে দ্রুত কাজ করতে, বেশি মেশিন আর লোকজন নিয়োগ করতে।

আমরা জিম্মি হয়ে আছি তাদের কাছে। অসহায় মানুষদের কপালে দুর্ভোগই থাকে।

এটা ধানমন্ডি, গুলশান বা বারিধারা হলে দেখতে কতো দ্রুত কাজ হয়। আমাদের কপালই এমন।

২.
গিট্টু খুব চিন্তায় পড়ে যায়। কী করা যায়? সারা খিলক্ষেতের মানুষ কষ্ট করছে গত এক বছর ধরে। আগে রাস্তার দুই এক জায়গায় গর্ত হতো, পানি জমতো।

এখন পুরো এলাকা পানির নীচে। চিন্তিত মনে বাইরে বের হয় গিট্টু। লেক সিটির পূর্ব পাশের ব্রীজের গোড়ায় এসে দাড়ায় ও।

একটা মাত্র মেশিন দিয়ে একটু একটু করে মাটি কাটা হচ্ছে। সারাদিনে একটার বেশি পাইপ বসাতে পারবে বলে মনে হয় না।

একটা ভূড়িওয়ালা লোক দূরে দাড়িয়ে কাজ দেখাশুনা করছে। পাশের এক দোকানদার লোকটার কাছে এসে দাঁড়ায়।

– স্লামালেকুম ঠিকাদার সাব।

– ওয়ালাইকুম সালাম। উত্তর দেন ভূড়িওয়ালা ঠিকাদার সাব।

– মাত্র একটা মেশিনে তো পুরা কাজ করতে কয়েক বছর লাগবে।

– তো?

– মেশিন বাড়ান, লোকজন বাড়ান…।

– আপনের কথায়? জ্ঞান দিয়েন না তো ভাই।

খেঁকিয়ে ওঠে ভূড়িওয়ালা।

– ওই চালায়ে যা আমি বিকালে আসমু আবার।

গটগট করে পূর্বপাড়ার দিকে হাঁটতে থাকে ঠিকাদার। গিট্টু তার পিছন পিছন হাঁটতে থাকে। পূর্বনামা পাড়ার জমকালো বাড়িটার দোতলায় উঠে পড়ে লোকটা। গিট্টু তার বাসাটা চিনে ফিরে আসে।

৩.
লোকটাকে সাইজ করা দরকার। তাকে বুঝানো দরকার যে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। পানি নেমে যাবার খাল যারা ভরাট করেছে তাদেরও বুঝানো দরকার। একটা রিয়েল এস্টেট কোম্পানী খালসহ জমি ভরাট করায় পানি নামতে পারছে না। প্রথমে ঐ কোম্পানীর সাইট অফিসে একটা ঢুঁ মারা যায়। রাতে অপারেশন ভূড়িওয়ালা। কার্যক্রম ঠিক করে মনে একটু শান্তি পায় গিট্টু। দিনের বেলা সাইট অপারেশন।

বোটঘাট এসে লেকসিটির দিকে হাঁটে গিট্টু। শত শত লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। অটো রিক্সা নেই। কোথাও হয়তো অটো গর্তে পড়ে রাস্তা জ্যাম হয়ে আছে। এটা এখন নিয়মিত ঘটনা। লেক সিটির পর রিয়েল এস্টেট এর অফিস।

অদৃশ্য হয়ে অফিসে ঢুকে পড়ে গিট্টু।লোকজন তেমন নেই। অফিসার গোছের একজন মোবাইল টিপছে। কাছে গিয়ে তাকায় গিট্টু। ফেসবুকে ব্যস্ত সে। তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে। অনেক জোরে দরোজাটা লাগিয়ে দেয় গিট্টু। লোকটা চমকে ওঠে। বাতাস নেই কোন মানুষও নেই। নিজে নিজে দরোজাটা লেগে যওেয়ার রহস্যটা বুঝতে পারে না লোকটা। সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে সে-

– কে? কে?

– আমি। মিহি গলায় উত্তর দেয় গিট্টু।

লোকটা চমকে গিয়ে চারদিকে তাকায়। কাউকে দেখতে পায় না। ফলে ভীষণ রকম ভড়কে যায় সে।

– দেখতে পাবি না। ভূত কি দেখা যায়? যায় না। তবে অজ্ঞান হবি না কিন্তু। হলে মেরে ফেলবো। আমি কী বলি সেটা মনোযোগ দিয়ে শুনবি। আর যা বলি সে মত কাজ শুরু করবি এখনি।

লোকটা নির্বাক হয়ে ফ্যলফ্যাল করে তাকায়। কিন্তু কিছুই দেখতে পায় না।

– মনোযোগ দিয়ে শোন। খিলক্ষেতের পানি যাবার বোয়ালিয়া খালের মুখ তোরা ভরাট করে ফেলেছিস। এই মূহুর্তে লোক লাগিয়ে সেটা কেটে দিবি আর যেখানে যেখানে পানি যাবার পথ বন্ধ আছে সকল পথ নিজ দায়িত্বে খুলে দিবি। না হলে তোদের কোম্পানীর মালিকসহ সবকটা আজ রাতেই সাবাড় করে দিবো।
লোকটা কাঁপতে শুরু করে।

– এই কাঁপবি না। নো কাঁপাকাপি।

– জী বস… জী বস.. এখনি করছি বস..।

– ওকে গুডবাই। আমি কিন্তু খেয়াল রাখছি।
৪.
গিট্টু বেরিয়ে আসে। এখন দেখার পালা লোকটা একশনে যায় কি না। গিট্টু আস্তে আস্তে বোয়ালিয়া খালের কাছে এসে দাঁড়ায়। ব্রীজের রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে মাটি ভরাট করা খালের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে জনা দশেক লোক ঝুড়ি ও কোদাল নিয়ে কাজে লেগে যায়। সাইট অফিসের লোকটি ভীত চোখে এদিক ওদিক তাকায়।

মজা দেখতে দু’একজন করে লোক জড়ো হতে শুরু করে। সন্ধের দিকে প্রবল বেগে খিলক্ষেতের পানি নামতে শুরু করে।

গিট্টু চিৎকার দিয়ে ওঠে, হুররে….!

৫.
সন্ধে হয়েছে অনেকক্ষণ। নামাপাড়ার বিলাসবহুল বাড়ির বারান্দায় অদৃশ্য হয়ে অপেক্ষা করছে গিট্টু। শেষ লোকটা ভূড়িওয়ালার রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই গিট্টু ঢুকে পড়ে।ওকে দেখেই কর্কশ গলায় ধমকে ওঠে ভূড়িওয়ালা।

– তুই কে রে ? কিভাবে ঢুকলি?

– আমি কে সেটা বড় কথা নয়। যেটা বলছি সেটা মন দিয়ে শুনুন। বোয়ালিয়া খালের মুখ কাটা হয়েছে খিলক্ষেতের পানি নামতে শুরু করেছে। কাল থেকে মাটি কাটার মেশিন তিন থেকে চারটা লাগাবেন। প্রয়োজন মতো লোক নিয়োগ দিবেন। তিনমাসের মধ্যে পাইপ লাইনের কাজ শেষ করবেন। ফাইনাল বলে গেলাম। না হলে ঘাড়ে মুণ্ডু থাকবে না। আমি গিট্টু ভূতের বাদশাহ। বাচ্চা দেখা গেলেও এটা আমার আসল রুপ নয়। আমি আশে পাশেই থাকবো আগামী তিনমাস। নো টেনশন। আপনারা ভাবেন ভূত নেই, ভূত কিন্তু আছে। কোন কথা চলবে না। কোন অন্যায় নয়। আগামীকাল সকাল থেকে পুরো দমে কাজ শুরু না করলে রাতে কী হবে? ঘাড়ে মুণ্ডু…।

বলেই অদৃশ্য হয়ে যায় গিট্টু।

৬.
পরদিন খুব ভোরে দুটি মাটিকাটার আধুনিক মেশিন খিলক্ষেতের লেকসিটির দিকে যেতে দেখা যায়। রঙধনু টুইন টাওয়ারের নয় তলার বারান্দায় বসে চান্দুমামার সাথে আড্ডা দিতে দিতে গিট্টু বলে- ‘দিন ফিরে যাচ্ছে মামা। ঐ দেখেন।’

চান্দুমামা অবাক হয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

 

গল্পের ঢালি

শেয়ার করুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও লেখা:

Scroll to Top